Thursday, September 20, 2018

Columbian Exchange




ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত ইউরোপ বা এশিয়ার বা আফ্রিকার মানুষ ভুট্টা কি জিনিস,
খায় নাকি মাথায় দেয় !!
সেটা জানতো না...

ভুট্টা ছিল আমেরিকা উপমহাদেশের আদি অধিবাসীদের অন্যতম প্রধান খাদ্য...
কেবল ভুট্টা নয়...
সুন্দর সুন্দর লাল লাল টমেটো খেতে কত ভালোই না লাগে... এই টমেটো আমেরিকা উপমহাদেশ (উত্তর+দক্ষিন আমেরিকা) আবিষ্কারের পর এসেছে...
প্রথমে লাল লাল টমেটো দেখে ইউরোপিয়ানরা ভেবেছিলো, হয়ত বিষাক্ত কিছু হবে...

যারা 'বাদশাহনামদার' পড়েছেন, তারা মরিচের ব্যাপারটা জানেন। কাচা মরিচও এসেছে আমেরিকা উপমহাদেশ থেকে। মোঘল সম্রাট বাবর বা মঙ্গল সম্রাট চেঙ্গিস খানও মরিচ খেতে পারেননি। তাদের রান্নাবান্না হইতো গোল মরিচ দিয়ে...

আলু... এই আলু না হলে আমাদের এখন চলেই না। অথচ এই আলু ছিল ইনকা'দের খাবার... দক্ষিন আমেরিকা থেকে কেবল কচুরি পানা নয়, আলুও এসেছে...
পিন্যাট, মিষ্টি কুমড়া, সিম (সিমের বিচি অনেক সুস্বাদু) ... এমনকি চলকেটের cacao beans ...
এসব আমরা পেয়েছি আমেরিকা আবিষ্কারের পর...
"আমরা" বলতে বোঝাচ্ছি, Old World অর্থাৎ ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, এসব মহাদেশের মানুষদের...

ওদিকে আমেরিকা উপমহাদেশের কোথাও তখনও গরু, ছাগল, ঘোড়া, শুকর, ভেড়া, এসবকিছু ডমেস্টিকেশন করা হয়নি...
অবশ্য হবে কিভাবে...
আমেরিকাতে ঘোড়া ছিল না। গাধা ছিল না। ছিল বাইসন... বাইসন আবার আটল্যান্টিকের এপাশে পাওয়া যেত না।
ছিল না গরু... ছিল না ছাগল...
মুরগী কিছু ছিল.. কিছু ফসিল ইদানিং পাওয়া গেছে... . কিন্তু মুরগী পালন হইতো না।
আমেরিকা উপমহাদেশের নাম্বার ওয়ান গৃহপালিত পশু ছিল Llama
লামা অনেকটা ছাগলের মতই...
লামা'র পিঠে চড়া যায় না,
লামা হালও টানতে পারে না।
ইউরোপ এশিয়ার চাষাবাদের সাথে এজন্য আদি আমেরিকার মানুষের চাষাবাদের পদ্ধতিতে আকাশ পাতাল ব্যবধান ছিল...

আমেরিকা আবিষ্কারের পর একটা দীর্ঘ সময় ইউরোপিয়ানরা কাঠের চাহিদা মিটিয়েছে আমেরিকা উপমহাদেশের গাছ পালা দিয়ে।
কাঠ তখন ছিল ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি।

আমাদের সিভিলাইজেশনের সাথে আমেরিকা মহাদেশের সিভিলাইজেশনের কার্যত আগে কোনো কানেকশন ছিল না। বা ছিল বলে জানা নেই।
ওদের সভ্যতা স্বতন্ত্রভাবেই গড়ে উঠেছিল।
আর আগেই বললাম, আমেরিকা মহাদেশে ঘোড়া ডমেস্টিকেশন করা হয়নি তখনও।
সুতরাং পরিবহন ব্যবস্থাতে ওরা ছিল অনেক পিছিয়ে। আর একারণে খোদ উত্তর আমেরিকার সিভিলাইজেশনগুলোর সাথে দক্ষিন আমেরিকার অনেক সিভিলাইজেশনের ভেতর কানেকশনও ছিল একেবারেই কম...

ইউরোপিয়ানরা আমেরিকাতে গম চাষাবাদ শুরু করে। আজ গাঁজা চাষ হয় দক্ষিন আমেরিকার সর্বত্র... এই গাঞ্জা চাষ আমেরিকাতে শুরু করেছিল ইউরোপিয়ানরাই।
ওদিকে আমেরিকা থেকে ইউরোপ পেয়েছিল টোবাকো...
প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত ইউরোপিয়ানরা সহজেই পেরেছিলো নেটিভদের স্লেভ বানিয়ে টোবাকো, আখ আর তুলার ক্ষেতে খাটাতে।

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা যে Quinine ব্যবহার করা হয়, সেটা প্রথম পাওয়া গিয়েছিল cinchona গাছ থেকে। এটা গাছ আমেরিকাতে পাওয়া যেত।
ইন্টারেস্টিং বিষয় হল, রোগের মেডিসিন আটল্যান্টিকের ওপাড়ে ছিল। আর রোগটা ছিল কিন্তু এপাড়ে।
রোগের মেডিসিনের এক্সচেঞ্জ যেমন হয়েছিল, রোগেরও তো হয়েছিল। আর আদি আমেরিকানদের কাছে ম্যালেরিয়া রোগের কোনো চিকিৎসা ছিল না। প্রচুর মানুষ মরেছিল ম্যালিরিয়া সহ নানান রোগ ভুগে।
তবে অসুখ বিসুখের কথা যখন আসলো, তখন বলি সিফিলিসের কথা। এই ভয়াবহ রোগটা কলম্বিয়ান এক্সেঞ্জের আগে ইউরোপিয়ানদের কাছে অপরিচিত ছিল। এই রোগ এসেছিলো আমেরিকা থেকে।

আজ যে টার্কি (মোরগের মত) আমাদের দেশেও পালন করা হচ্ছে, এই টার্কি কিন্তু তুরস্ক থেকে নয়, বরং এই টার্কি এসেছিল আমেরিকা থেকে।
মেক্সিকানরা প্রথম টার্কি ডমেস্টিকেট করেছিল।

প্লেগ, চিকেনপক্স, ম্যালেরিয়া, কলেরা, এসব ভয়াবহ রোগ বালায়ের তেমন কোনো চিকিৎসা আদি আমেরিকানরা জানতো না। এসব রোগ তাদের ছিল না। ইউরোপিয়ানরা আমেরিকায় গেলে এসব রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আদি আমেরিকানদের একটা বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল এসব রোগ ব্যাধি মহামারিতে।

reference:
https://en.wikipedia.org/wiki/Columbian_exchange
https://newsmaven.io/indiancountrytoday/archive/10-indigenous-foods-thought-to-be-european-uTmaPLGaLUa33WWgvgmSVQ/
Read More »

Tuesday, September 18, 2018

নর্থ কোরিয়ার স্পাই Ok Hwa


মহিলার নাম Kim Hyon-hui (aka "Ok Hwa")


ছবিতে তার মুখে ব্যান্ডেজ টাইপের কিছু একটা দেখতেছেন... শুনে অবাক হবেন হয়ত, তার মুখের ভেতর ছোট একটা ডিভাইজ ভরে এরপর মুখ শক্ত করে বেধে রাখা হয়েছে, যাতে সে নিজের জিভ চিবিয়ে রক্তক্ষরণে আত্মহত্যা করতে না পারে !

মহিলা নর্থ কোরিয়ান স্পাই এজেন্সি SSD -এর এজেন্ট... ১৯৭৩ সালে নর্থ কোরিয়ান এই এজেন্সি প্রতিষ্ঠিত হয় কেজিবি'র হুবহু অনুকরণে... এবং প্রকাশ্য সহায়তায়...

শুরু থেকেই এই এজেন্সি নানাবিধ কুখ্যাত কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। যেমন নানান সময়ে প্রায় এক ডজনের উপর জাপানি নাগরিক কিডন্যাপ করেছিলো জাস্ট নিজেদের স্পাইদের জাপানি শেখানোর জন্য !

এটা জাস্ট একটা উদাহরণ... এমন আরো অনেক কর্মকান্ড আছে।

তো ১৯৮৮ সালের কথা...
১৯৮৮ সালের সামার অলিম্পিক আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিলো দক্ষিণ কোরিয়া।
স্বাভাবিকভাবেই নর্থ কোরিয়ার ইগোতে লাগলো ব্যাপারটা। সাউথ কোরিয়াতে কিছুতেই অলিম্পিক আয়োজন করতে দেয়া যাবে না। যদি করতেই হয়, ইউনিফাইড কোরিয়াতে আয়োজন করতে হবে!
অর্থাৎ মামার বাড়ির আবদার...

তো এই অলিম্পিক ঠেকাতে হবে।
এখনকার নর্থ কোরিয়ার লিডার কিম জন উনের বাপ কিম জং লি তখন নর্থ কোরিয়ান সিক্রেট সার্ভিস ডিভিশনের দায়িত্ব। আর তার বাবা কিম এল স্যান তখনও নর্থ কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার।

অর্ডার এলো, সাউথ কোরিয়াকে ঝুকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। তাহলেই নিরাপত্তার অনুহাতে অলিম্পিক বয়কট করবে অধিকাংশ দেশ...

তো এই মহিলা এবং তার আরেকজন পুরুষ সহযোগীর উপর দায়িত্ব এলো, সাউথ কোরিয়া গামী একটা কোরিয়ান বিমান উড়িয়ে দেবার। ফলাফল, বাহরাইন থেকে সিউল যাবার পথে Korean Air Flight 858 বিমান বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হল। ১১৫ জন মারা গেল।

এই মহিলা এবং তার পুরুষ সহযোগি ফেক জাপানি পাসপোর্ট নিয়ে ঘুরতেন। ফেক আইডেন্টি তো ছিলোই। যারা স্পাই এজেন্সির কার্যক্রম সম্পর্কে হালকাপাতলা ধারণা রাখেন, তাদের এসব না বললেও চলবে।

প্রথমে গেলেন সার্বিয়া। সেখানে নিযুক্ত নর্থ কোরিয়ান স্পাইদের কাছ থেকে পেলেন বোমা... একটা রেডিওর ভেতর এই বোমা লুকানো ছিল। এরপর সেই বোমা নিয়ে বাহরাইন এলেন। বাহরাইন থেকে সিউলগামী KAF 858 বিমানের এক যাত্রীর সাথে সক্ষতা করে এরপর কোনোএক উপায়ে সেই রেডিও ঢুকিয়ে দিলেন লাগেজে। হয়ত কাউকে কনভিন্স করে বলেছিলো, কোনো আত্মীয় স্বজনের জন্য এটা ক্যারি করে নিয়ে যেতে।
ব্যস, এরপর বিমান আকাশে ওঠা মাত্র সবশেষ...

যাই হোক, ঘটনা ঘটানোর পর বাহরাইন থেকে মহিলা পালাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বাহরাইন পুলিশ মহিলাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় উনার সাথে যে পুরুষ সহযোগী ছিল, সে সাইনাইড খেয়ে আত্মহত্যা করে। সিগারেটের ভেতর সাইনাইড লুকানো ছিল।
আর এই মহিলা সাইনাইড ঠিকমত গিলতে পারেননি। পুলিশ বাধা দিয়েছিলো। এরপর মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে ট্রিটমেন্ট করা হয়। এবং দক্ষিন কোরিয়ান এজেন্সির লোকেরাও ততক্ষণে হাজির। মহিলাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় সাউথ কোরিয়াতে।
ছবিগুলো সাউথ কোরিয়াতে নিয়ে আসার সময় তোলা।
মহিলাকে ঘিরে আছে সাউথ কোরিয়ার এজেন্টরা।


মহিলার বিচার হয়। বিচারে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
যদিও সে বছরই দক্ষিন কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট তাকে ক্ষমা করে দেন। দিয়ে বলেন, 'Kim was merely a brainwashed victim of the real culprit, the North Korean government."

মহিলা পরবর্তীতে একটা বই লিখেছিলেন। নিজের আত্মজীবনী, নাম The Tears of My Soul
এই বই থেকে বিক্রি হওয়া সব টাকা পয়সা দান করেছিলেন ১১৫ জন নিহতের পরিবারগুলোকে।

মহিলার কেস যে দক্ষিন কোরিয়ান এজেন্ট হ্যান্ডেল করেছিলেন, তাকেই তিনি পরে বিয়ে করেন !
এরপর দুইটা সন্তানও হয়েছে তাদের।

শুরুতে বলেছিলেন, প্রায় ১৩ জন জাপানি নাগরিক কিডন্যাপ করেছিলো নর্থ কোরিয়ার গোয়েন্দা বাহিনী... ১৯৭৩ থেকে ৮৩ সালের মধ্যে।
এদের একজন ছিলেন Yaeko Taguchi
ছবির এই মহিলা যখন গোয়েন্দা ট্রেনিং প্রোগ্রামে নাম লিখান, তখন উনার প্রশিক্ষকদের ভেতর একজন ছিলেন Yaeko Taguchi

মাঝেমাঝে দুনিয়ার অনেককিছু শ্রেফ সিনেমার মত। বা সিনেমার চেয়েও বেশি সিনেম্যাটিক।

Read More »

Friday, September 14, 2018

Shin Sang-ok and Choi Eun-hee


সাউথ কোরিয়ান মুভি যারা দ্যাখেন, তারা ভালো করেই জানেন সাউথ কোরিয়ান মুভির কোয়ালিটি সম্পর্কে...

তো ছবিতে যে মহিলাকে দেখছেন, উনার নাম Shin Sang-ok ,

ষাট আর সত্তরের দশকে ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে নামকরা নায়িকা...

আর যে ভদ্রলোক'কে দেখছেন, উনার নাম Choi Eun-hee
ভদ্রমহিলার হাজবেন্ড, এবং নামকরা পরিচালক...


তো কোরিয়ান যুদ্ধের পর বিভক্ত দুই কোরিয়ার যাত্রা ছিল বিপরীতমুখী... দক্ষিণ কোরিয়া যখন মার্কিন ব্লকের ছায়াতলে উন্নত থেকে আরো উন্নত হচ্ছে, উত্তর কোরিয়া তখন এক প্যারানয়েড রিজিমের ক্ষপড়ে পড়ে মাফিয়া স্টেটে পরিনত হয়েছে।

বর্তমান নর্থ কোরিয়ান সুপ্রিম লিডার কিম জন উনের বাবা কিম জন লি তখন নর্থ কোরিয়ার প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার, এবং সেইসাথে স্পাই এজেন্সির দায়িত্বে।

ওদিকে তার বাবা অর্থাৎ এখনকার নর্থ কোরিয়ান লিডারের দাদা কিম এল স্যান তখন নর্থ কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার...


সালটা তখন ১৯৭৮...

ঘটনার পটভুমি হল, নর্থ কোরিয়ান লিডার কিম জন ইল ছিলেন সাইকোপ্যাথ। প্যারানয়েড। (তার ছেলেও বাপের গুনাবলি পেয়েছে)

তো কিম জন ইল ছোটবেলা নিজের ছোটভাইকে মেরে ফেলেছিলেন সুইমিংপুলে চুবিয়ে...
ছোটবেলা থেকে সুপ্রিম লিডারের ছেলে হবার কারণে জীবনে কেউ তাকে "না" বলেনি।
ফলাফল, ছিলেন বদরাগী... বেয়াদপ... স্পয়েল্ড চাইল্ড।
নর্থ কোরিয়াতে কোনো পশ্চিমা মুভি সার্কুলেট করা ছিল অপরাধ। কিন্তু কিম জন ইল ঠিকই পশ্চিমামুভি দেখতেন। হলিউড, বলিউড, দক্ষিন কোরিয়ান মুভি গিলতেন। এলভিস প্রিসলি হবার চেষ্টা ছিল তার।
এজন্য তার বাপ তাকে বয়সকালে প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার বানিয়ে দেন। :P অর্থাৎ, নে... এবার যত পারিস, মুভি বানা।
তবে কিমের মাথায় ভালোই শয়তানি বুদ্ধি ছিল। আজ আমরা কিম এল স্যান বা কিম জন ইলের যে কাল্ট অফ পার্সোনালিটি দেখি, সেটার রুপকার ছিল এই কিম জন ইল...
নিজের বাপকে রীতিমত ভগবান, আর নিজেকে ভগবানের অবতার বানিয়ে ছেড়েছিলেন কিম...
অর্থাৎ প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার হিসেবে গোসেপ গর্বলসের চেয়ে কোনো অংশে কম সফল নন তিনি।


কিন্তু একটা দেশে ট্যালেন্ট জন্মাতে গেলে তো চিন্তার স্বাধীণতা, জ্ঞান অর্জনের স্বাধীনতা দিতে হয়। নর্থ কোরিয়াতে সেটা ছিল না। এজন্য নর্থ কোরিয়াতে দক্ষিন কোরিয়ার মত ফ্লিম ডিরেক্টর বা এক্টরের জন্মও হত না ওভাবে।
ফলাফল, সাউথ কোরিয়ান ফ্লিম ইন্ড্রাস্ট্রি যেখানে সারা দুনিয়াতে নাম কামাচ্ছিলো, সেখানে নর্থ কোরিয়ান ফ্লিম ইন্ড্রাস্ট্রি অংকুরেই বিনষ্ট হবার দশা। কিছু প্রোপাগান্ডা মুভি বানানো ছাড়া তেমন কোনো কাজই ছিল না।

তো নিজের যখন নেই, তাহলে যার আছে, তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আসতে হবে,
এই ছিল কিম জন ইলের ধান্দা।
সাউথ কোরিয়ান নামকরা নায়িকা Shin Sang-ok কে পছন্দ করতেন কিম। উনি ছিলেন কিমের ক্রাশ।

ফলাফল, একদিন সাউথ কোরিয়ান গোয়েন্দা বাহিনী লাগিয়ে হংকং থেকে রীতিমত কিডন্যাপ করে ভদ্রমহিলাকে উত্তর কোরিয়াতে নিয়ে যাওয়া হল।
হংকং এর এক সমুদ্র সৈকত থেকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। কিডন্যাপারা এসেছিলো সমুদ্র হয়ে। স্পিডবোর্ডে। এরপর সেই স্পিডবোর্ডে করেই তাকে সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সোজা নর্থ কোরিয়াতে।
:P কিছুদিন পর ভদ্রমহিলার স্বামী অর্থাৎ বিখ্যাত পরিচালক Choi Eun-hee কে কিডন্যাপ করা হল একই কায়দায়।

ভদ্রমহিলাকে নিয়ে যাওয়া হয় কিম জন ইলের কাছে। সেখানে কেটে যায় তিনটি বছর।
ওদিকে ভদ্রমহিলার হাজবেন্ডকে নিয়ে যাওয়া হয় জেলখানায়। সেখানে তিন বছর ধরে উনার উপর চলে নির্যাতন। তিন বছর নির্যাতন সহ্য করে অবশেষে তিনি রাজি হন নর্থ কোরিয়ার জন্য ফ্লিম বানাতে :P
তখন তাকে মুক্তি দিয়ে কিম জন ইলের প্রাসাদে নেয়া হয়। পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় সাইকোপ্যাথ কিম জন ইলের সাথে। সেখানে তিন বছর পর প্রথমবারের মত তিনি নিজের স্ত্রীর দেখা পান। কিম জন ইল তাদের আবার বিয়ের ব্যবস্থা করেন :P

যাই হোক, এরপর তারা স্বামী স্ত্রী মিলে কিম জন ইলের জন্য মুভি বানিয়েছিলেন। কিছু প্রোপাগান্ডা মুভি বানানোর পর ১৯৮৬ সালে সুযোগ বুঝে ভিয়েনাতে আয়োজিত এক ফ্লিম ফেস্টিভালে যোগ দিতে এসে নর্থ কোরিয়ান প্রতিনিধি দলের সাথে আগত এই দপ্ততি পালিয়ে যান। আশ্রয় নেন ভিয়েনার মার্কিন দুতাবাসে।

যাই হোক, কেটে গেছে বহুদিন। কিম এল স্যান, কিম জন ইল... এরা দুজনই মারা গিয়েছে।
কিম জন ইলের ছেলে কিম জন উন এখন ক্ষমতায়।
সাউথ কোরিয়ান মুভি আজ গোটা দুনিয়াতে জনপ্রিয়।
ওদিকে নর্থ কোরিয়ান কোনো মুভির নামও কেউ শোনে না।
Read More »

Saturday, September 1, 2018

বাব ও বাহাই


আজ বলবো ‘বাহাই’দের কথা…
প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ বাংলাদেশে Baha'i Faith অনুসরণ করে।
কাকরাইল থেকে শান্তিনগর যাবার পথে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ। এর ঠিক পাশেই বাংলাদেশের বাহাই সেন্টার।

বাহাই ধর্ম তুলনামূলকভাবে নতুন…
বাহাই বিশ্বাস মতে, বাহাউল্লাহ ইশ্বরের প্রেরিতপুরুষ।



ধর্মের মূল শিক্ষা যদি একেবারে সংক্ষেপে বলি, তাহলে অনেকটা এমন…
স্রষ্টা যুগে যুগে মানবজাতিকে দীক্ষা দেবার জন্য দূত পাঠিয়েছেন। এরা মানব জাতির শিক্ষক। আব্রাহামিক ধর্মের নবী থেকে শুরু করে কৃষ্ণ, বুদ্ধ, জুরাস্ট্রিয়ার সহ যত প্রেরিত পুরুষ এসেছেন, এদেরকে ইশ্বর পাঠিয়েছিলেন মানব জাতির জন্য শিক্ষকরুপে।
মানুষ যাতে স্পিরিচুয়ালি শিক্ষা লাভ করে নিজেদের এবং সমাজের উন্নতিসাধণ করতে পারে।
বাহাউল্লাহ’র মতে,
সকল ধর্মগুলোই একই ইশ্বরের বন্দনা করে, এবং এগুলোর ভেতর ইন্টার কানেকশন আছে। সকল ধর্মের ভেতরই একটা ইউনিফাইন ভিশন আছে।
One God, One Universe, One Human race…

ব্যাপারটা আরেকটু সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলে অনেকটা পাঠশালার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ ক্লাস টেনে পড়া ছাত্রকে যা বোঝানো সম্ভব, ক্লাস টু’তে পড়া বাচ্চাকে সেটা বোঝানো সম্ভব না। আবার যে শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে জটিল সমীকরণ সহজে বোঝাতে পারেন, তিনি হয়ত উনার বাচ্চাকে অ আ ক খ গ বোঝাতে হিমশিম খেয়ে যাবেন। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা পড়ানো কঠিন কাজ। আবার হাই স্কুলের ছাত্রকে বীজগনিত বোঝানো আরেকধরণের কঠিন কাজ। দুইটা কাজই দুইরকম কঠিন।
আলাদা আলাদা ক্লাসের আলাদা আলাদা শিক্ষক বা এক্সপার্ট লাগে…
একটা বিষয় ক্লাস সেভেনের ছাত্রকে বোঝানোর জন্য যে ধরণের এপ্রোচ নিতে হয়, সেই একই বিষয় কলেজ পড়ুয়া ছাত্রকে বোঝাতে ভিন্ন এপ্রোচ নিতে হয়।
প্রেরিত পুরুষদের রোল এই শিক্ষকদের মতই…
সবাই আলাদা আলাদা ক্লাসের শিক্ষক…
তবে লক্ষ উদ্দেশ্য সবারই এক…
মানব কল্যান।

বাহাউল্লাহ মানব জাতির ইতিহাসকে এভাবেই দেখেছেন। অর্থাৎ আলাদা আলাদা সময়ে পরিস্থিতির প্রয়োজনে আলাদা আলাদা শিক্ষক/ নবী / প্রেরিতপুরুষ / অবদারের আগমন হয়েছে বা স্রষ্টার তরফ থেকে পাঠানো হয়েছে।
বাহাই বিশ্বাস অনুসারে,
These different religions are the chapters of a continuous story.
They are not in conflict with each other. There are different social teaching or version because of the needs and requirements of certain times of which those message were delivered,
but at their core, they are in complete harmony with each other.

আচ্ছা… এবার বাহাউল্লাহ’র জীবনী সংক্ষেপে বলা যাক।
তবে উনার কথা বলার আগে সংক্ষেপে বলতে হবে সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ সম্পর্কে।
জিসাসের আগে যেমন সাধু John the Baptist এসেছিলেন ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে, জিসুর আগমনের,
সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ রোল বাহাই বিশ্বাসীদের কাছে কিছুটা একই রকম।
সাইয়িদ আলী মোহাম্মদের আরেক নাম বাব (bab)
ইরানের সিরাজ প্রদেশে ১৮১৯ সালে জন্ম। মেধাবি, তরুণ ব্যবসায়ী ছিলেন। ইরানের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ভেতর বকধার্মিকতা, ধর্মের প্রতি উদাসীনতা, দূর্বল ইমান, দুর্বল বিশ্বাস, হিপোক্রেসি, এসব লক্ষ করেছিলেন তিনি অনেক তরুন বয়সে।
ধর্মকর্মের প্রতি আগ্রহ ছিল। প্রচুর পড়ালিখা করতেন ধর্মকর্ম নিয়ে।
সমাজ সংস্কারের ইচ্ছা হল মনে।

ইরানের মানুষ অধিকাংশ শিয়া মুসলিম।
শিয়াদের ভেতর বারোজন ইমামের ধারণা প্রচলিত। সর্বশেষ ইমান হলেন ইমাম মাহাদি।
শিয়া বিশ্বাস হল, ইমাম মাহাদি তার প্রতিনিধির মাধ্যমে শিষ্যদের সাথে যোগাযোগ রাখেন।
শেষ প্রতিনিধি মারা গেলে আর ইমাম মাহাদীর সাথে কানেকশন থাকবে না দুনিয়ায় জীবিত শিয়া শিষ্যদের।
অর্থাৎ গায়েবি কানেকশন অফ হয়ে যাবে।
এরপর কেয়ামতের আগে উনি এসে ধর্মের পুনরুদ্ধার করবেন।

তো সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ এবার নিজেকে ইমাম মাহাদি হিসেবে ঘোষনা দিলেন।
এপ্রসঙ্গে বলে রাখি,
নানান সময়ে নানান ব্যক্তির নিজেকে ইমাম মাহাদি হিসেবে দাবি করার ঘটনা নতুন নয়। ইতিহাসে এমন বেশকিছু নজির আছে।
যেমন আব্বাসীয় খেলাফতের সময় ইয়াহিয়া ইবনে উমর ছিলেন আলী বংশদ্ভুত একজন বিদ্রোহী ইমাম, যিনি আব্বাসিয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। বিদ্রোহটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
জায়েদি শিয়ারা ‘ইয়াহিয়া ইবনে উমর’কে ইমাম মাহদী বলে প্রচার করা শুরু করেছিল। অপেক্ষাকৃত দরীদ্র, বঞ্চিত ও শোষিত মুসলিমদের ভেতর মাহদীর আবির্ভাবের প্রত্যাশাটা ছিল প্রবল।
নবীর বংশ থেকে একজন মাহদীর আবির্ভাব ঘটবে যিনি সমগ্র পৃথিবীতে ন্যায় বিচার ও মানুষের মাঝ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করবেন। ইয়াহিয়া ইবনে উমর ৮৬৫ সালে আব্বাসিয় সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিহত হন।
এরপর তার অনুসারীরা প্রচার করতে থাকেন যে তিনি ‘গায়েব’ হয়ে গেছেন এবং কেয়ামতের পূর্বে তিনি আবার হাজির হবেন।
এই গায়েব তত্ত্বের সুযোগ নিয়েই চার বছর পর আলী বিন মুহাম্মদ নামের আরেক ইমাম নিজেকে ইয়াহিয়ার পুনরাবির্ভাব বলে দাবি করেছিলেন।

প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, পরাজিত ও নিহত হওয়া এবং তারপর ‘গায়েব হয়ে যাওয়া ও মাহদী হিসাবে পুনরাবির্ভাবে’র তত্ত্ব প্রচার, এই ধরণের ঘটনা ইমাম আলীর তৃতীয় পুত্র ইবনে আল হানাফিয়া থেকে শুরু হয়ে নানান সময়ে ঘটেছে।
ভারতে মুহাম্মদ জৌনপুরি (১৪৪৩-১৫০৫) নিজেকে মাহদী ঘোষনা করেন। তার অনুসারীরা মাহদিয়া সম্প্রদায় নামে ভারতিয় উপমহাদেশে এখনো টিকে আছে।
মরক্কোর বারবার নেতা ইবনে তুমরাত নিজেকে মহানবীর বংশধর ও ইমাম মাহদী দাবি করে ছিলেন। তার অনুসারীরা স্পেনে আলমোহাদ খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।
সুদানের সুফিবাদী ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ আহমেদ (১৮৪৪-১৮৮৫) নিজেকে ইমাম মাহদী ঘোষনা করেন, তার অনুসারীরা যথাক্রমে তুর্কি খেলাফত এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিল।
ব্রিটিশ আমলে ভারতিয় উপমহাদেশে মির্জা গোলাম আহমেদ (১৮৩৫-১৯০৮) নিজেকে মাহদী ঘোষনা করেন। তার অনুসারীরা ‘আহমেদিয়া মুসলিম’ হিসাবে পরিচিত।

যাই হোক, আমরা ফিরে যাচ্ছি মূল আলোচনায়, অর্থাৎ সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ, যিনি ২৪ বছর বয়সে নিজের টাইটেল নাম দিলেন ‘বাব” … যার অর্থ দরজা …
ইসলাম হতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে বাবিজম প্রতিষ্ঠা করলেন। বই লিখলেন, নাম দিলেন ‘বেয়ান’
এখানেই তুলে ধরলেন বাবিজমের শিক্ষা দিক্ষা…

প্রচার করতে শুরু করলেন তার নতুন সৃষ্টি করা বিশ্বাস। প্রথম প্রথম তেমন কোনো ভক্ত বা মুরিদ জোগাড় করতে পারলেন না। এজন্য তেমন একটা ফোকাসও পেলেন না।
তখন ইরানে মাঝেমাঝেই এমন নিত্য নতুন ধর্ম প্রচারকের আবির্ভার হইতো। জনসাধারণ পাগলের প্রলাপ বলেই উড়িয়ে দিতো। দ্রুত এরা হারিয়েও যেতো।
এতো আমলে নেবার মত কিছুই ছিল না।

কিন্তু বাব হাল ছাড়লেন না। লেগে থাকলেন। ফুল ডিটারমিনেশনের সাথে। একসময় কিছু সাঙ্গপাঙ্গ ঠিকই জুটে গেল। মানুষ তার কথা শুনতে শুরু করলো। ফলাফল, ধীরে ধীরে ফলোয়ার বাড়তে শুরু করলো এবং স্বাভাবিকভাবেই এবার শিয়া মোল্লারা বিষয়টি আমলে নিলো।
বাবের অনুসারীদের বলা হত বাবি।

বাব নিজেকে ইমাম মাহাদি হিসেবে ঘোষনা করার পরও আবার নতুন একজন নতুন প্রেরিত পুরুষের আগমনের বার্তা দিলেন। নিজের লিখা ‘বেয়ান’ প্রচার করতে লাগলেন এবং ঘোষনা দিলেন, ইহা সবচেয়ে যুগোপযোগী বাণী !

অতঃপর, যা হবার সেটাই হল। শিয়া মোল্লারা সিদ্ধান্ত নিলো, এবার বাব’কে দেখে নেবে। বাবের কথা ইরানের শাহ’র কানেও গেল।
এরপর একদিন ইরানের পুলিশ গুলি চালালো বাব ও বাবি’দের উপর।

বেশকিছু বাবের ফলোয়ার, অর্থাৎ বাবি নিহত হলেন। বাব গ্রেফতার হল। ব্লাফফেমি মামলা সহ নানান পদের মামলা দিয়ে অতঃপর নামকাওয়াস্তে বিচার করে বাব’কে তোলা হল ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে।
এরপর গুলি।
এরপর মৃত্যু।
এরপর দাফন।

(যেখানে গুলি করে বাব'কে হত্যা করা হয়েছিল)


দাফন করা হল ইরান থেকে বহু দূরে। তখনকার অটোম্যান সম্রাজ্যের অন্তর্গত প্যালেস্টাইনের হাইফা’তে।
যা এখন ইসরাইলের নিয়ন্ত্রনে। সেখানেই বাবের সমাধি।


বাবের অনুসারীদের ইরান ছাড়া করলেন শাহ।
বাবি’রা চলে গেল নির্বাসনে।
কিন্তু বাবের লাশ দাফন হলেও বাবের ‘বেয়ানের’ বাণী হারিয়ে গেল না।

ইরানের তেহরান শহর।
শাহ আমলের মন্ত্রী মির্জা নুরি’র ঘরে জন্ম নিলেন মির্জা হুসাইন আলী নুরি। ১৮১৭ সাল। অর্থাৎ বাবের চেয়ে দুই বছরের বড় মির্জা হুসাইন আলী নুরি।
বেশ আরাম আয়েশ বিলাসিতায় কেটেছিল মির্জা হুসাইন আলী নুরি’র জীবন। বড়লোকের ছেলে বলে কথা।
একদিন মন্ত্রী মশায় মারা গেলেন। ফলে মন্ত্রী পুত্র মির্জা হুসাইন আলী নুরি’কে বাপের মন্ত্রীত্ব সাধা হল। কিন্তু তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করলেন।
তিনি মিশতে শুরু করলেন একেবারে সাধারণ মানুষের সাথে। ইরানের রাস্তা ধরে হাটলেন যুবক মির্জা হুসাইন আল নুরি। দেখলেন ইরানকে। একেবারে সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে।

মানুষের উপকারে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন মির্জা হুসাইন আল নুরি। যুবক বয়সে লোকে তাকে ভালবেসে বলতো, ‘গরিবের বাবা’
১৮৪৮ সালের দিকের কথা। তখন সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ ও তার অনুসারীরা বাবিজম প্রচার শুরু করেছেন পুরোদমে।
মির্জা হুসাইন আল নুরি পরিচিত হলেন কিছু বাব অনুসারীদের সাথে।
তাদের সাথে চলা ফিরা করলেন। তাদের কথা শুনলেন। মুগ্ধ হলেন ‘বেয়ানের’ বাণী শুনে। বাবের ভক্ত হয়ে গেলেন মির্জা হুসাইন আল নুরি। বাব ধর্ম গ্রহন করলেন।
বাব যে প্রেরিত পুরুষের আগমনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেই কথা মননে ধারণ করলেন মির্জা হুসাইন আল নুরি।
১৮৫০ সালে যখন বাব’কে ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে নিয়ে খুন করা হয়, তখন আর সব বাবি’দের মত মির্জা হুসাইন আল নুরিও আত্মগোপনে চলে যান। ইরানের পুলিশ খুঁজতে থাকে বাবি’দের।

১৮৫২ সাল। তেহরানের কাছেই এফচি নামের গ্রাম। সেখানে গোপনে কিছু বাবি’দের সাথে আলোচনায় বসলেন মির্জা হুসাইন আল নুরি। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। পুলিশ ঘিরে ফেললো তাদের। গ্রেফতার করলো। টর্চার চেম্বারে নিয়ে পেটালো। পুরনো পরিত্যাক্ত কুপের ভেতর অন্য বন্দীদের সাথে রাখা হল মির্জা হুসাইন আল নুরিকে। গু মুতের গন্ধ। এক ভয়াবহ গহ্বর … অন্ধকার।
দুর্বিষহ পরিবেশ।
আর সেখানেই কিনা স্বর্গের প্রত্যাদেশ পেলেন মির্জা হুসাইন আল নুরি !
দেবদুত এসে উনার কানে বলে গেলেন, আজ থেকে আপনার নাম ‘বাহাউল্লাহ’ যার অর্থ আল্লাহ’র গৌরব।
ব্যস, মির্জা হুসাইন আল নুরি বুঝে গেলেন, তিনিই সেই প্রেরিতপুরুষ, যার সম্পর্কে বাব পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। মির্জা হুসাইন আল নুরি হয়ে গেলেন ‘বাহাউল্লাহ’

এভাবে চার মাস বন্দি থাকার পর ইরান সরকার বাহাউল্লাহ’কে মুক্তি দিল। বাহাউল্লাহ’র ভাগ্য ভালো ছিল। বাবের মত তাকে ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে তোলা হল না।
বরং নির্বাসনে পাঠানো হল।
বেশকিছু বাবি’দের সাথে নিয়ে বাহাউল্লাহ চলে গেলেন বাগদাদে।
বাগদাদ ছিল তখন তুর্কি অটোম্যান খেলাফতের আন্ডারে।
আটোম্যানদের সাথে ইরানের সম্পর্ক ভালো ছিল না।

বাহাউল্লাহ এরপর বাগদান থেকে কুর্দিস্তানের দিকে গেলেন। এরপর এক নির্জন পাহাড়ে ধ্যানমগ্ন হলেন। সেই নির্জন পাহাড়ে ধ্যান করে যা কিছু তার মাথায় এসেছিল,
লিখে ফেললেন।
হয়ে গেল বই।
নাম “কিতাব-ই-ইকান’
যেখানে জীবনকে দেখানো হয়েছে এক মহাজাগতিক উপন্যাস হিসেবে।
বাহাউল্লাহ এরপর বাগদাদে থাকতে শুরু করলেন। বাগদাদে কফি হাউজগুলোতে ঘুরলেন। সেইসময় বাগদাদে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা ছিল ভালোমতই।
বাহাউল্লাহ বাগদাদে ঘুরেঘুরে অনুধাবন করলেন, বিজ্ঞানকে এড়ানো যাবে না। ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করলেন বাহাউল্লাহ। অনেকটা সাধু দার্শনিক Thomas Aquinas এর মত।
বাগদাদে বাহাউল্লাহ’র ফলোয়ার বাড়তে থাকলো।

বাহাউল্লাহ বুঝতে পারলেন, এটাই সঠিক সময়। ফলোয়ারদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমিই সেই প্রেরিতপুরুষ, যার কথা বাব বলে গিয়েছিলেন। সালটা ১৮৬৩।

তিনি বললেন, আদম থেকে শুরু করে যুগে যুগে অনেক পেরিতপুরুষের আগমন ঘটেছে। বর্তমানে তিনি এসেছেন প্রেরিতপুরুষ হিসেবে। উনার পরেও অনেকে আসবেন ইশ্বরের বাণী প্রচার করতে।
তিনি বললেন,
সব ধর্মমতের উৎস অভিন্ন। পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে সেগুলোর রুপ বদল হয়েছে। কিন্তু রয়েছে অভিন্ন সুর।
বিশ্ব ধর্মের ঐক্যের আহবান দিলেন বাহাউল্লাহ।
বিজ্ঞানে বিশ্বাস, জাতিভেদাভেদের অবসান, লৈঙ্গিক বৈষম্যের অবসানের ডাক দিলেন বাহাউল্লাহ।
বিশ্বশান্তির প্রতিষ্ঠার ডাক দিলেন। মহান বাব ১৯ সংখ্যাকে পবিত্র বলে ঘোষনা করেছিলেন। এজন্য বছরে ১৯ দিন উপবাস থাকতে বললেন।

বাগদাদ থেকে ইস্তাম্বুল যাবার পথে টাইগ্রিস নদীর তীরে ১২ দিন অবস্থান করেছিলেন বাহাউল্লাহ তার শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে। বাহাই’রা রিদভান উৎসব পালনের মাধ্যমে আজও সেটাকে স্মরণ করে।

তবে সবকিছুতেই বিরোধ লাগে। বাবের মৃত্যুর পর বাহাউল্লাহর উত্থানও কট্টর বাব সমর্থকদের একটি অংশের ভেতর সন্দেহের জন্ম দিলো। তারা বাহাউল্লাহ’র এইসব দাবি প্রত্যাখান করলো। বাহাউল্লাহ’র প্রতি তারা বিশ্বাস আনতে পারলো না। এদের ভেতর ছিল খোদ বাহাউল্লাহর নিজের ভাই ইয়াহিয়া।
শুরু হল বাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। শুরু হল গ্রুপিং। ভেদাভেদ।

বাহাউল্লাহ ইস্তাম্বুল পৌছালেন, কিন্তু তুর্কি সুলতানকে উপহার দিতে ভুলে গেলেন। ফলাফল, শুরুতেই সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল। বাহাউল্লাহ মাত্র চার মাস ছিলেন। সুলতানের নির্দেশে তাকে ইস্তাবুল ছেড়ে চলে যেতে হল তুরস্কের আড্রিয়ানোপলে। গ্রিসের কাছাকাছি।
সেখানে বসে বাহাউল্লাহ লিখতে থাকলেন। প্রচার করতে থাকলেন তার ধর্মমত।
বিশ্বের বড়বড় নেতা, যেমন মহারানী ভিক্টোরিয়া, রাশিয়ার আলেকজ্যান্ডার সহ অনেক নেতাদের চিঠি লিখলেন।

ক্রমশ বাব এবং বাহাই বিরোধ বাড়তে থাকলো। বাহাউল্লাহ’র সেই ভাই, অর্থাৎ ইয়াহিয়া, যে ছিল কট্টর বাবপন্থি, সে বাহাউল্লাহকে ইমাম মাহাদি বা প্রেরিতপুরুষ হিসেবে মেনে নিতে পারলো না। ফলাফল, খাবারে বিষ মেশালো। বাহাউল্লাহ অসুস্থ হয়ে গেলেন। কিন্তু জানে বেঁচে গেলেন কোনোমতে। মির্জা ইয়াহিয়া তুর্কি সুলতানকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলো, বাহাউল্লাহ আটোম্যান সম্রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক। সম্রাজ্যের ভেতর অস্থিরতা এবং নৈরাজ্য তৈরি করতেছে বাহাউল্লাহ ও তার অনুসারীরা।
ফলাফল, সুলতানের নির্দেশে বাহাউল্লাহকে চলে যেতে হল প্যালেস্টাইনের আক্কায়। জেলখানায়।
বর্তমানে জায়গাটি ইসরাইলে।

(এই সেই জেলখানা)

সম্রাটের মৃত্যুর পর বাহাউল্লাহ জেল থেকে বের হয়ে আক্কার ‘বাহাজি ম্যাসনে” থাকতে শুরু করেন। যদিও কার্যত তিনি তখনও অটোম্যানদের হাতে বন্দী।

বাহাউল্লাহ ও তার সমর্থকদের ব্যাপারে স্থানীয় জনতাকে সতর্ক থাকতে বললেন তুর্কি সরকার। ফলাফল, বাহাউল্লাহর শেষ জীবনের সময়গুলো খুব একটা ভালো কাটেনি। সেখানেই উনার এক পুত্র মির্জা মেহেদি মারা গেলেন।
বাহাউল্লাহ কার্যত বন্দি দশাতেই ছিলেন। যদিও শেষ দিকে অনুমতি সাপেক্ষে আক্কার আশেপাশে যেতে পারতেন তিনি।
১৮৯২ সালে বাহাউল্লাহ মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে তিনি লিখে গেলেন ‘কিতাব-ই-আকদাস’

(বাহাউল্লাহ'র কবর)

বাহাউল্লাহ’র মৃত্যুর পর উনার আরেক ছেলে আব্দুল বাহা বাহাই ধর্মের হাল ধরলেন।


ওদিকে বাবের যে সব ভক্ত বাহাউল্লাহ’কে ইমাম মাহাদি বা প্রেরিতপুরুষ হিসেবে বিশ্বাস করেনি, তারা আলাদা হয়ে মধ্য এশিয়াতে বসবাস শুরু করে। আজও তারা আছে। এবং বাবের কথামত কোনো এক প্রেরিত পুরুষের অপেক্ষায় আছে। অর্থাৎ কবে কেউ একজন এসে সব মুশকিল আছান করে দেবে।

সারমর্ম হল, বাব প্রচার করেছিলেন বাবিজম।
বাবিজমে একজন প্রেরিতপুরুষের কথা ছিল। বাহাউল্লাহ নিজেকে সেই প্রেরিতপুরুষ বলে দাবি করেছিলেন। যারা তার কথায় বিশ্বাস এনেছিলো, তারা বাহাই অনুসারে।
অর্থাৎ সব বাহাই বাবি বা বাবের ভক্ত, সব বাহাই’দের প্রধান কেতাব ‘বেয়ান’
কিন্তু সব বাবি বাহাই নয়।

ব্যাপারটা সেই সব ক্ষারই ক্ষারক, কিন্তু সব ক্ষারক ক্ষার নয় টাইপের।

বাহাই’দের তীর্থ দুইটি।
একটি বাবের কবর,
অন্যটি বাহাজি ম্যানসন।
বাহাইদের সকল অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাব এবং বাহাউল্লাহ’র স্মৃতিকে স্মরণ করা হয়।


The Universal House of Justice, Haifa, Israel হল বাহাই’দের গ্লোবাল রুলিং বডি।



Baha'i festivals:

Naw-Ruz (New year) 21 March
Ridvan - first day 21 April
Ridvan - ninth day 29 April
Ridvan - twelfth day 2 May
The Bab's declaration of his mission 23 May
Passing of Baha'u'llah 29 May
Martyrdom of the Bab 9 July
Birth of the Bab 20 October
Birth of Baha'u'llah 12 November

https://en.wikipedia.org/wiki/Báb
https://en.wikipedia.org/wiki/Bahá%27í_Faith
https://en.wikipedia.org/wiki/Bahá%27u%27lláh
http://bahai-library.com/books/hinduism/ch7.htm
Read More »

Sunday, January 14, 2018

মসনদের রাজনীতি -১০১ (ক্লাস-১)



ক্ষমতা কি জিনিস?
ক্ষমতার মসনদে গেলে মানুষ কেন বদলে যায়?
আসুন, আমরা ক্ষমতাবানদের বোঝার চেষ্টা করি লেখক ব্রুস ব্রুনোর চোখে এবং বিশ্লেষণের মধ্যদিয়ে।
Bruce Bueno de Mesquita is a political scientist,
professor at New York University, and senior fellow at Stanford University's Hoover Institution.

একটি রুলস সবার আগে বিবেচনায় রাখুন।
ক্ষমতায় যাবার আগে যারা চিন্তা করে কিভাবে ক্ষমতায় যাবো,আবার ক্ষমতায় বসার পর তাদের চিন্তা শুরু হয়, কিভাবে ক্ষমতায় থাকবো।
এই চিন্তা সর্বদা তাদের ব্যস্ত রাখবে। রাখবেই রাখবে।

আপনি ভুলেও ভাববেন না, নর্থকোরিয়ার নেতা কিম জন উনের ক্ষমতা হারানোর ভয় নেই। অবশ্যই আছে।
ক্ষমতা হারানোর ভয় যেমন জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলের আছে,
তেমন কিম জন উনেরও আছে।

কিন্তু এখানে একটা জিনিস খেয়াল করেন।
জার্মানির নেতা এঙ্গেলা মার্কেল
আর নর্থ কোরিয়ার নেতা কিম জং উন,
দুজনের ক্ষমতার ধরণ আলাদা।

মার্কেল একটি গনতান্ত্রিক দেশের নেত্রী। জার্মানিতে সত্যিকার অর্থেই গনতান্ত্রিক চর্চা বিদ্যমান।
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামবে নির্বাচনে হেরে। (মারা গেলে ভিন্ন হিসাব)
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামলে তাঁর আহামরি খারাপ তেমনকিছুই হবে না। হয়ত দুর্নীতি করে থাকলে নেক্সট সরকার এসে সেই দুর্নীতির তদন্তে নামবে। মার্কেলকে কোর্টে হাজিরা দিতে হবে। এই যা।
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামলে তিনি “জার্মান চ্যান্সেলর” থেকে একজন “সাধারণ নাগরিক” হয়ে যাবেন।

কিন্তু কিম জং উন?
সে ক্ষমতা থেকে নামবে তখনই, যখন তাঁকে ক্ষমতা থেকে নামানো হবে জোর করে। হত্যা করা হবে সাদ্দামের মত অথবা জেলে ভরা হবে।
যে পদের ক্ষমতা যত বেশি, সেই পদ ততবেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এবং ক্ষমতা হারানোর ভয়ও ততবেশি।
জার্মানিতে মার্কেল যে পরিমাণ ক্ষমতাবান,
কিম জং উন উত্তর কোরিয়াতে আরো বেশি ক্ষমতাবান।
জার্মানিতে মার্কেল যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। ইচ্ছা হলে দশটা মানুষকে মেরে ফেলার ক্ষমতা মার্কেলের নেই। মার্কেলের ক্ষমতা জার্মানির সাংবিধানিক রুলস এন্ড রেগুলেশনে বাধা।
মার্কেল যেটা করেন, সেটা সাংবিধান চাকরি।
কিন্তু উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম?
সে তো উত্তর কোরিয়াতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারি। যা ইচ্ছা করতে পারে সে। উনার উপর কথা বলার সাহস কারো নেই। উনার আদেশ যেটাই হোক, মেনে চলতে হবে সবাইকে।

আর এজন্যেই কিম জং উনের ক্ষমতা যেমন বেশি, ঠিক তেমনই ক্ষমতা হারানোর ভয় বা প্যারানোয়া জার্মানির মার্কেলের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণ বেশি। আর ক্ষমতা হারালে পরিনতিও ভয়াবহ।
আর এজন্য ক্ষমতার প্রতি হুমকি হতে পারে, এমন কোনোকিছুকেই তিনি স্বাভাবিকভাবেই টলারেট করেন না।

নানান দেশে নানান ধরণের শাসন ব্যবস্থা চলতেছে। কোথাও গনতন্ত্র, কোথাও সামরিক সরকার, কোথাও একনায়কতন্ত্র, কোথাও রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র,
নানান ধরণের শাসন ব্যবস্থা চলতেছে।
কনভেনশন্যাল উইজডম অনুসারে আমরা নর্থ কোরিয়ার নেতা কিম জং উন’কে একজন ডিক্টেটর বা একনায়ক হিসেবেই চিনি।

তবে শাসনব্যবস্থা যেমনই হোক,
একটা জিনিস সবার আগে মনে রাখতে হবে,
No Leader Can Lead Unilaterally. No Leader is monolithic.

অর্থাৎ একাএকা কোনো লিডারের পক্ষেই দেশ চালানো সম্ভব না। সেটা অতীতের হিটলার বা জোসেফ স্তালিনের জন্যেও সমান সত্য ছিল।
ঠিক একইভাবি সত্য কিম জং উনের জন্যেও।
আমরা কেবল ক্ষমতার মসনদে বসা ব্যক্তিটিকেই দেখি।
ক্ষমতার মসনদটিকে যেসব স্তম্ভগুলো সাপোর্ট দিয়ে ধরে রাখে, সেগুলোকে দেখিনা।
প্রফেসর ব্রুসের লিখা “dictator's Handbook” বইটিতে প্রথমেই আলোচনায় এসেছে মসনদের এই স্তম্ভগুলো।
তিনি গনতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, ধনতন্ত্র, Oligarchy, মেরিটোক্র্যাসি সহ আরো যতধরণের ব্যবস্থা প্রচলিত আছে,
সবগুলোর ভেতর একটা কমন সিনারিও তুলে ধরেছেন। এসব গতানুগতিক ক্লাসিফিকেশন বাদ দিয়ে তিনি বলেছেন, ক্ষমতার মসনদে যে বা যারাই বসুক,
তাঁদের বা তাঁকে মুলত তিন শ্রেণীর মানুষ ডিল করতে হয়।
১. ইনফ্লুয়েন্সিয়াল (Influential) / প্রভাবশালী
২. এসেন্সিয়াল (Essential) / অপরিহার্য
৩. ইন্টারচেঞ্জেবল (interchangeable) / বিনিমেয়

তো প্রভাবশালী শ্রেনী কারা?
আমরা গতানুগতিকভাবে যাদেরকে প্রভাবশালী বলি। সেই প্রভাবশালীদের বোঝাচ্ছেনা এখানে।
এখানে প্রভাবশালী শ্রেনী বলতে তাঁদেরকে বোঝানো হচ্ছে, যাদেরকে মসনদে বসে আপনার “নিয়ন্ত্রণে” রাখতে হবে এবং যারা আপনাকে “ক্ষমতা থেকে নামানোর ক্ষমতা” রাখে।
এই জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশের সামরিকবাহিনী এই শ্রেণীর অন্তর্গত। সেইসাথে ফরেন ব্যাকার, তথা “বিদেশী প্রভু”রাও এই শ্রেনীতে পড়ে।
একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে।
মিশরের আরব বসন্তের কথা চিন্তা করুণ।
হোসনি মোবারকের তিন দশকের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হল। মানুষজন রাস্তায় নামলো। মিশরের তেহরির স্কোয়ার মানুষে ভরে গেল।
হোসনি মোবারক পুলিশ দিয়ে জনসমুদ্র নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেন।
এরপর তিনি আর্মি নামালেন।
আর্মি ট্যাঙ্ক গোটা তেহরির স্কোয়ার ঘিরে ফেললো। কিন্তু মানুষের গায়ে একটি বুলেটও ছুড়লো না।
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। ওদিকে মানুষের মিছিলে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে গেল। ট্যাঙ্কে বসা সেনারা কার্যত কিছুই করলো না।

অর্থাৎ?
অর্থাৎ বোঝা হয়ে গেল, হোসনি মোবারক ক্ষমতার মসনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ Influential পিলার বা স্তম্ভ হারিয়ে ফেলেছেন। সেটা হল “আর্মি”
তখন বুঝতে আর বাকি রইলো না, মিশরের আর্মি এখন হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে।
মিশরের রাজনীতি যারা পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁরা ভালো করেই জানেন, মিশরের রাজণীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে আর্মি আর আমেরিকা।
হোসনি মোবারক নিজেও একসময় বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন।
তো আমেরিকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ Influential স্তম্ভ।
আর্মি যেহেতু মোবারকের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সেহেতু এটাও বোধগম্য, আমেরিকাও আর চাচ্ছে না হোসনি মোবারক ক্ষমতায় থাকুক।
সুতরাং ফলাফল কি?
ফলাফল হল, মোবারক’কে এখন ক্ষমতা থেকে নামতে হবে। ইশারা পরিস্কার।

তো মোবারক সত্যিসত্যিই ক্ষমতা থেকে নেমে গেল। আর্মি পুলিশ গিয়ে হোসনি মোবারককে গ্রেফতার করলো।
ওদিকে আমজনতা?
আমজনতা কিন্তু মহাখুশি।
আমজনতার ধারণা, তাঁদের গনআন্দোলন আর বিশাল মিছিলের ঠেলায় হোসনি মোবারকের পতন ঘটেছে। সুতরাং
গোটাবিশ্বে এবার নিউজ পেপারে হেডলাইন হইল,
“জনতার আন্দোলন তথা আরব বসন্তে মোবারক পদচ্যুত”

ওকে... ফাইন।
খুব ভালো কথা।
এরপর কি হল?
এরপর মিশরে ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন হইলো। কে জিতলো?

জিতলো, মুসলিম ব্রাদারহুড।
খোদ আর্মির পরোক্ষ তত্ত্বাবধানেই নির্বাচন হয়েছিলো। মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি পেল ৫১.৭৩% ভোট।
মোহাম্মদ মুরসি হল প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু এখানে তো সমস্যা। এই মুসলিম ব্রাদারহুডকে দুচোখে দেখতে পারে না আমেরিকা আর আর্মি। এই দুইটা ইনফ্লুয়েন্সিয়াল স্তম্ভ একবছর যেতে না যেতেই ঠিকই মুরসির পতনের আয়োজন করলো।
কি হল এরপর?
আবার মিশরের তেহরির স্কোয়ারে আন্দোলন শুরু হল। এবার দাবি, মুরসি’কে ক্ষমতা থেকে নামাও। এরা মুলত এন্টি ব্রাদারহুড জনতা।
আবার ঠিক তখন মিশরের বড়বড় শহরগুলো ব্রাদারহুডের সমর্থকদের বিশাল মিছিল, তাদের দাবি, মুরসিকে ক্ষমতায় রাখো।

ব্যস, এবার আবার আর্মি নামলো। মুরসিকে গ্রেফতার করলো এবং হা... মুরসির সমর্থকদের উপর আর্মি নির্বিচারে গুলি চালালো। Rabaa স্কয়ারে গোলাগুলিতে বহুমানুষ মারা গেল।
কত মানুষ মারা গিয়েছিল, সঠিক হিসাব নেই।

ঠিকই মিশরকে রক্তে ভাসিয়ে এবার আর্মি ক্ষমতা নিয়ে নিলো।



ব্রাদারহুড আর এন্টি ব্রাদারহুড,
দুইগ্রুপই এবার আর্মির গুলির ভয়ে জীবন বাঁচাতে ঘরে ফেললো।
সেই হতে আমেরিকান ব্যাকিং নিয়ে আব্দুল ফাতাহ আল সিসি মিশরের ক্ষমতায়।
হোসনি মোবারক গেল। সিসি এলো।
মিশর সেই আগের মতই ডিক্টেটরশিপের আন্ডারেই রয়ে গেল।
এখন যদি সিসি’র পদত্যাগের দাবিতে কোনো মিসিল হয় তেহরির স্কোয়ারে,
নিশ্চিত থাকুন, আর্মি এসে গুলি করে ঝাঁজরা করে দেবে। কেউকিছু বলবে না। আমেরিকাও চুপ করে থাকবে।

সুতরাং বুঝতেই পারতেছেন, ইনফ্লুয়েন্সিয়াল বা প্রভাবশালী শ্রেনীকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আপনার ক্ষমতার গদী নড়ে যাবে। ফলাফল,
এই শ্রেনীকে চেকইনে রাখতে হবে।
তাঁদের সুযোগসুবিধা দিতে হবে।

যেমন, আমি নাম নিচ্ছি না, এমন অনেক গনতান্ত্রিক দেশ আছে, যে দেশের আর্মিরা প্রচুর ফরেন মিশনে যায়। জাতিসংঘের পিস মিশন, আফ্রিকান মিশন, এটা সেটা, নানান মিশনে যায়। সরকার এসব সুযোগ সুবিধা করে দেয়।
এসব বিদেশি মিশনের সিংহভাগ ডোনেশন দেয় আমেরিকা আর পশ্চিমা দেশগুলো।
সুতরাং আমেরিকা আর পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সরকারের যদি সম্পর্ক ভালো থাকে, তাহলে আর্মি সুযোগসুবিধা নিয়েই চুপ থাকবে। ক্ষমতা দখল করার চিন্তা সহজে করবে না। কারণ ক্ষমতা দখল করলে পশ্চিমারা রেগে যাবে। তখন মিশনে কর্মরত সেনাদের ফিরিয়ে দেবে। ফরেন মিশনে সেনা নেয়া বন্ধ করে দেবে। ফলাফল, যে আর্মি পারসন ক্ষমতা দখল করবে, তার বিপক্ষে খোদ আর্মির ভেতরেই অসন্তোষ তৈরি হবে। কেউ কি চায় নিজেদের পেটে লাথি মারতে?
সুতরাং আর্মি ক্ষমতা নেবার আগে দশবার ভাববে।
তবে হা... যদি এমন পরিস্থিতি কখনো আসে, পশ্চিমারা নিজেরাই গ্যারান্টি দেয় আর্মিকে যে ক্ষমতা কেড়ে নিলেও সমস্যা হবে না, ইন দ্যাট কেস, আর্মির ভেতরে থাকা উচ্চভীলাসী সেনা কর্মকর্তারা হয়ত তখন ক্ষমতা দখলের ট্রাই করবে। অন্যথায় তেমনটি হবে না।

এই হিসাবটা আফ্রিকার দেশগুলোতে অনেকবেশি প্রচলিত আছে।


সুতরাং, ক্ষমতার মসনদে যে বসে থাকবে, তাঁকে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে, এই প্রভাবশালী শ্রেনী অর্থাৎ ক্ষমতার ব্যাকার + ক্ষমতা কেড়ে নেবার ক্ষমতা যাদের আছে, তাঁদের বেশি পরিমাণ সুযোগসুবিধা দিয়ে শান্ত রাখতে।
সেইসাথে বেশি বিশ্বাসও করা যাবে না।
হোসনি মোবারকের কথা চিন্তা করুণ। তিন দশক কিন্তু ঠিকই ক্ষমতায় থেকেছিলো সে। কিন্তু একদিন না একদিন ঠিকই সমস্যা হবে।


যাই হোক...
এবার আসুন, এসেন্সিয়াল (Essential) / অপরিহার্য শ্রেনী।
এই শ্রেনীতে নানান কিসিমের, নানান ধরণের মানুষ থাকবে।
মসনদে যে বসে আছে, তাহার আপনজন, দলবল, প্রিয়জন, পুলিশ, আমলা, সরকারি বেতনভোগী ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, কর্মকর্তা সহ নানান পদের লোক।
অর্থাৎ দেশের + ক্ষমতার সিস্টেমটাকে সুন্দরমত সচল রাখতে যাদের লাগবে, তাহারা এই সিস্টেমে অন্তর্গত।
উন্নত দেশে বিজ্ঞানী + গবেষক + টেকনোক্রেটরাও এই শ্রেনীতে পড়ে।
যেমন হিটলারের সময়কার জার্মান নাৎসি অনুগত বিজ্ঞানী বা গবেষকদের কথা চিন্তাকরুণ। এরা কিন্তু হিটলারের ক্ষমতার প্রতি কোনো থ্রেট কখনো হবার ক্ষমতা রাখতো না। কিন্তু ছিল অপরিহার্য শ্রেনী।
এদেরকে ব্যবহার করে হিটলার জার্মানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিলো নাটকীয়ভাবে।
অর্থাৎ,
সোজা কথা, শাসনযন্ত্র সুন্দরমত টিকিয়ে রাখতে যাদের দরকার হয়, তাহারাই এই শ্রেনীভুক্ত।
গোয়েন্দাবাহিনীও এই শ্রেনীভুক্ত।
যেমন আমেরিকা গোটা দুনিয়াতে তাঁর প্রভাব বজায় রাখতে সিআইএ ব্যবহার করে। ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার। সিআইএ সেটা সরবরাহ করে।
তবে সোভিয়েত কেজিবি কিন্তু (Essential) / অপরিহার্য শ্রেনী ছিল না। বরং কেজিবি ছিল প্রভাবশালী বা ইনফ্লুয়েন্সিয়াল শ্রেণী।
কেজিবি একটা প্যারালাল সরকারের মত কাজ করতো এবং কেজিবির ক্ষমতা ছিল মসনদ বদলে দেবার। সুতরাং কেজিবি আলাদা হিসাব।

আগেই বলে নিচ্ছি, দেশ ভেদে হিসাবগুলো একটু বদলে যায়। তবে মোটামুটি সিনারিওতে মিল পাবেন।
সোজা হিসাব হল, এসেন্সিয়াল শ্রেণী জীবনে মসনদে বসতে পারবে না, কিন্তু শাসনতন্ত্র চালাতে হলে এই এসেন্সিয়াল শ্রেণীকে খুশি রাখতে হবে।
এরা ঠিকমত কাজ না করলে শাসকের জন্য নানান সমস্যা তৈরি হবে। কোনো শাসকই চাইবে না মসনদে বসে অশান্তিতে থাকতে।
সুতরাং সব প্রভাবশালী শ্রেণীর দাবিদাওয়া পুরনের পরই শাসক নজর দেবে অপরিহার্য শ্রেণীর দাবিদাওয়া, বেতনভাতা, আবাসন সুবিধা, এটাসেটা সহ ছোটখাটো নানান দাবিদাওয়া পুরন করতে।

এবার শেষ শ্রেণী হল, আমজনতা। অর্থাৎ ইন্টারচেঞ্জেবল (interchangeable) / বিনিমেয়
এরা না প্রভাবশালী, না অপরিহার্য।
তবে হা... ক্ষেত্র বিশেষে বা পেক্ষাপটভেদে এরা কখনো অপরিহার্য আবার কখনো খোদ প্রভাবশালীও হয়ে যেতে পারে, আবার অনেকসময় এদের মূল্য থাকে সবার পরে।
ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা না করে বললে বুঝবেন না।

যেমন, নর্থ কোরিয়ার কথা চিন্তা করুণ।
সেই দেশে কোনো গনতন্ত্র নাই। চলতেছে এবসোল্যুট ডিক্টেটরশিপ।
তো সেইদেশের প্রভাবশালী শ্রেণী হল নর্থ কোরিয়ার আর্মি + বিদেশী প্রভু “চীন”
কিম জং উনকে সবার আগে এই দুই শ্রেণীকে খুশি রাখতে হবে। নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে।
সুযোগসুবিধা দিতে হবে।
এরপর আসতেছে অপরিহার্য শ্রেণী, বা এসেন্সিয়াল।
যেমন কমিউনিস্ট পার্টি, আমলা, বিচারবিভাগ, পুলিশ, বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার,
এসব।
এদেরকে সুযোগসুবিধা দিতে হবে। তাহলে অন্তত রিজিম ক্যালাপস করবে না।
এরপর সবার শেষে আসতেছে আমজনতা। বা ইন্টারচেঞ্জেবল।
এরা না খেয়ে মরলেও সমস্যা নেই। আমজনতাকে নানান উপায়ে ভুলিয়ে রাখা যায়, ম্যানুপুলেট করা যায়। দুর্ভিক্ষ হলেও নর্থ কোরিয়াতে সরকার পতন হয় না, কারণ প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণী থাকে কিম পরিবারের পকেটে।
একই হিসাব জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবের জন্যেও প্রযোজ্য ছিল।
রবার্ট মুগাবে যুগের পর যুগ জিম্বাবুয়ে শাসন করেছে একটানা। এবং তাঁর শাসন আমলে অব্যবস্থাপনা চরমে উঠে গিয়েছিলো। জিম্বাবুয়ের মানুষ দিনকে দিন গরিব হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে মুগাবে ছিল সফল। কারণ মুগাবে জানতো, ক্ষমতায় বসে থাকতে হলে কাদেরকে হাতে রাখতে হবে।
এবং মুগাবে ঠিক তাঁদেরই সুযোগসুবিধা দিতো।

ডিক্টেটরশিপ যে দেশে চলে, সেইদেশের প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীর আকার হয় অনেক ছোট। ওদিকে ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী বা আমজনতার আকার হয় অনেক বড়।
ফলাফল, রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে সাপ্লাই হওয়া সুযোগসুবিধাগুলো প্রভাবশালী আর অপরিহার্য শ্রেণী অনেক বেশি ভোগ করে। (কারণ তাঁদের আকার ছোট)
সেইসাথে ডিক্টেটরও আমজনতার উপর ইচ্ছামত কর আরোপ করতে পারে। কারণ আমজনতা অসহায়। তাঁদের উপর বেশি কর আরোপ করে আরো বেশি টাকা তুলতে পারে এবং সেই টাকায় প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণী আরো বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে।
সুতরাং হিসাবটা বুঝতে পারতেছেন।
প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীর জন্য ডিক্টেটরশিপ রীতিমত আশীর্বাদ।

অন্যদিকে যদি দেশে গনতন্ত্র থাকে, তাহলে কি হয় চিন্তা করুণ।
বিশাল পরিমাণ আমজনতা, অর্থাৎ ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী প্রতি চার বছর বা দেশভেদে পাঁচ বছর পরপর রীতিমত প্রভাবশালী শ্রেণীর ভুমিকাতে অবর্তীর্ণ হয়। ভোট দেয়। ভোট দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল করতে পারে।
সুতরাং ক্ষমতায় যে বসে, সে চিন্তা করে কিছুতেই এই আমজনতা বা ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণীকে খ্যাপানো যাবে না। অন্তত সামান্যকিছু হলেও বা যতটুকু না হলেই না, ততটুকু সুযোগসুবিধা তাঁদের দিতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট, চালডাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পাতির সাপ্লাই নিশ্চিত করতে হবে আমজনতার জন্য। এতে আমজনতা শান্ত থাকবে।
চার বছর বা দেশভেদে পাঁচ বছর পর ভোট হলে তখন আমজনতা যাতে ভোট দেয় অন্তত।
সেইসাথে জনতার উপর ইচ্ছামত কর আরোপ করাও যাবে না। তাতেও জনতা রেগে যাবে।

গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতেও প্রভাবশালী শ্রেণী ও অপরিহার্য শ্রেণী বিদ্যমান। তবে ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী বা আমজনতা যেহেতু তিনশ্রেণীতেই সময়ে সময়ে অবস্থান করে, বা ওভারল্যাপ করে, সেজন্য ক্ষমতার মসনদে যে বসে আছে, তাঁকে পুরস্কারের বন্টন বা সুযোগসুবিধার বন্টন বেশ সাবধানে করতে হয়। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে প্রভাবশালী আর অপরিহার্য শ্রেণী সুযোগসুবিধা ঠিকই ভোগ করে, কিন্তু সেটা কখনোই ডিক্টেটরশিপে যেপরিমাণ একচেটিয়া সুযোগসুবিধা পায়, সেটার মত নয়।
যেমন গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে গনতান্ত্রিক দলগুলো নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে। গনতান্ত্রিক দলগুলো চালাতে বড়বড় বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ফান্ডিং লাগে। টাকা লাগে। এসব বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতায় গিয়ে সুযোগসুবিধা দিতে হয়। সরকারি কনট্রাক্ট, ঠিকাদারি কাজ, এসব দিতে হয়।
গনতান্ত্রিক সরকারকেও একইভাবে প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। এরপর অবশ্য আমজনতার ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হয়।
যদি একটা দেশে সত্যিকার গনতন্ত্র থাকে, তাহলে সেইদেশে দুর্ভীক্ষ হলে পরবর্তী নির্বাচনে অবশ্যই ক্ষমতার পালাবদল হবে। এটা পানির মত পরিস্কার হিসাব।

যাই হোক, আমি গনতন্ত্র বলতে বাস্তব ও কার্যকর গনতন্ত্রের কথা বলছি। লোক দেখানো গনতন্ত্র না।

সুতরাং প্রফেসর ব্রুসের মতে,
মসনদ ও ক্ষমতার ধরণ যেমনই হোক,
ক্ষমতাধরকে-
প্রভাবশালী, অপরিহার্য এবং (বিনিময়ে/ আমজনতা),
এই তিন শ্রেণীকে ফেস করতে হবে।

এতোটুকু যা লিখলাম, সেটা হল ইন্ট্রোডাকশন। বা সূচনা।
এবার এই বিষয়গুলোকে ভালোমত বিশ্লেষণের জন্য উদাহরণ প্রয়োজন।
আমি আমার এই সিরিজ লিখাটি প্রফেসর ব্রুসের “ডিক্টেটরস হ্যান্ডবুক” বইটির বিশ্লেষণ ও এনালাইসিসের সাথে নিজের বিশ্লেষণ যোগ করে তুলে ধরবো।
এই লিখাটি লিখছি মুলত বইটির আলোকে।

যেমন, বইটিতে শুরুতেই যাকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তিনি ফ্রান্সের রাজা লুই-১৪

একেবারে সংক্ষেপে লুই’এর জীবনের ঘটনাগুলো তুলে ধরা যাক।


লুই মাত্র ৪ বছর বয়সে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলেন। উনার বাবা মারা গিয়েছিলেন। ফলে রাজার ছেলে রাজা হলেন।
তো বুঝতেই পারতেছেন, মাত্র চার বছর বয়সে তো আর কেউকিছু বোঝে না। রাজ্য চালানো তো প্রশ্নই আসে না।
সুতরাং লুই-১৪ রাজা হিসেবে থাকলেও কার্যত রাজ্য পরিচালনা করতেছিলো তাঁর মা এবং সেইসাথে ফ্রান্সের এরিস্ট্রোক্র্যাট বা প্রভাবশালী শ্রেণী।
লুটেপুটেই চলতেছিলো রাজ্য শাসন। প্রভাবশালী শ্রেণী তথা ধনিক শ্রেণী ফ্রান্সকে রীতিমত দেউলিয়া করে ফেলেছিলো।
১৬৬১ সালে যখন লুই-১৪ এর বয়স ২৩ বছর, তখন যুবক লুই রাজ্যের সত্যিকারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেবার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু তিনি দেখলেন, নামকাওয়াস্তে তিনি রাজা। কার্যত দেশ চলে গিয়েছে এরিস্ট্রোক্রেসির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আর্মিও অসন্তুষ্ট। কার্যত দেশ দেউলিয়া। পলিটিক্যাল ক্রাইসিস যখন তখন শুরু হবে। এবং সেটা হলে লুই’এর গর্দান যাবে।
ওদিকে লুই খবর পেলেন, প্রভাবশালীরা চিন্তাভাবনা করতেছে ফ্রান্সের ক্ষমতার পালা বদলের। নতুন কাউকে ক্ষমতায় আনার। এটা মুলত একটা আইওয়াশ। অর্থাৎ দেশের দিশেহারা মানুষকে একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়ে শান্ত করার। সেইসাথে ভবিষ্যতেও নিজেদের লুটপাটতন্ত্র চালু রাখার।
তো লুই-১৪ বেশ সাবধানে এগোলেন। নবীন আর্মি অফিসারদের প্রমোশন দিলেন, এবং বয়স্ক আর্মি অফিসারদের অবসরে পাঠালেন এবং নতুন মানুষদের রাজার “Inner Circle” বা পলিটিক্যাল ক্ষমতার প্রভাববলয়ের ভেতরে নিয়ে আসতে শুরু করলেন।
আর্মি অফিসার র‍্যাঙ্কে প্রচুর নিয়োগ দিলেন একেবারে আমজনতার ভেতর থেকে।
আর্মি আরোবেশি রাজনীতিতে ইনভল্ভ হতে শুরু করলো।
এটা করে তিনি মুলত পুরনো এরিস্ট্রোক্র্যাসির ভেতর ফ্রেশ ব্লাড সঞ্চালন করতেছেন। সেইসাথে একটা নতুন এরিস্ট্রোক্রেসি তৈরি করতেছেন যারা রাজার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে এবং দায়বদ্ধ থাকবে। লুই খুব দ্রুত কাজটি করেছিলেন এবং আঘাত আসার আগেই তিনি পুরনো এরিস্ট্রোক্র্যাটদের টেকনিক্যালি আইসোলেট করে এবং পরে ক্ষমতার বলয়ের বাইরে ঠেলে দিয়ে ফ্রান্সের শাসনতন্ত্র এবং মসনদকে নতুনভাবে নিজেরমত করে গড়ে তোলেন।

সেইসাথে দীর্ঘদিন যারা প্রভাবশালী শ্রেণী হিসেবে বেশ আরামে ছিল, নিশ্চিন্তে ছিল, তাঁদের ভেতরই এবার কম্পিটিশন শুরু হয়ে গেল। নতুন ভার্সেস পুরনো।
এরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখতে নিজেদের ভেতর কম্পিটিসন শুরু করলো। ফলাফল, রাজা হটানোর চিন্তা আপাতত তাঁদের মাথা থেকে আউট।

আর এন্ড গেম হল, দিনশেষে লুই একেবারে লয়্যাল ইনার সার্কেল তৈরি করলেন একেবার নিজের হাতে গড়া লোক দিয়ে। পুরনো মানুষগুলোকে ঝেড়ে ফেলে।

এই লুই-১৪ গোটা ফ্রান্স সম্রাজ্যকেই বদলে দিয়েছিলেন পরে।
লুই-১৪ শাসনামলে ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আটল্যান্টিকের অন্যপাশে, অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশেও ফ্রান্সের প্রভাববৃদ্ধি পায়। তাঁর তৈরি করা 'কোড অফ ল” পরবর্তীতে নেপোলিয়নিক কোড তৈরিতেও ইনফ্লুয়েন্স করে এবং আধুনিক ফ্রান্সের আইনের ব্যাসিকও এসেছে সেই লুই-১৪ এর কাছ থেকেই।
লুই যে আধুনিক ধাচের আর্মি গড়ে তুলেছিলেন নতুন করে, নতুনভাবে, সেটা পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য শক্তিশালী সম্রাজ্যগুলোও অনুসরণ করেছিলো।

সুতরাং রাজা লুই-১৪ ছোট বয়সেই বুঝেছিলেন, ক্ষমতায় থাকতে হলে আগে প্রভাবশালী শ্রেনীকে চেকইন দিতে হবে। নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।
এরপর আসবে অপরিহার্য এবং বিনিমেয়রা...


(ধারাবাহিকভাবে সিরিজ আকারে বাকিঅংশ লিখা হবে)
ধন্যবাদ।
রেফারেন্স বইঃ “ডিক্টেটরস হ্যান্ডবুক” বাই প্রফেসর ব্রুস
Read More »

Monday, September 11, 2017

মেক্সিকান আন্ডারওয়ার্ল্ড


তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিলো মেক্সিকোর সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্বলিত মিলিটারি নিয়ন্ত্রিত জেলখানায়। তাঁর থাকার সেলটিও সর্বক্ষণ সিসি ক্যামেরা দ্বারা পর্যবেক্ষণে রাখা হত।
একদিন সিসি ক্যামেরায় দেখা গেল, তিনি গোসল করার জন্য shower room গেলেন। ব্যস, এরপর ঠিক ম্যাজিসিয়ানের মত, গায়েব !

বলছিলাম, CEO of Crime হিসেবে পরিচিত, এল চ্যাপো গুজম্যানের কথা।
কিভাবে সেদিন ওই গোসলখানা থেকে তিনি গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন, শুনলে অবাক হবেন।

সেই গোসল খানার ঠিক নিচে এক মাইল লম্বা ট্যানেল নির্মান করেছিলো এল চ্যাপোর লোকেরা। রীতিমত আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে লাইনের মত ট্যানেল।

এই সেই গোসলখানা।


আর এই সেই ট্যানেলের অন্যপ্রান্তের মুখ।


আর নিচের ছবিতে দেখতেছেন ট্যানেলের ডিজাইন।


এতো দীর্ঘপথ যাতে এল চ্যাপোকে পায়ে হেটে যেতে না হয়, সেজন্য রেল লাইন বসিয়ে তাতে আবার মোটরসাইকেল ইম্প্রোভাইজ করে বিশেষ vehicle বানিয়ে এল চ্যাপোকে জেল থেকে বের করে আনা হয়েছিল।




এতো দীর্ঘ টানেলের ভেতরে ইলেকট্রিসিটি ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উপরে ট্যানেলের নকশাটি দেখতে পাচ্ছেন।
রীতিমত প্রোফেশন্যাল লেভেলের কাজ।
প্রায় এক মাইলের বেশি দুরে গিয়ে ট্যানেলের অন্যপ্রান্ত থেকে বের হয়ে আসেন এল চ্যাপো।

গোটা ব্যাপারটা কোনো হলিউডি মুভিকে হার মানাবে।

যে ব্যক্তির কথা বলছি, সেই "El Chapo" Guzmán মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যমতে "the most powerful drug trafficker in the world"

গোটা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করে বিখ্যাত Forbes ম্যাগাজিন।
তাতে বারাক ওবামা, ভ্লাদিমির পুতিনের মত বিশ্ব নেতারা থাকেন।

আর ২০০৯, ২০১০ এবং ২০১১ সালের দিকে এল চ্যাপো ছিল যথাক্রমে ৪১, ৬০ এবং ৫৫ নাম্বারে !
মেক্সিকোর টেলিকম ব্যবসায়ী কার্লোস স্লিমের পর তিনিই ছিলেন মেক্সিকোর সবচেয়ে পাওয়ারফুল ব্যক্তি।
(DEA)- এর তথ্য মতে, তিনি “The most ruthless, dangerous, and feared man on the planet”

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের Crime Commission ২০১৩ সালে
"the godfather of the drug world" হিসেবে পরিচিত এল চ্যাপোকে ঘোষণা করেছিলো "Public Enemy Number One" হিসেবে।

এল চ্যাপো গুজম্যান মেক্সিকোর নাগরিক।
Gangland হিসেবে পরিচিত মেক্সিকোর অন্যতম পাওয়ারফুল গ্যাং সিনোলোয়া কার্টেলের প্রধান।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন মেক্সিকোকে টার্গেট করে। “they are bringing drugs.. they are bringing crimes… they are rapists… and some of them are good people”

এই কথাটি বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই সমালোচিত হয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমস্যা হল, যে কথাটা ভদ্রভাষায় বলা যায়, সেই কথাটাকেও সে সরলীকরণ করে একেবারে বাজেভাবে বলে।
তবে আমেরিকাতে ড্রাগসের সমস্যা যে ভয়াবহ, সেটা জানার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের দরকার নেই। তথ্য উপাত্ত দেখলেই চলে।
কিছু তথ্য উপাত্ত দেয়া যাক। খোদ মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য উপাত্ত দেখলেই ভয়াবহ অবস্থাটা কিছুটা হলেও বোঝা যায়।

মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, Mexican drug cartels take in between $19 and $29 billion annually from US drug sales.

কেবল মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলগুলোই যদি বছরে ১৯ থেকে ২৯ বিলিয়ন ডলারের ড্রাগসের সাপ্লাই আমেরিকাতে দেয়, তাহলে ভেবে দেখুন আসল চিত্র আরো কত ভয়াবহ।

আমেরিকাতে ঢোকা ৯০% কোকেন মেক্সিকোর বর্ডার হয়েই আসে। আর এই কোকেন উৎপাদন হয় মুলত পেরু, কলম্বিয়া আর বলিভিয়াতে।
কলম্বিয়ান মাফিয়ারা মেনুফ্যাকচারিং বা প্রোডাকশন নিয়ন্ত্রন করে। আর মেক্সিকান মাফিয়া সাপ্লাই চেইনের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রন করে। মুল গন্তব্য কিন্তু সেই আমেরিকা।
পাবলো এস্কোবার বা কালি কার্টেলদের জামানায় মেক্সিকোকে বলা হত বাউন্সিং ট্রেম্পোলিন। অর্থাৎ দক্ষিন আমেরিকা থেকে উৎপাদিত ড্রাগ মেক্সিকো নামক ট্রেম্পোলিনের উপর একটা লাফ দিয়ে আমেরিকাতে চলে যেত। কথাটা মেটাফোরিক। কি বোঝানো হচ্ছে, আশা করি সবাই বুঝতে পারতেছেন।
যেমন, কেবল ২০১০ সালেই ৪০০ মেট্রেক টন কোকেন মেক্সিকোর বর্ডার হয়ে আমেরিকাতে ঢুকেছে।

কোকেনের মুল সাপ্লাই দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশীয় দেশগুলো থেকে এলেও,
আমেরিকাতে ঢোকা হেরোইন আসে মুলত মধ্যএশিয়া ও এশিয়া থেকে।
৯০% ওপিয়াম উৎপাদন হয় আফগানিস্তানে। এখানে প্রোডাকশন নিয়ন্ত্রন করে এশিয়ান মাফিয়াগুলো। আর তাঁদের সাথে যুক্ত হয়ে ল্যাটিনো ও আমেরিকান মাফিয়াগুলো সাপ্লাই ও ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ন্ত্রন করে।
গাজা আমেরিকার কিছুকিছু স্টেটে লিগালাইজ হয়েছে। কিন্তু এখনো মেক্সিকো থেকেই গাজার সিংহভাগ সাপ্লাই আমেরিকাতে আসে।
জাতিসংঘের তথ্য মত বার্ষিক ড্রাগ ট্রেডের পরিমাণ হাফ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। মেক্সিকোতে তৈরি হওয়া মেথানফেটামিনের জন্য দরকারি কেমিক্যালস আসে চীন থেকে। অর্থাৎ ইয়াবা বা মেথ। যেটাই বলি।
সেই সুত্র মেক্সিকান মাফিয়াদের সাথে চাইনিজ ও জাপানিজ সহ এশিয়ান মাফিয়াদের লিঙ্ক তৈরি হয়েছে অনেক আগে থেকেই।

According to a 2007 United Nations report, স্পেনে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভেতর প্রতি ১০০ জনের ৩ জন, অর্থাৎ ৩% মানুষ কোকেন আসক্ত। যা দুনিয়াতে সর্বোচ্চ। আর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। (২.৮%)
তবে দেশ হিসেবে মোট সেবনের পরিমাণ বিচার করলে আমেরিকা সর্বোচ্চ।
২০০০ সালে গোটা পৃথিবীতে কোকেন সেবনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬০০ টন। যার ৩০০ টন কনজিউম করেছে আমেরিকা একাই। অর্থাৎ ৫০%
The 2010 UN World Drug Report concluded that "it appears that the North American cocaine market has declined in value from US$47 billion in 1998 to US$38 billion in 2008. Between 2006 and 2008, the value of the market remained basically stable.
http://www.unodc.org/pdf/research/wdr07/WDR_2007.pdf


গাঁজার পর কোকেনই আমেরিকার মাদকসেবীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় রিক্রিয়েশনাল ড্রাগ। এবং একক দেশ হিসেবে আমেরিকাতে সবচেয়ে বেশি কোকেনের সেবন হয়। মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের ভেতর কোকেন জনপ্রিয় হবার কারণে এটাকে "rich man's drug" বলা হয়ে থাকে।

কলেজ পড়ুয়া মার্কিনী ছেলেমেয়েদের কাছেও কোকেন সবচেয়ে জনপ্রিয় পার্টি ড্রাগস হিসেবে। . A study throughout the entire United States has reported that around 48 % people who graduated high school in 1979 have used Cocaine recreationally during some point in their lifetime,
the drug became particularly popular in the disco culture as cocaine usage was very common and popular in many discos such as Studio 54.


২০০৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেনের মোট বাজার ছিল ৭০ বিলিয়ন ডলারের। যা সেই বছর Starbucks টাইপের বিখ্যাত কর্পোরেশনের বার্ষিক রেভিনিউয়ের চেয়ে বেশি ছিল।


২০১৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ওপিয়াম উৎপাদনের ৬৬% হয়েছে কেবল এক আফগানিস্তানে।
According to a U.N. sponsored survey, in 2004, Afghanistan accounted for production of 87 percent of the world's diamorphine.
Afghan opium kills around 100,000 people annually.

According to the 2012 National Survey on Drug Use and Health (NSDUH), আমেরিকাতে কেবল ইয়াবা বা মেথ আসক্ত মানুষ আছে ১ কোটি ২০ লাখ।
এটাও মাথায় রাখুন, আমেরিকার জনসংখ্যা ৩১ কোটির বেশি।

আমাদের বাংলাদেশেও প্রতিমাসে লক্ষ লক্ষ পিচ ইয়াবা প্রবেশ করে কেবল পার্বত্য চট্রগ্রাম দিয়েই। লক্ষ লক্ষ পিচ ইয়াবা পুলিশ আটক করে।
আমাদের দেশও এদিক দিয়ে খুব একটা পিছিয়ে আছে কি?
পুলিশের হাতে যা ধরা পড়ে, সেটা খুব ক্ষুদ্র একটা অংশ।

যেখানে ডিমান্ড থাকবে, সেখানে সাপ্লাই আসবেই। এটা ঠেকানোটা দুরুহ ব্যাপার। সেই পাবলো এস্কোবারের যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমেরিকার DEA কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু লাভ কি?
ল্যাটিন আমেরিকার ড্রাগ ট্র্যাফিকারদের ধরতে আমেরিকা গত পঞ্চাশ বছরে যে পরিমাণ অর্থ ও সময় ব্যয় করেছে, তাতে লাভ হয়েছে কি?
তেমন কোনো লাভ হয়নি।
পাবলো এস্কোবার মরেছে। তাঁর জায়গায় ক্যালি কার্টেল এসেছে। ক্যালি কার্টেলকে ধরা হয়েছে। তাঁদের জায়গায় মেক্সিকান মাফিয়ারা এসেছে। এল চ্যাপো গুজম্যানকে ধরা হল, এবার তাঁর জায়গায় অন্যকেউ আসবে।
এই যুদ্ধ চলবেই।
অথচ এই অর্থ, এই সময়, এই শ্রম যদি আমেরিকা নিজের দেশে মাদকসেবন রোধ করতে ব্যয় করতো, সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে নিজ দেশে মাদকসেবন প্রতিহত করার চেষ্টা করতো, তাহলে হয়ত আরো বেশি সফলতা আসতো।


এটি ২০১০ সালে মেক্সিকোতে ড্রাগ কার্টেলগুলোর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ম্যাপ...
ড্রাগ কার্টেলগুলোর ভেতর সর্বক্ষণ টেরিটোরিয়াল ক্ল্যাস চলে। এবং তাতে মারা যায় হাজারহাজার মানুষ।
মেক্সিকো ড্রাগ কার্টেলগুলোর জন্য রীতিমত রণক্ষেত্র।
যেমন উপরের মানচিত্রে (২০১০ সালের) আকাশী রঙের যে টেরিটোরি দেখছেন, সেটা ছিল সিনালোয়া কার্টেলের নিয়ন্ত্রণে।
সবচেয়ে পাওয়ারফুল এই সিন্যালোয়া কার্টেলের প্রধান হল এল চ্যাপো গুজম্যান।

মেক্সিকোর সাথে আমেরিকার যে বিশাল বর্ডার আছে, এই বর্ডার দিয়ে আনায়াসে ড্রাগ প্রবেশ করে। বিশেষ করে আমেরিকার নিউ মেক্সিকো এবং এরিজোনা বর্ডার এরিয়াতে বিশাল বিশাল ট্যানেল বানিয়ে এসব ট্যানেল দিয়ে টনকে টন মাদকদ্রব্য প্রবেশ করানো হয়।
মার্কিন বর্ডার গার্ডেরা মাঝেমাঝেই বড়বড় ট্যানেলের সন্ধান পায়। এবং সেসব ট্যানেল ধ্বংসও করা হয়। কিন্তু ট্যানেল নির্মান চলতে থাকে। এবং ড্রাগসও আমেরিকাতে প্রবেশ করতেই থাকে।
এল চ্যাপোর সিনালোয়া কার্টেলে এক বড়সড় ইঞ্জিনিয়ারিং টিম আছে, ট্যানেল এক্সপার্ট আছে, যারা রীতিমত প্রফেশন্যাল স্কিলে এসব ট্যানেল নির্মান করে।

যেমন নিচের চিত্রে ২০০৭ সালে মার্কিন বর্ডার গার্ড’দের সিজ করা একটা ট্যানেল দেখতে পাচ্ছেন। অন্তত ধারণা পাবেন, কিভাবে ট্যানেলগুলো মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেল ব্যবহার করে।







নানান উপায়ে আমেরিকাতে প্রবেশ করানোর পর এসব ড্রাগস ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় আমেরিকা জুড়ে। আমেরিকাতে থাকা ডিস্ট্রিবিউটরদের সাহায্যে।



যেমন উপরের মানচিত্রে দেখতেই পাচ্ছেন, আমেরিকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অধিকাংশ জায়গায় প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে সিনালোয়া কার্টেল। (deep yellow color)

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন লোকেশনগুলো হল ম্যায়ামি, নিউইয়র্ক, লাস ভেগ্যাস, লস এঞ্জেলস, এবং অবশ্যই শিকাগো।
শিকাগো শহর অবশ্য অনেক আগে থেকেই আমেরিকান মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য ছিল। এই শিকাগোতে রাজত্ব করতো আল ক্যাপোনের মত ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মাফিয়া ডন।

আর এখন এই শিকাগো শহরে সবচেয়ে বেশি মেক্সিকান হিস্পানিক মানুষের বসবাস। আর এসব হিস্পানিক কমিউনিটির ভেতর ঘাপটি মেরে থাকে MS-13 এর মত দুর্ধর্ষ গ্যাং...
এল চ্যাপোর সিনালোয়া কার্টেলের সাথে সরাসরি সম্পর্ক আছে MS-13 এর। MS-13 এর মুল ট্যারিটোরি অবশ্য ক্যালিফোর্নিয়াতে।
শিকাগো শহর দাপিয়ে বেড়ায় Latin kings, Gangster Disciples, Latin Angels, Los Zetas, Chicago outfits
টাইপের ডজনখানেক গ্যাং।
এসব গ্যাংগুলো টেরিটোরি নিয়ে নিজেরা নিজেরা মারামারি খুনোখুনি করে। ফলাফল, শিকাগো শহরের ক্রাইমরেট রীতিমত ভয়াবহ। খোদ মার্কিন রাজনীতিবিদেরাও শিকাগো শহরের ক্রাইম প্রবলেম নিয়ে অনেক চিল্লাপাল্লা করে এসেছে।
Chicago is considered the most gang infested city in the United States, with a population of over 100,000 active members from nearly 60 different factions.
Gang warfare and retaliation is common in Chicago. Gangs were responsible for 61% of the homicides in Chicago in 2011. (from Wikipedia)

August 2016 marked the most violent month Chicago had recorded in over two decades with 92 murders,
By October 2016, Chicago had surpassed 600 homicides and over 2,800 people shot, marking a 32 percent increase in murders and non-fatal shootings compared to 2015.
Chicago's 2016 murder and shooting surge has attracted national media attention from CNN, The New York Times, USA Today, Time Magazine and PBS.


আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব গ্যাংগুলোর মুল ব্যবসা হল ড্রাগস। মেক্সিকান মাফিয়াদের সাথে এরা ব্যবসা করে। মেক্সিকান মাফিয়ারা কলম্বিয়া থেকে কোকেনের মত ড্রাগস প্রতি কেজি ২ হাজার ডলার মুল্যে কিনে নিয়ে আসে। এরপর সেটা বর্ডার পার করে আমেরিকাতে থাকা এসব গ্যাংগুলোর কাছে প্রতি কেজি ৩০ হাজার ডলার মুল্যে বিক্রি করে। এরপর সেই কোকেন আমেরিকাতে কেজি প্রতি ১ লাখ ডলার মুল্যে বিক্রি হয়।
বুঝতেই পারতেছেন, বিশাল ব্যবসা।
চেইন বিজনেস।

ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক, ম্যায়ামি, লস এঞ্জেলস, লাস ভেগাসের মত জায়গায় ড্রাগসের দাম বেশি। সেখানে পয়সাওয়ালা মানুষও বেশি। কমন ইকুয়েশন। সুতরাং এসব এলাকার টেরিটোরি দখল করা নিয়ে গ্যাংগুলোর ভেতর মারামারিও বেশি হয়।

এল চ্যাপো গুজম্যানের জন্ম ১৯৫৭ সালে। তাঁর জন্ম সিনালোয়া প্রদেশে।
এই রিজিওনে গ্রামীন এলাকার প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে গাঁজার চাষ করে। গন্তব্য আবার সেই আমেরিকা।
অর্থাৎ আমেরিকাতে গাঁজা চাষ যেহেতু অবৈধ ছিল, (এখনো আমেরিকার অধিকাংশ রাজ্যে অবৈধ) সেহেতু এসব মেক্সিকোর গ্রামীণ জনপদে গাঁজার চাষ হয়, এবং এই গাঁজা মেক্সিকান ড্রাগ ট্রাফিকাররা আমেরিকাতে এক্সপোর্ট করে।
সনাতনী ফসল চাষ করার চেয়ে কৃষকদের কাছে গাঁজা চাষ অনেক বেশি লাভজনক।
এটা অবশ্য আমাদের দেশেও একটু অন্যভাবে দেখা যাচ্ছে। যেমন হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে কিছুদিন আগে একটি প্রতিবেদন দেখিয়েছিল। দেশের উত্তরবঙ্গে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো টাইপের বিদেশি বিড়ি সিগারেট কোম্পানিগুলো মোটা অংকের টাকা দিয়ে কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করতেছে। কৃষকরাও দ্রুত লোভের আশায় ফসলী জমিতে তামাক চাষ করতেছে। তামাক গাছ চাষ করতে গিয়ে কেবল মাটি না, জমির পাশে পুকুর, খাল বিলও বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাটির অবস্থা এমন হচ্ছে, ভবিষ্যতে এই মাটিতে আর কোনো ফসল ফলানো সম্ভব না, কেবল তামাক ছাড়া...

তো মেক্সিকোতে চলতেছে গাঁজা চাষ।
এল চ্যাপো গুজম্যানের পরিবার এই গাঁজা চাষের সাথেই যুক্ত ছিল।
ফলে ড্রাগ ট্রাফিকারদের সাথে তাঁর পরিচয় হতে বেশি সময় লাগেনি।
এল চ্যাপোর বাবা সারাদিন মদ গাঁজা খেতো এবং পতিতালয়ে গিয়ে সময় কাটাতো। ফলে কম বয়সেই গাঁজা চাষাবাদের কাজে এল চ্যাপোকে মনযোগ দিতে হয়। লিখাপড়া আর করা হয়ে ওঠেনি।
সময় যেতে থাকে। এল চ্যাপো উঠাবসা করতে শুরু করে ড্রাগ ট্রাফিকারদের সাথে। ধীরেধীরে ওই অঞ্চলের বড়বড় ড্রাগ ট্রাফিকার হর্তাকর্তাদের সাথে এল চ্যাপোর পরিচয় হয়।
এরপর যা হবার সেটাই... অর্থাৎ একেএকে ওদেরকে খুন করে বা সরিয়ে দিয়ে একসময় এল চ্যাপো গ্যাংলিডার হয়ে যায়।




এবার কিছু ব্যাপার মাথার রাখতে বলবো। মেক্সিকোর পরিস্থিত আপনাকে বিবেচনায় নিতে হবে। আশি ও নব্বয়ের দশকে মেক্সিকোর অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এখনো খুব একটা ভালো না। সিনোলোয়ার মত এলাকাগুলোর অধিকাংশ জায়গা অনুন্নত। গরিব মানুষ আছে প্রচুর। বেকারত্ব সমস্যা আছে ভয়াবহ। তো দেখা যায়, ড্রাগসের বিজনেসের সাথে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে গিয়েছে প্রচুর মানুষজন। ড্রাগস উৎপাদন করে আমেরিকাতে রফতানি করা হচ্ছে। সুতরাং ডলার রিটার্ন আসতেছে। সিনালোয়ার মত এলাকাতে এল চ্যাপোর ইমেজ একারণে রীতিমত রবিন হুডের মত।
পুলিশ প্রশাসন এল চ্যাপোর পে রোলে থাকে। রাজার হালে চলে সে। দুইশো দেহরক্ষী তাঁর নিরাপত্তা দেয়।
সেইসাথে সিনোলোয়া কার্টেলের আছে বিশাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক। রীতিমত প্রফেশন্যাল লেভেলের। যারা Netflix এর Narcos সিরিয়াল দেখেছেন, আমি কি বলতেছি, সেটা হয়ত তাঁরা আরো ভালো বুঝতে পারবেন।
আমেরিকা থেকে fusion চ্যানেলের কিছু সাংবাদিক গিয়েছিলো এল চ্যাপোর সিনোলোয়া প্রবেশে। এল চ্যাপোর উপর প্রতিবেদন বানাতে।
বিমানবন্দরে নামার সাথেসাথে এল চ্যাপোর লোকেরা তাঁদের ফলো করা শুরু করে। এবং তাঁদের প্রতিটি মুভমেন্ট ফলো করা হয়।
পলিটিয়ান থেকে শুরু করে সরকারি হর্তাকর্তা আমলাদেরও অনেকে থাকে এল চ্যাপোর পে রোলে...
টাকা থাকলে ক্ষমতা কেনা যায়... আবার ক্ষমতা থাকলে টাকা আসে...

রীতিমত গোয়েন্দাবাহিনী বানিয়ে ফেলেছে এসব কার্টেলগুলো। তাঁদের নিজনিজ টেরিটোরি ও তাঁদের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে।
এবং ব্যাপক মানুষের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাতে এলাকাতেও তাঁরা জনপ্রিয়।
যেমন এল চ্যাপো গুজম্যানকে তাঁর এলাকায় রীতিমত প্রভুভক্তি করা হয়। সে রীতিমত সেলিব্রিটি। আর সেইসাথে যেহেতু সে আমেরিকার শত্রু, সেহেতু তাঁর প্রতি আলাদা সফট কর্নার আছে মেক্সিকোবাসীর। কারণ এসব ল্যাটিন দেশের অনেক দুর্দশার জন্য এরা আমেরিকাকে দায়ী করে এবং এসব দেশের মানুষের ভেতর এন্টি আমেরিকান সেন্টিমেন্ট আছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণে।



এল চ্যাপো এই রিজিওনে রীতিমত সেলিব্রিটি। তাঁর নামে ক্যাপ, টি শার্ট বিক্রি হয়।



যেমন, নিচে ছবি’তে দেখছেন, সিনোলোয়া এলাকাতে একটা চার্চ



খেয়াল করে দেখুন, জিসাস ও মাদার মেরীর মুর্তির সামনে যে মোচওয়ালা মুর্তি আছে, এই ভদ্রলোকের নাম Joaquin Murrieta
তাঁকে মেক্সিকোর রবীনহুড বলা হয়। The Real Zorro (দেখতেই তো পারছেন, চার্চের দেয়ালে রীতিমত মার্কিন ডলার লাগিয়ে রেখেছে)
তাঁকে রীতিমত পুজা করা হয়।

সিনালোয়াতে এল চ্যাপোর ইমেজ হল আধুনিক যুগের Joaquin Murrieta, যে গরিব মানুষের জন্য কাজের ব্যবস্থা করেছে, ডলার নিয়ে এসেছে।



রাইভেল গ্যাংদের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে এল চ্যাপো ১৯৯৩ সালে জেলে গিয়েছিল। অবশ্য এই জেলে যাওয়াটা কিছুটা তাঁর ইচ্ছাতেই হয়েছিল। তাঁর মত লোকের জন্য জেলখানা মাঝেমাঝে বেশ নিরাপদ জায়গা।
এল চ্যাপো জেলখানাকে রীতিমত ফাইভ স্টার হোটেল বানিয়ে ফেলেছিলো। জেলখানার নিরাপত্তা প্রহরী অনেকেই ছিল এল চ্যাপোর পে রোলে।
টাকা থাকলে সব জায়গাতেই সিস্টেম করা যায়।
জেলখানাতে মডেল থেকে শুরু করে প্রস্টিটিউটদের রাতদিন আনাগোনা চলতো। জেলখানার কয়েদী অনেকেই ছিল এল চ্যাপোর লোকজন। সেখানে আবার অন্য রাইভেল গ্যাংদের লোকেরাও ছিল। তাঁদের সাথে মারামারিও বেধে যেত।

Zulema Hernandez নামের এক মহিলার সাথে প্রেম হয়ে যায় এল চ্যাপোর এই জেলখানায় বসে।
এই জেলখানাতে বসেই এল চ্যাপোর বিজনেস ছড়িয়ে পড়ে মেক্সিকো থেকে স্পেন। স্পেন হয়ে ইউরোপে।

২০০১ সালে পরিস্থিত বদলে গেলে জেলখানা থেকে একরকম পায়ে হেটে বেরিয়ে যান এল চ্যাপো।
এরপর এল চ্যাপো রাইভেল গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধ আজ পর্যন্ত চলতেছে। লক্ষাধিক লোক নিহত হয় এই ড্রাগ যুদ্ধে।
কেবল ২০০৬ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৬০ হাজার মানুষ মারা গেছে ড্রাগ ট্রাফিকারদের ভেতর ইন্টারনাল যুদ্ধে।
Beltrán Leyva Cartel ছিল এল চ্যাপোর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।
ওদিকে মেক্সিকান সরকারি আর্মি এবং আমেরিকার DEA এক হয়ে এল চ্যাপোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে।

অনুমানিক, কমপক্ষে ৪ বার বৈধভাবে বিয়ে করেছেন এল চ্যাপো। সন্তান আছে কমপক্ষে দশজন।
২০০৭ সালে সর্বশেষ বৈধভাবে বিয়ে করেন একজন মার্কিনী মডেলকে। নাম Emma Coronel Aispuro



২০১২ সালে আমেরিকার মাটিতে তাঁদের জমজ সন্তানের জন্ম হয়।
এটা বলা বাহুল্য যে নিরাপত্তাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়েই এল চ্যাপো দেশে দেশে ঘুরতো...

২০১৪ সালে এল চ্যাপো আবার গ্রেফতার হয়। এবার আর নাম’কা ওয়াস্তে গ্রেফতার নয়। এবার সিরিয়াস।
মিলিটারি গ্রেডের জেলখানায় রাখা হয় এল চ্যাপোকে।
সেখানথেকেই সেই টানেল বানিয়ে পালিয়ে যায় এল চ্যাপো। যেটা নিয়ে শুরুতেই বললাম।
২০১৫ সালে।

ঠিক সেইবছরই নির্বাচনী প্রচারণায় নামে ডোনাল্ড জে ট্রাম্প।
আর নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেই মেক্সিকো’ এবং ড্রাগস ইস্যুকে হাইলাইট করে প্রচারণা শুরু করে ট্রাম্প।
এল চ্যাপো ট্রাম্পের মাথার মুল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করে। জি হা... ঠিকই শুনেছেন। ট্রাম্পের মাথার মুল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার ঘোষনা করেছিল এল চ্যাপো।

ড্রাগস ইস্যু যে কত বড় সমস্যা আমেরিকাতে, আমেরিকার প্রগতিশীল শিক্ষিত সমাজ সেটা নিয়ে এতোটা চিন্তিত না হলেও আমেরিকার আমজনতা এটাকে বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছিল।
খেয়াল করে দেখবেন, ট্রাম্প যে বর্ডার দেয়াল বানানোর প্রপোজাল দিয়েছে, সেটা কিন্তু এই ড্রাগস এবং অবৈধ অধিবাসী প্রবেশ বন্ধ করার ধুয়া তুলে...
যদিও দেয়াল বানিয়ে কখনোই ড্রাগ ট্রাফিকারদের আটকানো পসিবল হবে কিনা, সেটা সন্দেহ।
কারণ তো এতোক্ষণ পড়লেনই।
এরা রীতিমত আন্ডারগ্রাউন্ডে বিশাল সাইজের টানেল বানিয়ে ড্রাগ প্রবেশ করাচ্ছে। দেয়াল বানিয়ে এদের কিভাবে আটকানো যাবে, সেটা আমার বোধগম্য না।


এরপর এল চ্যাপোকে তৃতীয়বারের মত গ্রেফতার করা হয়। ২০১৬ সালে।


এবার আর মেক্সিকোর কোনো জেলে রাখা হয়নি তাঁকে। আমেরিকা তাঁকে extradition এর মাধ্যমে ২০১৭ সালে এল চ্যাপোকে মেক্সিকো থেকে আমেরিকাতে নিয়ে আসা হয়। ১৯শে জানুয়ারি।

ঠিক তার একদিন পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়।


বর্তমানে এল চ্যাপো আমেরিকাতে বন্দী আছে।
টেড ক্রুজ কিছুদিন আগে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এল চ্যাপোর লুকানো ব্যাংক ব্যালান্স উদ্ধার করে সেই টাকা দিয়ে ট্রাম্পের বর্ডার দেয়াল বানাতে।
আমার ধারনা, এটা জাস্ট কথার কথা...

মেক্সিকোর প্রশাসন আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ড্রাগ কার্টেলগুলোকে দমন করতে। সাফল্যের দেখা কিছু পেয়েছে। তবে ড্রাগ কার্টেলের বিশাল সম্রাজ্যে হয়ত কেবলমাত্র কিছু অংশতে আঘাত হানতে পেরেছে।
এল চ্যাপো না থাকলে তাঁর জায়গায় অন্যকেউ আসবে। অথবা রাইভেল গ্যাং এল চ্যাপোর ভ্যাক্যুয়াম দখল করবে। কিন্তু কার্টেলের রাজত্ব চলবেই। অন্তত যতদিন আমেরিকাতে ড্রাগসের বিশাল ডিমান্ড থাকবে, ততদিন।

কিছুদিন আগে মেক্সিকান সেনাবাহিনী ড্রাগসের একটা চালান জব্দ করেছিল। নিচে দেখছেন সেটার ছবি।



এছাড়া ড্রাগ ট্রাফিকারদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে নানা সময়ে। তাঁদের টাকা পয়সাও জব্দ করা হচ্ছে।






এতোকিছুর পরও মেক্সিকোতে গাঁজা, পপি, মেথ উৎপাদন কমেনি। বরং বেড়েছে। গত দশ বছরে দিগুন হয়েছে। এল চ্যাপোর না থাকার পরও তাঁর সিনোলোয়া কার্টেল বহাল তবিয়তে চলতেছে।



এতো গেল কেবল ড্রাগস। কার্টেলদের বিজনেস কখনোই কেবলমাত্র ড্রাগসের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না। মানবপাচার, মানিলন্ডারিং, হুন্ডির ধান্দা, প্রস্টিটিউশন, অস্ত্রের ব্যবসা তাঁদের কাছে নতুন কিছু না। তবে একটা ভিন্ন ডাইমেনশন তাঁরা এনেছে গত বিশ বছরে।
সেটা হল তেল।

এবার বলতেছি মেক্সিকোর আরো একটি ভয়াবহ চিত্র।
ইরাক যুদ্ধের পর তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল ব্যাপকভাবে। আর মেক্সিকোর কার্টেলগুলোর চোখ পড়েছিল তখন তেলের দিকে।
ক্রুড ওয়েল, অর্থাৎ অপরিশোধিত তেল মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় রফতানিখাত। এবং মেক্সিকোর তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা আবারও সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মেক্সিকোর অর্থণীতির লাইফ ব্লাড বলা হল তেল।
রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানি Pemex এর কাছ থেকেই মেক্সিকো সরকার মোট রাজস্বের তিনভাগের একভাগে আদায় করে।
অথচ এই কোম্পানির তেলের পাইপলাইন কেটে তেল চুরি করাটাকে রীতিমত ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে মেক্সিকান মাফিয়ারা।

২০০০ সাল থেকে তেলের পাইপ লাইন কেটে তেল চুরি করার হার বেড়ে গিয়েছে ভয়াবহ ১৫৪৮%

মাল্টি মিলিয়ন ডলারের আন্ডারগ্রাউন্ড তেলের বাজার তৈরি করেছে মেক্সিকান মাফিয়ারা চুরি করা তেল বিক্রি করে।
ইন ফ্যাক্ট, রীতিমত মিলিটারি দিয়ে তেলের পাইপলাইনগুলোর নিরাপত্তা দিতে হচ্ছে মেক্সিকান সরকারকে।
মেক্সিকান সরকার রীতিমত দিশেহারা এই তেলচুরি ঠেকাতে গিয়ে।

ব্যবসাটা কি বুঝেছেন এখনো?
ধরূণ, মেক্সিকো থেকে একটা পাইপলাইনে করে তেল যাচ্ছে আমেরিকাতে। মেক্সিকো সরকার ব্যারেল প্রতি তেল বিক্রি করতেছে আন্তর্জাতিক বাজার মুল্যে। ধরূণ, ১০০ টাকা... অর্থাৎ কথার কথা, ১০০ টাকা দিয়ে মেক্সিকো আমেরিকার কাছে তেল বিক্রি করতেছে।

এখন ড্রাগ কার্টেলরা পাইপলাইন কেটে তেল চুরি করে সেই চুরি করা তেল ধরূণ ৫০ টাকায় আমেরিকার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতেছে গোপনে। অর্থাৎ অর্ধেক দামে চুরি করা তেল ব্যারেলে ভরে টেক্সাসে পাচার করে দিচ্ছে, যেভাবে হেরোইন, কোকেইন পাচার করে, সেভাবে।
আমেরিকান ছোটছোট তেলের ডিপোর মালিকদের এতে লাভ। তাঁরা ৫০ টাকা দিয়ে তেল কিনে ১২০ টাকার বিক্রি করতেছে। যেখানে ১০০ টাকায় লিগ্যালি কিনে ১২০ টাকায় বিক্রি করার কথা।
অর্থাৎ হিসাবটা নিশ্চয় বুঝেছেন। আমেরিকার তেলের পাম্প বা ডিপোগুলোর মালিকেরা বেশি লাভ করতেছে চুরি করা তেল কিনে।

টেক্সাসের পাঁচটি কোম্পানিকে ইতিমধ্যেই সনাক্ত করা হয়েছে চুরি করা তেল কেনার দায়ে। valley fuel ltd, Murphy Energy Corp, Trammo petroleum, BASF Corp এবং US petroleum Deport সরাসরি চুরি করা তেল কেনার সাথে জড়িত।
আবার মেক্সিকান কার্টেলগুলোর তো সবটাই লাভ। চুরি করা তেল যত কম দামেই বিক্রি করুক, লোকসান অন্তত হবে না।



ছবিতে দেখতেছেন, কিভাবে মাটি খুড়ে তেলের পাইপ লাইন ফুটা করে ছোট পাইপ লাগিয়ে তেলে টেনে চুরি করা হচ্ছে।

কার্টেলরা এটাকে বলে Fuel milking

মেক্সিকোতে মোট ১৭ হাজার মাইল তেলের পাইপলাইন আছে। এতো বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্ক সারাক্ষণ সামাল দিয়ে রাখাটা রীতিমত অসম্ভব।
আর এজন্য তেল চুরিও ঠেকানো যাচ্ছে না।
সেইসাথে পেমেক্স কোম্পানির অসাধু কর্মচারী ও ঠিকাদারেরাও জড়িত আছে। জড়িত আছে অসাধু কর্মকর্তারা। গত দশ বছরে শতাধিক পেমেক্স কর্মকর্তা কর্মচারীকে তেল চুরি ও ড্রাগ কার্টেলের সাথে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সেইসাথে তেল চুরি করতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার নজীরও আছে।
সেইসাথে মেক্সিকো বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব থেকে।
এভাবে চলতে থাকলে মেক্সিকোর অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
কারণ ইতিমধ্যে কেবল Los Zetas নামের কার্টেল প্রায় বিলিয়ন ডলারের আন্ডারগ্রাউন্ড তেলের বাজার তৈরি করে ফেলেছে।
তেল চুরির সাথে লস জেটাস নামের এই মাফিয়া সবচেয়ে বেশি জড়িত।


এছাড়া নাইট টেম্পলার কার্টেলের মত ভয়াবহ সংগঠনও সরাসরি জড়িত অস্ত্র এবং তেল চুরির সাথে।

প্রায় ডজনখানেক পাওয়ারফুল এবং আরো ডজনখানেক ছোট বড় কার্টেল মেক্সিকোতে রাজত্ব করতেছে। মার্কিন প্রশাসন এবং DEA বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতেছে কখনো সরাসরি আবার কখনো মেক্সিকান সরকারের সাথে মিলে কাজ করে ড্রাগ ট্রাফিকারদের সামাল দিতে।
কিন্তু কার্যত ফলাফল খুব একটা ভালো হচ্ছে না।
হাইড্রার মাথার মত একটা মাথা কাটতেছে, আরো দুইটা তৈরি হচ্ছে।

সবকথার শেষ কথা হল, ডিমান্ড থাকলে কেউ না কেউ বাইরে থেকে সাপ্লাই দিবেই।
আমাদের দেশে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পিচ ইয়াবা প্রবেশ করে কেবল মিয়ানমান বর্ডার দিয়েই। এছাড়া হেরোইন, কোকেইন, ফেন্সিডিল, এসবের কথা তো বাদই দিলাম।
এসব কারা খায়?
অবশ্যই এই দেশের মানুষই খায়।
ডিমান্ড তাঁরা তৈরি করেছে, সুতরাং চোরেরা সাপ্লাই নিয়ে আসতেছে।

বিশাল বড় অংকের বাজার তৈরি করে ফেলেছে দেশের ভেতর। ফলে ড্রাগ ট্রাফিকারদের হাতে টাকাও যাচ্ছে মোটা অংকের। আর এই টাকা দিয়ে তাঁরা ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে।

আমি চেষ্টা করলাম একটা ব্রিফ আইডিয়া দেবার।
অনেককিছু বাদ দিয়ে গেলাম। বাদ না দিলে লিখাটা আরো বড় হইতো। আর একটামাত্র লিখাতে ডিটেইলস সবকিছু বলা পসিবল না।
আমি কেবল ড্রাগসের আগ্রাসনের ভয়াবহ চিত্রটি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

লিখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।









Read More »