Showing posts with label International Politics. Show all posts
Showing posts with label International Politics. Show all posts

Thursday, March 14, 2024

ডলারের রাজত্ব, যেভাবে শুরু হল

 


কল্পনা করুণ, প্রাচীন কালে একজন কৃষকের কথা। কৃষক ধান চাষ করে। নিজের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু ধান রেখে বাকি অংশ দিয়ে দিলো একজন জেলের কাছে।

কতটুকু ধানের বিনিময়ে জেলে কতগুলো মাছ বিক্রি করবে, সে বিষয়ে যাবো না।
একেবারে সহজ ভাবে চিন্তা করূণ।
বিনিময় প্রথাতে, একটি পণ্যের বিনিময়ে আরেকটি পণ্য পাচ্ছেন।
সমস্যা হল,
এই পণ্যগুলো পচনশীল।
ধরূণ একজন মাছ বিক্রেতা ৬টি কাতল মাছ দিয়ে ১০টি মুরগী চাচ্ছে।
কিন্তু এলাকায় যে মুরগী পালে,
তার কাছে বিনিময় যোগ্য মুরগী আছে ৫টি।
আরেকটি সমস্যা হল, মুরগী খামারি কাতল মাছ খেতে পছন্দ করে না।
আবার চিন্তা করুণ, ধার বা ক্রেডিট নেওয়ার প্রয়োজন হল।
ধান বিক্রেতা মুরগীর খামারির কাছে ৫টি মুরগী চাচ্ছে।
কিন্তু এমুহুর্তে বিনিময় করার মত ধান তার মজুদ নেই। মাঠে এখনো ধান পাকেনি।
৫টি মুরগী ধার করে নিয়ে ভবিষ্যতে ৫ কেজি ধান দেওয়ার চুক্তি তাকে করতে হবে।
এরকম প্রতিমূহুর্তে ক্রেডিট তথা ধার নিতে গেলে তো সমস্যা।
এভাবেই প্রয়োজনের তাগিদেই এসেছিল মুদ্রার কনসেপ্ট।
ধরূন, ১ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের টুকরা। এই ১ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের টুকরাকে গ্রামবাসী সবাই মিলে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলো। সবাই মিলে আস্থা রাখলো। স্বর্ণ চাইলেই পাওয়া যায় না মাটি বা পানির মত। এর সাপ্লাই নিয়ন্ত্রিত। সে সাথে স্বর্ণ অপচনশীল। ফেলে রাখলে নষ্ট হয় না।
ধরূণ, কৃষক ১০ মন ধান বিক্রি করে বিনিময়ে ১ কেজি স্বর্ণ মুদ্রা নিলো। অর্থাৎ ১০০০টি ১ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ মুদ্রা। এরপর ২০০ স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে সে মুরগী কিনলো।
২০০ স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে মাছ কিনলো।
বাকি ৬০০ স্বর্ণ মুদ্রা থেকে ৫০০ স্বর্ণ মুদ্রা অন্যকে ধার দিয়ে সুদের ব্যবসা শুরু করলো।
বাকি ১০০ স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে কিছু মানুষ ভাড়া করে নিজের জমিতে বর্গা খাটানো শুরু করলো। আর নিজে পায়ের উপর পা তুলে বসে বসে চিল করতে লাগলো।
বাস্তবে Lydia তে প্রথম ২৬০০ বছর আগে প্রথম স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন হয়। স্বর্ণ মুদ্রার সমস্যা হল,
বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মুদ্রা বহন করা ঝামেলা। সে সাথে স্বর্ণ মুদ্রায় ভেজাল মেশানোর চান্স থাকে।
উপরের উদাহারণের কথা চিন্তা করুণ।
প্রতিটি স্বর্ণ মুদ্রাতে ১ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ আছে, এটা নিশ্চিত করতে তো সমগ্র বিষয়টা Centralized এবং নিয়ন্ত্রিত করা লাগবে। অর্থাৎ দরকার সরকার বা Bank বা অন্যকোনো Centralized institution যে এসব নিয়ন্ত্রন করতে পারবে। অন্যথায় সারাদিন দাড়িপাল্লা নিয়ে ঘুরতে হবে।
সোজা বাংলায়, সরকার তথা Government, Leadership, bank, institutions এসব ছাড়া মুদ্রা কনসেপ্টের বাস্তবায়ন তখন সম্ভব ছিল না সম্ভবত। এযুগে অবশ্য Blockchain / bitcoin এসব আছে যা দিয়ে সরকার/ Govt ইগনোর করা সম্ভব।
যাই হোক, সময়ের পরিক্রমায় এসেছিল পেপার নোট।
চাইনিজরা প্রথম পেপার নোট চালু করে।
বিষয়টা সহজ করে বলি।
ধরূন উপরের উদাহারণের কথা। ওই কৃষক আব্দুল রহিম আস্তে আস্তে জমিদার হয়ে গেল।
এখন সে টনকে টন ধান বিক্রি করে।
এতো পরিমাণ ধানের বিনিময়ে হাজার হাজার কেজি স্বর্ণ তাকে নিতে হয় যা একদিকে বাড়িতে রাখা বিপদ। কারণ বিশাল ভল্ট দরকার হয়। সেসব ভল্ট পাহারা দিতে দরকার হয় বিপুল পরিমাণ জনবলের।
চুরি ডাকাতির ভয় থাকে।
সে সাথে প্রতিবার লেনদেন করার সময় গরূর গাড়ি বোঝায় করে স্বর্ণ নিতে হয়। একবার তো রাস্তায় ডাকাতিও হয়েছিল।
তো তখন এলো ব্যাংক নোট।
ব্যাংক স্বর্ণ নিজের ভল্টে রেখে সমপরিমাণ কাগুজে নোট ছেড়ে দিলো। ধরূন একটি নোটের উপর লিখা ১০। অর্থাৎ ওই ১০ লিখা নোট ব্যাংকে দিলে ব্যাংক ১ গ্রাম স্বর্ণ দিবে, এমনই সিস্টেম চালু হল। এই সিস্টেমটাও প্রথম চালু করেছিল চীন। শুরু হল Gold Backed Currency অধ্যায়। এই সিস্টেম পরবর্তীতে ইউরোপ কপি পেস্ট করেছিল।
যেমন ১৪৬৪ সালে ইংল্যান্ডের ১ পাউন্ড স্টারলিং ছিল ১৫.৪৭ গ্রাম Fine Gold-এর সমান। অর্থাৎ আপনার পকেটে যদি তখন ৬৪ পাউন্ড থাকে, তার মানে হল আপনি পকেটে করে ১ কেজি স্বর্ণের সমান অর্থ নিয়ে ঘুরতেছেন।
আবার ১৮১৬ থেকে ১৯১৪ সাল, এই সময়কালে ইংল্যান্ডের ১ পাউন্ড স্টারলিং ছিল ৭.৩ গ্রাম Fine Gold-এর সমান।
অর্থাৎ আপনার পকেটে যদি তখন ১৩৭ পাউন্ড থাকে, তার মানে হল আপনি পকেটে করে ১ কেজি স্বর্ণের সমান অর্থ নিয়ে ঘুরতেছেন।
দীর্ঘ সময়কালে Currency অবমূল্যায়ন হয়েছে। তবে মুদ্রা কিন্তু Represent করতো স্বর্ণকে। কম হোক বা বেশি।
একটা উদাহারণ দিয়ে বলি।
ধরূন ১৯০০ সালের কথা।
ইংল্যান্ডের Currency তখন পাউন্ড স্টারলিং এবং ১ পাউন্ড তখন ৭.৩২ gm স্বর্ণের সমান।
তো ইংল্যান্ডের টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিতে কয়লা প্রয়োজন। কয়লা ক্রয় করা হবে জার্মানি থেকে।
জার্মানির মুদ্রা তখন Goldmark
এখন ইংল্যান্ডের টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিতে ১০০ টন কয়লা লাগবে, এবং জার্মানির একটি কয়লা কোম্পানির সাথে প্রতি টন ১০ পাউন্ড হারে ইংল্যান্ডের ফ্যাক্টরিটি কয়লা ক্রয়ের চুক্তি করলো।
১০০ টন কয়লার জন্য ইংল্যান্ড ১০০ x ১০ = ১০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড দেবে জার্মানিকে।
ইংল্যান্ডের ওই টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিটি কিন্তু কয়লার বিনিময়ে ফিজিক্যালি স্বর্ণ জার্মানিতে পাঠাচ্ছে না।
পাঠালে সেক্ষেত্রে ১০০০ x ৭.৩২ গ্রাম অর্থাৎ ৭.৩২ কেজি স্বর্ণ পাঠাতে হতো।
তা না করে ফ্যাক্টরিটি দেবে Bill of Exchange যা মুলত একটি ১০০০ ব্রিটিশ পাউন্ডের চেক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, এই চেকটি নির্দিষ্ট ব্রিটিশ ব্যাংকে জমা দিয়ে যদি সমভ্যালুর স্বর্ণ দাবি করা হয়, তাহলে ওই পরিমাণ স্বর্ণ ব্যাংকটি দিতে বাধ্য।
ইংল্যান্ডের কাছ থেকে পাওয়া Bill of Exchange-টি নিয়ে জার্মান কয়লা কোম্পানি কি করবে?
তার স্বর্ণের দরকার আছে? নাহ। নাই।
তার দরকার জার্মান মুদ্রা গোল্ডমার্কের।
যে মুদ্রা দিয়ে তারা কর্মচারিদের বেতন ভাতা দেবে।
তো কয়লা কোম্পানি ওই Bill of Exchange-টি জার্মান ব্যাংকে জমা দিলে ৭.৩২ কেজি স্বর্ণের Equivalent জার্মান মুদ্রা, অর্থাৎ Goldmark কোম্পানিটি পেয়ে যাবে।
কারণ জার্মানির মুদ্রা Goldmark-ও ব্রিটিশ পাউন্ডের মতই Gold backed.
যদি ১ গোল্ড মার্ক সমান ১ গ্রাম স্বর্ণ হয়, তাহলে উপরোক্ত Bill of Exchange-টি জমা দিয়ে জার্মান কয়লা কোম্পানিটি ৭৩২০ গোল্ড মার্ক পাবে।
সে হিসেবে, ১০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড = ৭৩২০ গোল্ডমার্কের সমান।
অর্থাৎ এটাই ওই সময়ে জার্মানি ও ইংল্যান্ডের ভেতর মুদ্রা বিনিময় হার।
১৯৩০ সালের আগে একজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ব্যাংকে গিয়ে ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ এক্সচেঞ্জ করতে পারতেন। কিন্তু এই জিনিসটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট এসে বন্ধ করে দেন। তবে বড় বড় ব্যাংক এবং অন্যকোনো দেশ ইচ্ছা করলে ডলারের বিনিময়ে গোল্ড এক্সচেঞ্জ করতে পারতো।
কতগুলো বিষয় এবার মাথায় আনুন গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি সিস্টেমের জন্য।
ধরূন, ইরান তার দেশে তৈরি পোশাক রফতানি করেছে ইংল্যান্ডে।
তো বিনিময়ে পেমেন্ট পেয়েছে ব্রিটিশ পাউন্ডে।
এই ব্রিটিশ পাউন্ড দিয়ে তারা ইংল্যান্ডের কিছু জিনিস পাতি কিনতে পারে। অথবা জমা করে রাখতে পারে রিজার্ভ হিসেবে।
কথার কথা, ফ্রান্সের কাছ থেকে ইরান কিছু জিনিসপাতি কিনবে। জিনিসপাতির বিনিময়ে ফ্রান্সকে ইরান তার নিজের কারেন্সিতে পেমেন্ট করতে চাইলো। কিন্তু ফ্রান্স বললো, তোমার কারেন্সির প্রতি আমার আস্থা নাই। তোমার দেশেরই ভরসা নাই। কারেন্সি তো দূর কি বাত। তুমি আমাকে বরং মার্কিন ডলার বা ব্রিটিশ পাউন্ডের মত কারেন্সিতে পেমেন্ট করো। অথবা ডাইরেক্ট স্বর্ণ দিতে পারো।
তো ইরান তাদের কাছে সেই মজুদ ব্রিটিশ পাউন্ড দিয়ে এই দফায় পেমেন্ট করে দিলো।
ফ্রান্সও পেমেন্টটি নিলো কারণ ব্রিটিশ পাউন্ডের প্রতি তাদের আস্থা আছে। তারা জানে, ইচ্ছা করলেই ইংল্যান্ডের ব্যাংকে গিয়ে ব্রিটিশ পাউন্ডের বিনিময়ে তারা গোল্ড পেয়ে যাবে। ভুগিযুগি হবে না।
আচ্ছা, কেমন হবে যদি ইংল্যান্ডের কাছে মজুদ স্বর্ণ খুবই কম থাকে। অর্থাৎ চাহিবা মাত্র ব্রিটিশ পাউন্ড স্বর্ণে কনভার্ট করে দিতে তারা ব্যর্থ হয়? তখন? তখন তো ঝামেলা হয়ে যাবে।
সূতরাং ইংল্যান্ড যখন কোনো দেশকে Bill of Exchange-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ পাউন্ডে পেমেন্ট করবে, তখন এই বিষয়টা তাকে মাথায় রাখতে হবে। সে চাইলেই ইচ্ছামত Currency ছাপাতে পারবে না। নিশ্চয় বুঝতেই পারতেছেন, এহেন সিস্টেমে ইউনিভার্সেল কারেন্সি হয়ে যাবে সেই দেশের মুদ্রা, যে দেশের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে পৃথিবীর অবস্থা চিন্তা করূন।
সবগুলো ইউরোপিয়ান দেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত।
ইংল্যান্ডের মত দেশ আমেরিকার কাছ অর্থ ধার করতেছে যুদ্ধের জন্য। ইউরোপিয়ান দেশগুলো নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করে শেষ হয়ে যাচ্ছে, আমেরিকার মেইনল্যান্ডে তখন সে যুদ্ধের আচও পড়তেছেনা।
এর আগে পৃথম বিশ্বযুদ্ধেও এমনই হয়েছিল।
গোটা ইউরোপ যখন যুদ্ধ করতেছিলো, আমেরিকা তখন ব্যবসা করেছে আরামছে। হেনরি ফোর্ড ব্যবসা করেছে সমানে। আমেরিকার ব্যবসায়ী পিয়েরে ডু পন্ট তখন ইউরোপে গান পাউডারের ব্যবসা করে বস্তা বস্তা অর্থ কামিয়েছে।
এই ডু পন্ট পরে General Motors কিনে নিয়েছিলো।
এরপর তো আমেরিকার বিখ্যাত Empire State Building বানিয়েছিলো গাড়ি ব্যবসায়ী ওয়ালটার ক্রাইসলারের সাথে টেক্কা দিয়ে। Empire State Building-থেকে পাঁচ মিনিট দূরুত্বে Crysler Building
তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে ইউরোপ বিধ্বস্ত। অন্যদিকে আমেরিকা দুনিয়ার সেরা অর্থনীতি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে উডস চুক্তির মাধ্যমে IMF এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্ম হয়। আর ডলার হয়ে যায় ইউনিভার্সেল কারেন্সি।
সে সময়ে আমেরিকার কাছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ ছিল। এজন্যেই মার্কিন ডলারকে ইউনিভার্সেল কারেন্সি হিসেবে মেনে নেয়া হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঙ্গীকার করেছিল যে ৩৫ মার্কিন ডলার= ১ আউন্স স্বর্ণ Rate অনুযায়ী যেকোনো দেশ চাওয়া মাত্র ডলারের রিজার্ভ ভাঙ্গাতে পারবে। ব্যস, তখন থেকে মার্কিন ডলারে অন্যান্য সকল দেশ তাদের রিজার্ভ রাখতে শুরু করে।
এবার একেবারে সিমপ্লিফাইড ওয়েতে একটা পরিস্থিতি কল্পনা করুণ।
ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে,
১ আউন্স স্বর্ণের মুল্য ৩৫ মার্কিন ডলার।
কথার কথা, আমেরিকাতে বিভিন্ন পন্য রফতানি করে ফ্রান্স ১৪০০ মার্কিন ডলার কামিয়েছে। এবং এই অর্থটা আমেরিকাতেই সে রিজার্ভ আকারে রেখেছে। অর্থাৎ সোজা কথা হল, ফ্রান্সের ফরেন রিজার্ভ ১৪০০ মার্কিন ডলার।
ধরূন, আমেরিকার কাছে ১,০০০ আউন্স স্বর্ণ আছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৩৫,০০০ মার্কিন ডলার সে স্বর্ণের বিনিময়ে ভাঙিয়ে দিতে পারবে।
হঠাৎ ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু হল।
এই যুদ্ধে অস্ত্রসস্ত্র বানানোর জন্য আমেরিকা ১ লাখ মার্কিন ডলার ইমিডিয়েট দরকার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক তথা আমেরিকার সেন্ট্রাল ব্যাংক-এর চেয়ারম্যানকে ফোন করে বলে দিলো ১ লাখ মার্কিন ডলার ছাপাতে এবং উনারা প্রিন্টিং প্রেস চালিয়ে ফটাফট ডলার ছাপিয়ে দিলো।
এখন ১০ লাখ ডলার দিয়ে ফ্রান্সের কাছ থেকে লোহা, তামা, দস্তা, নিকেল, ইস্পাত, এটা সেটা কিনে যুদ্ধের অস্ত্রসস্ত্র বানালো আমেরিকা।
ফ্রান্স ওই ১০ লাখ ডলার পেমেন্ট আকারে নিলো এবং রিজার্ভ হিসেবে রাখলো আমেরিকাতে।
সে প্রেক্ষিতে, ফ্রান্সের ফরেন রিজার্ভ এখন বেড়ে দাড়ালো ১ লাখ + আগের ১৪০০ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ ফ্রান্সের এখন মোট ফরেন রিজার্ভ দাঁড়ালো ১,০১,৪০০ মার্কিন ডলার।
সমস্যা হল, আগেই বলেছি আমেরিকার কাছে তো স্বর্ণ আছে ৩৫,০০০ হাজার মার্কিন ডলারের সম পরিমাণ।
তো এখন যদি ফ্রান্স ১,০১,৪০০ মার্কিন ডলার ভাঙিয়ে নিতে চায়, তখন স্বর্ণ পাবে কই? স্বর্ণ তো নেই।
পরিস্থিতিটা বুঝতে পারতেছেন?
ঠিক এমন পরিস্থিতি হোক, সেটা কিন্তু ফ্রান্স চাইবে না। কারণ লস কিন্ত ফ্রান্সের।
ফ্রান্স ডলার ভাঙিয়ে স্বর্ণ নিয়ে অন্য যেকোনো দেশকে পেমেন্ট করতে পারবে। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নকেও পেমেন্ট করতে পারবে।
স্বর্ণ ন্যাচারাল মেটাল।
এটার সাপ্লাই কম। ইচ্ছে হলেই ডলার ছাপানো সম্ভব। স্বর্ণ নয়।
একটি দেশ আজ আছে কাল নেই। দেশ না থাকলে সে দেশের মুদ্রাও মূল্যহীন।
আজকে কারো হাতে ১ লাখ মার্কিন ডলার থাকতে পারে। এই ১ লাখ মার্কিন ডলার হাতে নিয়ে যদি টাইম মেশিনে করে ৩০০ বছর অতীতে চলে যান, তাহলে ওই ১ লাখ মার্কিন ডলারের কোনো ভ্যালু নাই।
৩০০ বছর আগে তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক দেশেরই অস্তিত্ব ছিল না।
কিন্তু স্বর্ণ? আপনি স্বর্ণ হাতে নিয়ে টাইম মেশিনে করে ১০০০ বছর পেছনে গেলেও মূল্য পাবেন।
টপিক্সে ফিরে আসি।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট Charles de Gaulle শুরু থেকেই ব্রেটন উডস এগ্রিমেন্ট পছন্দ করতেন না।
১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ যখন শুরু হল,
তিনি আশঙ্কা করলেন আমেরিকা যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহ করার জন্য ইচ্ছামত ডলার ছাপাচ্ছে। কারণ ডলার ইউনিভার্সেল কারেন্সি হওয়াতে এবং সকল দেশগুলো আমেরিকাতে মার্কিন ডলারে রিজার্ভ রাখাতে আমেরিকা আনফেয়ার এডভান্টেজ পাচ্ছে। ঠিক উপরের উদাহরণের মত।
সে সাথে, ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে বাস্তবে কত স্বর্ণ মজুদ আছে, সেটা নিয়েও আশঙ্কা ছিল তার।
তো ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এবং তার finance minister, Valéry Giscard d'Estaing সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফ্রান্সের ফরেন মার্কিন ডলার রিজার্ভের বড় একটি অংশ স্বর্ণতে কনভার্ট করে ফেলার।
ফ্রান্স যখন এই কাজ শুরু করে, তখন মার্কিন গোল্ড রিজার্ভে চাপ পড়ে। ব্যস, যা হবার সেটাই হল।
১৯৭১ সালের ১৫ই আগস্ট, এলো Nixon Shock !
৩৫ ডলারের বিনিময়ে ১ আউন্স স্বর্ণের যে হিসাব কিতাব, তা বাতিল করে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।
শেষ হয়ে গেল ব্রেটন উডস সিস্টেম।
তত দিনে দুনিয়ার বহু দেশ ফরেন রিজার্ভ রাখতে শুরু করেছে মার্কিন ডলারে।
গোটা বিশ্বের ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম চালিত হচ্ছে মার্কিন ডলারে। সামরিক, অর্থনৈতিক, ও প্রযুক্তিগতভাবে মার্কিনীরা ততদিনে সুপারপাওয়ার।
এবং মার্কিন ডলার ইউনিভার্সেল কারেন্সি।
মার্কিন ডলারকে সবাই বিশ্বাস করে।
আপনি যে দেশেই যান, ডলার সাথে করে যাচ্ছেন। যে দেশেই যাবেন, ডলারের ভ্যালু পাবেন। ভাঙ্গাতে পারবেন। VISA আর MasterCard দিয়ে কেনাকাটা করতেছেন। ডলারে পেমেন্ট করতেছেন।
পৃথিবীর সব দেশেই ডলার গ্রহনযোগ্য, এবং গোটা দুনিয়ার ব্যবসা বানিজ্য লেনদেন ততদিনে চলতেছে ডলারে।
সে সাথে ততদিনে সৌদি আরবের সাথে মার্কিনীরা ডিল করে ফেলেছে। সৌদি তেল বিক্রি হচ্ছে ডলারে। চলতেছে পেট্রো ডলারের রাজত্ব।
পরবর্তী পর্বে লিখবো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের ধ্বংসস্তুপ থেকে দেশগুলোর উঠে দাঁড়ানোর কাহিনী। আর তার পেছনে থাকা আমেরিকার মার্শাল প্ল্যান।
এছাড়াও লিখবো চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে কিভাবে বিভিন্ন দেশ চেষ্টা করতেছে মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর। যেমন ব্রিকস-এর মত সংগঠন চাচ্ছে আবার গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি ফিরিয়ে আনতে।
অন্যদিকে আমেরিকার ডলারকে কেউ উপেক্ষা করবে, এটা আমেরিকা সহ্য করতে পারবে না। গাদ্দাফি বা সাদ্দাম, যারা যখনই চেষ্টা করে ডলার ব্যতিত অন্যকোনো মুদ্রা বা স্বর্ণে তেল বিক্রি করতে, ব্যস, তখনই তাদের শেষ করে দিয়েছে।
অন্যসব দেশ যদি ডলার ইগনোর করে ভিন্ন ব্যবস্থাপনায় লেনদেন শুরু করে, তাহলে ডলারের বিশ্বব্যাপী ডিমান্ড যাবে কমে। ডিমান্ড কমে গেলে মূল্য হারাবে ডলার। আর তা হবে মার্কিন অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক।
ডলারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। Gold Backed Currency থেকে Fiat Currency-এর এই অধ্যায় নিয়ে লিখবো সামনে।
আজ একেবারে সিম্পল ওয়েতে, একেবারে Basic লেভেলে লিখলাম। বাস্তবে অবশ্যই সবকিছু আরো অনেক জটিল ছিল। সামনে আরো লিখবো।
Read More »

Friday, August 7, 2020

তাইওয়ান






দেখুন তো, এই পরিচিত ব্রান্ডগুলো চিনতে পারেন কিনা ??




Acer..... Apacer..... HTC.....
.....Asus...... BenQ.....Cyberlink....
Foxconn....Gigabyte...............Realtek...
.........Transcend......liteOn....China Steel...
....ADATA.....SilverStone......
Thermaltake (কম্পিউটারের পাওয়ার সাপ্লাই বানায়)
...Biostar......chinaTech...

এসব ব্রান্ডের সাথে পরিচিত হবার কথা। অধিকাংশ কম্পিউটারের পার্টস প্রস্তুত করে। ইলেকট্রনিক্স বিজনেসওয়ার্ল্ডের নামকরা নাম...

এগুলো কোন দেশের কোম্পানি জানেন??
জানা কথা।  Republic of China

শুধু, সেটাই না... Republic of China বংশোদ্ভূত মানুষদের হাতে গড়া আরো কিছু কোম্পানি জগৎবিখ্যাত।
NVIDIA
Trend Micro
Yahoo !
এবং Youtube এর কো ফাউন্ডাররা Republic of China বংশোদ্ভূত।

কাহিনী হইলো Republic of China এর সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই 
বাংলাদেশ Republic of China কে স্বীকৃতি দেয় নি।
এমনকি বাংলাদেশের সাথে Republic of China এর কোনো ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্ক নাই।

থাকবে কিভাবে ??
রিপাবলিক অফ চীন'কে দুনিয়ার বড়বড় কোনো দেশই স্বীকৃত দেয় না ।
মাত্র ২১ টা দেশ স্বীকৃতদেয়। যাদের ভেতর সবচেয়ে পাওয়ারফুল দেশ হল পানামা আর প্যারাগুয়ে 
আর বাকিসবগুলো দেশের নাম বললে চিনবেন না
একারণে কষ্ট করে লিখলাম না

আপনি বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে রিপাবলিক অফ চীনে যেতে পারবেন না।
যদিও তাদের দেশের পন্য ছাড়া আমাদের চলেও না। (ভিন্নদেশ ভায়া হয়ে যেতে পারবেন। সেটা ভিন্ন ব্যাপার)

দেশটি People Republic of China নয়।
Republic of China.
যাকে আমরা তাইওয়ান বলে জানি।



৩৬ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশটিতে জনসংখ্যা ২ কোটি ৩৩ লাখ।
দুনিয়ার উন্নত দেশগুলোর একটি 
দুনিয়ার ২১ তম বৃহৎ অর্থনীতি।
মাথাপিছু আয় ৪৩ হাজার মার্কিন ডলার। (১৭তম )

তাইওয়ানের সাথে চীনের সম্পর্ক সাপে নেউলে...
চীন স্বপ্ন দ্যাখে, তাইওয়ান'কে দখল করে মুলভুমির কমিউনিস্ট পার্টির শাসনে আনার।
আর তাইওয়ানি স্বপ্ন দ্যাখে, চীনের ভাইব্রাদার'দের কমিউনিস্ট পার্টির হাত থেকে মুক্ত করে চীনকে স্বাধীন করার 

চীনের আছে দুনিয়ার সবচেয়ে 'সাইজে বড় আর্মি"
আর তাইওয়ানের আছে ওই রিজিওনের সবচেয়ে "সফিস্টিকেটেড" আর্মি।
সেইসাথে তাইওয়ানের সাথে আছে আমেরিকা।
প্রেসিডেন্ট বুশ অঙ্গীকার করেছিলো যদি চীন কখনো তাইওয়ান আক্রমন করে, তাহলে আমেরিকা যেকোনোকিছুর বিনিময়ে তাইওয়ানকে, অর্থাৎ Republic of china কে রক্ষা করবে

ব্যাপারটা সেই ডিকটেটর মুভির মত হয়ে গেলো...
হয় এই aladeen এর পক্ষে,
না হয় এই aladeen এর পক্ষে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীনে শুরু হয় কমিউনিস্ট vs Nationalist গৃহযুদ্ধ।
তাতে সোভিয়েত ব্যাকড কমিউনিস্টরা জিতে যায়।
মাও সে তুং ক্ষমতায় আসে।
আর ন্যাশোন্যালিস্টরা জীবন বাঁচাতে চলে যায় সাগরে ১৮০ কিমি দুরের ফরমোসা দ্বীপে। অর্থাৎ তাইওয়ানে।
সেখানে তারা নিজেদের ন্যাশনালিস্ট সরকারের অবশিষ্ট অংশ টিকিয়ে রাখে।
এবং আজ পর্যন্ত মুলভুমি চীন দখলের স্বপ্ন দ্যাখে।
তাদের ভাষায়, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির হাত থেকে চীনের ভাইব্রাদারদের উদ্ধার করা তাদের লক্ষ্য।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হল, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে তাইওয়ানের অর্থাৎ Republic of China (Taiwan) এর সদস্যপদ ছিলো। বিশ্বশক্তিগুলো তখন তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দিতো।

কিন্তু PRC (China) ছিলো আমেরিকার জন্য এক নিষিদ্ধ দেশ। চীনের সাথে ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত আমেরিকার কোনো ডিপলোম্যাটিক সম্পর্ক ছিলো না।
সম্পর্ক করে দিয়েছিলো কে ??
পাকিস্তান। কুটনামো ভন্ডামো আর শয়তানিতে যাদের পিএইচডি আছে 

দশ বছর ধরে পাকিস্তানের চেষ্টায় আমেরিকা আর চীনের ভেতর সম্পর্ক তৈরি হয়। ইনফ্যাক্ট হেনরি কিসিঞ্জারকে লুকিয়ে, গোপনে ইয়াহিয়া খান নিজেস্ব প্লেনের ভেতর করে চীনে নিয়ে গিয়েছিলো 
দুনিয়া জানতো, কিসিঞ্জার পাকিস্তানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে গেছেন !

যাই হোক, সেসব অন্য ইতিহাস।
ভিন্ন কোনোদিন লিখবো।
তো চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক হয়।
ফলাফল, ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর জাতিসংঘ থেকে ROC আউট, আর RPC ইন 
অর্থাৎ আলাদিন আউট, তার বদলে আলাদিন ইন 

তখন অন্যান্য বড়বড় দেশগুলোও পাইকারি হারে 'আলাদিন ইন, আরেক আলাদিন আউট" করা শুরু করে।

সেই ১৯৭১ সাল থেকে তাইওয়ান আর জাতিসংঘে নেই।
মজার ব্যাপার হল, আমেরিকা এখন চীনের সবচেয়ে বড় বিজনেস পার্টনার হয়ে গেছে।
চীনও আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে অনেক ধনী হয়েছে। একটা ধনী উন্নয়নশীল দেশ চীন। 
তবে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষও চীনে আছে। ফলাফল, তাদের শ্রমবাজারও সস্তা।
সাপে নেউলে সম্পর্ক হলেও, বিশাল গরিব মানুষের বেকারত্ব মেটাতে হয় উন্নয়নশীল দেশ চীনকে!
ফলাফল, যতই শত্রুতা থাকুক, তাইওয়ানের সাথে ব্যবসা ঠিকই করতেছে চীন। যেমন উপরে শুরুতে যতগুলো কোম্পানির নাম বললাম, সবগুলো কোম্পানির হেড অফিস তাইওয়ানে হলেও শাখা অফিস এবং শাখা ফ্যাক্টরি চীনে আছে।
লক্ষ লক্ষ চাইনিজের দারিদ্র বিমোচন হচ্ছে, কর্মসংস্থান হচ্ছে এতে।
ফলাফল, এগুলো আপনি বাংলাদেশে বসেও কিনতে পারতেছেন। তাইওয়ানের সাথে আপনার রিলেশন থাক আর না থাক। কারণ, এসব পন্য যাতে বিক্রি হয়, সেটার নিশ্চিত করার মাথাব্যাথা তাইওয়ানের চেয়েও চীনাদের বেশি।
একারণে প্যাকেটে সবসময় made in china লিখা দেখবেন। যদিও কোম্পানি তাইওয়ানের।
Lenovo আর ইদানীং আসা Xiaomi ছাড়া চীনের আর তেমন ভালো ব্রান্ড খুবএকটা দেখবেন না। (রিসেন্টলি হোয়াওয়ে এসেছে)

আপনি যখন Foxconn মাদারবোর্ড কম্পিউটারে লাগাচ্ছেন, তখন হয়ত Foxconn কোম্পানির চীনের ফ্যাক্টরিতে চাইনিজ কর্মীরা অত্যাধিক কাজের চাপে, ইনহিউমেন কন্ডিশনে কাজ করে করে একসময় ডিপ্রেশনে ভুগে আত্মহত্যা করতেছে।
এমন এক ঘটনা ঘটেছিলো। Foxconn এর কর্মীদের এই আত্মহত্যার ঘটনায় চীন সরকার তাইওয়ানের Foxconn কোম্পানিকে গালিগালা করেছিলো।
ব্যস... এটুকুই।
লোকদেখানো কিছু মামলা হয়েছিলো।
এসব পড়লে আমাদের রানা প্লাজার কথা মনে আসে। 
হায়'রে সস্তা শ্রম। শ্রমিকের শ্রম কিভাবে সস্তা হয় !! আর সেটা নিয়ে গর্ব করা পলিটিসিয়ানেরও অভাব নয় না।
আমার দেশের মানুষের শ্রমের মুল্য অনেক কম, এই কথা বলাটা গর্বের নয়, লজ্জার।

যাই হোক, তাইওয়ানের উপকুলের এলাকাগুলোতে এন্টি ট্যাংক ম্যাকানিজম দিয়ে ঘেরা। তাইওয়ান ভয়ে ভয়ে থাকে কখন কমিউনিস্টরা আক্রমন করে চীন থেকে। মাত্র ১৮০ কিমি দূরে বলে কথা। 
তবে ওই যে বললাম, তাইওয়ানের আর্মি অনেক শক্তিশালী। সফিস্টিকেটেড। আর মার্কিন আর্মির বিশাল ঘাটি আছে সেখানে। আমেরিকার সাথে রক্ষাচুক্তিও করা আছে।
সুতরাং... বুঝতেই তো পারেন

তাইওয়ানের নিজেস্ব ভাষা আছে। আদিবাসীদের ভাষা। কিন্তু তাইওয়ান সরকার স্কুল কলেজে এখনো চীনা ভাষা শিক্ষাতে প্রাধান্য দেয়। কারণ তারা নিশ্চিত, একদিন না একদিন মুল চীনের ভুমি আবার তারা ফিরে পাবে। এক পতাকার নিচে আবার থাকবে এক চীনের মানুষ  গনতান্ত্রিক, পুজিবাদী republic of China

আমাদের দেশেও যেসব দলের সাথে চীনের সম্পর্ক একটু বেশি ভালো, তারা দেখবেন চীনকে খুশি করার জন্য সবসময় বলে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হা, কথাখানা কেবলই বলার জন্য বলা। বাস্তবে তাইওয়ানের চুল ছেড়ার ক্ষমতা চীনের আছে কিনা, সন্দেহ আছে। থাকলে অনেক আগেই চুল ছিড়তো।

তাইওয়ানের উপকুল থেকে আগে বিশাল বড় লাউড স্কিপার দিয়ে, আবার মাঝেমাঝে গোয়েন্দা বাহিনীর লিফলেট ছড়িয়ে চীনের মানুষকে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সাধীনতা সংগ্রাম করতে আহবান জানানো হয়  তাদের ভাষায়, evil কমিউনিস্ট হটাও, চীন বাঁচাও।
আর চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কাছে তাইওয়ান হল আমেরিকার দালাল।

চীনের আসলে ভয় কম নেই।
সামনে তালাকেই চীন তাইওয়ান, জাপান, ফিলিপাইন, দক্ষিন কোরিয়ার চেহারা দ্যাখে। সবই চীনের নাকের ডগায়। এসব দেশ ইকোনমিক্যালি অনেক পাওয়ারফুল। এবং সবগুলো দেশের সাথে আমেরিকার মিউচুয়্যাল প্রোটেকশন ট্রিটি সাইন করা। এবং সবগুলো দেশে আমেরিকার বিশাল বিশাল সামরিক ঘাটি আছে।
এই রিজিওনে চীনের বন্ধু বলতে উপরের রুশরা আর উত্তর কোরিয়া। এই যা।

তাইওয়ানে 95% মানুষ চাইনিজ। ২% আদিবাসী।
দ্বীপটি আবিস্কার করেছিলো ডাচ আর স্প্যানিশরা। এরপরই মুলত মুলভুমি থেকে চাইনিজরা গিয়ে বসবাস শুরু করে।
একসময় জাপান দ্বীপটিকে দখলও করেছিলো। যাই হোক, সেসব পুরন কথা।

তাইওয়ানের আর্মির নাম Republic of China Armed Forces
প্রায় ছয় লক্ষ মানুষ মিলিটারির জন্য available...
মিলিটারি বাজেট ১০ বিলিয়ন ডলার। আমেরিকা, ফ্রান্স, ইসরাইল, জার্মানি সহ উন্নত সবদেশই এর মিলিটারি সাপ্লাইয়ার।

কত প্যাচপুচ

Read More »

Monday, September 16, 2019

প্রেমের নাম বেদনা- -- স্পাই ভার্সন




প্রেম করে প্রতারিত হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। যুগ যুগ ধরে বহু মানুষ প্রেম করে প্রতারিত হয়ে কেউ নিঃস্ব হয়েছে, কেউ খুন হয়েছে, কেউ জেলে ঢুকেছে, কত কি হয়েছে।

তবে ছবির বাম পাশের এই ফরাসি ভদ্রলোক সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রেম ঘটিত প্রতারণার শিকার।
উনি ছিলেন একজন ফরাসি ডিপ্লোমেট। নাম Bernard Boursicot


তো ফরাসিরা যৌনতার ব্যাপারে একটু বেশি খোলামেলা। যারা ফরাসি মুভি সিরিয়াল দেখেছেন, তারা হয়ত বুঝতে পারবেন।
আমেরিকান মুভিতে ভায়োলেন্স অর্থাৎ যুদ্ধ হানাহানি, মারামারি গোলাগুলি, এসব খুব সহজভাবেই দেখানো হয়। অন্যদিকে যৌনতার দ্রশ্যগুলো 2x লেভেলে সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আপনি নারীর বক্ষ দেখতে পাবেন। কিন্তু পুরুষের লিঙ্গ প্রদর্শন হয়না।
অন্যদিকে ফরাসি মুভি সিরিয়ালে যৌনতাকে খোলামেলা, অর্থাৎ 3x লেভেলেই প্রদর্শন করা হয়। সবই দেখানো হয়। অন্যদিকে যুদ্ধ হানাহানি, গোলাগুলি, এসব কম দেখানো হয়। অর্থাৎ ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিষয়টা নিয়ে ইভা গ্রিনের একটা সাক্ষাৎকার আছে, যেটা কমেন্টে দিচ্ছি।

তো মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ভদ্রলোকের জন্ম ১৯৪৪ সালে। ভদ্রলোক স্কুলে পড়া অবস্থায় স্কুলের বন্ধুবান্ধবের সাথে সমকামীতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত নিলেন, কোনো নারীর সাথে সম্পর্ক করবেন। সংসার করবেন। প্রেম করবেন। বাচ্চা জন্ম দিবেন। ব্লাহ ব্লাহ ব্লাহ।

১৯৬৪ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে ফরাসি ডিপ্লোমেট হিসেবে কাজ পেলেন চীনের ফ্রেন্স দুতাবাসে।
সেটা ছিল চীনের মাটিতে কোরিয়ান যুদ্ধের পর প্রথম কোনো পশ্চিমা দেশের দুতাবাস। মনে রাখবেন, সালটা ১৯৬৪
তখন কমিউনিস্ট চীন ছিল পশ্চিমাদের জন্য প্রায় নিষিদ্ধ একটি দেশ। তখন তো আর ইন্টারনেট, মোবাইল, এসব ছিল না। পশ্চিমাদের কাছে চীন অনেকটাই রহস্যময়।

তো চীনে গিয়ে এক সুন্দরী ওপেরা গায়িকার প্রেমে পড়ে গেলেন এই ভদ্রলোক।
গায়িকার নাম Shi Pei Pu, বয়স ২৬ বছর।
শুরু হল তুমুল প্রেম।
গভীর প্রেম।
দ্রুতই সম্পর্ক গড়ালো যৌনতার দিকে।
বিয়ে করলেন না। সম্পর্কটা গোপনে চালিয়ে গেলেন। কাজের ফাকে যখনই সময় পেতেন, ছুটে যেতেন পিউ'এর বাড়িতে।

কিন্তু কিছুদিনের ভেতরই এই গোপন সম্পর্কের ব্যাপারে চাইনিজ গোয়েন্দাবাহিনী জেনে গেল। তারা ফরাসি ভদ্রলোক'টিকে ইমোশন্যালি ব্ল্যাকমেইল করলো। বললো, তুমি আমাদের দেশের ওই মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারবা না। আমরা ওই মেয়েকে মেরে ফেলবো। কারণ সে ভিন্ন জাতির সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে অন্যায় করেছে। তবে হা, যদি সম্পর্ক রাখতেই চাও, আর মেয়েটির ভালো চাও, তাহলে আমাদের কিছু গোপন নথিপত্র ফরাসি এম্ব্যাসি থেকে চুরি করে দিতে থাকো। তাহলে আর কোনো ঝামেলা হবে না। যা ইচ্ছা করতে থাকো। নো প্রবলেম।

তো প্রেমিক ভদ্রলোক এবার প্রেম ও প্রেমিকা, দুটোর জন্যেই নিজ দেশের সাথে গাদ্দারি করতে শুরু করলেন। কিন্তু আসল কাহিনী হল, তার প্রেমিকা মোটেও ইনোসেন্ট নয়।
সি পেই পিউ আসলে চাইনিজ স্পাই।
চাইনিজ গোয়েন্দাবাহিনীর হয়ে কাজ করে। পেতেছে classic honey-trap
যা হবার সেটাই হল। পরবর্তী প্রায় ২০ বছর প্রেমের সম্পর্ক চলতে থাকলো। আর প্রায় ৫০০ গোপনীয় ডকুমেন্ট চাইনিজ গোয়েন্দাবাহিনীর কাছে হাতবদল হয়ে গেল।

ডিপ্লোমেট হিসেবে কাজ করার কারণে মাঝে বেশকিছুদিন ফরাসি ভদ্রলোক চীনের বাইরে ছিলেন। পরে চীনে ফিরে যখন পিউ'এর সাথে দেখা হল, পিউ একটা বাচ্চা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা তোমার সন্তান। :P
ভদ্রলোক তো মহা খুশি।

তো ১৯৮২ সালে ভদ্রলোক তার প্রেমিকা ও সন্তান নিয়ে ফ্রান্সে চলে এলেন।
বহু কষ্টে প্রেমিকার ফরাসি ভিসা ম্যানেজ করেছিলেন।
সমস্যা হল,
বেশকিছুদিন ধরেই ফরাসি গোয়েন্দাবাহিনী ভদ্রলোকের কাজকর্মের দিকে নজর রাখছিলেন। সেহেতু ফ্রান্সের মাটিতে নামার কিছুদিন পরই ভদ্রলোক এবং তার প্রেমিকা পিউ গ্রেফতার হল।

প্রায় বিশটি বছর প্রেম করার পর ভদ্রলোক জানতে পারলেন তার জীবনের করুণ পরিনতির বিষয়টি।
তিনি প্রতারিত হয়েছেন :P
পিউ আসলে চাইনিজ স্পাই।
এবং আরো দুঃখের ব্যাপার হল, পিউ আসলে নারী নয়, পুরুষ :P সুস্থ স্বাভাবিক একজন পুরুষ।
যার অসাধারণ ক্ষমতা আছে to retract his own testicles, which, combined with the manipulation of his own penis, created the illusion of labial lips and a clitoris and allowed for shallow penetration.

হায়রে দুনিয়া। :(
বিশ বছর প্রেম করে, তথাকথিত বাচ্চা পয়দা করে, প্রেমিক জানতে পারলো প্রেমিকা আসলে নারী নয়। নারী ছদ্মবেশি পুরুষ।

আমি জানি, এবার আপনাদের মাথায় নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিভাবে সম্ভব !!
:v যাই হোক, চিন্তাভাবনা করতে থাকুন :v
মাথায় যা আসে, ভেবে নিন :P
M.Butterfly নামে একটু মুভি আছে। ওটা দেখতে পারেন। যদিও পুরোপুরি ব্যাপারটা দেখানো হয়নি।
Kang Sheng ছিলেন Shi Pei Pu এর কনট্রোলিং ইন্টেলিজেন্স অফিসার। তার লিখা বই the Chinese Secret Service এ Shi Pei Pu এর ক্যারিয়ার কভার করা হয়েছে।

তো ফরাসি ভদ্রলোক এবং সি পেই পিউ এর জেল হয়।
কিন্তু সেইসময় পশ্চিমাদের সাথে চীনের সম্পর্ক ভালোর দিকে যেতে শুরু করেছে।
তো ফরাসি প্রেসিডেন্ট দুজনকে সাধারণ ক্ষমা প্রদান করেন। পিউ মুক্ত হয়ে চীনে ফিরে যান।
পরে মাঝেমাঝেই তিনি ফ্রান্সে আসতেন। তার পালিত সন্তানের খোজখবর নিতে।
২০০৯ সালে ফ্রান্সে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

ওদিকে ফরাসি সেই ভদ্রলোক Bernard Boursicot এই পোস্ট লিখা পর্যন্ত এখনো বেঁচে আছেন।

নিচের ছবি'তে ডান পাশের ভদ্রলোকটি ছিল সেই shi Pe Peu
নিচের ছবিতে অবশ্য ছদ্মবেশে নয়, বরং পুরুষের পোষাকেই আদালতে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

হায়রে প্রেম।
Read More »

অজিত দোভাল, The Indian James Bond


অজিত দোভাল'কে বলা হয় ইন্ডিয়ান জেমস বন্ড


বাস্তবে অজিত দোভালের ক্যারিয়ার জেমস বন্ডের চেয়েও ইন্টারেস্টিং।
১৯৭১ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সবমিলিয়ে ১৭ বার ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে হাইজ্যাকিং'এর ঘটনা ঘটেছে। এবং প্রতিবারই এই অজিত দোভাল টেরোরিস্টদের সাথে নেগোসিয়েশন করেছেন। এবং সফলভাবে।

সুতরাং বুঝতেই পারতেছেন, মুখ চালু লোক। এবং মানুষকে কনভিন্স করার অসাধারণ ক্ষমতা আছে উনার।

ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসে ক্যারিয়ার শুরু। এরপর সেখান থেকে ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর আন্ডারকভার এজেন্ট।
রীতিমত স্পাই।
ভারতের মিজোরামে চলছিল তখন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। অজিত দোভাল ঢুকে পড়েন Mizo National Front এর ভেতর। তাদের সাথে মিশে চীনে এবং মিয়ানমারের মাটিতে লুকিয়ে থাকা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাটিতে থেকেছেন। মিশে গিয়েছিলেন তাদের টপ লিডারদের সাথে। এরপর Mizo National Front (MNF) এর সাতজন কমান্ডারদের ভেতর ছয়জনকে তিনি কনভিন্স করাতে সক্ষম হয়েছিলেন ভারতীয় সরকারের সাথে শান্তি আলোচনায় যেতে।
এবং তাহারা কেউই বুঝতে পারেনি, দোভাল মুলত ভারত সরকারেরই স্পাই।
তাহলে বুঝে দেখুন, কনভিন্স করার ক্ষমতা তার কি অসাধারণ !!
দোভাল না হলে মিজোরাম ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রনে বাইরে চলে যেতো হয়ত।

এবং ঠিক একই কাজ তিনি করেছেন সিকিমে।
সিকিমকে ভারতের সাথে জুড়ে নেবার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করেছিলো অজিত দোভাল।
এবং সেখানেই আন্ডারকাভার স্পাই হিসেবে ঢুকে গিয়েছিলো সিকিম সরকারের উচ্চমহলে। এরপর যথারীতি তার কনভিন্সিং ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কার্যউদ্ধার করে ছেড়েছিলেন।
সিকিম আজ ভারতের অংশ।

অজিত দোভাল এরপর চলে যান পাকিস্তানে। কোরান মুখস্ত তার। পাকিস্তানে সাত বছর আন্ডারকাভার স্পাই হিসেবে থেকেছেন তিনি। এবং সেখানে মুসলিম হিসেবে থেকেছেন। রেগুলার মসজিদে যেতেন। নামাজ পড়তেন। পাকিস্তানিদের সাথে একেবারে মিশে গিয়েছিলেন।

ভারতের গোল্ডেন টেম্পেলে Sikhs ইন্সার্জেন্সি শুরু হলে দোভাল পাকিস্তানি গোয়েন্দাবাহিনীর স্পাই ছদ্মবেশ নিয়ে ঢুকে পড়েন গোল্ডেন টেম্পেলে। :P
সেখানে Sikhs বিদ্রোহীদের গিয়ে বলেছিলেন, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে আপনাদের সংগ্রামে পাকিস্তান আপনাদের পাশে থাকবে। হেল্প করার জন্য আমাকে পাঠিয়েছে। :P অর্থাৎ তিনি আইএসআই এজেন্টের ছদ্মবেশে Sikh বিদ্রোহীদের সাথে মিশে গেলেন। এরপর তাদের কাছ থেকে ক্রিটিক্যাল সব তথ্য নিয়ে ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্সকে জানাতে শুরু করলেন। তার তথ্যের উপর ভিক্তি করে ভারতীয় সেনারা গোল্ডেন টেম্পলে Operation Black Thunder পরিচালনা করে।
In 1988, Doval was granted one of the highest gallantry awards, the Kirti Chakra, becoming the first police officer to receive a medal previously given only as a military honour.

দোভাল ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অপারেশন উইংএর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রায় একযুগেরও বেশি সময়।
এবং পরে Multi Agency Centre (MAC), এবং Joint Task Force on Intelligence (JTFI) এর চেয়ারম্যানও ছিলেন।

অজিত দোভাল জম্মু কাশ্মিরের একজন প্রাক্তন MLA, Mohammad Yusuf Parray কে দিয়ে Counter insurgency pro-India militant outfit, Ikhwan-ul-Muslemoon সংগঠন খুলে ফেলেন ১৯৯৬ সালে। এদের দিয়ে pro-Pakistani militants দের কাউন্টার দিতে শুরু করেন।
অর্থাৎ কাটা দিয়ে কাটা তোলা।
তখন দোভাল ছিলেন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অপারেশন উইংএর চিফ।

২০০৫ সালে অজিত দোভাল অবসর নিয়েছিলেন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর চিফ হিসেবে।
এরপর কিছুদিন অবসর কাটানোর পর রাজনীতিতে আসেন।
২০১৪ সাল থেকে মোদী সরকারের national Security advisor হিসেবে দায়িত্বপালন শুরু করেন।
২০১৪ সালে সিরিয়াতে আইসিসের হাতে আটক ৪৬ জন ভারতীয় নার্সের মুক্তির জন্য Hostage negotiation এই অজিত দোভালই করেছিলেন এবং তিনি নার্সদের মুক্ত করতে সক্ষম হন।

অজিত দোভাল ভারতীয় ফরেন পলিসি'তে বেশকিছু পরিবর্তন ইতিমধ্যেই এনেছেন। ভারত সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক এখন অজিত দোভাল।

Read More »

Monday, August 5, 2019

ভেনিজুয়েলা পাঠ


হাইপোথেট্যিকাল এক পরিস্থিত। কাল্পনিক এক চরিত্র আবুল। ১০ বিঘা জমির মালিক। এই দশ বিঘা জমিতে ফসল ফলিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে আবুলের সংসার চলে।
তো ১০ বিঘা জমিতে ধরে নিন একটা নির্দিষ্ট পরিমান ধান গড় অনুপাতে সারা বছরে উৎপাদন সম্ভব। যেহেতু গল্পটা কাল্পনিক এবং বোঝানোর সুবিধার জন্য লিখা, এজন্য ধরে নিন প্রতি মন ধানের বাজার মূল্য ১০০ স্বর্নমুদ্রা !!
হঠাৎ বাজারে ধানের দাম বাড়তে শুরু করলো। ওদিকে প্রতি মন ধানের উৎপাদন খরচ অপরিবর্তিত রইল। ফলে উৎপাদিত ধান বিক্রি করে অধিক মুনাফা লাভ করতে শুরু করলো আবুল।
ধানের দাম যত বাড়ে, আবুলের মুনাফাও তত বাড়ে। একসময় মন প্রতি ধানের বাজার মূল্য গিয়ে দাড়ালো ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা !
অর্থাৎ আয় বেড়ে গেল পাঁচগুন।
আয় যত বাড়তে শুরু করলো, আবুলের জীবনযাত্রার মানও তত বাড়লো। আগে আবুল মোটর সাইকেলে ঘুরতো। সেটা বাদ দিয়ে গাড়ি কিনলো।
আবুলের আয় যত বাড়ে, খরচও তত বাড়ে। লাইফ স্টাইলের উন্নতি ঘটে।
আবুলের বৌ ছিল একজন। টাকা পয়সার মালিক হবার পর দ্বিতীয় বিয়ে করলো আবুল। পকেটে পয়সা বেড়ে গেলে পয়সার গরমও বাড়ে। জুয়া খেলতে শুরু করলো আবুল।
বাসায় কর্মচারী নিয়োগ দিলো সেবাযত্নের জন্য। আগে নিজের কাপড় নিজে ধুইতো, এখন কাপড় ধোয়ার জন্য একজন আলাদা লোকই আছে তার।
আবুলের লাইফ স্টাইলের এই বিশাল পরিবর্তন এসেছে বাজারে ধানের দামের ক্রমবৃদ্ধির কারণে। ধানের দাম যত বেড়েছে, আবুলের আয় তত বেড়েছে। ফুটানিও তত বেড়েছে।
হঠাৎ যদি ধানের দামের পতন হয়, হঠাৎ যদি বাজারে প্রতি মন ধানের মূল্য ১০০ স্বর্ণমুদ্রায় নেমে আসে, আবুলের এই জাঁকজমক মুহুর্তেই মিলিয়ে যাবে। যে বিশাল খরুচে সিস্টেম দাড় করিয়ে ফেলেছে সে, সেটা বেসামাল হয়ে যাবে। ৫০ জন কর্মচারী না হয় ছাটাই করতে পারবে, কিন্তু ইতিমধ্যে ২টা বিয়ে করেছে, ১৫টা সন্তানের জন্ম দিয়েছে, তাদের তো ছাটাই করতে পারবে না !!
যখন সুসময় ছিল, আবুল ভালোভাবেই এদের মেন্টেন করেছে, কিন্তু এবার?
আবুল যেটা করেছে, সেটা হল মিসম্যানেজমেন্ট। যখন গোলা ভরা ধান ছিল, তখন রেধেছে আর খেয়েছে। ভবিষ্যতের কথা ভাবেনি।

এবার পরিস্থিতি ভয়াবহ। আবুলের অবস্থা বেসামাল।

এবার আসি ভেনিজুয়েলার কথায়।



অনেকে ভেনিজুয়েলার বর্তমান সিচ্যুয়েশন যেভাবে এনালাইসিস করে, সেটা অনেকটা আমার বানানো কাল্পনিক এই গল্পটার মত যা উপরে লিখলাম।
দক্ষিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে প্রায় আটগুণ বড়। মূলত স্প্যানিস ভাষাভাষীর মানুষের বসবাস সেখানে। তবে স্বীকৃত আঞ্চলিক ভাষা আছে ২৬টি। জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির কাছাকাছি। মেজরিটি ক্যাথেলিক খ্রিস্টান।



কিন্তু এসবকিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হল, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ আছে ভেনিজুয়েলার মাটির নিচে। এখানে শুরুতেই একটা কথা বলি। তেলের মজুদ থাকা এক জিনিস। আর সেই তেল তুলতে পারার, রিফাইন করার ক্ষমতা, এসব আরেক জিনিস।



https://www.worldatlas.com/articles/the-world-s-largest-oil-reserves-by-country.html

৩০ হাজার কোটি ব্যারেলের অধিক তেলের মজুদ আছে ভেনিজুয়েলার মাটির তলে।

কাগজে কলমে ভেনিজুয়েলা পৃথিবীর সবচেয়ে বিত্তশালী দেশগুলোর ভেতর পড়ে। কিন্তু সম্পদ শুধু থাকলেই হয় না, সেই সম্পদ কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং হবে, সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভেনিজুয়েলার Lake Maracaibo অঞ্চলে তেলের সন্ধান পাওয়া যায়। ফলে, দ্রুতই কৃষিপন্ন রপ্তানি নির্ভর ছোট অর্থনীতি থেকে সরে গিয়ে তেল রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে ভেনিজুয়েলা। রাতারাতি গুপ্তধন পাবার মত ব্যাপার। আঙ্গুল ফুলে বটগাছ।
ভেনিজুয়েলার মানুষের জীবনযাত্রার মানের ব্যাপক উন্নতি হতে থাকে। এবং এই উত্তরণ ১৯৮০ সাল পর্যন্ত চলেছে। ছোটখাটো হোচট খেলেও বড়কোনো ডিজাস্টার হয়নি। কখনো সরাসরি ডিক্টেটরশিপের আন্ডারে আবার কখনো গনতান্ত্রিক লেবাজধারী ডিক্টেটরশিপের আন্ডারে পরিচালিত হয়েছে ভেনিজুয়েলা। হয়েছে ব্যাপক দূর্নীতি। হয়েছে Mismanagement.
কিন্তু উপরে বলা সেই আবুলের গল্পের মত, যতদিন ধানের দাম ক্রমবর্ধমান ছিল, ততদিন আবুল যা ইচ্ছা করেছে। জুয়া খেলেছে, মদ খেয়েছে, ছয়নয় করেছে, কিন্তু এরপরও সংসার চলেছে আরামছে। কারণ টাকা তো প্রচুর আয় হচ্ছিলো। সুতরাং এদিকসেদিকে অপচয় হলেও ব্যাপারটা তখন গায়ে লাগেনি।

আমি ডিটেইলস ইতিহাসে যাবো না, কারণ আলোচনা আরো জটিল হয়ে যাবে। দ্রুত ইতিহাসের কিছু অধ্যায় তুলে ধরে বর্তমানে আসার চেষ্টা করবো।

তো যা বলছিলাম। ১৯৭৬ সালে ভেনিজুয়েলার সরকার ভেনিজুয়েলার Oil Industries জাতীয়করণ শুরু করে। বেশকিছু ওয়েল ইন্ড্রাস্ট্রি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রনে চলে যায়। তবে সব নয়।
সোজা বাংলায় বলি জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রীয়করণ ব্যাপারটা। ভেনিজুয়েলাতে তেল ও গ্যাসের সবই তুলতো বিদেশী কোম্পানিগুলো। আফটার অল, বিদেশী কোম্পানিগুলোই ভেনিজুয়েলাতে তেলের সন্ধান পেয়েছিলো এবং তেল তুলে প্রক্রিয়াজাতকরণের মত টেকনিক্যাল knowhow এবং এক্সপার্টিজ বিদেশীদেরই ছিল।
ভেনিজুয়েলার সরকার বেশকিছু তেল স্থাপনা নিজ দায়িত্ব নিলো।
একটা ভিন্ন উদাহরণ টেনে আনি।
ইরানের মাটির নিচে প্রথম তেলের সন্ধান পাওয়া যায় ইরানের আবাদান এলাকায়। তো সন্ধান পেলেই শুধু হবে? তুলতে হবে না? আর তুলতে গেলে তো টেকনোলজি লাগবে। তখন ব্রিটিশরা এগিয়ে আসলো। তাদের কাছে আছে প্রযুক্তি। ইরানকে বললো, আসো, দুজন মিলে একটা কোম্পানি খুলি। তবে শর্ত যা আয় হবে, ৮৪% আমার, বাকি ১৬% তোমার !
এখন ইরান কি অফার ফিরিয়ে দেবে? চিন্তা করে দেখুন, নাই মামার চেয়ে তো কানা মামা ভালো। আফটার অল, মাটির তলে তেলের ভান্ডার রেখে লাভ কি যদি কাজেই না আসে, তুলতেই না পারে। সুতরাং অফার মেনে নিতেই হবে। মন্দের ভালো। সুতরাং নিজ দেশের তেল অথচ ভাগের ভাগ মাত্র ১৬%
চিন্তা করেন অবস্থা !! তো ইরান আর ব্রিটিশরা মিলে খুলে ফেললো Anglo Persian Oil Company Ltd.
অনেকদিন পারস্য অঞ্চলে ব্যবসা করেছে এই কোম্পানি।
এরপর ১৯৫২ সালে ইরানে বিপ্লব হল। ডক্টর মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতায় এলো। এবং ইরানের তেলকুপ ও তেল শোধনাগারগুলো জাতীয়করণ করলো। অর্থাৎ ইরানের সম্পদ এবার ইরানিরাই দখলে নিলো। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ব্রিটিশদের বের করে দিলো। এরপর সেই Anglo Persian Oil Company নাম পরিবর্তন করে হয়ে গেল ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম অর্থাৎ বিপি।

তো ফিরে আসি ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে। ১৯৭৬ সালে ভেনিজুয়েলা তাদের পেট্রোলিয়াম ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো রাষ্ট্রয়ত্বকরণ শুরু করার পর থেকে ভেনিজুয়েলার সরকার আয় গেল বেড়ে। (তবে মোট প্রোডাকশন রেট কমে গেল। কারণ remainging foreign/ international oil Company গুলো নিজেদের অবস্থান নিয়েই চিন্তিত হয়ে পড়লো। তারা ইনভেস্টমেন্ট ও ডেভলপমেন্ট কমিয়ে দিলো)
স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করুন। আগে আপনি ভাগের ভাগ পেতেন ১০ থেকে ২০%। হঠাৎ যদি ৮০% দখলে পান, তাহলে আয় তো বাড়বেই। এখন সরকারের হঠাৎ আয় বেড়ে গেলে সরকারও হয়ে যায় উপরের গল্পের সেই আবুলের মত।
সরকার এবার বেশিবেশি পাবলিক স্পেন্ডিং শুরু করলো। বাজেট বাড়ালো। ব্যয় বাড়ালে। টেকসই উন্নয়নের দিকে না গিয়ে শর্ট টার্ম ফটকাবাজিতে ঝোক ছিল বেশি।

ধাক্কা খেলো আশির দশকে এসে। তেলের দাম গেল ধপাস করে নেমে।
১৯৮৫ সালে সৌদি’রা মার্কিনীদের সাথে পরামর্শ করে তেলের প্রোডাকশন ব্যাপক বাড়িয়ে বাজার তেলে সয়লাব করে দিলো। চাহিদার তুলনায় বাজারে যোগান বাড়িয়ে দাম কমিয়ে দিলো।
সৌদিদের আবার তেল তোলার ক্ষমতা ভেনিজুয়েলার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। আফটার অল, পশ্চিমা বড়বড় তেল কোম্পানি এবং মার্কিন সরকার সরাসরি সেখানে টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং এক্সপার্টিজ দিতো। সৌদিতে মার্কিন ইনভেস্টমেন্টেরও অভাব হইতো না। হয়ও না এখনো।
তেলের এই প্রোডাকশন বাড়ানোর পেছনে সৌদিরা অফিসিয়ালি যা বলেছিলো, সেটা হল, OPEC দেশগুলো গোপনে গোপনে প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত কোটার চেয়ে বেশি পরিমান তেল তুলে বিক্রি করতেছিলো বেশি পয়সা কামানোর ধান্দায়। তাদের শায়েস্তা করতে সৌদিরা বাজারে তেলের দাম কমিয়ে দেবার জন্য একাজটি করেছিলো।
তবে নিন্দুকেরা বলে, মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতিতে আঘাত করা। সেসময় আফগান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সোভিয়েত’রা অর্থনৈতিকভাবে নাজুক পরিস্থিতির ভেতরে ছিল।
যাই হোক, ১৯৮৫ সালের ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বারবার মূল টপিক্স বাদ দিয়ে এদিকে সেদিকে লাফ দিচ্ছি। এজন্য দুঃখিত।
তো, এসময় পরিস্থিত সামাল দেবার জন্য যেসব ইকোনমিক্যাল মেজার্স নেবার দরকার ছিল, ভেনিজুয়েলার সরকার তা নিতে ব্যর্থ হল। ভুলভাল পলিসির ইমপ্লিমেন্টেশনের কারণে সিচ্যুয়েশন গেল আরো খারাপ হয়ে। শুরু হল প্যানিক।
একটা কথা সবসময় মনে রাখবেন, ভলাটাইল ইকোনমিক্যাল সিচ্যুয়েশন থাকলে দূর্নীতি যেমন বেশি হয়, বিদেশে অর্থ পাচারও তেমন বেড়ে যায়। কারণ মানুষ তার অর্জিত ধনসম্পদ হেফাজত করতে চেষ্টা করে। এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবনতা।
আপনি যদি জানেন, আপনার ব্যাংকে জমানো ১০ লক্ষ টাকা ক্রমশ মূল্য হারাবে, উচ্চ মুদ্রাস্ফিতি তথা ইনফ্লেশনের কারণে, তাহলে আপনি হয় বৌ’এর জন্য সোনাদানা বা গয়না কিনে ঘর ভরে ফেলবেন, আর না হয় টাকাপয়সা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করবেন।
যে দেশে সোশ্যাল সিকিউরিটি নেই,
সেই দেশে মানুষ দূর্নীতি প্রবন বেশি হবে। সোশ্যাল সিকিউরিটি, অর্থাৎ বেকার ভাতা, পেনশন, মেডিকেল বা হেলথ ইন্সুরেন্স, এসব না থাকলে মানুষ দেখবেন সবসময় টাকা জমানোর দিকে ঝুকবে। বাংলাদেশে আমরা যেমন করি। সবসময় ভবিষ্যতের চিন্তা করি। একটা বড়সড় অসুখ হতে পারে। বিপদ আপদ আসতে পারে। হেলথ ইন্সুরেন্স নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যেও কিছু জমিয়ে যেতে হবে। কারণ রাষ্ট্র দায়িত্ব নেবে না। এরকম সিচ্যুয়েশনে মানুষ টাকা জমিয়ে নির্ভার হয়।
আর জমানো টাকার হেফাজত করতে কে না চায়? তো দূর্নীতি সবচেয়ে বেশি করে রুলিং ক্লাস। ক্ষমতাবানেরা। উচ্চবিত্তরা। দূর্নীতির টাকা নিজ দেশে রাখা বিপদজনক। কারণ হিসাব দেখাতে হবে, উৎস দেখাতে হবে। অন্যথায় পুলিশে বা দুদকে ধরবে। এজন্য এই টাকা হয় নামে বেনামে রাখবে, অন্যথায় বিদেশে পাচার করে দেবে। বিদেশে পাচার করে দেয়াটা দূর্নীতিবাজদের জন্য নিরাপদ।
যেমন আমাদের দেশে আমরা হরহামেশা শুনি, হাজার কোটি টাকা মালেয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে চলে যাচ্ছে। সুইস ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। তো এসব পাচার করে সমাজের উচ্চবিত্ত, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
আবার এসব প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবানেরা তাদের দূর্নীতি এবং বিত্ত পাচার চালিয়ে যেতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ইনিস্টিটিউশনগুলো, যেমন দূর্নীতিদমক কমিশন, পুলিশ, প্রশাসন, বিচারবিভাগ, ইত্যাদি ধ্বংস করে অথবা করাপ্টেড করে ছাড়ে, অথবা ইন-ইফেক্টিভ করে রাখে।
কারণ চিন্তা করুণ। দূর্নীতিদমন কমিশন যদি শক্তিশালি থাকে, তাহলে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদগনের দুর্ণীতি বা টাকা পাচার ধরে ফেলবে, জেলে ভরবে, তখন তাদের খেল খতম।
এজন্য এরা এসব প্রতিষ্ঠানকে কখনোই ইফেক্টিভ হতে দেয় না। এসব দেশে দুর্ণীতি দমন কমিশন কেবল লোক দেখানো কিছু সরকারি আমলা পাকড়াও করবে দুর্নীতির অভিযোগ। পুটি মাছ ধরবে। কিন্তু কখনোই রাঘব বোয়ালের দিকে চোখও দেবে না।
এগুলো একটার সাথে আরেকটা ইন্টারকানেক্টেড।
একটা বাড়লে অন্যটা বাড়ে। একটার জন্য অন্যটা দায়ী।

তো Capital Flight বলে একটা টার্ম আছে। দেশের ধনী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেনী যখন দেখবে, দেশে টাকা পয়সা রাখা নিরাপদ নয়, তখন সেই সম্পদ বিদেশে পাচারের প্রবনতা বাড়বে।
আশির দশকের শুরুতে তেলের দামের পতনের পর ভেনিজুয়েলাতে বেশকিছু পলিটিক্যাল চেঞ্জ এলো। পলিটিক্যাল সিস্টেম ডি’সেন্ট্রালাইজ করা হল। কিন্তু পরিস্থিত সবসময় থাকতো ভলাটাইল।
আন্দোলন, ক্যু, দাঙ্গাহাঙ্গামা লেগেই থাকতো। ১৯৯৮ সালে আরেক দফা তেলের দামের ভয়াবহ পতন হল।
সেইসাথে ১৯৭৬ সালে Oil industries জাতীয়করণ শুরু করার পর থেকে Oil industry গুলোর অবস্থাও খারাপ। Venezuelan state-owned oil company Petróleos de Venezuela S.A. (PDVSA) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৬ সালে। আমাদের দেশের পেট্রোবাংলার মত।
সরকারি খাতে গেলে যা হয় আরকি !! যেমন বাংলাদেশের রেলওয়ে, বিআরটিসি সহ আরো যত সরকারি মালিকানাধিন সেক্টর আছে, সবগুলোর অবস্থা চিন্তা করুণ এবং ব্যাপারটা অনুমান করতে পারবেন।
আমরা যেমন হরহামেশা বলি, সরকারি খাতে কোনোকিছু থাকলে সেগুলো ভালোভাবে চলে না। ম্যানেজমেন্ট ঠিক থাকে না। লোকসানে চলে। এবং সার্ভিসের মানও খারাপ হয়ে যায়। ব্যাপারটা তেমন।

১৯৭৬ সালে থেকে তেলের প্রোডাকশন কমে যায়। ১৯৭০ সালে ভেনিজুয়েলা সর্বোচ্চ তেল তুলেছিলো ৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন। এবং অবাক হবার মত বিষয় হল, তেল তোলার সর্বোচ্চ লিমিট বা ক্ষমতা আজ পর্যন্ত বাড়েনি।
১৯৮৯ সালে IMF-backed austerity মেনে নিতে হয় ভেনিজুয়েলাকে।



১৯৮৯ সালে থেকে তেলের উৎপাদন আবার উর্ধমুখি হলেও মানুষের জীবনযাত্রার মানের এই পতনের কারণে ১৯৯৯ সালে Bolivarian Revolution শুরু হল। হুগো স্যাভেজ ক্ষমতায় এলো।
ইতিহাসের অনেককিছু আমি স্কিপ করে গেলাম। অতীত ইতিহাস নিয়ে বেশি ডিটেইলসে যাবো না।

হুগো স্যাভেজের সোশ্যালিস্ট সরকারি সিস্টেম ক্ষমতায় এসে ভাগ্যের সহায়তা পেলো শুরুতেই। চিত্রটা নিচে দিচ্ছি।


খেয়াল করে দেখুন, যে বছর হুগো স্যাভেজ ক্ষমতায় এলো, অর্থাৎ ১৯৯৯ সাল... তখন থেকে তেলের দাম বেড়ে ১৯ ডলার প্রতি ব্যারেল থেকে লাফাতে লাফাতে ৯৭ ডলারে গিয়ে থেমেছে ২০১৩ সালে।
অর্থাৎ ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে ২০১৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হুগো স্যাভেজের শাসনামলে তেলের দাম বেড়েছে।
(২০০৮-০৯ সালে গ্লোবাল ইকোনমিক ক্রাইসিসের কারনে একটু পতন হয়েছিলো। কিন্তু সেটা আবার ঠিকই বেড়েছে দ্রুত)
তেলের এই দাম বৃদ্ধির সুফল স্যাভেজ পেয়েছে।
প্রচুর সরকারি হাসপাতাল, স্কুল কলেজ, সোশ্যাল ওয়েল ফেয়ার প্রোজেক্ট, হাউজিং প্রজেক্ট, এটাসেটা, নানান প্রজেক্ট গর্ভমেন্ট ফান্ডিং’এ করেছে তেল বিক্রি করা টাকায়।
সৌদি আরবের মত ভেনিজুয়েলার কোনো Social Welfare Fund (SWF) ছিল না। সৌদি আরব যেখানে ১০ টাকা আয় করলে ৭ টাকা ব্যয় করে ৩ টাকা ভবিষ্যতের আপদকালিন সময় মোকাবেলার জন্য SWF ফান্ডে রাখতো, সেখানে ভেনিজুয়েলা তেলখাতে আয় করা রেভিনিউ পুরোটাই ব্যয় করতো।

এরপরও তেলের ক্রমবর্ধমান মুল্যের কারণে, হুগো স্যাভেজের এই সময়কালে ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালোই ছিল।
ইনফ্যাক্ট তখন দেশে বিদেশি ভেনিজুয়েলার প্রশংসা শোনা যেত তথাকথিত সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের মুখে।
যেমন, https://www.youtube.com/watch?v=5OqXBdCHJDc The times that Corbyn and his allies praised socialist Venezuela লিখে গুগলে সার্স দিলে উপরের ভিডিওটি পাবেন। ২০১১ সালে ব্রিটিশ পলিটিসিয়ান Jermy Corbyn ভেনিজুয়েলার সোশ্যালিস্ট সিস্টেমের অনেক প্রশংসা করেছিলাম। উপরের ভিডিওটি দেখতে পারেন।
২০১৩ সালে হুগো স্যাভেজ মারা গেলে তিনি টুইটও করেছিলেন।
https://twitter.com/jeremycorbyn/status/309065744954580992?lang=en


এমনকি বার্নি স্যান্ডার্সের মত মার্কিন পলিটিসিয়ানরাও সরাসরি নাম উল্লেখ না করেও ইনডাইরেক্টলি হুগো স্যাভেজের প্রশংসা করেছিলেন।
২০১১ সালে স্যান্ডার্স বলেছিলেন,
“These days, the American dream is more apt to be realized in South America, in places such as Ecuador, Venezuela and Argentina, where incomes are actually more equal today than they are in the land of Horatio Alger. Who's the banana republic now?”

এখন ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটি হল, তেলের এই দামের উর্ধ্বগতির জন্য দায়ী ছিল আমেরিকা। প্রথমে আফগান যুদ্ধ, এবং পরে ইরাক যুদ্ধ। এই দুইটা যুদ্ধের কারণে তেলের দাম একসময় ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছিলো।
আর এই সময়টার সুফল পেয়েছে ভেনিজুয়েলা আর রাশিয়ার মত দেশ।

হুগো স্যাভেজের বিভিন্ন সোশ্যালিস্টিক প্রোগ্রামের কারনে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেনীর কাছে হুগো স্যাভেজের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বি হয়েছিলো। এই সময়টাতে ইকোনমি ডাইভার্সিফাই করলে ইন দা লং রান ভেনিজুয়েলার জন্য ভালো হত। কিন্তু হুগো স্যাভেজ সেই সিস্টেমটি দাড় করিয়ে যেতে পারেননি। বরং তার আমলে যে ইকোনমিক বাবল তৈরি হয়েছিলো, তার মৃত্যুর কিছুকাল পরই সেটা ফেটে গিয়ে আজকের অবস্থায় নিয়ে এসেছে ভেনিজুয়েলাকে।


এবার দেখুন ২০১৪ সালের পর থেকে তেলের দামের পতন। ৯৩ ডলার থেকে কমে পরের বছর হয়েছে ৪৮ ডলার। প্রায় অর্ধেক কমেছে। এবং সেটা আগের মত রিকোভার করেনি।
সেই ৯০+ ডলার প্রতি ব্যারেল তেলের দামের যুগ আর নেই। হগো স্যাভেজের রেখে যাওয়া সেই সিস্টেমের অবস্থা আবার সেই উপরের গল্পের আবুলের মত।
আবুলের কমে গেছিলো ধানের দাম। আর ভেনিজুয়েলার তেল।
লিমিটেড গর্ভমেন্ট আর বিগ গর্ভমেন্টের এটাই পার্থক্য।
আর হুগো সাভেজের আমল থেকে অর্থনীতি ডাইভার্সিফাই হয়নি। বরং আরো তেলের উপর নির্ভরশীল হয়েছে। সোজা বাংলায়, তারা মাটি থেকে তেল তোলে। বিক্রি করে। আর সেই টাকা দিয়ে আবুলের মত চলে।


উপরের Graphical depiction of Venezuela's product exports দেখলেই বুঝতে পারবেন অবস্থা। ভেনিজুয়েলার রফতানি খাত প্রায় পুরোপুরিই পেট্রোলিয়াম আর প্রেট্রোলিয়ামজাত পণ্য নির্ভর।
ভেনিজুয়েলার জিডিপির মাত্র ৩% কৃষি নির্ভর। ওয়ার্কফোর্সের মাত্র ১০% কৃষিখাতে নিযুক্ত। খাদ্রে ভেনিজুয়েলা আত্মনির্ভরশীল নয়। তিনভাগের দুইভাগ খাদ্র ভেনিজুয়েলাকে বাইরের থেকে ইমপোর্ট করতে হয়। এবং ভয়াবহ ব্যাপার হল, এই আমদানিকৃত খাদ্যের তিনভাগের একভাগ আসে আমেরিকার কাছ থেকে যারা কিনা ভেনিজুয়েলার শত্রু ভাবাপন্ন দেশ।
আর ভেনিজুয়েলাকে চলমান ভয়াবহ সংকটের শুরুটা এই খাদ্য নিয়েই। সেগুলো একটু পর বলবো।

হুগো সাভেজের পলিসিগত বেশকিছু ভুল ছিল যেগুলো সুসময়ে বোঝা যায়নি। ক্ষমতাগ্রহনের তিন বছরের মাথায় তিনি সকল সরকারি সেক্টরে নিজের অনুগত লোকজন বসানো শুরু করেন। ভেনিজুয়েলার মেজরিটি মানুষের জীবন জীবিকা তেল ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে সরকারি তেল কোম্পানি PDVSA ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ২০০২ সালে হুগো সাভেজ কোম্পানির বড়বড় হর্তাকর্তাদের সরিয়ে সেখানে নিজের অনুগত লোকজন এবং লয়ালিস্ট বসাতে শুরু করেন। ফলে শ্রমিক সংগঠনগুলো হরতাল ডাকে। হুগো সাভেজের পলিটিক্যাল অপনেন্টরা সেখানে বাতাস দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একসময় আন্দোলন শুরু হয়। পলিটিক্যাল ক্রাইসিস দেখা দেয়। মিলিটারি ক্যু, প্লাটা ক্যু পর্যন্ত হয়। বেশকিছু মানুষের প্রাণ ঝড়ে পড়ে। কিন্তু সাভেজ ঠিকই ক্ষমতায় টিকে থাকে। পলিটিক্যাল অপজিশনকে সাভেজ দেশের শত্রু, আমেরিকার দালাল, জাতীয় বেইমান টাইপের ট্যাগ দেয়া শুরু করে।
PDVSA তে meritocracy বাদ দিয়ে দলীয় আজ্ঞাবহ “ইয়েস স্যার” লয়ালিস্ট নিয়োগ শুরু হয় ঢালাওভাবে। আন্দোলনে সম্পৃক্ত ট্রেড ইউনিয়নের নেতা কর্মী থেকে শুরু করে PDVSA এর স্কিল ওয়ার্কারদের পর্যন্ত অপসাহর করা শুরু হয় আন্দোলন এবং অপজিশন পার্টির সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে। ২০,০০০ কর্মী ছাটাই হয় একদিনে।
আর এইসময় থেকেই সাভেজের সাথে মার্কিন সরকারের সম্পর্ক ব্যাপকহারে খারাপ হতে শুরু করে।

২০০৩ সালে Capital Flight এবং ইনফ্লেশন ঠেকানোর জন্য হুগো সাভেজ প্রাইস কন্ট্রোল শুরু করে। ব্যাপারটা সংক্ষেপে বলি। ধরুণ বাংলাদেশে আলুর দাম ১০ টাকা প্রতি কেজি। (কথার কথা)। ভারতে আলূর দাম ৮ রুপি প্রতি কেজি। কথার কথা,
বাংলাদেশের ১০ টাকা ভারতের ৮ রুপির সমান।
তো বাংলাদেশ সরকার যদি এখন, আলুর দাম ৫ টাকা প্রতি কেজি নির্ধারিত হারে বেধে দেয়,
তখন কৃষক আলু ইন্ডিয়াতে ব্ল্যাক মার্কেটে পাচর শুরু করবে। কারণ একই আলু ইন্ডিয়াতে বেশি দামে বিক্রি হবে। সুতরাং লাভও সে বেশি পাবে।
এবং এই জিনিসটা কেবল আলু’তে নয়, আরো অনেককিছুতেই হবে। হয়েছে। কিন্তু এরপরও সমস্যা হয়নি, কারণ তখন তেলের দাম ছিল ক্রমবর্ধমান। সুতরাং খাদ্যে ভর্তুকি দিয়ে খাদ্য রফতানি করেছে সাভেজ। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতে ভর্তুকি দিয়ে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার প্রোগ্রাম চালিয়ে দরিদ্রমানুষের ভেতর জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ভোটেও জিতেছে।
তেল বেচা টাকা যতদিন এসেছে ভুড়িভুড়ি, কোনো সমস্যা হয়নি।
কিন্তু সবকিছু এতো ফ্রি দেয়া সবসময় ভালো হয় না। কর্মসংস্থান তৈরি না করে, জনগনের মাঝে প্রোডাক্টিভিটি না বাড়িয়ে, খালি ফ্রি ফ্রি সুবিধা দিয়ে ভোট পেয়ে গেছে সেসময়।

আগে আসুন, চলমান ভয়াবহ পরিস্থিতিটা তথ্য উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরি।
প্রথমেই আসি, ভেনিজুয়েলার হাইপার ইনফ্লেশন প্রসঙ্গ। মনে আছে, ২০০৬-০৯ সালের জিম্বাবুয়ের কথা? এক হালি ডিম কিনতেও মিলিয়ন জিম্বাবুয়িয়ান ডলার খরচ করতে হইতো। সেগুলো নিয়ে মানুষ ঠাট্টা তামাশা করতো। কিছু ছবি দিচ্ছি সেইসময়কার জিম্বাবুয়ের।
জিম্বাবুয়ের হাইপার ইনফ্লেশন এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে, জিম্বাবুয়ের দশ মিলিয়ন ডলারের সমান ছিল আমেরিকার মাত্র ১০ ডলার।
একটা মুর্গী কিনতে হলেও বস্তা ভরে টাকা নিয়ে যেতে হত।
ফকিরেরা ভিক্ষা পেতো মিলিয়ন ডলার। টাকা না গুনে ওজন করে লেনদেন হত। কারণ এতো টাকা গোনার সময় নেই।


অর্থাৎ টিস্যু পেপারের চেয়েও কারেন্সির মূল্য কম।
হাইপার ইনফ্লেশন এতটাই ভয়াবহ জিনিস।
২০১৮ সালে ভেনিজুয়েলার ইনফ্লেশন রেট প্রায় ১০ লক্ষ পারসেন্ট অর্থাৎ ১০,০০,০০০% এর কাছাকাছি হয়ে যায়। অর্থাৎ টোটাল ডিজাস্টার।



ইনফ্লেশন বা মুদ্রাস্ফিতি ব্যাপারটা সহজভাবে বলি। আপনার দেশের মুদ্রাস্ফিতি যদি প্রতিবছর ৫% হারে থাকে, তাহলে আপনার হাতে মজুদ ১ লক্ষ টাকার যে পারসেসিং পাওয়ার, বা ক্রয় ক্ষমতা, সেটা ১৪ বছরে অর্ধেক হয়ে যাবে।
উল্টোভাবে বললে, আজ যেটার দাম ১ লাখ টাকা, ১৪ বছর পর সেটার দাম হয়ে যাবে ২ লাখ টাকা।
এটাই মুদ্রাস্ফিতি।
কমপাউন্ড ইন্টারেস্ট রেটের ম্যাথমেটিক্যাল ইকুয়েসন ইউজ করে আপনি এটা বের করে পারেন সহজেই।
আপনার দেশের বার্ষরিক মুদ্রাস্ফিতির হার যদি টানা ১০ বছর ৭% হারে থাকে,
তাহলে দশ বছর পর সবকিছুর দাম ডাবল হয়ে যাবে।
এবার চিন্তা করুন, আপনি আমাকে ১ লাখ টাকা ধার দিবেন কিনা এই শর্তে যে আমি ঠিক দশ বছর পর আপনাকে ১ লাখ টাকা রিটার্ন দেব। হাহাহা। অথবা ১ লাখ টাকা মাটির ব্যাংকে রেখে দেবেন কিনা, দশ বছর পর ব্যাংক ভেঙ্গে ইউজ করার স্বপ্নে।

এজন্য দেখবেন, ত্রিশ বছর আগে মানুষ ৮০০ টাকা বেতন পেয়ে সংসার চালিয়েছে, আর আজ ৮০ হাজার টাকা বেতন দিয়ে চলতেও হিমসিম খাচ্ছে। যাই হোক। বাংলাদেশ, ভেনিজুয়েলা এবং গ্লোবাল ওভারঅল ইনফ্লেশন রেট নিচের গ্রাফে তুলে ধরলাম।


ভেনিজুয়েলার অবস্থা কি ভয়াবহ, এই গ্রাফ সেটা তুলে ধরে। Y axis লগারিদমিক স্কেলে। কারণ লিনিয়ার স্কেলে গ্রাফে আটাতে পারেনি। হাহাহাহা।



২০১৩ সালে হুগো স্যাভেজের মৃত্যু পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসে। ভেনিজুয়েলার এই ভয়াবহ সিচ্যুয়েশনের জন্য তার প্রশাসনকে অনেকাংশে দায়ী করা হয়। কেউ আবার সরাসরি সোশ্যালিস্ট সিস্টেমকে দায়ী করে।
অন পেপার, সোশ্যালিস্টিক প্রোপজালগুলো জনবান্ধব এবং শুনতে ভালো শোনালেও প্রোপার ম্যানেজমেন্ট এনসিওর না হলে অন্য যেকোনো ইকোনমিক্যাল সিস্টেমের মত এটাও ভয়াবহ পরিনতি বয়ে নিয়ে আসতে পারে, ভেনিজুয়েলা সেটারই প্রমাণ।
অনেকে ভেনিজুয়েলার এই পরিস্থিতির জন্য মোটা দাগে তেলের মূল্য পতন ও ইকোনমিক্যাল মিসম্যানেজমেন্টকে দায়ী করেছে।
কেউ আবার সোশ্যালিস্ট সিস্টেমকেই সবসমস্যার মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

এদের পক্ষে এরা যেসব যুক্তি দেখায়, সেগুলো কিছু তুলে ধরি।

শুরুতেই একটা গল্প বলি ছোট করে।
এক রাজনীতিবিদের ব্যাপারে শুনলাম, তার আশেপাশে নাকি স্থানীয় কলেজ পড়ুয়া ছেলেপেলে ঘুরাঘুরি করে। অর্থাৎ পলিটিক্যাল চ্যালাপুলো।
ছেলেগুলোকে প্রতিমাসে দশ হাজার টাকা করে হাতখরচ দেয়া হয়। কোনো কাজ করুক আর না করুক।
প্রতিমাসে ফ্রি ফ্রি একটা ছেলেকে যদি অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা আপনি ধরিয়ে দিতে শুরু করে, তাহলে তার লাইফ স্টাইলে পরিবর্তন আসবে। সে অতিরিক্ত ১০ হাজার ফাউ টাকা তার লাইফ স্টাইলে ইনক্লুড করে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
তখন এই টাকার সোর্স যদি অফ হয়ে যায়, তাহলে ছেলেটি বিপদে পড়ে যাবে। এমতাবস্থায় ওই পলিটিসিয়ানের উপর ছেলেটি ডিপেন্ডেবল হয়ে যাবে। এই সুযোগে ওই পলিটিসিয়ানও ছেলেটিকে দিয়ে ঝোপ বুঝে কোপ মারার মত কোনোএকটি কাজ করিয়ে নিতে পারবে।
নির্ভরশীলতা এভাবেই তৈরি হয়। টাকা দিয়ে, মাদক দিয়ে। নানানভাবে।
মানুষকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ালে মানুষের কাজ করার ক্ষমতা কমে যাবে, এটাই স্বাভাবিক।
সেইসাথে কম্পিটেটিভ ইনভায়রমেন্টও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ তথাকথিত “ভালো স্কুল” বা “ভালো কলেজে” ছেলেমেয়ে কেনো পড়ায়? এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের জন্যই।
ধরুণ আপনি স্কুলে পড়েন।
গেলেন এমন একটি স্কুলে, যেখানে ফাস্ট বয় ৬০% মার্ক পেয়ে ফাস্ট হয়। সেকেন্ড বয় ৫০% মার্ক পেয়ে সেকেন্ড হয়।
এমন একটা স্কুলে গেলে ফাস্ট হবার জন্য ৬১% মার্ক পেলেই আপনার যথেষ্ট।
সুতরাং আপনার চেষ্টাটাও থাকবে ৬১% মার্কের জন্য।

আবার যদি এমন স্কুলে ভর্তি হন, যেখানে ফাস্ট বয় ৯৮%, সেকেন্ড বয় ৯৭% মার্ক পায়, অর্থাৎ হাইলি-কম্পিটেটিভ ইনভায়রমেন্ট, সেখানে আপনি আপনার সর্বোচ্চ বা বেস্ট পারফর্মেন্স দিয়েই ৯৯% মার্ক তোলার চেষ্টা করবেন। হয়ত ব্যর্থ হবেন। কিন্তু আপনি আপনার সাধ্যের পুরোটাই দেবেন।

সিস্টেম খুব গুরত্বপূর্ণ। জার্মানির লোকেরা এতো পরিশ্রমী, গ্রিসের লোকেরা তেমনটি নয়। কেন এমন হয়? শুধুই কি জাতিগত? নাকি সিস্টেমের ব্যাপারস্যাপার জড়িত?
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবশ্যই সিস্টেম।
ভেনিজুয়েলার সোশ্যালিস্ট ইকোনমিক্যাল পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই বিগ গভর্মেন্ট নির্ভর। এখানে মানুষের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট আশা করাটা কঠিন। আপনি বাংলাদেশের দিকেই তাকান। বাংলাদেশের সরকারি যেসব সেক্টর আছে,
সরকারি টেলিকমিউনিকেশন, সরকারি পোস্টাল সার্ভিস, রেলওয়ে, সরকারি ট্রান্সপোর্টেশন, এটাসেটা, যা কিছু সরকারি মালিকানাধিন বা সরকার নিয়ন্ত্রিত, সেসবকিছুতে সার্ভিসের মান দেখুন, আর প্রাইভেট সেক্টরে একই ধরণের খাতে সেবার মান তুলনা করুণ। বুঝবেন।
আপনি সরকারি ব্যাংকগুলোতে যান। জনতা, পুবালি, রুপালি, আরো যা যা আছে। এগুলোতে গিয়ে একটা হেল্প চান। সার্ভিস দেখুন। আর বেসরকারি কোনো ব্যাংকে গিয়ে সার্ভিস দেখুন। আকাশ পাতাল ব্যবধান।
অথচ যে মানুষটা সরকারি সেক্টরে নিযুক্ত, সেই একই মানুষকে যদি আপনি বেসরকারি সেক্টরে নিয়োগ দেন, অবশ্যই সে বেটার পারফর্মেন্স দিবে। দিতে বাধ্য। কারণ সেখানে বেটার পারফর্মেন্স না দিলে তার চাকরি যাবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কম্পিটিশন করে টিকে থাকে (ব্যতিক্রম ব্যতিত) । তাদের বেটার সার্ভিস দিতেই হবে।
এখন চিন্তা করুণ, একটা দেশে নামকাওয়াস্তে প্রাইভেট সেক্টর। বাকিসবকিছু চলে সরকারি খাতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি খুব একটা ভালো হয় না। তবে ব্যতিক্রম আছে। কিছুকিছু জাতি বা রাষ্ট্রের উদাহরণ আপনি চাইলে দেখাতে পারবেন। তবে সেটা এক্সেপশন্যাল হিসেবেই পাবেন।

অন্যদিকে বিগ গভর্মেন্টের সমস্যা হল, এটা যদি ডিক্টেটর দিয়ে পরিচালিত হয়, তাহলে সেই পুরনো কথা।
Power tends to corrupt; absolute power corrupts absolutely.
এটারও এক্সেপশনাল আপনি খুঁজে পাবেন। কিন্তু এক্সেপশন ইজ নট এন এক্সাম্পল।

ভেনিজুয়েলা ভয়াবহ করাপশনে ডুবে আছে গত শতাব্দীর পুরোটা জুড়েই। এবং এখন পর্যন্ত।
Venezuela has been ranked one of the most corrupt countries on the Corruption Perceptions Index since the survey started in 1995. The 2016 ranking placed Venezuela at number 166, out of 178 ranked countries in government transparency.
Similarly, the World Justice Project ranked Venezuela 99th out of 99 countries surveyed in its 2014 Rule of Law Index.

এখানে বিষয়গুলো ইন্টার কানেক্টেড। এখানে resource curse বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে।
ব্যাপারটা সহজে বলার চেষ্টা করি।
মধ্যপ্রাচ্যের উদাহরণ দেখুন। যখন মধ্যপ্রাচ্যে তেল ছিল না, অর্থাৎ মধ্যযুগে। তখন দেশবিদেশের জ্ঞানীগুনী ব্যক্তিরা জ্ঞান অর্জনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে আসতো। ইনবে সিনা, জাবির ইবনে হাইয়ানদের সময়কালগুলো দেখুন। তখন তো মাটি খুড়ে এতো সম্পদ বের হতো না। কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চাটা তখন ঠিকই হত। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাও এখনকার চেয়ে বেশি ছিল।
আর এখন এতো অর্থ সম্পদ। এতোকিছু। অথচ একটা ভালো ইউনিভার্সিটি খুঁজতে গেলে হারিকেন লাগে। জ্ঞানীগুনী ব্যক্তিদের মধ্যপ্রাচ্যে এখন আর দেখা যায়না। আর গবেষনা তো বহুত দূর কি বাত।
মোটা দাগে কারণ এই রিসোর্স অভিশাপ।
মাটির তলে তেল আছে। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সরকারের রেভিনিউ জেনারেট করতে মানুষের ইনকামের উপর ট্যাক্স বসানোর খুব একটা বেশি দরকার নেই। তেল তোলো। বিক্রি করো। পয়সা কোষাগারে জমা করো। সেই টাকা দিয়ে রাস্তাঘাট উন্নত করো। মিলিটারি পুষে জনতা নিয়ন্ত্রন করো। উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে ভোগ বিলাস, আমোদ ফুর্তি করো। সহজ হিসাব। জনগনের মন জুগিয়ে চলার দরকার নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেল আছে। জনসংখ্যা কম। সুতরাং তাদের অন্তত বিল গেইটস, স্টিভ জবস, সার্গে ব্রাইন, ইলোন মাক্স’দের মত লোকের দরকার নেই। আমেরিকার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় কন্ট্রিবিউটার যদি গুগল, Apple, Microsoft হয়, তাহলে চিন্তা করে দেখুন, এগুলো সবই নলেজবেইজড বিজনেস। এদের মালিকেরা টেকনোক্র্যাট। মাটি ফুড়ে তেল তুলে বিক্রি করতে অনেকেই পারে। কিন্তু এসব টেকনোক্র্যাট, জ্ঞানীগুনী মেধা তৈরি করতে সবাই পারে না। মধ্যপ্রাচ্যের ডিক্টেটরদের জন্য এসব ইন্টেলেকচুয়াল লোকের দরকার নেই। আর সেই পুরনো কথা তো আছেই। হীরক রাজার দেশের ডায়লগ, “এর যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে”
সেইসাথে সোশ্যালিস্ট করাপ্টেড ডিক্টেটরিয়াল গভর্মেন্টের কারণ প্রাইভেট সেক্টর বলে কার্যত কিছু নেই।
একটা উদাহরণ দেয়া যাক।
কিছুদিন আগে একটা নিউজ দেখলাম,
আমেরিকার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান Amazon গতবছর কোনো ট্যাক্স দেয়নি।
ওদিকে Amazon এর মালিক দুনিয়ায়র শ্রেষ্ঠ ধনী।
প্রশ্ন হল, এমাজন কি ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে? ব্যাপারটা তেমন নয়।
এখানে, ইনসেন্টিভ (incentive) জড়িত।
ইনসেন্টিভ হল a thing that motivates or encourages someone to do something.
আপনি বিশাল করপোরেশনের জন্য একটা ইনসেন্টিভ চালু করলেন। বললেন, যদি ১০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য ট্যাক্স মাফ। তো চিন্তা করেন এরপর কি হবে। সেই করপোরেশন নিজের ব্যবস্থা প্রসারের জন্য সর্বশক্তি দেবে। কারণ ব্যবসা বড় করলে তার যেমন কোনো ক্ষতি নেই, উল্টো লাভ।
ওদিকে সরকার ১০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করলো।
আবার যদি সরকার বেকুবের মত বিশাল ট্যাক্স বসিয়ে দেয় করপোরেশনের উপর, তাহলে বড়বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেশ ছেড়ে ভাগবে। ভিন্ন দেশে, যে দেশে কর্পোরেট ট্যাক্স কম, দরকার হয় সেই দেশে গিয়ে ব্যবসার রেজিস্ট্রেশন করাবে।
এমন তো হরহামেশা হচ্ছে। হয়।
সুতরাং আপনাকে ব্যবসা বান্ধব ইনসেন্টিভ দিতে হবে।
করপোরেশনের ট্যাক্স কাট দিলেন, এতে কর্পোরেশন যদি তিন ডাবল কর্মসংস্থান তৈরি করে, তাহলে সেটা তো বেশি লাভ। সরকার তখন কর্মচারীদের ইনকাম থেকে ট্যাক্স ঠিকই পাবে। আর আয় রোজগেরে মানুষগুলো অর্থনীতিতেও কনট্রিবিউট করবে।
সুতরাং লাভ তো বাড়বে। কমবে না।

সরকারকে এজন্য ইনসেনটিভ দিতে হয়। সেইসাথে কম্পিটেটিভ পরিবেশও তৈরি হয়। জিডিপির গ্রোথ রেট বাড়ে।
সোশ্যালিস্ট অনেক এজেন্টা শুনে ভালো লাগে, কিন্তু আউটকাম ভালো নাও আনতে পারে।
সবসময় মাথায় রাখবেন, পলিটিসিয়ানরা লাভ ব্যাতিত কোনো কিছুর জন্য ফাইট করে না। উইথআউট এনি বেনিফিট, একটা টিনেজ ছেলে হয়ত কিছু করতে পারে, কিন্তু একটা ত্রিশোর্ধ ব্যক্তি বেনিফিট না থাকলে এক পা সামনেও আগায় না আজকাল।
বার্নি স্যান্ডার্সের মত মার্কিন সোশ্যাল ডেমোক্রেট পলিটিসিয়ানরা যখন মিনিম্যান ওয়েজ, অর্থাৎ শ্রমিকের নুন্যতম মজুরি ১৫ ডলার বেধে দিতে দাবি করে, তখন ভুলেও এটা মনে কইরেন না জনদরদি হয়ে মানুষের জন্য চিল্লাইতেছে।
খোঁজ নিয়ে দেখুন, তাদের পেছনে বিশাল বিশাল মেগা ডোনার কর্পোরেশন আছে। স্পেশ্যাল ইন্টারেস্ট ফান্ডিং দিতেছে তাদের। তাহলে মিনিম্যান ওয়েজ, বা নুন্যতম মজুরি ১৫ ডলার নির্ধারণ করলে এসব কর্পোরেশনের ফায়দা কি?

চিন্তা করে দেখুন। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে লিভিং কস্ট, আর লুইজিয়ানা স্টেটের লিভিং কস্ট এক কিনা। মোটেও এক নয়। লুইজিয়ানাতে যে শ্রমিক ১০ ডলার প্রতি ঘন্টা মজুরীতে সংসার চালাতে পারবে, সেই শ্রমিক কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়াতে গিয়ে ১০ ডলার প্রতি ঘন্টা মজুরিতে চলতেও পারবে না। কারণ ওখানে সবকিছুর দাম বেশি।
আমেরিকাতে আছে ৫০টা স্টেট । এখন ক্যালিফোর্নিয়াতে একটা প্রোডাক্ট তৈরি করলেন ১০ জন শ্রমিক’কে ১০ ঘন্টা খাটিয়ে। ১৫ ডলার প্রতি ঘন্টা মজুরী দিয়ে। অর্থাৎ ১৫০০ ডলার শ্রমিকের পেছনে ব্যয় হল প্রোডাক্ট তৈরিতে। অন্যদিকে একই প্রোডাক্ট লুইজিয়ানা’তে ১০ জন শ্রমিক ১০ ঘন্টা খাটিয়ে ৮ ডলার প্রতি ঘন্টা মজুরি দিয়ে তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ শ্রমিক খাটানো বাবদ ব্যয় হল ৮০০ ডলার। অর্থাৎ ক্যালিফোর্নিয়ার চেয়ে ৭০০ ডলার কম।
কিন্তু খেয়াল করুণ, ক্যালিফোর্নিয়া আর লুইজিয়ানের শ্রমিকের লাইফ স্টাইল কিন্তু একই হবে। যদিও একজন ঘন্টা প্রতি আয় করে ১৫ ডলার, আরেকজন ৮ ডলার। ওই যে বললাম, ক্যালিফোর্নিয়া অনেক ব্যয়বহুল শহর।
তো স্বাভাবিকভাবেই লুইজিয়ানাতে প্রোডাকশন কস্ট কম। এজন্য একই প্রোডাক্ট লুইজিয়ানার কোনো কোম্পানি তৈরি করলে ক্যালিফোর্নিয়ার কোম্পানির চেয়ে সে বেটার পজিশনে থাকবে। হোক ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিষ্ঠানটি জায়েন্ট বিজনেস, এবং লুইজিয়ানার প্রতিষ্ঠানটি স্মল বিজনেস।
এবার ভেবে দেখুন, যদি গোটা আমেরিকাতে নুন্যতম মজুরি ১৫ ডলার প্রতি ঘন্টা আপনি নির্ধারন করে দেন, তাহলে কি হবে? এমাজন বা গুগলের মত বিগ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতি ঘন্টা ১৫ ডলার মজুরি দেয়া সহজ। লোক ছাটাই করে অটোমেশন দিয়ে লেবার খরচের মোট হিসাব কমিয়ে রাখা এদের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু স্মল বিজনেস সব শেষ হয়ে যাবে। বিগ কর্পোরেশনগুলো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষগুলোকে খেয়ে দেবে।
কর্পোরেশনের উদ্দেশ্য থাকবে মনোপলি তৈরি করা। আর সরকারের উদ্দেশ্য থাকবে এই মনোপলি যাতে না হয়, সেটার ব্যবস্থা করা। স্মল বিজনেস, স্টার্ট আপ বিজনেসগুলোকে সুযোগ করে দেয়া। এই চেক এন্ড ব্যালান্স যদি থাকে, তাহলে সিস্টেম ভালোভাবে চলে। কম্পিটিশন থাকে।
হিলারি যখন নুন্যতম মজুরি ১৫ ডলার প্রতি ঘন্টা দাবি নিয়ে চিল্লাপাল্লা করে, তখন উনার লবিস্টদের স্বার্থ এখানে জড়িত থাকে।
আবার বাস্তবেই নুন্যতম মজুরি বাড়ানোর পক্ষেও যোক্তিক কারণ দেখানো যায়। যদিও অনেক রথি মহারথীরা দাবি করে, মুন্যতম মজুরি নির্ধারিত করার কিছু নেই। মার্কেটের উপর বিষয়টি নির্ভর করবে। কিন্তু তেমন করতে দিলে আবার হিতে বিপরীত হবার চান্স থাকে। যেমন আমাদের দেশের গার্মেন্টসের কথা চিন্তা করুণ। গার্মেন্ট মালিকেরা তো পারলে আমাদের দেশের মানুষকে মাগনা খাটাবে। সারাদিন অমানুবিক পরিশ্রম করিয়ে দিনশেষে ১০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলবে, ভালো লাগলে নাও, না নিলে ভাগো। এক্ষেত্রে সরকারকে ইন্টারভিন করতেই হবে। পুঁজিবাদীরা অন্যথায় একচেটিয়া লাভ করবে। এদের অর্থের পিপাসা অনেক বেশি।
অর্থাৎ মুদ্রার দুই পিঠই আছে। পলিটিসিয়ানেরা অধিকাংশ সময় আপনাকে মুদ্রার এক পিঠ দেখাবে। অন্য পিঠ নিয়ে কথা বলবে না।
যেমন আমেরিকাতে যদি নুন্যতম মজুরি ১৫ ডলার প্রতি ঘন্টা ফেডারেল সরকার নির্ধারন করে দেয়, তাহলে মেক্সিকো থেকে আমেরিকাতে বৈধ অবৈধ অভিবাসন আরো বাড়বে।
আবার মুদ্রাস্ফিতিও বাড়বে। মুদ্রাস্ফিতি বাড়ানোর ব্যাপারটা কিছুদিন আগে ছোট একটা উদাহরণ দিয়ে একজনকে বুঝিয়েছিলাম।
ধরুণ একটি সরকারি আবাসিক কোয়াটার। তাতে ৩০০ অফিসার, ১২০০ স্টাফ থাকেন।
অফিসারদের মাসিক আয়ের নুন্যতম লিমিট ১০০০ টাকা, (কথার কথা)
আর স্টাফদের মাসিক আয়ের সর্বোচ্চ লিমিট ৫০০ টাকা।
এখন মাছের বাজারে ৮০০ টাকার দামের মাছটি হয়ত ঘুরেফিরে অফিসারেরাই ক্রয় করে।
তো হঠাৎ সবার স্যালারি বাড়িয়ে দেয়া হল। ফলে এবার অফিসারের মাসিক আয়ের নুন্যতম লিমিট ২০০০ টাকা,
আর স্টাফের ১০০০ টাকা।
ফলাফল, এবার স্টাফেরাও সেই ৮০০ টাকার মাছ ক্রয় শুরু করবে।
মাছের বিক্রেতা দেখবে, আগে তার ক্রেতা ছিল ৩০০ জন। এখন হয়ে গেছে ১৫০০ জন।
সুতরাং সে এবার মাছের দাম বাড়িয়ে ১৬০০ টাকা করে দেবে।
অফিসার এবার ১৬০০ টাকা দিয়ে সেই মাছ কিনবে।
সুতরাং যেই লাউ, সেই কদুই হয়ে গেল।
আগের ১০ টাকা আর এখনকার ২০ টাকা সমান।
যাই হোক,
সুতরাং সবকিছুরই প্রোস এন্ড কনস আছে।
জনতার যদি বিচার বুদ্ধি থাকে, জনতা যদি well informed থাকে, তখন জনতা হিসাব কিতাব করে ভালো মন্দ বিচার করে একটা ডিসিশনে যেতে পারে।
সবকিছুতে গভর্মেন্ট কনট্রোল ভালো না। আবার সবকিছুতে ছাড় দিলেও সমস্যা।
তবে একটা কথা সত্য, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ না থাকলে সিস্টেমে সমস্যা হতে বাধ্য।

যাই হোক, ভেনিজুয়েলাও এই রিসোর্স অভিশাপ এবং সোশ্যালিস্ট ডিক্টেটরিয়াল সিস্টেমের অপরিনামদর্শী পলিসি মেকিংএর ভয়াবহ যুগলবন্দীর খপ্পড়ে আটকা পড়েছে।
ভেনিজুয়েলার ম্যানেজম্যান্ট, পলিসিমেকিং, কোনো জায়গাতেই যোগ্য ইন্টেলেকচুয়াল লোকের সুযোগ হয়নি। এই ভয়াবহ মিসম্যানেজমেন্টের জন্য সিস্টেম অবশ্যই দায়ী। তবে একমাত্র দায়ী নয়।
যেমন ২০১৪ সালে যখন তেলের দাম ধপাস করে কমে গেল, তখন আমেরিকার দেয়া অনেক অর্থনৈতিক অবরোধের পরও রাশিয়া কিন্তু ঠিকই টিকে ছিল। রাশিয়া ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু ধ্বসে পড়েনি। ঠিকই ঘুরে দাড়িয়েছে। এসময়কালে খুব গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করেছিলো রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর Elvira Nabiullina
এই ভদ্রমহিলার মত কেউ ভেনিজুয়েলাতে ছিল না। কোনো পদেই না।
অন্যথায় কেবলমাত্র তেলের দামের পতনের কারনে ভেনিজুয়েলার এমন অবস্থা হবার কথা না।
নিচের গ্রাফটি দেখুন।


https://www.worldometers.info/population/world/

সৌদি আরব ঠিক ভেনিজুয়েলার মতই। প্রায় কাছাকাছি জনসংখ্যা। এবং দুইটি দেশের অর্থনীতিই সিংহভাগ পেট্রোলিয়াম নির্ভর।
তাহলে সৌদি আরব ক্রাইসিসের ভেতর পড়লো না, ভেনিজুয়েলা কেনো পড়লো?

এবার এই লিখার শেষ অংশে ইন্টারকানেক্টেড ভেরিয়েবলগুলো এবং ঘটনাগুলোকে তুলে ধরবো।

কথার কথা, আমি একজন ভেনিজুয়েলান সিটিজেন।
বয়স ৩০ বছর। ব্যাংকে ৫০ লাখ বলিভার (ভেনিজুয়েলার মুদ্রা) মজুদ আছে।
ধরুণ এটাকে টাকা হিসেবে ধরলাম।
অর্থাৎ ব্যাংকে আছে ৫০ লাখ টাকা।
সাল ১৯৮৫। সৌদি আরব আর আমেরিকা মিলে যুক্তি করে তেলের দাম একেবারে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ভেনিজুয়েলার অর্থণীতি একেবারেই shrink করেছে। কারণ তেলের দাম কমে যাওয়াতে সরকারের রেভিনিউ কমে গেছে। বাজেট কমে গেছে। সুতরাং আমার দেশে ইনফ্লেশন শুরু হয়েছে।
আমার দেশের মানুষ এখন আমেরিকাকে ব্লেইম করে এই পরিস্থিতির জন্য।
আমার দেশের ইনফ্লেশন বাড়তে থাকার মানে কি?
যদি আমার দেশের ব্যাংকে সুদের হার ৫% হয়, এবং ইনফ্লেশন প্রতিবছর ২৫% হয়, তাহলে এভাবে চলতে থাকলে ৪ বছরেরও কম সময়ে আমার ক্রয় ক্ষমতা অর্ধেক হয়ে যাবে। গানিতিকভাবে আমার টাকা বাড়বে, কিন্তু সেই টাকা মূল্য হারাবে।
চার বছরে হবে অর্ধেক।
এমন পরিস্থিতিতে আমি কি করতে পারি? গয়না কিনে মজুদ করতে পারি। কিন্তু সেটা অনেক ডিফিকাল্ট। আমি যেটা করতে পারি, টাকাগুলো বিদেশে পাচার করে দিতে পারি। হেফাজত করতে পারি। সেক্ষেত্রে আমি হুন্ডি ধরে বাইরে টাকা পাচার করলাম। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে ১ ডলার = ১০ বলিভার না করে ১ ডলার = ১৫ বলিভার করলাম। কারণ হুন্ডি’রা এমনই রেট ধরবে। এটাই তাদের লাভ।
তো আমি না হয় এভাবে টাকা পাচার করলাম। কিন্তু এই কাজটা কেবল আমি না। করতেছে আমার মত আরো অনেকে। ফলে ভেনিজুয়েলার ইনফ্লেশন আরো বাড়তেছে। চেইন রিয়াকশনের মত।
এমনকি সবজি বিক্রেতাও তার ফসল ব্লাক মার্কেটে ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করতেছে। সেই ফসল চলে যাচ্ছে পাশের দেশ কলম্বিয়াতে। সেখানে গিয়ে কালোবাজারিরা ফসল বিক্রি করতেছে। কৃষক ডলার কামিয়ে নিজের ছেলেকে দিচ্ছে। ডলার হাতে দিয়ে বলতেছে, যা’রে খোকা। এই দেশে ভবিষ্যৎ নাই। এই ডলারগুলো নিয়ে পাশের দেশে পাড়ি জমা। সম্ভব হলে বর্ডার ক্রস করে আমেরিকা ঢোকার চেষ্টা কর। এই ডলারগুলো সাথে রাখ। দুনিয়ার যেখানেই যাবি, ডলারগুলো ঠিক গোল্ডের মত তোকে সাহায্য করবে। ডলার দুনিয়ার সবজায়গায় বিক্রি করে ভালো দাম পাবি।

আর এভাবেই আমরা সবাই মিলে ইনফ্লেশন আরো বাড়িয়ে দিলাম। এরপর যখন ১৯৯৬ সাল এলো, তখন ইনফ্লেশন ১০০% ছুয়ে গেল।
কিন্তু এরকিছুদিন পর সোশ্যালিস্ট বিপ্লব হয়ে হুগো সাভেজ ক্ষমতায় এলো।
কিন্তু সোশ্যালিস্টরা ক্ষমতায় এলো আরেক ঝামেলা বেধে গেল। সমাজের বিত্তবানেরা এবার সংকটে। সোশ্যালিস্ট সরকার তাদের উপর বিশাল বিশাল ট্যাক্স বসাবে। তাদের বিত্ত ধরে টান দেবে।
ফলাফল, বড়লোকেরা আরো মরিয়া হয়ে এবার ক্যাপিটাল ফ্লাইট, সোজা বাংলায়, টাকা পাচার করতে শুরু করলো আমেরিকার ফ্লোরিডায়, ব্রাজিলে, বা কলম্বিয়ায়।
ল্যাটিন আমেরিকা এমনিতেই ড্রাগ লর্ড’দের কার্যকালাপের জন্য বিখ্যাত। এখানে আন্ডার ওয়ার্ল্ড অনেক শক্তিশালি। সুতরাং হুন্ডি বা কালোবাজারি খুজলেই মেলে।
সহজ সুত্র হল, যতবেশি অর্থ বাইরে পাচার হবে, ডলারের বিপরীত বলিভারের ভ্যালু তত কমবে।
ফলে সরকারের আমদানি ব্যয় ততবেশি বাড়বে। আগেই বলেছি, ভেনিজুয়েলা প্রচুর খাদ্রদ্রব্য আমদানি করে। সুতরাং পরিস্থিতি আশা করি বুঝতে পারতেছেন।

হগো সাভেজ এবার নানান কিসিমের আইন করে, control mechanism দিয়ে Capital Flight বা অর্থপাচার কমিয়ে দিলো।
সরকার সরাসরি মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করলো। ডলারে থাকা ফরেন রিজার্ভ দিয়ে নিজ দেশের মুদ্রা কিনতে লাগলো। এতে ইনফ্লেশন কমে গেল। এটা মুলত ম্যানুপুলেশন। কারেন্সি রেট আর্টিফিসিয়ালি কনট্রোল করতে শুরু করলো। CADIVI চালু করলো ২০০৩ সালে। স্টেটরান এক্সচেঞ্জ ব্যুরো CADIVI বানিয়ে নিজ দেশের জনগনের কাছে বেধে দেয়া রেটে ডলার বিক্রি শুরু করলো। কিন্তু এখানে বেশকিছু শর্ত দিয়ে দিলো। যেমন, আমি (একজন ভেনিজুয়েলান) তখনই ডলার কিনতে পারবো, যখন আমি বাইরে ঘুরতে যাবো, অথবা ফরেন কিছু ইনপোর্ট করবো, অথবা ফরেন কোনো ব্যাংক’কে আমার পাওনা ঋণ ফেরত দেবো। ব্লাহ ব্লাহ।
এবং সরকারি বেধে দেয়া রেট ধরুণ, ১ ডলার = ৬ বলিভার।

তো এবার মানুষজন শুরু করলো অন্যকাহিনী। তারা প্লেনের টিকেট কাটলো বলিভারে। বোঝার সুবিধার জন্য, ধরুণ টাকায়। আপ ডাউন টিকেট কাটলো কারাকাস টু ফ্লোরিডা।
এরপর ক্রেডিট কার্ডে ১ ডলার =৬ টাকা এক্সচেঞ্জ রেটে ৩ হাজার ডলার এনডোর্স করে ফ্লোরিডা গেল। ফ্লোরিডা গিয়ে কিছুদিন আত্মীয় স্বজনের বাসায় ঘুরলো। এরপর সেখানে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ৩ হাজার ডলার ক্যাশ আউট করলো।
এরপর সেই ক্যাশ টাকা নিয়ে ভেনিজুয়েলায় ফিরে এলো। এসে সেই তিন হাজার ডলার, যেটা কিনা সরকারি ভাবে বেধে দেয়া ১ ডলার = ৬ টাকা এক্সচেঞ্জ রেটে তোলা,
সেটা ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রি করলো ১ ডলার = ৬০ টাকা হারে।
অর্থাৎ মোট ১৮,০০০ টাকার সমপরিমান ৩ হাজার ডলার এনডোর্স করিয়ে নিয়ে গেছিলাম। এবার সেটা দেশে এনে ৬০ টাকা/ডলার এক্সচেঞ্জ রেটে ব্ল্যাকমার্কেটে বিক্রি করলাম। ফলে আমার পকেটে এখন ১,৮০,০০০ টাকা। কি এক আজব ব্যবসা করে ফেললাম !!
অথচ এই ধান্দা করতেছে আরো অনেকে।
এবং এই ধান্দা করতে গিয়ে ব্ল্যাক মার্কেটেও ডলার প্রতি বলিভারের রেট বেড়ে যাচ্ছে।
ব্ল্যাক মার্কেটে ডলারের বিশাল চাহিদা।

এসবকিছুই সামাল দেয়া যাচ্ছিলো যখন তেলের দাম ভালো ছিল। কিন্তু যেই না তেলের দাম কমে গেল ২০১৩ সালে। ওমনি আবার ক্রাইসিস।
এবং মানুষ যত প্যানিকড হবে, অর্থপাচার তত বাড়তে থাকবে। মানুষের আস্থা যত কমতে থাকবে নিজ দেশের মুদ্রা এবং অর্থণীতির উপর, ততবেশি মুদ্রা বাজারে ধ্বস নামবে।
শেয়ার বাজারে যেমন গুজব রটিয়ে ধ্বস নামানো যায়, ব্যাপারটা তেমনই।
আপনি কালই যদি গুজব রটিয়ে দিতে পারেন, আগামীকাল দেশের অর্থনীতি কোনোএক কারনে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, ওমনি দেখবেন মানুষ হুমড়ি খেয়ে টাকা পাচার শুরু করবে। শেয়ার বিক্রি শুরু করবে। Chaos লাগিয়ে দেবে।
আর এই ব্যাপারটি ভাইরাসের মত কাজ করে। এবং এর ইফেক্ট হয় exponential


নিকোলাস মাদুরো নিজ দেশের আর্মিকে দায়িত্ব দিয়েছে খাদ্র রফতানির কাজে। সমস্যা হল, আর্মিতেও তো খারাপ মানুষ কম নেই। বেধে দেয়া ডলার রেটে খাদ্য কিনে আর্মিও ব্ল্যাকমার্কেটে খাবার বিক্রি করে ডলার কামাচ্ছে। ব্যবসা করতেছে।

চাকরি নেই। আর্থিক নিরাপত্তা নেই। খাদ্য নেই। হাইপার ইনফ্লেশন চরমে। এহেন পরিস্থিতিতে দেশের যুবসমাজ পালাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ ভেনিজুয়েলা ছেড়ে পাশের দেশগুলোতে রিফিউজি হিসেবে পাড়ি দিচ্ছে। আর যতবেশি মানুষ বর্ডার ক্রস করে পাড়ি দিচ্ছে, সবার কাছে আর কিছু থাকুক আর না থাকুক, ডলার ঠিকই আছে। কারণ বাইরের একটা অপরিচিত দেশে যেতে গেলে ডলার দরকার।
এভাবে সিস্টেম গুণোত্তর হারে খারাপ হচ্ছে।
আর ডলারের ভ্যালু ব্ল্যাক মার্কেটে দিনের পর দিন বাড়তেছে।
সেইসাথে দেশে খাবার দাবার নেই।
ফলাফল, ভয়াবহ হাইপার ইনফ্লেশন।
হাইপার ইনফ্লেশন একেবার সহজ করে বলি। বছরের শুরুতে যে জিনিসের দাম ১ টাকা ছিল, বছরের শেষদিনে সেই জিনিসের দাম বেড়ে যদি ১৩০ টাকা হয়, থাওলে সেই দেশে হাইপারইনফ্লেশন শুরু হয়ে গেছে।
Too much money chasing too few products.

তো ভেনিজুয়েলার এই সিস্টেমের অন্যতম রুপকার Jorge Giordani


তিনি ভেনিজুয়েলার পরিকল্পনামন্ত্রী। এবং হুগো সাভেজের ডাই হার্ড সাপোর্টার। এই ফিক্সড কারেন্সি এক্সচেঞ্জ রেট সিস্টেমের অন্যতম প্রবর্তক তিনি।
২০১৩ সালে শুরুর আভাস দেখা দিলে নিকোলাস মাদুরো অর্থমন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলাম গণিতবিদ Nelson Merentes কে।


অর্থপাচার বা ব্ল্যাকমার্কেট মুলত রোগের লক্ষণ, কিন্তু মূল সমস্যা ভেনিজুয়েলার এই ফিক্সড কারেন্সি এক্সচেঞ্জ সিস্টেম, যাকে ফল্টি সিস্টেম হিসেবে চিহ্নিত করে এটা সংস্কার করার কথা ভেবেছিলেন তিনি। এই ফিক্সড এক্সচেঞ্জ সিস্টেমকে বাতিল করার জন্য কাজ শুরু করলে তখন তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়। সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলেন Jorge Giordani.
গিওর্দানি ছিলেন পলিটিক্যাল আইডিওলজি ড্রিভেন। পরিস্থিত না বুঝে বরং গোয়াড়ের মত হুগো সাভেজের ফিক্সড এক্সচেঞ্জরেটকে হুগো সাভেজের লেগাসি হিসেবে নিয়ে সেটাকেই রেখে দেয়া হয়। যুক্তি দেখানো হয়, ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট তুলে দিলে হাইপারইনফ্লেশন শুরু হবে।
তো Nelson merentes কে অর্থমন্ত্রনালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ২০১৪ সালে যদিও তাকে আবার ডেকে এনে ভেনিজুয়েলার সেন্ট্রাল ব্যাংকের দায়িত্ব দেয়া হয়।
কিন্তু এতোকাল যে bubble ফুলে ফেপে উঠেছে,
সেটা ততদিনে brust হয়েছে।
তেলের দামের পতন, এবং সেই পতন লাগাতার চলতে থাকলে ক্রমশ ভেনিজুয়েলার অবস্থা তলানিতে যেতে শুরু করে। সেইসাথে ভয়াবহ করাপশন, মেরিটোক্রেসির অভাব, এবং পরিকল্পনার অভাব, ভেনিজুয়েলাকে আজকের অবস্থানে এনেছে।
আইডিওলজি ড্রিভেন এই সিস্টেমে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বললে, সরকারের পলিসি নিয়ে সমালোচনা করলে সেটাকে দমন করা হয়, কখনো আবার মার্কিন দালাল ট্যাগ দেয়া হয়।
ফলাফল, এসব সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং সেগুলো আরো বাড়ে।
ভেনিজুয়েলার গল্পটা অনেকটা সেই ঘাসফড়িং আর পিপড়ার মতই। যা ছোটবেলা পড়েছিলাম।

পলিটিক্যাল মিসম্যানেজমেন্ট, দূরদর্শিতার অভাব, দূর্নীতি এবং মেরিটোক্রেসির অভাব একটি আপাত সম্পদশালী দেশকে তিলেতিলে কিভাবে শেষ করে দিতে পারে, তার ক্লাসিক উদাহরণ হয়ে থাকবে ভেনিজুয়েলা।

--
--
--
নানাবিধ রেফারেন্স উপরে লিখার ভেতরে ভেতরে প্রোভাইড করা হয়েছে।
(*** বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ এটিএম গোলাম কিবরিয়া ভাই এবং ক্ষিরোদ মোহন বোস স্যার )



Read More »

Tuesday, September 18, 2018

নর্থ কোরিয়ার স্পাই Ok Hwa


মহিলার নাম Kim Hyon-hui (aka "Ok Hwa")


ছবিতে তার মুখে ব্যান্ডেজ টাইপের কিছু একটা দেখতেছেন... শুনে অবাক হবেন হয়ত, তার মুখের ভেতর ছোট একটা ডিভাইজ ভরে এরপর মুখ শক্ত করে বেধে রাখা হয়েছে, যাতে সে নিজের জিভ চিবিয়ে রক্তক্ষরণে আত্মহত্যা করতে না পারে !

মহিলা নর্থ কোরিয়ান স্পাই এজেন্সি SSD -এর এজেন্ট... ১৯৭৩ সালে নর্থ কোরিয়ান এই এজেন্সি প্রতিষ্ঠিত হয় কেজিবি'র হুবহু অনুকরণে... এবং প্রকাশ্য সহায়তায়...

শুরু থেকেই এই এজেন্সি নানাবিধ কুখ্যাত কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। যেমন নানান সময়ে প্রায় এক ডজনের উপর জাপানি নাগরিক কিডন্যাপ করেছিলো জাস্ট নিজেদের স্পাইদের জাপানি শেখানোর জন্য !

এটা জাস্ট একটা উদাহরণ... এমন আরো অনেক কর্মকান্ড আছে।

তো ১৯৮৮ সালের কথা...
১৯৮৮ সালের সামার অলিম্পিক আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিলো দক্ষিণ কোরিয়া।
স্বাভাবিকভাবেই নর্থ কোরিয়ার ইগোতে লাগলো ব্যাপারটা। সাউথ কোরিয়াতে কিছুতেই অলিম্পিক আয়োজন করতে দেয়া যাবে না। যদি করতেই হয়, ইউনিফাইড কোরিয়াতে আয়োজন করতে হবে!
অর্থাৎ মামার বাড়ির আবদার...

তো এই অলিম্পিক ঠেকাতে হবে।
এখনকার নর্থ কোরিয়ার লিডার কিম জন উনের বাপ কিম জং লি তখন নর্থ কোরিয়ান সিক্রেট সার্ভিস ডিভিশনের দায়িত্ব। আর তার বাবা কিম এল স্যান তখনও নর্থ কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার।

অর্ডার এলো, সাউথ কোরিয়াকে ঝুকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। তাহলেই নিরাপত্তার অনুহাতে অলিম্পিক বয়কট করবে অধিকাংশ দেশ...

তো এই মহিলা এবং তার আরেকজন পুরুষ সহযোগীর উপর দায়িত্ব এলো, সাউথ কোরিয়া গামী একটা কোরিয়ান বিমান উড়িয়ে দেবার। ফলাফল, বাহরাইন থেকে সিউল যাবার পথে Korean Air Flight 858 বিমান বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হল। ১১৫ জন মারা গেল।

এই মহিলা এবং তার পুরুষ সহযোগি ফেক জাপানি পাসপোর্ট নিয়ে ঘুরতেন। ফেক আইডেন্টি তো ছিলোই। যারা স্পাই এজেন্সির কার্যক্রম সম্পর্কে হালকাপাতলা ধারণা রাখেন, তাদের এসব না বললেও চলবে।

প্রথমে গেলেন সার্বিয়া। সেখানে নিযুক্ত নর্থ কোরিয়ান স্পাইদের কাছ থেকে পেলেন বোমা... একটা রেডিওর ভেতর এই বোমা লুকানো ছিল। এরপর সেই বোমা নিয়ে বাহরাইন এলেন। বাহরাইন থেকে সিউলগামী KAF 858 বিমানের এক যাত্রীর সাথে সক্ষতা করে এরপর কোনোএক উপায়ে সেই রেডিও ঢুকিয়ে দিলেন লাগেজে। হয়ত কাউকে কনভিন্স করে বলেছিলো, কোনো আত্মীয় স্বজনের জন্য এটা ক্যারি করে নিয়ে যেতে।
ব্যস, এরপর বিমান আকাশে ওঠা মাত্র সবশেষ...

যাই হোক, ঘটনা ঘটানোর পর বাহরাইন থেকে মহিলা পালাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বাহরাইন পুলিশ মহিলাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় উনার সাথে যে পুরুষ সহযোগী ছিল, সে সাইনাইড খেয়ে আত্মহত্যা করে। সিগারেটের ভেতর সাইনাইড লুকানো ছিল।
আর এই মহিলা সাইনাইড ঠিকমত গিলতে পারেননি। পুলিশ বাধা দিয়েছিলো। এরপর মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে ট্রিটমেন্ট করা হয়। এবং দক্ষিন কোরিয়ান এজেন্সির লোকেরাও ততক্ষণে হাজির। মহিলাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় সাউথ কোরিয়াতে।
ছবিগুলো সাউথ কোরিয়াতে নিয়ে আসার সময় তোলা।
মহিলাকে ঘিরে আছে সাউথ কোরিয়ার এজেন্টরা।


মহিলার বিচার হয়। বিচারে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
যদিও সে বছরই দক্ষিন কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট তাকে ক্ষমা করে দেন। দিয়ে বলেন, 'Kim was merely a brainwashed victim of the real culprit, the North Korean government."

মহিলা পরবর্তীতে একটা বই লিখেছিলেন। নিজের আত্মজীবনী, নাম The Tears of My Soul
এই বই থেকে বিক্রি হওয়া সব টাকা পয়সা দান করেছিলেন ১১৫ জন নিহতের পরিবারগুলোকে।

মহিলার কেস যে দক্ষিন কোরিয়ান এজেন্ট হ্যান্ডেল করেছিলেন, তাকেই তিনি পরে বিয়ে করেন !
এরপর দুইটা সন্তানও হয়েছে তাদের।

শুরুতে বলেছিলেন, প্রায় ১৩ জন জাপানি নাগরিক কিডন্যাপ করেছিলো নর্থ কোরিয়ার গোয়েন্দা বাহিনী... ১৯৭৩ থেকে ৮৩ সালের মধ্যে।
এদের একজন ছিলেন Yaeko Taguchi
ছবির এই মহিলা যখন গোয়েন্দা ট্রেনিং প্রোগ্রামে নাম লিখান, তখন উনার প্রশিক্ষকদের ভেতর একজন ছিলেন Yaeko Taguchi

মাঝেমাঝে দুনিয়ার অনেককিছু শ্রেফ সিনেমার মত। বা সিনেমার চেয়েও বেশি সিনেম্যাটিক।

Read More »