Friday, October 5, 2018

Otto Skorzeny, from SS to Mossad


নাম Otto Skorzeny (অটো স্কোর্জেনি)
এই লোক ছিলেন হিটলারের পছন্দের হিটম্যান এবং নাৎসি জার্মানির সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব Knight's Cross of the Iron Cross পাওয়া অফিসার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশকিছু দূর্ধর্ষ অভিযানে অংশ নেয়া এই Waffen-SS হিটম্যান ঠিক কিভাবে জীবনের শেষভাগে এসে ইসরাইলের স্পাই এজেন্সি মোসাদের পেইড এস্যাসিন হয়ে গেল,
অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রি রুপান্তরের সেই কাহিনী এবার বলবো।

সংক্ষেপে তার জীবন কাহিনী আগে বলি। রীতিমত উপন্যাস...

জন্ম হিটলারের মতই অস্ট্রিয়াতে। ১৯০৮ সালে।
পূর্ব পুরুষ ছিল পোলিশ। একারণে নামেও পোলিশ ছাপ।
মিলিটারি পরিবারেই জন্ম।
জার্মান ছাড়াও ফ্লুয়েন্ট ফ্রেন্স এবং ইংলিশ বলতে পারতেন।
১৯৩১ সালে তেইশ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার নাৎসি পার্টিতে। তখন জার্মানিতেও নাৎসিরা শক্তিশালি হয়ে উঠেছে। দুই বছর পর, ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে নাৎসিরা ক্ষমতায় চলে আসে। ফলাফল, পাশের দেশ অস্ট্রিয়াতেও জাত ভাই অস্ট্রিয়ান নাৎসিরা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। ১৯৩৮ সালে হিটলার অস্ট্রিয়া আর জার্মানিকে একীভূত করে।
অটো স্কোর্জেনি তখন জার্মানির বিমান বাহিনীতে যোগ দেবার চেষ্টা করেন।
কিন্তু তার উচ্চতা ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি।
এতো বিশাল শরীর, তার উপর বয়স হয়ে গিয়েছে ত্রিশের বেশি। এজন্য বিমান বাহিনী থেকে তাকে রিফিউজ করা হয়। নিয়োগ দেয়া হয় হিটলারের পার্সোন্যাল বডিগার্ডের SS ডিভিশনে। 1st SS Panzer Division Leibstandarte SS Adolf Hitler
যা অনেকটা আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল সিক্রেট সার্ভিস বা আমাদের বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টসিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট বা পিজিআরের মত ডিভিশন। ব্যাপারটা অটো স্কোর্জেনির জন্য ছিল অনেক বড় সম্মানের।
আফটার অল, হিটলারের কাছের লোক হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয় তার এসময়ে।


১৯৪০ সালের জুলাই মাস। স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমন চালান হিটলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাটকীয় মোড় নেয়। জার্মান ওয়ারমেশিন হামলে পড়ে বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভুমিতে।
হিটলারের সবচেয়ে কুখ্যাত ফোর্স ছিল Schutzstaffel বা SS
খোদ হেনরিক হিমলার ছিল এটার দায়িত্বে।
নাৎসি জার্মানির সবচেয়ে পাওয়ারফুল এই ফোর্সই ইহুদী গনহত্যা চালানোর ক্ষেত্রে মূখ্য ভুমিকা পালন করে। Architect of the Final Solution, হেনরিক হিমলার ছিলেন এর প্রধান। এডল্ট আইকম্যানও ছিলেন SS কর্মকর্তা।
ইহুদী গনহত্যার জন্য যেসব বিশাল বিশাল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ছিল ইউরোপ জুড়ে, এগুলো পরিচালনা করতো SS।

SS নামটি ছিল এক আতঙ্ক।
অনেকেই Gestapo বাহিনীর নাম শুনেছেন, এই গেস্টেপো ছিল SS এর সাবডিভিশন। এটা ছিল কেজিবি বা সিআইএ টাইপের গোয়েন্দা এজেন্সি।
আবার এই SS এর আরেকটা সাবডিভিশন ছিল, যার নাম Waffen-SS, দূর্ধর্ষ স্পেশ্যাল ফোর্স। এটা অনেকটা হালআমলের মার্কিন ডেলটা ফোর্স বা রাশিয়ান আর্মির স্পেৎনাজের সমতূল্য।
অটো স্কোর্জেনি যোগ দিলেন Waffen-SS ডিভিশনে। ইস্টার্ন ফ্রন্ট, অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুদ্ধে মাঠে নামলেন। প্রায় দুই বছর ইস্টার্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ করলেন তিনি। ১৯৪২ সালে মস্কো'র খুব নিকটে পৌচ্ছে গিয়েছিল নাৎসি বাহিনী। মস্কো দখলের সুযোগ তখন হাতছানি দিচ্ছে। জার্মানরা মস্কো দখলের ছকও কষে ফেলেছে। মস্কো দখলের পর কি কি করতে হবে, কোন ডিভিশনের কি কাজ, এসব ছক কষা শুরু হয়েছে।
October 1941 and January 1942 পর্যন্ত চলেছিল Battle of Moscow, যাতে ফলাফল ছিলStrategic Soviet victory due to German operational and tactical failure.

অটো স্কোর্জেনির মস্কো দখলের স্বপ্ন পূরণ হল না। ১৯৪২ সালে সোভিয়েত গোলার আঘাতে আহত হলেন তিনি। ফিরে এলেন বার্লিনে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলেন। যুদ্ধের পারফর্মেন্সের জন্য হিটলার তাকে আইরন ক্রস সম্মাননা দিলেন।
এরপর তাকে নিযুক্ত করা হল Reich Main Security Office, RHSA ডিভিশনে।
এটাও SS এর আরেকটা সাবডিভিশন। কাজ হল কোর্ভার্ট অপারেশন। স্যাবোটাজ, সাবভার্সন ও স্পেশ্যাল ব্ল্যাক অপস অপারেশন।

তাকে পাঠানো হল ইরানে। স্পেশ্যাল মিশনে। নাম Operation François
মিশন হল, ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ইরানে গেরিলা তৎপরতা চালানো।
ইরানের সমুদ্র বন্দর এবং ইরানের ভেতর দিয়ে যাওয়া Trans-Iranian Railway ব্যবহার করে ব্রিটিশ ও আমেরিকানরা সোভিয়েত ইউনিয়নে রসদ পাঠাচ্ছিলো। অটো স্কোর্জেনির মিশন ছিল এই রেল লাইন ও রসদের সাপ্লাইরুট ধ্বংস করা। অটো স্কোর্জেনি ইরানের স্থানীয় রেবলদের টাকা পয়সা দিয়ে, অস্ত্রসস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের বিরুদ্ধে অপারেশনে পাঠাতে শুরু করলেন।



মিত্র বাহিনীর কাছেও ইতিমধ্যে অটো স্কোর্জেনির নাম বেশ পরিচিত। মিত্র বাহিনীর গোয়েন্দারাও স্কোর্জেনির কর্মকান্ড এবং তৎপরতার উপর নজরদারি শুরু করেছিল। অটো স্কোর্জেনি তখন নিজেও মিত্র বাহিনীর হিটলিস্টে।

এদিকে ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসের ঘটনা।
ইতালি তখন হারতে বসেছে। মিত্র বাহিনী সিসিলি দখলে নিয়েছে। ইতালির রোমে তীব্র বোমাবর্ষন করেছে মিত্র বাহিনীর বোমারু বিমান।
যখন মুসলিনি যুদ্ধে জিতছিলেন, তখন তার সমর্থক ও ভক্তের অভাব ছিল না। কিন্তু এবার যখন হারতে বসেছেন, তখন তার বিরোধিতাকারীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করলো।
ফলাফল, মুসলিনির রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদী দলের ফ্যাসিস্ট কাউন্সিল তার বিরুদ্ধে পলিটিক্যাল ক্যু করলো। ইতালির রাজার নির্দেশে মুসলিনিকে বন্দী করা হল এবং তার জায়গায় Marshal Pietro Badoglio নামের আর্মির জেনারেলকে দায়িত্ব দেয়া হল।
মুসলিনিকে বন্দী করে রাখা হল Apennine পাহাড়ের উপর Campo Imperatore নামের একটি হোটেলে।
প্রায় ২০০ জন কমান্ডো গার্ড তাকে ঘিরে রাখলো যাতে পালাতে না পারে বা তাকে কেউ উদ্ধার করতে না পারে।

হিটলার এবার মুসলিনিকে উদ্ধার করার দায়িত্ব দিলেন অটো স্কোর্জেনির উপর।
ফলাফল, সেপ্টেম্বর মাসের ১২ তারিখে এক ডেয়ার ডেভিল উদ্ধার অভিযান চালালেন স্কোর্জেনি।
মাত্র ১৬ জন SS কমান্ডো প্যারাট্রুপার সাথে নিয়ে গ্লাইডারে করে চলে গেলেন এপেনাইন পাহাড়ের উপর সেই হোটেলে। সাথে নিয়ে গেলেন একজন মুসলিনিপন্থি ইতালিয়ান আর্মি কর্মকর্তাকেও।
SS কমান্ডো'দের দেখে ইতালিয়ান গার্ডেরা তেমন কোনো প্রতিরোধই করেনি।
উদ্ধার অভিযান দ্রুতই সম্পন্ন হয়।
মুসলিনিকে উদ্ধার করা হয় এবং নিয়ে যাওয়া হয় জার্মানিতে। সোজা হিটলারের কাছে।


এই ছবিটা সেই উদ্ধার অভিযানের পর তোলা।
ছবিতে বাইনাকুলার গলায় ঝোলানো অটো স্কোর্জেনি এবং সাথে কালো কোর্ট পরা মুসলিনি।


অটো স্কোর্জেনি এই মিশনের সফলতার জন্য হিটলারের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হন। তাকে প্রমোশন দেয়া হয়।


১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে,
তেহরানে অনুষ্ঠিত হয় মিত্র বাহিনীর তিন পরাশক্তির তিন নেতার কনফারেন্স। যা তেহরান কনফারেন্স হিসেবে পরিচিত। তাতে যোগ দিতে আসবেন রাশিয়ার জোসেফ স্তালিন, আমেরিকার রুজভেল্ট আর ব্রিটেনের চার্চিল।
মিটিং অফ দা বিগ থ্রি।
হিটলার দেখলেন, এটা একটা বিশাল সুযোগ। তিন নেতাকে এক সাথে পাওয়া যাবে। বোমা মেরে উড়িয়ে দিলে সব খতম।
অটো স্কোর্জেনি এবার এই মিশনের দায়িত্ব পেলেন। নাম Operation Long Jump
এই মিশন যদি সফল হয়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাটকীয় মোড় নেবে।
স্কোর্জেনির টিম এই মিশনের জন্য তেহরান কনফারেন্সের সকল সিডিউল, নেতাদের মিটিং'এর সিডিউল, নেতারা কোথায় থাকবেন, কোন পথ দিয়ে চলাচল করবেন, সকল তথ্য কালেক্ট করেছিলেন।
কিন্তু বাপেরও বাপ আছে। অটো স্কোর্জেনি যখন 'তিন নেতা' খুন করার জন্য ছক কষছিলেন, সোভিয়েত গোয়েন্দা বাহিনী NKVD (Predecessor of the Famous KGB) তখন তার উপর কাউন্টার Espionage মিশন চালাচ্ছিলো।
ফলাফল, অটো স্কোর্জেনি'র 'Operation Long Jump' এর সকল ছক আগে থেকেই সোভিয়েতরা জেনে গিয়েছিলো এবং এই মিশন ভেস্তে দিয়েছিল। মিটিং অফ দা বিগ থ্রি বেশ সফলভাবেই সমাপ্ত হয়।

(** Operation Long Jump নিয়ে পরবর্তীতে আমি একটি ডিটেইলস ব্লগ লিখবো। )

সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিনগ্রাডের যুদ্ধে হার হিটলারের জয়রথের লাগাম টেনে দিয়েছিল। হিটলারের পতনের শুরুও হয় সেখান থেকেই। স্তালিনগ্রাডের পর হিটলারকে আর কখনোই অজেয় মনে হয়নি।
১৯৪৪ সালের দিকে সোভিয়েতরাই আক্রমনে, আর হিটলার তখন কন্টেইনমেন্টে ব্যস্ত।

১৯৪৪ সালের অক্টোবরের দিকে অটো স্কোর্জেনিকে হিটলার পাঠালেন হাংগেরিতে। নতুন অপারেশনে। নাম Operation Panzerfaust

হাংগেরি শুরু থেকেই হিটলারের পক্ষে ছিল। লক্ষাধিক হাংগেরিয়ান সেনা বলকান রিজিওনে এক্সিস পাওয়ারের হয়ে যুদ্ধ করছিল। হিটলারের সাথে ত্রিশের দশক থেকেই হাংগেরির ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। হিটলারের যুদ্ধে হাংগেরি লাভবান হয়েছিলো নানানভাবে। কিন্তু ১৯৪৪ সালের দিকে যখন যুদ্ধের গতিপথ বদলাতে শুরু করে, তখন হাংগেরির শাসক গোপনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের সাথে যোগাযোগ শুরু করে। হিটলার এই বিশ্বাস ঘাতকতার খবর পান। হাংগেরি যদি মিত্র বাহিনীর সাথে যোগ দেয়, তাহলে এক্সিস পাওয়ার প্রায় মিলিয়ন খানেক সেনা হারাবে। এই ভয় হিটলারের ছিল। সুতরাং যে করেই হোক, হাংগেরিকে নিজেদের পক্ষে রাখতে হবে।
ফলাফল, হিটলার সিদ্ধান্ত নেন হ্যাংগেরির শাসক Admiral Miklós Horthy কে সরিয়ে দেবার। এজন্যে পাঠানো হয় অটো স্কোর্জেনি'কে।
অটো স্কোর্জেনির দল গিয়ে Admiral Miklós Horthy এর ছেলেকে কিডন্যাপ করে।
এবার শর্ত হল, নিজের ছেলের জীবন বাঁচাতে চাইলে পদত্যাগ কর।
ফলাফল, Miklós Horthy পদত্যাগ করেন এবং তার জায়গায় Ferenc Szálasi নামের হার্ডকোর ফ্যানাটিক পাপেট বসিয়ে দেয়া হয়। এই লোক ক্ষমতায় বসেই ১০ থেকে ১৫ হাজার ইহুদী খুন করেছিলেন।


এরপর অটো স্কোর্জেনিকে এক ভয়াবহ মিশনে পাঠান হিটলার।
সাল ১৯৪৪ এর শেষের দিকে। শুরু হয়ে গেছে বেলজিয়ামের যুদ্ধ। মার্কিনীদের বিপক্ষে চলছে Battle of the Bulge
এই যুদ্ধ ছিল ঠিক স্তালিনগার্ডের মতই আরো একটি ডিসাইসিভ ওয়ার।
দুই পক্ষেরই লাখের কাছাকাছি সেনা হতাহত হয় এই যুদ্ধে।



স্কোর্জেনি প্রায় দুই ডজনের মত জার্মান সেনা নিয়ে একটা অপারেশনে নামেন। নাম Operation Greif
আগেই বলেছিলাম, স্কোর্জেনি ফ্লুয়েন্ট ইংলিশ বলতে পারতেন। দুই ডজন জার্মান সেনা তিনি কালেক্ট করলেন যারা ভালো ইংলিশ বলতে পারে। এরপর মার্কিন সেনাদের ড্রেস পরে আগে ইতিপূর্বে মার্কিন সেনাদের কাছ থেকে দখল করা গাড়ি নিয়ে করে স্কোর্জেনির দল মার্কিন ডিফেন্স লাইনে প্রবেশ করেন। মার্কিন সেনা সেজে।
উদ্দেশ্য, স্যাবোট্যাজ করা।
কিন্তু এই মিশন বিফলে যায়। স্কোর্জেনি পালিয়ে যেতে সফল হলেও তার হ্যান্ডপিক জার্মান সেনাদের অনেকেই ধরা পড়েছিলেন। Hague Convention of 1907 অনুসারে প্রতিপক্ষের সেনাদের ড্রেস পরার অপরাধ বেশ গুরুত্বর। এরুপ কাজ কেউ করলে তাদের স্পাই হিসেবে ট্রিট করা হবে এবং সোজা ফাঁসি। স্কোর্জেনি এসব জানতেন, এবং জেনেশুনেই এতবড় রিক্স নিয়েছিলেন।
স্কোর্জেনির টিমের আটকে পড়া সদস্যদের ইন্ট্রোগেট করে আমেরিকানরা জানতে পারে, বছরের শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার যখন ক্রিসমাসে প্যারিস ভ্রমনে আসবেন, তখন তাকে খুন করার একটি প্লট ইতিমধ্যেই স্কোর্জেনি তৈরি করে রেখেছেন।

ফলাফল, গোটা প্যারিস জুড়েই মার্কিনীরা স্কোর্জেনির পোস্টার লাগিয়ে ম্যানহান্ট শুরু করে। অর্থাৎ এই লোক'কে প্যারিসে দ্যাখা মাত্র খবর দেন। ধরিয়ে দিলে পুরস্কার।

যাই হোক, আর তেমন বেশি প্যারা নিতে হয়নি মিত্র বাহিনীর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কিছুদিন পরই শেষ হয়ে যায়। ১৯৪৫ সালের মে মাসে জার্মানি আত্মসমর্পন করে। স্কোর্জেনি জেলে যান।
দুই বছর জেলে ছিলেন। ১৯৪৭ সালে তার বিচার শুরু হয়।


কিন্তু এবার শুরু হয় স্কোর্জেনির জীবনের নতুন চ্যাপ্টার।
জার্মানির ব্যাভেরিয়াতে বিচার শুরু হয়েছিল স্কোর্জেনির। কিন্তু...

স্কোর্জেনি জেল থেকে পালিয়ে যান !
ঘটনার বর্ণনা অনুসারে,
১৯৪৮ সালের জুলাই মাসে তিনজন সাবেক SS অফিসার মার্কিনীদের মিলিটারি পুলিশের ইউনিফর্ম পরে স্কোর্জেনিকে জেল আসেন।
ছদ্মবেশি এই সাবেক জার্মান কর্মকর্তারা স্কোর্জেনিয়ে নুরেনবার্গে নেবার নাম করে জেল থেকে বের করে নিয়ে যান। ব্যস, এই হল উদ্ধার অভিযান।
এতো সহজ?

না, এখানে টুইস্ট আছে।
ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে স্নায়ু যুদ্ধ। কোল্ড ওয়ার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্র দেশ আমেরিকা আর রাশিয়া এবার শুরু করেছে ক্ষমতার লড়াই।
আর এই লড়াই এর মোক্ষম অস্ত্র হবে গোয়েন্দা বাহিনীগুলো।

জার্মানির অর্ধেক পশ্চিমাদের দখলে। আবার বাকি অর্ধেক রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের লৌহ যবনিকায়।
মার্কিন নিয়ন্ত্রিত জার্মানিতে সোভিয়েত গোয়েন্দা কার্যক্রমের কাউন্টার দিতে হবে। এবং সেটা করতে CIA নিযুক্ত করেছে আটক সাবেক জার্মান সেনা অফিসার ও গোয়েন্দা সদস্যদের। আফটার অল, দেশটা তারাই সবচেয়ে ভালো চেনে। জানে। বোঝে। সুতরাং এদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরে না ফেলে এদের দিয়েই সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে চালানো হবে গোয়েন্দা কার্য্যক্রম। আর তেমনটি করার জন্য CIA ফান্ডিংএ পশ্চিম জার্মানিতে গড়ে ওঠে একটি গোয়েন্দা বাহিনী তথা ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি। যার নাম Gehlen Organization or Gehlen Org

১৯৪৬ সালে এই এজেন্সি গোপনে গড়ে তুলেছিল আমেরিকা। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার জন্য। Hartmann Lauterbacher (former deputy head of the Hitler Youth) এই এজেন্সির প্রথম দিকের সদস্য ছিলেন। নাৎসি জার্মানির সেনা অফিসারদের দিয়ে শুরু করা হয় এই এজেন্সি। ১৯৪৮ সালে জেল ব্রেকের মাধ্যমে অটো স্কোর্জেনিকে এরাই মুক্ত করে। আসলে আমেরিকার ইশারা ছিল এবং সিআইএ গোটা ব্যাপারই জানতো। তারা বিষয়টি না দেখার ভান করে যায়।

এই জার্মান ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি Gehlen Organization or Gehlen Org পরবর্তীতে নাম পাল্টে হয়ে যায়Bundesnachrichtendienst তথা BND
যা আজও আছে এবং আজ এটি জার্মানির প্রধান ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এবং দুনিয়ার সেরা ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির একটা।

শুরু হল স্কোর্জেনির নতুন জীবন। তাকে নতুন পাসপোর্ট দেয়া হয়। পাঠিয়ে দেয়া হয় স্পেনে। সেখানে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম খোলা হয় তার নামে। অর্থাৎ একটা নতুন জীবন, নতুন কভার স্টোরি দেয়া হয়।

১৯৫২ সাল।
মিশরে মার্কিন মদদে জেনারেল Mohammed Naguib ক্ষমতায় আসেন।
ওদিকে হিটলারের সময়কার নাৎসি মিলিটারি অফিসার জেনারেল Reinhard Gehlen এতোদিকে চাকরি করেন সিআইএ'র হয়ে। যার কিনা গনহত্যার দায়ে ফাঁসি হবার কথা, তারাই এবার মার্কিনী ও ব্রিটিশদের হয়ে রিক্রুটেড !!
তো এই জেনারেল জেনারেল Reinhard Gehlen একইসাথে সেই নতুন জার্মান গোয়েন্দা বাহিনী Gehlen Org এর হয়েও কাজ করেন। তিনিই অটো স্কোর্জেনির হ্যান্ডেলার।
অটো স্কোর্জেনি'কে মিশরের প্রেসিডেন্টের মিলিটারি এডভাইজার হিসেবে পাঠানো হয়। স্কোর্জেনি মিশরে গিয়ে সাবেক SS অফিসারদের রিক্রুট করে একটা টিম গঠন করেন যা মিশরীয় সেনাদের প্রশিক্ষণ দিতো। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, এই টিমে সাবেক নাৎসি জেনারেল Wilhelm Fahrmbacher, Oskar Munzel, Leopold Gleim, Joachim Daemling এর মত অফিসার ছিল।

নামগুলো হয়ত পরিচিত না। কিন্তু একটা একটা করে যদি পরিচয় দেই, তাহলে অবাকই হবেন।
Wilhelm Fahrmbacher এবং Oskar Munzel ছিল হিটলারের আইরন ক্রস পাওয়া সেনা কর্মকর্তা।
Leopold Gleim ছিলে Gestapo বাহিনীর Jewish Affairs in Poland শাখার দায়িত্বে। অর্থাৎ বুঝতেই পারতেছেন সে একজন mass Murderer
Joachim Daemling ছিলেন গেস্টাপোর আরেক কর্মকর্তা এবং শাখা প্রধান।
এই লোকগুলোর যেখানে ফাঁসি হবার কথা, সেখানে এরা বেশ ভালো লাইফ লিড করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর।
এদেরকে দিয়েই মিশরীয় নেতারা আরব ভলেনটিয়ারদের কমান্ডো ট্রেনিং দিয়েছিলো সুয়েজ ক্যানাল দখলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, এসব ট্রেনিং প্রোগ্রামে মিশরের বাইরে থেকে আসা আরব ভলেনটিয়ারেরা অংশ নিতো। আফটার অল, তখন গোটা আরব বিশ্বে প্যান-আরব সেন্টিমেন্ট ছড়িয়ে পড়েছিলো। ইয়াসির আরাফাত এই ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন।

মিশরে পরবর্তীতে গামাল আব্দেল নাসের ক্ষমতায় এলেও অটো স্কোর্জেনি মিলিটারি এডভাইজার হিসেবে দায়িত্ব বহাল ছিলেন। এসময়ে স্পেন এবং আর্জেন্টিনাতেও তাকে পাঠানো হয়েছিলো। আর্জেন্টিনার এন্টি সেমাইট প্রেসিডেন্ট জুয়ান পেরণের এডভাইজার এবং তার স্ত্রী ইভা পেরনের বডিগার্ড হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেছিলেন অটো স্কোর্জেনি।

এসময়ে মার্টিন বোর্মান সহ বেশকিছু পলাতক নাৎসি নেতা ল্যাটিন আমেরিকাতে আত্মগোপনে ছিল। আর্জেন্টিনা ছিল পলাতন নাৎসি নেতাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। ফোর্থ রাইট তৈরির একটা নতুন প্রচেষ্টাও এসময় চালানো হয়েছিলো এসব পলাতক নাৎসি এবং ল্যাটিন নাৎসি সমর্থকদের তরফে।
সেসব ভিন্ন আলোচনা।

ওদিকে ইতিমধ্যে পৃথিবী বদলে গেছে। নতুন রাষ্ট্র ইসরাইলের উত্থান হয়েছে। ইসরাইলিরা গোটা বিশ্বে পলাতক নাৎসিদের খুঁজে ফিরছে।
১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনাতে ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা হলোকস্টের অন্যতম রুপকার এডলফ আইকম্যানকে মোসাদ কিডন্যাপ করে ইসরাইলে নিয়ে আসে। শো ট্রায়ালে তার বিচার হয় এবং ফাঁসি দেয়া হয়।
পলাতক প্রতিটি নাৎসি নেতার মনে এই মোসাদের প্যারানোয়া সবসময় ছিল।
আমেরিকা বা ব্রিটেনের কাছ থেকে ছাড় পেলেও মোসাদের কাছ থেকে ছাড় পাওয়া এতো সহজ ছিল না অনেকের জন্যেই।
এডলফ আইকম্যানের কিডন্যাপের ঘটনার পর পলাতক নাৎসিদের ভেতর প্যারানোয়া আরো বেড়ে যায়।
এই প্যারানোয়া খোদ অটো স্কোর্জেনির মত বাঘা খেলোয়াড়ের মনেও ছিল।

গামাল আব্দেল নাসের মিশরে ক্ষমতায় আসার পর প্যান আরবিক পলিটিক্স মধ্যপ্রাচ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ওদিকে ইসরাইলের সাথে একবার যুদ্ধও হয়ে যায় ১৯৫৬ সালে। সেই যুদ্ধবিরতি কার্য্যকর হলেও নাসের বুঝে গিয়েছিলেন ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে আবার আসন্ন।
নাসের শুরু করেছিলেন মিসাইল পোগ্রাম। Factory 333 নামের একটি ফ্যাসিলিটে মিসাইল পোগ্রাম চালানো হচ্ছিলো।
এর আগে বলে রাখি, Peenemünde Army Research Center নামের এক বিশাল মিলিটারি ফ্যাসিলিটি ১৯৩৭ সালে হিটলার তৈরি করেছিল। সেখানে নাৎসি বাহিনীর জন্য অস্ত্রসস্ত্রের গবেষনা করা হইতো। Wernher von Braun, আজ যাকে আমেরিকা the father of rocket technology and space science বলে সম্মান করে, সেই ভন ব্রাউন ছিলেন হিটলারের অন্যতম সেলিব্রিটি বিজ্ঞানী। তিনি V1 এবং V2 রকেট বানিয়েছিলেন যা দিয়ে লন্ডনে বোমাবাজি করেছিলো হিটলার।
এই ভন ব্রাউনের রকেট ফ্যাক্টরিতে ৭০ হাজার ইহদি রাতদিন জীবনের বিনিময়ে খাটতো। বহু মানুষ মারা গেছে এই ফোর্স লেবরে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর আমেরিকানরা ভালো ভালো অনেক নাৎসি সাইন্টিস্টদের নিয়ে যায়। কাজে লাগায়। হাইজেনবার্গ কাজ করতো হিটলারের নিউক প্রোজেক্টে। ভাগ্য ভালো যে হাইজেনবার্গ সফল হয়নি। ওপেনহাইমারের জায়গায় যদি হাইজেনবার্গ সফল হইতো, তাহলে জার্মানি জিতে যেতো যুদ্ধে। যুদ্ধের পর অনেককিছুই ধুয়ে ফেলা সম্ভব। যেমন হলোকস্টের অন্যতম কুসিলব এডলফ আইকম্যানও ট্রায়ালে দাঁড়িয়ে বলেছিলো, আমি তো এসব খুন খারাবি করতে চাইনি। আমি কেবল একজন সেনা কর্মকর্তা। আমি খালি হিটলারের আদেশ পালন করেছি।
তো এই লজিক দেখানো খুব সহজ।
আজকাল অনেকের কথা শুনলে মনে হয়, হিটলার একাই এসে ভোলাভালা জার্মানদের হ্যামিলিনের বাঁশি বাজিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে অকাম কুকাম করিয়েছে। জার্মানরা বুঝতে পারেনি। অথচ এটা বোঝে না, প্রতিটি নেতা সময় এবং সমাজের প্রতিচ্ছবি। আপনি আজকের বাস্তবতায় হিটলারকে চিন্তা করলে হবে না। জার্মানিদের ভেতর যে ভয়াবহ এন্টি সেমিটিজম ছিল, সেটা অস্বীকার যদি করেন, তাহলে ভুল করবেন। হিটলার সেটাকে এক্সপ্লোয়েট করেছিলো। জার্মানদের ভোটেই সে ক্ষমতায় এসেছিলো। আজ আপনি হাইজেনবার্গের ভক্তি করতেছেন। কিন্তু হাইজেনবার্গ যদি হিটলারের নিউক প্রোজেক্টে সফল হইতো, তাহলে আপনি হাইজেনবার্গকে অনিশ্চয়তা সূত্রের জন্য নয়, বরং মনে রাখতেন পারমানবিক বোমা আবিষ্কারের জন্য। হাইজেনবার্গ যেমন অতীতের ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে পেরেছিলেন, ভন ব্রাউনও পেরেছিলো। অন্যতম সেলিব্রিটি নাৎসি বিজ্ঞানী বা V1-2 রকেটের জনক নয়, মানুষ বরং তাকে মনে রাখে এখন নাসার বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে।

যাই হোক, ভিন্ন আলোচনায় চলে যাচ্ছি। ভন ব্রাউনের টিমের অন্যতম বিজ্ঞানী ছিলেন Heinz Krug, যাকে গালাম আব্দেল নাসের নিয়োগ দিয়েছিলেন। Factory 333 তে Heinz Krug ছাড়াও আরো অনেক নাৎসি বিজ্ঞানী কাজ শুরু করেন নাসেরের জন্য মিসাইল বানাতে। এমন মিসাইল, যাতে রেডিওএক্টিভ ওয়াস্ট প্রোডাক্ট ইউজ করে ইসরাইলে আঘাত হানা সম্ভব হবে।



সুতরাং, Heinz Krug সহ Factory 333 তে যেসব গুরুত্বপূর্ণ নাৎসি বিজ্ঞানী কাজ করেন, তাদের মারতে হবে। মোসাদ ডিসিশন নিয়ে নিয়েছে ইতিমধ্যেই।
আগেই বলেছিলাম, অটো স্কোর্জেনি চাকরি করতেন গালাম আব্দেল নাসেরের চিফ মিলিটারি এডভাইজার হিসেবে। সুতরাং মোসাদ এবার তাকে অফার দিলো। হিসাবটা সহজ। মোসাদের হয়ে কাজ করো, Heinz Krug সহ আরো যত বিজ্ঞানী মিশরে মিলিটারি প্রোটেকশনে মিসাইল পোগ্রামে কর্মরত আছে, তাদের মেরে দাও। বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা পাবা এবং মোসাদের হিট লিস্ট থেকে তোমার নাম কেটে দেবো। আর যদি অফার কবুল না করো, তাহলে ভিন্ন কথা। আজ হোক কাল হোক, আমরা ঠিকই একভাবে না একভাবে Heinz Krug সহ টার্গেটেড বিজ্ঞানীদের ঠিকই মারবো, সাথে তোমাকেও ছাড়বো না। একদিন না একদিন তোমাকে বাগে পাবো। আর সেদিন শেষ। এখন চিন্তা করো, কি করবা।
আগেই বলেছিলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসিরা মোসাদের প্যারানোয়ায় থাকতো। সবসময় একটা আতঙ্ক তাদের তাড়া করতো। অটো স্কোর্জেনি দেখলো, অফারটা এবার কবুল করা যেতে পারে। Yitzhak Shamir, যিনি পরবর্তীতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তিনি তখন মোসাদের প্রধান। Yitzhak Shamir নির্দেশ দিলেন Operation Damocles বাস্তবায়ন করার।
মিশনের উদ্দেশ্য, টার্গেটেড বিজ্ঞানীগুলোকে হত্যা করো। যেভাবেই হোক।
অটো স্কোর্জেনিকে রিক্রুট করেছিলেন Peter Zvi Malkin আর অটো স্কোর্জেনি রিক্রুট হবার পর তার হ্যান্ডেলারের দায়িত্ব পালন করেন Rafi Eitan

ছবিঃ পিটার জাভি মাল্কিন


ছবিঃ রাফি আইতান

এই পিটার জাভি মাল্কিন আর রাফি আইতান ছিলেন ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনা থেকে নাৎসি SS কর্মকর্তা Adolf Eichemann কে কিডন্যাপ করে ইসরাইলে নিয়ে আসার চাঞ্চল্যকর অভিযানটি মোসাদ টিমের অন্যতম সদস্য।

টার্গেটেড নাৎসি বিজ্ঞানীদের খুন করা হয়েছিল অভিনব কায়দায়। একধরণের বোমা পার্সেলে ভরে পাঠানো হত। পার্সেল খোলা মাত্র বিস্কোরণ।
সবচেয়ে বড় টার্গেট Heinz Krug কে নিজ হাতে মেরেছিলো অটো স্কোর্জানি।
খুন করে তার শরীর এসিড দিয়ে নষ্ট করে এরপর অবশিষ্ট যা ছিল, পুতে ফেলা হয়েছিলো।
এছাড়া ইউরোপে আরো যেসব বিজ্ঞানী কাজ করেছে পরবর্তীতে আরবদের হয়ে, তাদেরই মোসাদ মেরে ফেলেছে।

হোক সে জার্মান বা অন্য যেকোনো দেশের বিজ্ঞানী।
যেমন কানাডার Gerald Bull নামের একজন ইঞ্জিনিয়ার কাজ করতেন সাদ্দাম হোসেনের লংরেঞ্জ সুপারগান তৈরির প্রোজেক্টে। ইসরাইলিরা যখনই দেখলো, এই সুপার কামান দিয়ে ইসরাইলে আঘাত হানা সম্ভব হবে, তখনই এই কানাডিয়ান ভদ্রলোক'কে খুন করলো।


যাই হোক,
১৯৭৫ সালে মারা যান অটো স্কোর্জেনি।
ক্যান্সারে।
মরার পর তার দেহাবশেষ পাঠানো হয় ভিয়েনার। সেখানে তার ফিউনারেল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মোসাদের এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন। এবং সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, সেই ফিউনারেলে স্কোর্জেনির সাবেক জার্মান নাৎসি কলীগেরা উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন তাদের স্ত্রী পুত্ররা।
সেই ফিউনারেলে শেষবারের মত নাৎসিদের সেই কুখ্যাত one-armed Nazi salute দিয়ে জার্মান কলীগরা তাকে শেষ সম্মান জানিয়েছিলেন।

Read More »

Thursday, September 20, 2018

Columbian Exchange




ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত ইউরোপ বা এশিয়ার বা আফ্রিকার মানুষ ভুট্টা কি জিনিস,
খায় নাকি মাথায় দেয় !!
সেটা জানতো না...

ভুট্টা ছিল আমেরিকা উপমহাদেশের আদি অধিবাসীদের অন্যতম প্রধান খাদ্য...
কেবল ভুট্টা নয়...
সুন্দর সুন্দর লাল লাল টমেটো খেতে কত ভালোই না লাগে... এই টমেটো আমেরিকা উপমহাদেশ (উত্তর+দক্ষিন আমেরিকা) আবিষ্কারের পর এসেছে...
প্রথমে লাল লাল টমেটো দেখে ইউরোপিয়ানরা ভেবেছিলো, হয়ত বিষাক্ত কিছু হবে...

যারা 'বাদশাহনামদার' পড়েছেন, তারা মরিচের ব্যাপারটা জানেন। কাচা মরিচও এসেছে আমেরিকা উপমহাদেশ থেকে। মোঘল সম্রাট বাবর বা মঙ্গল সম্রাট চেঙ্গিস খানও মরিচ খেতে পারেননি। তাদের রান্নাবান্না হইতো গোল মরিচ দিয়ে...

আলু... এই আলু না হলে আমাদের এখন চলেই না। অথচ এই আলু ছিল ইনকা'দের খাবার... দক্ষিন আমেরিকা থেকে কেবল কচুরি পানা নয়, আলুও এসেছে...
পিন্যাট, মিষ্টি কুমড়া, সিম (সিমের বিচি অনেক সুস্বাদু) ... এমনকি চলকেটের cacao beans ...
এসব আমরা পেয়েছি আমেরিকা আবিষ্কারের পর...
"আমরা" বলতে বোঝাচ্ছি, Old World অর্থাৎ ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, এসব মহাদেশের মানুষদের...

ওদিকে আমেরিকা উপমহাদেশের কোথাও তখনও গরু, ছাগল, ঘোড়া, শুকর, ভেড়া, এসবকিছু ডমেস্টিকেশন করা হয়নি...
অবশ্য হবে কিভাবে...
আমেরিকাতে ঘোড়া ছিল না। গাধা ছিল না। ছিল বাইসন... বাইসন আবার আটল্যান্টিকের এপাশে পাওয়া যেত না।
ছিল না গরু... ছিল না ছাগল...
মুরগী কিছু ছিল.. কিছু ফসিল ইদানিং পাওয়া গেছে... . কিন্তু মুরগী পালন হইতো না।
আমেরিকা উপমহাদেশের নাম্বার ওয়ান গৃহপালিত পশু ছিল Llama
লামা অনেকটা ছাগলের মতই...
লামা'র পিঠে চড়া যায় না,
লামা হালও টানতে পারে না।
ইউরোপ এশিয়ার চাষাবাদের সাথে এজন্য আদি আমেরিকার মানুষের চাষাবাদের পদ্ধতিতে আকাশ পাতাল ব্যবধান ছিল...

আমেরিকা আবিষ্কারের পর একটা দীর্ঘ সময় ইউরোপিয়ানরা কাঠের চাহিদা মিটিয়েছে আমেরিকা উপমহাদেশের গাছ পালা দিয়ে।
কাঠ তখন ছিল ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি।

আমাদের সিভিলাইজেশনের সাথে আমেরিকা মহাদেশের সিভিলাইজেশনের কার্যত আগে কোনো কানেকশন ছিল না। বা ছিল বলে জানা নেই।
ওদের সভ্যতা স্বতন্ত্রভাবেই গড়ে উঠেছিল।
আর আগেই বললাম, আমেরিকা মহাদেশে ঘোড়া ডমেস্টিকেশন করা হয়নি তখনও।
সুতরাং পরিবহন ব্যবস্থাতে ওরা ছিল অনেক পিছিয়ে। আর একারণে খোদ উত্তর আমেরিকার সিভিলাইজেশনগুলোর সাথে দক্ষিন আমেরিকার অনেক সিভিলাইজেশনের ভেতর কানেকশনও ছিল একেবারেই কম...

ইউরোপিয়ানরা আমেরিকাতে গম চাষাবাদ শুরু করে। আজ গাঁজা চাষ হয় দক্ষিন আমেরিকার সর্বত্র... এই গাঞ্জা চাষ আমেরিকাতে শুরু করেছিল ইউরোপিয়ানরাই।
ওদিকে আমেরিকা থেকে ইউরোপ পেয়েছিল টোবাকো...
প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত ইউরোপিয়ানরা সহজেই পেরেছিলো নেটিভদের স্লেভ বানিয়ে টোবাকো, আখ আর তুলার ক্ষেতে খাটাতে।

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা যে Quinine ব্যবহার করা হয়, সেটা প্রথম পাওয়া গিয়েছিল cinchona গাছ থেকে। এটা গাছ আমেরিকাতে পাওয়া যেত।
ইন্টারেস্টিং বিষয় হল, রোগের মেডিসিন আটল্যান্টিকের ওপাড়ে ছিল। আর রোগটা ছিল কিন্তু এপাড়ে।
রোগের মেডিসিনের এক্সচেঞ্জ যেমন হয়েছিল, রোগেরও তো হয়েছিল। আর আদি আমেরিকানদের কাছে ম্যালেরিয়া রোগের কোনো চিকিৎসা ছিল না। প্রচুর মানুষ মরেছিল ম্যালিরিয়া সহ নানান রোগ ভুগে।
তবে অসুখ বিসুখের কথা যখন আসলো, তখন বলি সিফিলিসের কথা। এই ভয়াবহ রোগটা কলম্বিয়ান এক্সেঞ্জের আগে ইউরোপিয়ানদের কাছে অপরিচিত ছিল। এই রোগ এসেছিলো আমেরিকা থেকে।

আজ যে টার্কি (মোরগের মত) আমাদের দেশেও পালন করা হচ্ছে, এই টার্কি কিন্তু তুরস্ক থেকে নয়, বরং এই টার্কি এসেছিল আমেরিকা থেকে।
মেক্সিকানরা প্রথম টার্কি ডমেস্টিকেট করেছিল।

প্লেগ, চিকেনপক্স, ম্যালেরিয়া, কলেরা, এসব ভয়াবহ রোগ বালায়ের তেমন কোনো চিকিৎসা আদি আমেরিকানরা জানতো না। এসব রোগ তাদের ছিল না। ইউরোপিয়ানরা আমেরিকায় গেলে এসব রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আদি আমেরিকানদের একটা বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল এসব রোগ ব্যাধি মহামারিতে।

reference:
https://en.wikipedia.org/wiki/Columbian_exchange
https://newsmaven.io/indiancountrytoday/archive/10-indigenous-foods-thought-to-be-european-uTmaPLGaLUa33WWgvgmSVQ/
Read More »

Tuesday, September 18, 2018

নর্থ কোরিয়ার স্পাই Ok Hwa


মহিলার নাম Kim Hyon-hui (aka "Ok Hwa")


ছবিতে তার মুখে ব্যান্ডেজ টাইপের কিছু একটা দেখতেছেন... শুনে অবাক হবেন হয়ত, তার মুখের ভেতর ছোট একটা ডিভাইজ ভরে এরপর মুখ শক্ত করে বেধে রাখা হয়েছে, যাতে সে নিজের জিভ চিবিয়ে রক্তক্ষরণে আত্মহত্যা করতে না পারে !

মহিলা নর্থ কোরিয়ান স্পাই এজেন্সি SSD -এর এজেন্ট... ১৯৭৩ সালে নর্থ কোরিয়ান এই এজেন্সি প্রতিষ্ঠিত হয় কেজিবি'র হুবহু অনুকরণে... এবং প্রকাশ্য সহায়তায়...

শুরু থেকেই এই এজেন্সি নানাবিধ কুখ্যাত কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। যেমন নানান সময়ে প্রায় এক ডজনের উপর জাপানি নাগরিক কিডন্যাপ করেছিলো জাস্ট নিজেদের স্পাইদের জাপানি শেখানোর জন্য !

এটা জাস্ট একটা উদাহরণ... এমন আরো অনেক কর্মকান্ড আছে।

তো ১৯৮৮ সালের কথা...
১৯৮৮ সালের সামার অলিম্পিক আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিলো দক্ষিণ কোরিয়া।
স্বাভাবিকভাবেই নর্থ কোরিয়ার ইগোতে লাগলো ব্যাপারটা। সাউথ কোরিয়াতে কিছুতেই অলিম্পিক আয়োজন করতে দেয়া যাবে না। যদি করতেই হয়, ইউনিফাইড কোরিয়াতে আয়োজন করতে হবে!
অর্থাৎ মামার বাড়ির আবদার...

তো এই অলিম্পিক ঠেকাতে হবে।
এখনকার নর্থ কোরিয়ার লিডার কিম জন উনের বাপ কিম জং লি তখন নর্থ কোরিয়ান সিক্রেট সার্ভিস ডিভিশনের দায়িত্ব। আর তার বাবা কিম এল স্যান তখনও নর্থ কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার।

অর্ডার এলো, সাউথ কোরিয়াকে ঝুকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। তাহলেই নিরাপত্তার অনুহাতে অলিম্পিক বয়কট করবে অধিকাংশ দেশ...

তো এই মহিলা এবং তার আরেকজন পুরুষ সহযোগীর উপর দায়িত্ব এলো, সাউথ কোরিয়া গামী একটা কোরিয়ান বিমান উড়িয়ে দেবার। ফলাফল, বাহরাইন থেকে সিউল যাবার পথে Korean Air Flight 858 বিমান বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হল। ১১৫ জন মারা গেল।

এই মহিলা এবং তার পুরুষ সহযোগি ফেক জাপানি পাসপোর্ট নিয়ে ঘুরতেন। ফেক আইডেন্টি তো ছিলোই। যারা স্পাই এজেন্সির কার্যক্রম সম্পর্কে হালকাপাতলা ধারণা রাখেন, তাদের এসব না বললেও চলবে।

প্রথমে গেলেন সার্বিয়া। সেখানে নিযুক্ত নর্থ কোরিয়ান স্পাইদের কাছ থেকে পেলেন বোমা... একটা রেডিওর ভেতর এই বোমা লুকানো ছিল। এরপর সেই বোমা নিয়ে বাহরাইন এলেন। বাহরাইন থেকে সিউলগামী KAF 858 বিমানের এক যাত্রীর সাথে সক্ষতা করে এরপর কোনোএক উপায়ে সেই রেডিও ঢুকিয়ে দিলেন লাগেজে। হয়ত কাউকে কনভিন্স করে বলেছিলো, কোনো আত্মীয় স্বজনের জন্য এটা ক্যারি করে নিয়ে যেতে।
ব্যস, এরপর বিমান আকাশে ওঠা মাত্র সবশেষ...

যাই হোক, ঘটনা ঘটানোর পর বাহরাইন থেকে মহিলা পালাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বাহরাইন পুলিশ মহিলাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় উনার সাথে যে পুরুষ সহযোগী ছিল, সে সাইনাইড খেয়ে আত্মহত্যা করে। সিগারেটের ভেতর সাইনাইড লুকানো ছিল।
আর এই মহিলা সাইনাইড ঠিকমত গিলতে পারেননি। পুলিশ বাধা দিয়েছিলো। এরপর মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে ট্রিটমেন্ট করা হয়। এবং দক্ষিন কোরিয়ান এজেন্সির লোকেরাও ততক্ষণে হাজির। মহিলাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় সাউথ কোরিয়াতে।
ছবিগুলো সাউথ কোরিয়াতে নিয়ে আসার সময় তোলা।
মহিলাকে ঘিরে আছে সাউথ কোরিয়ার এজেন্টরা।


মহিলার বিচার হয়। বিচারে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
যদিও সে বছরই দক্ষিন কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট তাকে ক্ষমা করে দেন। দিয়ে বলেন, 'Kim was merely a brainwashed victim of the real culprit, the North Korean government."

মহিলা পরবর্তীতে একটা বই লিখেছিলেন। নিজের আত্মজীবনী, নাম The Tears of My Soul
এই বই থেকে বিক্রি হওয়া সব টাকা পয়সা দান করেছিলেন ১১৫ জন নিহতের পরিবারগুলোকে।

মহিলার কেস যে দক্ষিন কোরিয়ান এজেন্ট হ্যান্ডেল করেছিলেন, তাকেই তিনি পরে বিয়ে করেন !
এরপর দুইটা সন্তানও হয়েছে তাদের।

শুরুতে বলেছিলেন, প্রায় ১৩ জন জাপানি নাগরিক কিডন্যাপ করেছিলো নর্থ কোরিয়ার গোয়েন্দা বাহিনী... ১৯৭৩ থেকে ৮৩ সালের মধ্যে।
এদের একজন ছিলেন Yaeko Taguchi
ছবির এই মহিলা যখন গোয়েন্দা ট্রেনিং প্রোগ্রামে নাম লিখান, তখন উনার প্রশিক্ষকদের ভেতর একজন ছিলেন Yaeko Taguchi

মাঝেমাঝে দুনিয়ার অনেককিছু শ্রেফ সিনেমার মত। বা সিনেমার চেয়েও বেশি সিনেম্যাটিক।

Read More »

Friday, September 14, 2018

Shin Sang-ok and Choi Eun-hee


সাউথ কোরিয়ান মুভি যারা দ্যাখেন, তারা ভালো করেই জানেন সাউথ কোরিয়ান মুভির কোয়ালিটি সম্পর্কে...

তো ছবিতে যে মহিলাকে দেখছেন, উনার নাম Shin Sang-ok ,

ষাট আর সত্তরের দশকে ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে নামকরা নায়িকা...

আর যে ভদ্রলোক'কে দেখছেন, উনার নাম Choi Eun-hee
ভদ্রমহিলার হাজবেন্ড, এবং নামকরা পরিচালক...


তো কোরিয়ান যুদ্ধের পর বিভক্ত দুই কোরিয়ার যাত্রা ছিল বিপরীতমুখী... দক্ষিণ কোরিয়া যখন মার্কিন ব্লকের ছায়াতলে উন্নত থেকে আরো উন্নত হচ্ছে, উত্তর কোরিয়া তখন এক প্যারানয়েড রিজিমের ক্ষপড়ে পড়ে মাফিয়া স্টেটে পরিনত হয়েছে।

বর্তমান নর্থ কোরিয়ান সুপ্রিম লিডার কিম জন উনের বাবা কিম জন লি তখন নর্থ কোরিয়ার প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার, এবং সেইসাথে স্পাই এজেন্সির দায়িত্বে।

ওদিকে তার বাবা অর্থাৎ এখনকার নর্থ কোরিয়ান লিডারের দাদা কিম এল স্যান তখন নর্থ কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার...


সালটা তখন ১৯৭৮...

ঘটনার পটভুমি হল, নর্থ কোরিয়ান লিডার কিম জন ইল ছিলেন সাইকোপ্যাথ। প্যারানয়েড। (তার ছেলেও বাপের গুনাবলি পেয়েছে)

তো কিম জন ইল ছোটবেলা নিজের ছোটভাইকে মেরে ফেলেছিলেন সুইমিংপুলে চুবিয়ে...
ছোটবেলা থেকে সুপ্রিম লিডারের ছেলে হবার কারণে জীবনে কেউ তাকে "না" বলেনি।
ফলাফল, ছিলেন বদরাগী... বেয়াদপ... স্পয়েল্ড চাইল্ড।
নর্থ কোরিয়াতে কোনো পশ্চিমা মুভি সার্কুলেট করা ছিল অপরাধ। কিন্তু কিম জন ইল ঠিকই পশ্চিমামুভি দেখতেন। হলিউড, বলিউড, দক্ষিন কোরিয়ান মুভি গিলতেন। এলভিস প্রিসলি হবার চেষ্টা ছিল তার।
এজন্য তার বাপ তাকে বয়সকালে প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার বানিয়ে দেন। :P অর্থাৎ, নে... এবার যত পারিস, মুভি বানা।
তবে কিমের মাথায় ভালোই শয়তানি বুদ্ধি ছিল। আজ আমরা কিম এল স্যান বা কিম জন ইলের যে কাল্ট অফ পার্সোনালিটি দেখি, সেটার রুপকার ছিল এই কিম জন ইল...
নিজের বাপকে রীতিমত ভগবান, আর নিজেকে ভগবানের অবতার বানিয়ে ছেড়েছিলেন কিম...
অর্থাৎ প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার হিসেবে গোসেপ গর্বলসের চেয়ে কোনো অংশে কম সফল নন তিনি।


কিন্তু একটা দেশে ট্যালেন্ট জন্মাতে গেলে তো চিন্তার স্বাধীণতা, জ্ঞান অর্জনের স্বাধীনতা দিতে হয়। নর্থ কোরিয়াতে সেটা ছিল না। এজন্য নর্থ কোরিয়াতে দক্ষিন কোরিয়ার মত ফ্লিম ডিরেক্টর বা এক্টরের জন্মও হত না ওভাবে।
ফলাফল, সাউথ কোরিয়ান ফ্লিম ইন্ড্রাস্ট্রি যেখানে সারা দুনিয়াতে নাম কামাচ্ছিলো, সেখানে নর্থ কোরিয়ান ফ্লিম ইন্ড্রাস্ট্রি অংকুরেই বিনষ্ট হবার দশা। কিছু প্রোপাগান্ডা মুভি বানানো ছাড়া তেমন কোনো কাজই ছিল না।

তো নিজের যখন নেই, তাহলে যার আছে, তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আসতে হবে,
এই ছিল কিম জন ইলের ধান্দা।
সাউথ কোরিয়ান নামকরা নায়িকা Shin Sang-ok কে পছন্দ করতেন কিম। উনি ছিলেন কিমের ক্রাশ।

ফলাফল, একদিন সাউথ কোরিয়ান গোয়েন্দা বাহিনী লাগিয়ে হংকং থেকে রীতিমত কিডন্যাপ করে ভদ্রমহিলাকে উত্তর কোরিয়াতে নিয়ে যাওয়া হল।
হংকং এর এক সমুদ্র সৈকত থেকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। কিডন্যাপারা এসেছিলো সমুদ্র হয়ে। স্পিডবোর্ডে। এরপর সেই স্পিডবোর্ডে করেই তাকে সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সোজা নর্থ কোরিয়াতে।
:P কিছুদিন পর ভদ্রমহিলার স্বামী অর্থাৎ বিখ্যাত পরিচালক Choi Eun-hee কে কিডন্যাপ করা হল একই কায়দায়।

ভদ্রমহিলাকে নিয়ে যাওয়া হয় কিম জন ইলের কাছে। সেখানে কেটে যায় তিনটি বছর।
ওদিকে ভদ্রমহিলার হাজবেন্ডকে নিয়ে যাওয়া হয় জেলখানায়। সেখানে তিন বছর ধরে উনার উপর চলে নির্যাতন। তিন বছর নির্যাতন সহ্য করে অবশেষে তিনি রাজি হন নর্থ কোরিয়ার জন্য ফ্লিম বানাতে :P
তখন তাকে মুক্তি দিয়ে কিম জন ইলের প্রাসাদে নেয়া হয়। পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় সাইকোপ্যাথ কিম জন ইলের সাথে। সেখানে তিন বছর পর প্রথমবারের মত তিনি নিজের স্ত্রীর দেখা পান। কিম জন ইল তাদের আবার বিয়ের ব্যবস্থা করেন :P

যাই হোক, এরপর তারা স্বামী স্ত্রী মিলে কিম জন ইলের জন্য মুভি বানিয়েছিলেন। কিছু প্রোপাগান্ডা মুভি বানানোর পর ১৯৮৬ সালে সুযোগ বুঝে ভিয়েনাতে আয়োজিত এক ফ্লিম ফেস্টিভালে যোগ দিতে এসে নর্থ কোরিয়ান প্রতিনিধি দলের সাথে আগত এই দপ্ততি পালিয়ে যান। আশ্রয় নেন ভিয়েনার মার্কিন দুতাবাসে।

যাই হোক, কেটে গেছে বহুদিন। কিম এল স্যান, কিম জন ইল... এরা দুজনই মারা গিয়েছে।
কিম জন ইলের ছেলে কিম জন উন এখন ক্ষমতায়।
সাউথ কোরিয়ান মুভি আজ গোটা দুনিয়াতে জনপ্রিয়।
ওদিকে নর্থ কোরিয়ান কোনো মুভির নামও কেউ শোনে না।
Read More »

Saturday, September 1, 2018

বাব ও বাহাই


আজ বলবো ‘বাহাই’দের কথা…
প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ বাংলাদেশে Baha'i Faith অনুসরণ করে।
কাকরাইল থেকে শান্তিনগর যাবার পথে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ। এর ঠিক পাশেই বাংলাদেশের বাহাই সেন্টার।

বাহাই ধর্ম তুলনামূলকভাবে নতুন…
বাহাই বিশ্বাস মতে, বাহাউল্লাহ ইশ্বরের প্রেরিতপুরুষ।



ধর্মের মূল শিক্ষা যদি একেবারে সংক্ষেপে বলি, তাহলে অনেকটা এমন…
স্রষ্টা যুগে যুগে মানবজাতিকে দীক্ষা দেবার জন্য দূত পাঠিয়েছেন। এরা মানব জাতির শিক্ষক। আব্রাহামিক ধর্মের নবী থেকে শুরু করে কৃষ্ণ, বুদ্ধ, জুরাস্ট্রিয়ার সহ যত প্রেরিত পুরুষ এসেছেন, এদেরকে ইশ্বর পাঠিয়েছিলেন মানব জাতির জন্য শিক্ষকরুপে।
মানুষ যাতে স্পিরিচুয়ালি শিক্ষা লাভ করে নিজেদের এবং সমাজের উন্নতিসাধণ করতে পারে।
বাহাউল্লাহ’র মতে,
সকল ধর্মগুলোই একই ইশ্বরের বন্দনা করে, এবং এগুলোর ভেতর ইন্টার কানেকশন আছে। সকল ধর্মের ভেতরই একটা ইউনিফাইন ভিশন আছে।
One God, One Universe, One Human race…

ব্যাপারটা আরেকটু সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলে অনেকটা পাঠশালার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ ক্লাস টেনে পড়া ছাত্রকে যা বোঝানো সম্ভব, ক্লাস টু’তে পড়া বাচ্চাকে সেটা বোঝানো সম্ভব না। আবার যে শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে জটিল সমীকরণ সহজে বোঝাতে পারেন, তিনি হয়ত উনার বাচ্চাকে অ আ ক খ গ বোঝাতে হিমশিম খেয়ে যাবেন। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা পড়ানো কঠিন কাজ। আবার হাই স্কুলের ছাত্রকে বীজগনিত বোঝানো আরেকধরণের কঠিন কাজ। দুইটা কাজই দুইরকম কঠিন।
আলাদা আলাদা ক্লাসের আলাদা আলাদা শিক্ষক বা এক্সপার্ট লাগে…
একটা বিষয় ক্লাস সেভেনের ছাত্রকে বোঝানোর জন্য যে ধরণের এপ্রোচ নিতে হয়, সেই একই বিষয় কলেজ পড়ুয়া ছাত্রকে বোঝাতে ভিন্ন এপ্রোচ নিতে হয়।
প্রেরিত পুরুষদের রোল এই শিক্ষকদের মতই…
সবাই আলাদা আলাদা ক্লাসের শিক্ষক…
তবে লক্ষ উদ্দেশ্য সবারই এক…
মানব কল্যান।

বাহাউল্লাহ মানব জাতির ইতিহাসকে এভাবেই দেখেছেন। অর্থাৎ আলাদা আলাদা সময়ে পরিস্থিতির প্রয়োজনে আলাদা আলাদা শিক্ষক/ নবী / প্রেরিতপুরুষ / অবদারের আগমন হয়েছে বা স্রষ্টার তরফ থেকে পাঠানো হয়েছে।
বাহাই বিশ্বাস অনুসারে,
These different religions are the chapters of a continuous story.
They are not in conflict with each other. There are different social teaching or version because of the needs and requirements of certain times of which those message were delivered,
but at their core, they are in complete harmony with each other.

আচ্ছা… এবার বাহাউল্লাহ’র জীবনী সংক্ষেপে বলা যাক।
তবে উনার কথা বলার আগে সংক্ষেপে বলতে হবে সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ সম্পর্কে।
জিসাসের আগে যেমন সাধু John the Baptist এসেছিলেন ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে, জিসুর আগমনের,
সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ রোল বাহাই বিশ্বাসীদের কাছে কিছুটা একই রকম।
সাইয়িদ আলী মোহাম্মদের আরেক নাম বাব (bab)
ইরানের সিরাজ প্রদেশে ১৮১৯ সালে জন্ম। মেধাবি, তরুণ ব্যবসায়ী ছিলেন। ইরানের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ভেতর বকধার্মিকতা, ধর্মের প্রতি উদাসীনতা, দূর্বল ইমান, দুর্বল বিশ্বাস, হিপোক্রেসি, এসব লক্ষ করেছিলেন তিনি অনেক তরুন বয়সে।
ধর্মকর্মের প্রতি আগ্রহ ছিল। প্রচুর পড়ালিখা করতেন ধর্মকর্ম নিয়ে।
সমাজ সংস্কারের ইচ্ছা হল মনে।

ইরানের মানুষ অধিকাংশ শিয়া মুসলিম।
শিয়াদের ভেতর বারোজন ইমামের ধারণা প্রচলিত। সর্বশেষ ইমান হলেন ইমাম মাহাদি।
শিয়া বিশ্বাস হল, ইমাম মাহাদি তার প্রতিনিধির মাধ্যমে শিষ্যদের সাথে যোগাযোগ রাখেন।
শেষ প্রতিনিধি মারা গেলে আর ইমাম মাহাদীর সাথে কানেকশন থাকবে না দুনিয়ায় জীবিত শিয়া শিষ্যদের।
অর্থাৎ গায়েবি কানেকশন অফ হয়ে যাবে।
এরপর কেয়ামতের আগে উনি এসে ধর্মের পুনরুদ্ধার করবেন।

তো সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ এবার নিজেকে ইমাম মাহাদি হিসেবে ঘোষনা দিলেন।
এপ্রসঙ্গে বলে রাখি,
নানান সময়ে নানান ব্যক্তির নিজেকে ইমাম মাহাদি হিসেবে দাবি করার ঘটনা নতুন নয়। ইতিহাসে এমন বেশকিছু নজির আছে।
যেমন আব্বাসীয় খেলাফতের সময় ইয়াহিয়া ইবনে উমর ছিলেন আলী বংশদ্ভুত একজন বিদ্রোহী ইমাম, যিনি আব্বাসিয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। বিদ্রোহটি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
জায়েদি শিয়ারা ‘ইয়াহিয়া ইবনে উমর’কে ইমাম মাহদী বলে প্রচার করা শুরু করেছিল। অপেক্ষাকৃত দরীদ্র, বঞ্চিত ও শোষিত মুসলিমদের ভেতর মাহদীর আবির্ভাবের প্রত্যাশাটা ছিল প্রবল।
নবীর বংশ থেকে একজন মাহদীর আবির্ভাব ঘটবে যিনি সমগ্র পৃথিবীতে ন্যায় বিচার ও মানুষের মাঝ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করবেন। ইয়াহিয়া ইবনে উমর ৮৬৫ সালে আব্বাসিয় সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিহত হন।
এরপর তার অনুসারীরা প্রচার করতে থাকেন যে তিনি ‘গায়েব’ হয়ে গেছেন এবং কেয়ামতের পূর্বে তিনি আবার হাজির হবেন।
এই গায়েব তত্ত্বের সুযোগ নিয়েই চার বছর পর আলী বিন মুহাম্মদ নামের আরেক ইমাম নিজেকে ইয়াহিয়ার পুনরাবির্ভাব বলে দাবি করেছিলেন।

প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, পরাজিত ও নিহত হওয়া এবং তারপর ‘গায়েব হয়ে যাওয়া ও মাহদী হিসাবে পুনরাবির্ভাবে’র তত্ত্ব প্রচার, এই ধরণের ঘটনা ইমাম আলীর তৃতীয় পুত্র ইবনে আল হানাফিয়া থেকে শুরু হয়ে নানান সময়ে ঘটেছে।
ভারতে মুহাম্মদ জৌনপুরি (১৪৪৩-১৫০৫) নিজেকে মাহদী ঘোষনা করেন। তার অনুসারীরা মাহদিয়া সম্প্রদায় নামে ভারতিয় উপমহাদেশে এখনো টিকে আছে।
মরক্কোর বারবার নেতা ইবনে তুমরাত নিজেকে মহানবীর বংশধর ও ইমাম মাহদী দাবি করে ছিলেন। তার অনুসারীরা স্পেনে আলমোহাদ খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।
সুদানের সুফিবাদী ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ আহমেদ (১৮৪৪-১৮৮৫) নিজেকে ইমাম মাহদী ঘোষনা করেন, তার অনুসারীরা যথাক্রমে তুর্কি খেলাফত এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিল।
ব্রিটিশ আমলে ভারতিয় উপমহাদেশে মির্জা গোলাম আহমেদ (১৮৩৫-১৯০৮) নিজেকে মাহদী ঘোষনা করেন। তার অনুসারীরা ‘আহমেদিয়া মুসলিম’ হিসাবে পরিচিত।

যাই হোক, আমরা ফিরে যাচ্ছি মূল আলোচনায়, অর্থাৎ সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ, যিনি ২৪ বছর বয়সে নিজের টাইটেল নাম দিলেন ‘বাব” … যার অর্থ দরজা …
ইসলাম হতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে বাবিজম প্রতিষ্ঠা করলেন। বই লিখলেন, নাম দিলেন ‘বেয়ান’
এখানেই তুলে ধরলেন বাবিজমের শিক্ষা দিক্ষা…

প্রচার করতে শুরু করলেন তার নতুন সৃষ্টি করা বিশ্বাস। প্রথম প্রথম তেমন কোনো ভক্ত বা মুরিদ জোগাড় করতে পারলেন না। এজন্য তেমন একটা ফোকাসও পেলেন না।
তখন ইরানে মাঝেমাঝেই এমন নিত্য নতুন ধর্ম প্রচারকের আবির্ভার হইতো। জনসাধারণ পাগলের প্রলাপ বলেই উড়িয়ে দিতো। দ্রুত এরা হারিয়েও যেতো।
এতো আমলে নেবার মত কিছুই ছিল না।

কিন্তু বাব হাল ছাড়লেন না। লেগে থাকলেন। ফুল ডিটারমিনেশনের সাথে। একসময় কিছু সাঙ্গপাঙ্গ ঠিকই জুটে গেল। মানুষ তার কথা শুনতে শুরু করলো। ফলাফল, ধীরে ধীরে ফলোয়ার বাড়তে শুরু করলো এবং স্বাভাবিকভাবেই এবার শিয়া মোল্লারা বিষয়টি আমলে নিলো।
বাবের অনুসারীদের বলা হত বাবি।

বাব নিজেকে ইমাম মাহাদি হিসেবে ঘোষনা করার পরও আবার নতুন একজন নতুন প্রেরিত পুরুষের আগমনের বার্তা দিলেন। নিজের লিখা ‘বেয়ান’ প্রচার করতে লাগলেন এবং ঘোষনা দিলেন, ইহা সবচেয়ে যুগোপযোগী বাণী !

অতঃপর, যা হবার সেটাই হল। শিয়া মোল্লারা সিদ্ধান্ত নিলো, এবার বাব’কে দেখে নেবে। বাবের কথা ইরানের শাহ’র কানেও গেল।
এরপর একদিন ইরানের পুলিশ গুলি চালালো বাব ও বাবি’দের উপর।

বেশকিছু বাবের ফলোয়ার, অর্থাৎ বাবি নিহত হলেন। বাব গ্রেফতার হল। ব্লাফফেমি মামলা সহ নানান পদের মামলা দিয়ে অতঃপর নামকাওয়াস্তে বিচার করে বাব’কে তোলা হল ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে।
এরপর গুলি।
এরপর মৃত্যু।
এরপর দাফন।

(যেখানে গুলি করে বাব'কে হত্যা করা হয়েছিল)


দাফন করা হল ইরান থেকে বহু দূরে। তখনকার অটোম্যান সম্রাজ্যের অন্তর্গত প্যালেস্টাইনের হাইফা’তে।
যা এখন ইসরাইলের নিয়ন্ত্রনে। সেখানেই বাবের সমাধি।


বাবের অনুসারীদের ইরান ছাড়া করলেন শাহ।
বাবি’রা চলে গেল নির্বাসনে।
কিন্তু বাবের লাশ দাফন হলেও বাবের ‘বেয়ানের’ বাণী হারিয়ে গেল না।

ইরানের তেহরান শহর।
শাহ আমলের মন্ত্রী মির্জা নুরি’র ঘরে জন্ম নিলেন মির্জা হুসাইন আলী নুরি। ১৮১৭ সাল। অর্থাৎ বাবের চেয়ে দুই বছরের বড় মির্জা হুসাইন আলী নুরি।
বেশ আরাম আয়েশ বিলাসিতায় কেটেছিল মির্জা হুসাইন আলী নুরি’র জীবন। বড়লোকের ছেলে বলে কথা।
একদিন মন্ত্রী মশায় মারা গেলেন। ফলে মন্ত্রী পুত্র মির্জা হুসাইন আলী নুরি’কে বাপের মন্ত্রীত্ব সাধা হল। কিন্তু তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করলেন।
তিনি মিশতে শুরু করলেন একেবারে সাধারণ মানুষের সাথে। ইরানের রাস্তা ধরে হাটলেন যুবক মির্জা হুসাইন আল নুরি। দেখলেন ইরানকে। একেবারে সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে।

মানুষের উপকারে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন মির্জা হুসাইন আল নুরি। যুবক বয়সে লোকে তাকে ভালবেসে বলতো, ‘গরিবের বাবা’
১৮৪৮ সালের দিকের কথা। তখন সাইয়িদ আলী মোহাম্মদ ও তার অনুসারীরা বাবিজম প্রচার শুরু করেছেন পুরোদমে।
মির্জা হুসাইন আল নুরি পরিচিত হলেন কিছু বাব অনুসারীদের সাথে।
তাদের সাথে চলা ফিরা করলেন। তাদের কথা শুনলেন। মুগ্ধ হলেন ‘বেয়ানের’ বাণী শুনে। বাবের ভক্ত হয়ে গেলেন মির্জা হুসাইন আল নুরি। বাব ধর্ম গ্রহন করলেন।
বাব যে প্রেরিত পুরুষের আগমনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেই কথা মননে ধারণ করলেন মির্জা হুসাইন আল নুরি।
১৮৫০ সালে যখন বাব’কে ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে নিয়ে খুন করা হয়, তখন আর সব বাবি’দের মত মির্জা হুসাইন আল নুরিও আত্মগোপনে চলে যান। ইরানের পুলিশ খুঁজতে থাকে বাবি’দের।

১৮৫২ সাল। তেহরানের কাছেই এফচি নামের গ্রাম। সেখানে গোপনে কিছু বাবি’দের সাথে আলোচনায় বসলেন মির্জা হুসাইন আল নুরি। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। পুলিশ ঘিরে ফেললো তাদের। গ্রেফতার করলো। টর্চার চেম্বারে নিয়ে পেটালো। পুরনো পরিত্যাক্ত কুপের ভেতর অন্য বন্দীদের সাথে রাখা হল মির্জা হুসাইন আল নুরিকে। গু মুতের গন্ধ। এক ভয়াবহ গহ্বর … অন্ধকার।
দুর্বিষহ পরিবেশ।
আর সেখানেই কিনা স্বর্গের প্রত্যাদেশ পেলেন মির্জা হুসাইন আল নুরি !
দেবদুত এসে উনার কানে বলে গেলেন, আজ থেকে আপনার নাম ‘বাহাউল্লাহ’ যার অর্থ আল্লাহ’র গৌরব।
ব্যস, মির্জা হুসাইন আল নুরি বুঝে গেলেন, তিনিই সেই প্রেরিতপুরুষ, যার সম্পর্কে বাব পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। মির্জা হুসাইন আল নুরি হয়ে গেলেন ‘বাহাউল্লাহ’

এভাবে চার মাস বন্দি থাকার পর ইরান সরকার বাহাউল্লাহ’কে মুক্তি দিল। বাহাউল্লাহ’র ভাগ্য ভালো ছিল। বাবের মত তাকে ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে তোলা হল না।
বরং নির্বাসনে পাঠানো হল।
বেশকিছু বাবি’দের সাথে নিয়ে বাহাউল্লাহ চলে গেলেন বাগদাদে।
বাগদাদ ছিল তখন তুর্কি অটোম্যান খেলাফতের আন্ডারে।
আটোম্যানদের সাথে ইরানের সম্পর্ক ভালো ছিল না।

বাহাউল্লাহ এরপর বাগদান থেকে কুর্দিস্তানের দিকে গেলেন। এরপর এক নির্জন পাহাড়ে ধ্যানমগ্ন হলেন। সেই নির্জন পাহাড়ে ধ্যান করে যা কিছু তার মাথায় এসেছিল,
লিখে ফেললেন।
হয়ে গেল বই।
নাম “কিতাব-ই-ইকান’
যেখানে জীবনকে দেখানো হয়েছে এক মহাজাগতিক উপন্যাস হিসেবে।
বাহাউল্লাহ এরপর বাগদাদে থাকতে শুরু করলেন। বাগদাদে কফি হাউজগুলোতে ঘুরলেন। সেইসময় বাগদাদে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা ছিল ভালোমতই।
বাহাউল্লাহ বাগদাদে ঘুরেঘুরে অনুধাবন করলেন, বিজ্ঞানকে এড়ানো যাবে না। ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করলেন বাহাউল্লাহ। অনেকটা সাধু দার্শনিক Thomas Aquinas এর মত।
বাগদাদে বাহাউল্লাহ’র ফলোয়ার বাড়তে থাকলো।

বাহাউল্লাহ বুঝতে পারলেন, এটাই সঠিক সময়। ফলোয়ারদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমিই সেই প্রেরিতপুরুষ, যার কথা বাব বলে গিয়েছিলেন। সালটা ১৮৬৩।

তিনি বললেন, আদম থেকে শুরু করে যুগে যুগে অনেক পেরিতপুরুষের আগমন ঘটেছে। বর্তমানে তিনি এসেছেন প্রেরিতপুরুষ হিসেবে। উনার পরেও অনেকে আসবেন ইশ্বরের বাণী প্রচার করতে।
তিনি বললেন,
সব ধর্মমতের উৎস অভিন্ন। পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে সেগুলোর রুপ বদল হয়েছে। কিন্তু রয়েছে অভিন্ন সুর।
বিশ্ব ধর্মের ঐক্যের আহবান দিলেন বাহাউল্লাহ।
বিজ্ঞানে বিশ্বাস, জাতিভেদাভেদের অবসান, লৈঙ্গিক বৈষম্যের অবসানের ডাক দিলেন বাহাউল্লাহ।
বিশ্বশান্তির প্রতিষ্ঠার ডাক দিলেন। মহান বাব ১৯ সংখ্যাকে পবিত্র বলে ঘোষনা করেছিলেন। এজন্য বছরে ১৯ দিন উপবাস থাকতে বললেন।

বাগদাদ থেকে ইস্তাম্বুল যাবার পথে টাইগ্রিস নদীর তীরে ১২ দিন অবস্থান করেছিলেন বাহাউল্লাহ তার শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে। বাহাই’রা রিদভান উৎসব পালনের মাধ্যমে আজও সেটাকে স্মরণ করে।

তবে সবকিছুতেই বিরোধ লাগে। বাবের মৃত্যুর পর বাহাউল্লাহর উত্থানও কট্টর বাব সমর্থকদের একটি অংশের ভেতর সন্দেহের জন্ম দিলো। তারা বাহাউল্লাহ’র এইসব দাবি প্রত্যাখান করলো। বাহাউল্লাহ’র প্রতি তারা বিশ্বাস আনতে পারলো না। এদের ভেতর ছিল খোদ বাহাউল্লাহর নিজের ভাই ইয়াহিয়া।
শুরু হল বাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। শুরু হল গ্রুপিং। ভেদাভেদ।

বাহাউল্লাহ ইস্তাম্বুল পৌছালেন, কিন্তু তুর্কি সুলতানকে উপহার দিতে ভুলে গেলেন। ফলাফল, শুরুতেই সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল। বাহাউল্লাহ মাত্র চার মাস ছিলেন। সুলতানের নির্দেশে তাকে ইস্তাবুল ছেড়ে চলে যেতে হল তুরস্কের আড্রিয়ানোপলে। গ্রিসের কাছাকাছি।
সেখানে বসে বাহাউল্লাহ লিখতে থাকলেন। প্রচার করতে থাকলেন তার ধর্মমত।
বিশ্বের বড়বড় নেতা, যেমন মহারানী ভিক্টোরিয়া, রাশিয়ার আলেকজ্যান্ডার সহ অনেক নেতাদের চিঠি লিখলেন।

ক্রমশ বাব এবং বাহাই বিরোধ বাড়তে থাকলো। বাহাউল্লাহ’র সেই ভাই, অর্থাৎ ইয়াহিয়া, যে ছিল কট্টর বাবপন্থি, সে বাহাউল্লাহকে ইমাম মাহাদি বা প্রেরিতপুরুষ হিসেবে মেনে নিতে পারলো না। ফলাফল, খাবারে বিষ মেশালো। বাহাউল্লাহ অসুস্থ হয়ে গেলেন। কিন্তু জানে বেঁচে গেলেন কোনোমতে। মির্জা ইয়াহিয়া তুর্কি সুলতানকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলো, বাহাউল্লাহ আটোম্যান সম্রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক। সম্রাজ্যের ভেতর অস্থিরতা এবং নৈরাজ্য তৈরি করতেছে বাহাউল্লাহ ও তার অনুসারীরা।
ফলাফল, সুলতানের নির্দেশে বাহাউল্লাহকে চলে যেতে হল প্যালেস্টাইনের আক্কায়। জেলখানায়।
বর্তমানে জায়গাটি ইসরাইলে।

(এই সেই জেলখানা)

সম্রাটের মৃত্যুর পর বাহাউল্লাহ জেল থেকে বের হয়ে আক্কার ‘বাহাজি ম্যাসনে” থাকতে শুরু করেন। যদিও কার্যত তিনি তখনও অটোম্যানদের হাতে বন্দী।

বাহাউল্লাহ ও তার সমর্থকদের ব্যাপারে স্থানীয় জনতাকে সতর্ক থাকতে বললেন তুর্কি সরকার। ফলাফল, বাহাউল্লাহর শেষ জীবনের সময়গুলো খুব একটা ভালো কাটেনি। সেখানেই উনার এক পুত্র মির্জা মেহেদি মারা গেলেন।
বাহাউল্লাহ কার্যত বন্দি দশাতেই ছিলেন। যদিও শেষ দিকে অনুমতি সাপেক্ষে আক্কার আশেপাশে যেতে পারতেন তিনি।
১৮৯২ সালে বাহাউল্লাহ মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে তিনি লিখে গেলেন ‘কিতাব-ই-আকদাস’

(বাহাউল্লাহ'র কবর)

বাহাউল্লাহ’র মৃত্যুর পর উনার আরেক ছেলে আব্দুল বাহা বাহাই ধর্মের হাল ধরলেন।


ওদিকে বাবের যে সব ভক্ত বাহাউল্লাহ’কে ইমাম মাহাদি বা প্রেরিতপুরুষ হিসেবে বিশ্বাস করেনি, তারা আলাদা হয়ে মধ্য এশিয়াতে বসবাস শুরু করে। আজও তারা আছে। এবং বাবের কথামত কোনো এক প্রেরিত পুরুষের অপেক্ষায় আছে। অর্থাৎ কবে কেউ একজন এসে সব মুশকিল আছান করে দেবে।

সারমর্ম হল, বাব প্রচার করেছিলেন বাবিজম।
বাবিজমে একজন প্রেরিতপুরুষের কথা ছিল। বাহাউল্লাহ নিজেকে সেই প্রেরিতপুরুষ বলে দাবি করেছিলেন। যারা তার কথায় বিশ্বাস এনেছিলো, তারা বাহাই অনুসারে।
অর্থাৎ সব বাহাই বাবি বা বাবের ভক্ত, সব বাহাই’দের প্রধান কেতাব ‘বেয়ান’
কিন্তু সব বাবি বাহাই নয়।

ব্যাপারটা সেই সব ক্ষারই ক্ষারক, কিন্তু সব ক্ষারক ক্ষার নয় টাইপের।

বাহাই’দের তীর্থ দুইটি।
একটি বাবের কবর,
অন্যটি বাহাজি ম্যানসন।
বাহাইদের সকল অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাব এবং বাহাউল্লাহ’র স্মৃতিকে স্মরণ করা হয়।


The Universal House of Justice, Haifa, Israel হল বাহাই’দের গ্লোবাল রুলিং বডি।



Baha'i festivals:

Naw-Ruz (New year) 21 March
Ridvan - first day 21 April
Ridvan - ninth day 29 April
Ridvan - twelfth day 2 May
The Bab's declaration of his mission 23 May
Passing of Baha'u'llah 29 May
Martyrdom of the Bab 9 July
Birth of the Bab 20 October
Birth of Baha'u'llah 12 November

https://en.wikipedia.org/wiki/Báb
https://en.wikipedia.org/wiki/Bahá%27í_Faith
https://en.wikipedia.org/wiki/Bahá%27u%27lláh
http://bahai-library.com/books/hinduism/ch7.htm
Read More »

Sunday, January 14, 2018

মসনদের রাজনীতি -১০১ (ক্লাস-১)



ক্ষমতা কি জিনিস?
ক্ষমতার মসনদে গেলে মানুষ কেন বদলে যায়?
আসুন, আমরা ক্ষমতাবানদের বোঝার চেষ্টা করি লেখক ব্রুস ব্রুনোর চোখে এবং বিশ্লেষণের মধ্যদিয়ে।
Bruce Bueno de Mesquita is a political scientist,
professor at New York University, and senior fellow at Stanford University's Hoover Institution.

একটি রুলস সবার আগে বিবেচনায় রাখুন।
ক্ষমতায় যাবার আগে যারা চিন্তা করে কিভাবে ক্ষমতায় যাবো,আবার ক্ষমতায় বসার পর তাদের চিন্তা শুরু হয়, কিভাবে ক্ষমতায় থাকবো।
এই চিন্তা সর্বদা তাদের ব্যস্ত রাখবে। রাখবেই রাখবে।

আপনি ভুলেও ভাববেন না, নর্থকোরিয়ার নেতা কিম জন উনের ক্ষমতা হারানোর ভয় নেই। অবশ্যই আছে।
ক্ষমতা হারানোর ভয় যেমন জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলের আছে,
তেমন কিম জন উনেরও আছে।

কিন্তু এখানে একটা জিনিস খেয়াল করেন।
জার্মানির নেতা এঙ্গেলা মার্কেল
আর নর্থ কোরিয়ার নেতা কিম জং উন,
দুজনের ক্ষমতার ধরণ আলাদা।

মার্কেল একটি গনতান্ত্রিক দেশের নেত্রী। জার্মানিতে সত্যিকার অর্থেই গনতান্ত্রিক চর্চা বিদ্যমান।
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামবে নির্বাচনে হেরে। (মারা গেলে ভিন্ন হিসাব)
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামলে তাঁর আহামরি খারাপ তেমনকিছুই হবে না। হয়ত দুর্নীতি করে থাকলে নেক্সট সরকার এসে সেই দুর্নীতির তদন্তে নামবে। মার্কেলকে কোর্টে হাজিরা দিতে হবে। এই যা।
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামলে তিনি “জার্মান চ্যান্সেলর” থেকে একজন “সাধারণ নাগরিক” হয়ে যাবেন।

কিন্তু কিম জং উন?
সে ক্ষমতা থেকে নামবে তখনই, যখন তাঁকে ক্ষমতা থেকে নামানো হবে জোর করে। হত্যা করা হবে সাদ্দামের মত অথবা জেলে ভরা হবে।
যে পদের ক্ষমতা যত বেশি, সেই পদ ততবেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এবং ক্ষমতা হারানোর ভয়ও ততবেশি।
জার্মানিতে মার্কেল যে পরিমাণ ক্ষমতাবান,
কিম জং উন উত্তর কোরিয়াতে আরো বেশি ক্ষমতাবান।
জার্মানিতে মার্কেল যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। ইচ্ছা হলে দশটা মানুষকে মেরে ফেলার ক্ষমতা মার্কেলের নেই। মার্কেলের ক্ষমতা জার্মানির সাংবিধানিক রুলস এন্ড রেগুলেশনে বাধা।
মার্কেল যেটা করেন, সেটা সাংবিধান চাকরি।
কিন্তু উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম?
সে তো উত্তর কোরিয়াতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারি। যা ইচ্ছা করতে পারে সে। উনার উপর কথা বলার সাহস কারো নেই। উনার আদেশ যেটাই হোক, মেনে চলতে হবে সবাইকে।

আর এজন্যেই কিম জং উনের ক্ষমতা যেমন বেশি, ঠিক তেমনই ক্ষমতা হারানোর ভয় বা প্যারানোয়া জার্মানির মার্কেলের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণ বেশি। আর ক্ষমতা হারালে পরিনতিও ভয়াবহ।
আর এজন্য ক্ষমতার প্রতি হুমকি হতে পারে, এমন কোনোকিছুকেই তিনি স্বাভাবিকভাবেই টলারেট করেন না।

নানান দেশে নানান ধরণের শাসন ব্যবস্থা চলতেছে। কোথাও গনতন্ত্র, কোথাও সামরিক সরকার, কোথাও একনায়কতন্ত্র, কোথাও রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র,
নানান ধরণের শাসন ব্যবস্থা চলতেছে।
কনভেনশন্যাল উইজডম অনুসারে আমরা নর্থ কোরিয়ার নেতা কিম জং উন’কে একজন ডিক্টেটর বা একনায়ক হিসেবেই চিনি।

তবে শাসনব্যবস্থা যেমনই হোক,
একটা জিনিস সবার আগে মনে রাখতে হবে,
No Leader Can Lead Unilaterally. No Leader is monolithic.

অর্থাৎ একাএকা কোনো লিডারের পক্ষেই দেশ চালানো সম্ভব না। সেটা অতীতের হিটলার বা জোসেফ স্তালিনের জন্যেও সমান সত্য ছিল।
ঠিক একইভাবি সত্য কিম জং উনের জন্যেও।
আমরা কেবল ক্ষমতার মসনদে বসা ব্যক্তিটিকেই দেখি।
ক্ষমতার মসনদটিকে যেসব স্তম্ভগুলো সাপোর্ট দিয়ে ধরে রাখে, সেগুলোকে দেখিনা।
প্রফেসর ব্রুসের লিখা “dictator's Handbook” বইটিতে প্রথমেই আলোচনায় এসেছে মসনদের এই স্তম্ভগুলো।
তিনি গনতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, ধনতন্ত্র, Oligarchy, মেরিটোক্র্যাসি সহ আরো যতধরণের ব্যবস্থা প্রচলিত আছে,
সবগুলোর ভেতর একটা কমন সিনারিও তুলে ধরেছেন। এসব গতানুগতিক ক্লাসিফিকেশন বাদ দিয়ে তিনি বলেছেন, ক্ষমতার মসনদে যে বা যারাই বসুক,
তাঁদের বা তাঁকে মুলত তিন শ্রেণীর মানুষ ডিল করতে হয়।
১. ইনফ্লুয়েন্সিয়াল (Influential) / প্রভাবশালী
২. এসেন্সিয়াল (Essential) / অপরিহার্য
৩. ইন্টারচেঞ্জেবল (interchangeable) / বিনিমেয়

তো প্রভাবশালী শ্রেনী কারা?
আমরা গতানুগতিকভাবে যাদেরকে প্রভাবশালী বলি। সেই প্রভাবশালীদের বোঝাচ্ছেনা এখানে।
এখানে প্রভাবশালী শ্রেনী বলতে তাঁদেরকে বোঝানো হচ্ছে, যাদেরকে মসনদে বসে আপনার “নিয়ন্ত্রণে” রাখতে হবে এবং যারা আপনাকে “ক্ষমতা থেকে নামানোর ক্ষমতা” রাখে।
এই জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশের সামরিকবাহিনী এই শ্রেণীর অন্তর্গত। সেইসাথে ফরেন ব্যাকার, তথা “বিদেশী প্রভু”রাও এই শ্রেনীতে পড়ে।
একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে।
মিশরের আরব বসন্তের কথা চিন্তা করুণ।
হোসনি মোবারকের তিন দশকের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হল। মানুষজন রাস্তায় নামলো। মিশরের তেহরির স্কোয়ার মানুষে ভরে গেল।
হোসনি মোবারক পুলিশ দিয়ে জনসমুদ্র নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেন।
এরপর তিনি আর্মি নামালেন।
আর্মি ট্যাঙ্ক গোটা তেহরির স্কোয়ার ঘিরে ফেললো। কিন্তু মানুষের গায়ে একটি বুলেটও ছুড়লো না।
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। ওদিকে মানুষের মিছিলে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে গেল। ট্যাঙ্কে বসা সেনারা কার্যত কিছুই করলো না।

অর্থাৎ?
অর্থাৎ বোঝা হয়ে গেল, হোসনি মোবারক ক্ষমতার মসনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ Influential পিলার বা স্তম্ভ হারিয়ে ফেলেছেন। সেটা হল “আর্মি”
তখন বুঝতে আর বাকি রইলো না, মিশরের আর্মি এখন হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে।
মিশরের রাজনীতি যারা পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁরা ভালো করেই জানেন, মিশরের রাজণীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে আর্মি আর আমেরিকা।
হোসনি মোবারক নিজেও একসময় বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন।
তো আমেরিকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ Influential স্তম্ভ।
আর্মি যেহেতু মোবারকের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সেহেতু এটাও বোধগম্য, আমেরিকাও আর চাচ্ছে না হোসনি মোবারক ক্ষমতায় থাকুক।
সুতরাং ফলাফল কি?
ফলাফল হল, মোবারক’কে এখন ক্ষমতা থেকে নামতে হবে। ইশারা পরিস্কার।

তো মোবারক সত্যিসত্যিই ক্ষমতা থেকে নেমে গেল। আর্মি পুলিশ গিয়ে হোসনি মোবারককে গ্রেফতার করলো।
ওদিকে আমজনতা?
আমজনতা কিন্তু মহাখুশি।
আমজনতার ধারণা, তাঁদের গনআন্দোলন আর বিশাল মিছিলের ঠেলায় হোসনি মোবারকের পতন ঘটেছে। সুতরাং
গোটাবিশ্বে এবার নিউজ পেপারে হেডলাইন হইল,
“জনতার আন্দোলন তথা আরব বসন্তে মোবারক পদচ্যুত”

ওকে... ফাইন।
খুব ভালো কথা।
এরপর কি হল?
এরপর মিশরে ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন হইলো। কে জিতলো?

জিতলো, মুসলিম ব্রাদারহুড।
খোদ আর্মির পরোক্ষ তত্ত্বাবধানেই নির্বাচন হয়েছিলো। মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি পেল ৫১.৭৩% ভোট।
মোহাম্মদ মুরসি হল প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু এখানে তো সমস্যা। এই মুসলিম ব্রাদারহুডকে দুচোখে দেখতে পারে না আমেরিকা আর আর্মি। এই দুইটা ইনফ্লুয়েন্সিয়াল স্তম্ভ একবছর যেতে না যেতেই ঠিকই মুরসির পতনের আয়োজন করলো।
কি হল এরপর?
আবার মিশরের তেহরির স্কোয়ারে আন্দোলন শুরু হল। এবার দাবি, মুরসি’কে ক্ষমতা থেকে নামাও। এরা মুলত এন্টি ব্রাদারহুড জনতা।
আবার ঠিক তখন মিশরের বড়বড় শহরগুলো ব্রাদারহুডের সমর্থকদের বিশাল মিছিল, তাদের দাবি, মুরসিকে ক্ষমতায় রাখো।

ব্যস, এবার আবার আর্মি নামলো। মুরসিকে গ্রেফতার করলো এবং হা... মুরসির সমর্থকদের উপর আর্মি নির্বিচারে গুলি চালালো। Rabaa স্কয়ারে গোলাগুলিতে বহুমানুষ মারা গেল।
কত মানুষ মারা গিয়েছিল, সঠিক হিসাব নেই।

ঠিকই মিশরকে রক্তে ভাসিয়ে এবার আর্মি ক্ষমতা নিয়ে নিলো।



ব্রাদারহুড আর এন্টি ব্রাদারহুড,
দুইগ্রুপই এবার আর্মির গুলির ভয়ে জীবন বাঁচাতে ঘরে ফেললো।
সেই হতে আমেরিকান ব্যাকিং নিয়ে আব্দুল ফাতাহ আল সিসি মিশরের ক্ষমতায়।
হোসনি মোবারক গেল। সিসি এলো।
মিশর সেই আগের মতই ডিক্টেটরশিপের আন্ডারেই রয়ে গেল।
এখন যদি সিসি’র পদত্যাগের দাবিতে কোনো মিসিল হয় তেহরির স্কোয়ারে,
নিশ্চিত থাকুন, আর্মি এসে গুলি করে ঝাঁজরা করে দেবে। কেউকিছু বলবে না। আমেরিকাও চুপ করে থাকবে।

সুতরাং বুঝতেই পারতেছেন, ইনফ্লুয়েন্সিয়াল বা প্রভাবশালী শ্রেনীকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আপনার ক্ষমতার গদী নড়ে যাবে। ফলাফল,
এই শ্রেনীকে চেকইনে রাখতে হবে।
তাঁদের সুযোগসুবিধা দিতে হবে।

যেমন, আমি নাম নিচ্ছি না, এমন অনেক গনতান্ত্রিক দেশ আছে, যে দেশের আর্মিরা প্রচুর ফরেন মিশনে যায়। জাতিসংঘের পিস মিশন, আফ্রিকান মিশন, এটা সেটা, নানান মিশনে যায়। সরকার এসব সুযোগ সুবিধা করে দেয়।
এসব বিদেশি মিশনের সিংহভাগ ডোনেশন দেয় আমেরিকা আর পশ্চিমা দেশগুলো।
সুতরাং আমেরিকা আর পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সরকারের যদি সম্পর্ক ভালো থাকে, তাহলে আর্মি সুযোগসুবিধা নিয়েই চুপ থাকবে। ক্ষমতা দখল করার চিন্তা সহজে করবে না। কারণ ক্ষমতা দখল করলে পশ্চিমারা রেগে যাবে। তখন মিশনে কর্মরত সেনাদের ফিরিয়ে দেবে। ফরেন মিশনে সেনা নেয়া বন্ধ করে দেবে। ফলাফল, যে আর্মি পারসন ক্ষমতা দখল করবে, তার বিপক্ষে খোদ আর্মির ভেতরেই অসন্তোষ তৈরি হবে। কেউ কি চায় নিজেদের পেটে লাথি মারতে?
সুতরাং আর্মি ক্ষমতা নেবার আগে দশবার ভাববে।
তবে হা... যদি এমন পরিস্থিতি কখনো আসে, পশ্চিমারা নিজেরাই গ্যারান্টি দেয় আর্মিকে যে ক্ষমতা কেড়ে নিলেও সমস্যা হবে না, ইন দ্যাট কেস, আর্মির ভেতরে থাকা উচ্চভীলাসী সেনা কর্মকর্তারা হয়ত তখন ক্ষমতা দখলের ট্রাই করবে। অন্যথায় তেমনটি হবে না।

এই হিসাবটা আফ্রিকার দেশগুলোতে অনেকবেশি প্রচলিত আছে।


সুতরাং, ক্ষমতার মসনদে যে বসে থাকবে, তাঁকে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে, এই প্রভাবশালী শ্রেনী অর্থাৎ ক্ষমতার ব্যাকার + ক্ষমতা কেড়ে নেবার ক্ষমতা যাদের আছে, তাঁদের বেশি পরিমাণ সুযোগসুবিধা দিয়ে শান্ত রাখতে।
সেইসাথে বেশি বিশ্বাসও করা যাবে না।
হোসনি মোবারকের কথা চিন্তা করুণ। তিন দশক কিন্তু ঠিকই ক্ষমতায় থেকেছিলো সে। কিন্তু একদিন না একদিন ঠিকই সমস্যা হবে।


যাই হোক...
এবার আসুন, এসেন্সিয়াল (Essential) / অপরিহার্য শ্রেনী।
এই শ্রেনীতে নানান কিসিমের, নানান ধরণের মানুষ থাকবে।
মসনদে যে বসে আছে, তাহার আপনজন, দলবল, প্রিয়জন, পুলিশ, আমলা, সরকারি বেতনভোগী ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, কর্মকর্তা সহ নানান পদের লোক।
অর্থাৎ দেশের + ক্ষমতার সিস্টেমটাকে সুন্দরমত সচল রাখতে যাদের লাগবে, তাহারা এই সিস্টেমে অন্তর্গত।
উন্নত দেশে বিজ্ঞানী + গবেষক + টেকনোক্রেটরাও এই শ্রেনীতে পড়ে।
যেমন হিটলারের সময়কার জার্মান নাৎসি অনুগত বিজ্ঞানী বা গবেষকদের কথা চিন্তাকরুণ। এরা কিন্তু হিটলারের ক্ষমতার প্রতি কোনো থ্রেট কখনো হবার ক্ষমতা রাখতো না। কিন্তু ছিল অপরিহার্য শ্রেনী।
এদেরকে ব্যবহার করে হিটলার জার্মানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিলো নাটকীয়ভাবে।
অর্থাৎ,
সোজা কথা, শাসনযন্ত্র সুন্দরমত টিকিয়ে রাখতে যাদের দরকার হয়, তাহারাই এই শ্রেনীভুক্ত।
গোয়েন্দাবাহিনীও এই শ্রেনীভুক্ত।
যেমন আমেরিকা গোটা দুনিয়াতে তাঁর প্রভাব বজায় রাখতে সিআইএ ব্যবহার করে। ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার। সিআইএ সেটা সরবরাহ করে।
তবে সোভিয়েত কেজিবি কিন্তু (Essential) / অপরিহার্য শ্রেনী ছিল না। বরং কেজিবি ছিল প্রভাবশালী বা ইনফ্লুয়েন্সিয়াল শ্রেণী।
কেজিবি একটা প্যারালাল সরকারের মত কাজ করতো এবং কেজিবির ক্ষমতা ছিল মসনদ বদলে দেবার। সুতরাং কেজিবি আলাদা হিসাব।

আগেই বলে নিচ্ছি, দেশ ভেদে হিসাবগুলো একটু বদলে যায়। তবে মোটামুটি সিনারিওতে মিল পাবেন।
সোজা হিসাব হল, এসেন্সিয়াল শ্রেণী জীবনে মসনদে বসতে পারবে না, কিন্তু শাসনতন্ত্র চালাতে হলে এই এসেন্সিয়াল শ্রেণীকে খুশি রাখতে হবে।
এরা ঠিকমত কাজ না করলে শাসকের জন্য নানান সমস্যা তৈরি হবে। কোনো শাসকই চাইবে না মসনদে বসে অশান্তিতে থাকতে।
সুতরাং সব প্রভাবশালী শ্রেণীর দাবিদাওয়া পুরনের পরই শাসক নজর দেবে অপরিহার্য শ্রেণীর দাবিদাওয়া, বেতনভাতা, আবাসন সুবিধা, এটাসেটা সহ ছোটখাটো নানান দাবিদাওয়া পুরন করতে।

এবার শেষ শ্রেণী হল, আমজনতা। অর্থাৎ ইন্টারচেঞ্জেবল (interchangeable) / বিনিমেয়
এরা না প্রভাবশালী, না অপরিহার্য।
তবে হা... ক্ষেত্র বিশেষে বা পেক্ষাপটভেদে এরা কখনো অপরিহার্য আবার কখনো খোদ প্রভাবশালীও হয়ে যেতে পারে, আবার অনেকসময় এদের মূল্য থাকে সবার পরে।
ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা না করে বললে বুঝবেন না।

যেমন, নর্থ কোরিয়ার কথা চিন্তা করুণ।
সেই দেশে কোনো গনতন্ত্র নাই। চলতেছে এবসোল্যুট ডিক্টেটরশিপ।
তো সেইদেশের প্রভাবশালী শ্রেণী হল নর্থ কোরিয়ার আর্মি + বিদেশী প্রভু “চীন”
কিম জং উনকে সবার আগে এই দুই শ্রেণীকে খুশি রাখতে হবে। নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে।
সুযোগসুবিধা দিতে হবে।
এরপর আসতেছে অপরিহার্য শ্রেণী, বা এসেন্সিয়াল।
যেমন কমিউনিস্ট পার্টি, আমলা, বিচারবিভাগ, পুলিশ, বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার,
এসব।
এদেরকে সুযোগসুবিধা দিতে হবে। তাহলে অন্তত রিজিম ক্যালাপস করবে না।
এরপর সবার শেষে আসতেছে আমজনতা। বা ইন্টারচেঞ্জেবল।
এরা না খেয়ে মরলেও সমস্যা নেই। আমজনতাকে নানান উপায়ে ভুলিয়ে রাখা যায়, ম্যানুপুলেট করা যায়। দুর্ভিক্ষ হলেও নর্থ কোরিয়াতে সরকার পতন হয় না, কারণ প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণী থাকে কিম পরিবারের পকেটে।
একই হিসাব জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবের জন্যেও প্রযোজ্য ছিল।
রবার্ট মুগাবে যুগের পর যুগ জিম্বাবুয়ে শাসন করেছে একটানা। এবং তাঁর শাসন আমলে অব্যবস্থাপনা চরমে উঠে গিয়েছিলো। জিম্বাবুয়ের মানুষ দিনকে দিন গরিব হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে মুগাবে ছিল সফল। কারণ মুগাবে জানতো, ক্ষমতায় বসে থাকতে হলে কাদেরকে হাতে রাখতে হবে।
এবং মুগাবে ঠিক তাঁদেরই সুযোগসুবিধা দিতো।

ডিক্টেটরশিপ যে দেশে চলে, সেইদেশের প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীর আকার হয় অনেক ছোট। ওদিকে ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী বা আমজনতার আকার হয় অনেক বড়।
ফলাফল, রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে সাপ্লাই হওয়া সুযোগসুবিধাগুলো প্রভাবশালী আর অপরিহার্য শ্রেণী অনেক বেশি ভোগ করে। (কারণ তাঁদের আকার ছোট)
সেইসাথে ডিক্টেটরও আমজনতার উপর ইচ্ছামত কর আরোপ করতে পারে। কারণ আমজনতা অসহায়। তাঁদের উপর বেশি কর আরোপ করে আরো বেশি টাকা তুলতে পারে এবং সেই টাকায় প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণী আরো বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে।
সুতরাং হিসাবটা বুঝতে পারতেছেন।
প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীর জন্য ডিক্টেটরশিপ রীতিমত আশীর্বাদ।

অন্যদিকে যদি দেশে গনতন্ত্র থাকে, তাহলে কি হয় চিন্তা করুণ।
বিশাল পরিমাণ আমজনতা, অর্থাৎ ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী প্রতি চার বছর বা দেশভেদে পাঁচ বছর পরপর রীতিমত প্রভাবশালী শ্রেণীর ভুমিকাতে অবর্তীর্ণ হয়। ভোট দেয়। ভোট দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল করতে পারে।
সুতরাং ক্ষমতায় যে বসে, সে চিন্তা করে কিছুতেই এই আমজনতা বা ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণীকে খ্যাপানো যাবে না। অন্তত সামান্যকিছু হলেও বা যতটুকু না হলেই না, ততটুকু সুযোগসুবিধা তাঁদের দিতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট, চালডাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পাতির সাপ্লাই নিশ্চিত করতে হবে আমজনতার জন্য। এতে আমজনতা শান্ত থাকবে।
চার বছর বা দেশভেদে পাঁচ বছর পর ভোট হলে তখন আমজনতা যাতে ভোট দেয় অন্তত।
সেইসাথে জনতার উপর ইচ্ছামত কর আরোপ করাও যাবে না। তাতেও জনতা রেগে যাবে।

গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতেও প্রভাবশালী শ্রেণী ও অপরিহার্য শ্রেণী বিদ্যমান। তবে ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী বা আমজনতা যেহেতু তিনশ্রেণীতেই সময়ে সময়ে অবস্থান করে, বা ওভারল্যাপ করে, সেজন্য ক্ষমতার মসনদে যে বসে আছে, তাঁকে পুরস্কারের বন্টন বা সুযোগসুবিধার বন্টন বেশ সাবধানে করতে হয়। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে প্রভাবশালী আর অপরিহার্য শ্রেণী সুযোগসুবিধা ঠিকই ভোগ করে, কিন্তু সেটা কখনোই ডিক্টেটরশিপে যেপরিমাণ একচেটিয়া সুযোগসুবিধা পায়, সেটার মত নয়।
যেমন গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে গনতান্ত্রিক দলগুলো নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে। গনতান্ত্রিক দলগুলো চালাতে বড়বড় বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ফান্ডিং লাগে। টাকা লাগে। এসব বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতায় গিয়ে সুযোগসুবিধা দিতে হয়। সরকারি কনট্রাক্ট, ঠিকাদারি কাজ, এসব দিতে হয়।
গনতান্ত্রিক সরকারকেও একইভাবে প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। এরপর অবশ্য আমজনতার ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হয়।
যদি একটা দেশে সত্যিকার গনতন্ত্র থাকে, তাহলে সেইদেশে দুর্ভীক্ষ হলে পরবর্তী নির্বাচনে অবশ্যই ক্ষমতার পালাবদল হবে। এটা পানির মত পরিস্কার হিসাব।

যাই হোক, আমি গনতন্ত্র বলতে বাস্তব ও কার্যকর গনতন্ত্রের কথা বলছি। লোক দেখানো গনতন্ত্র না।

সুতরাং প্রফেসর ব্রুসের মতে,
মসনদ ও ক্ষমতার ধরণ যেমনই হোক,
ক্ষমতাধরকে-
প্রভাবশালী, অপরিহার্য এবং (বিনিময়ে/ আমজনতা),
এই তিন শ্রেণীকে ফেস করতে হবে।

এতোটুকু যা লিখলাম, সেটা হল ইন্ট্রোডাকশন। বা সূচনা।
এবার এই বিষয়গুলোকে ভালোমত বিশ্লেষণের জন্য উদাহরণ প্রয়োজন।
আমি আমার এই সিরিজ লিখাটি প্রফেসর ব্রুসের “ডিক্টেটরস হ্যান্ডবুক” বইটির বিশ্লেষণ ও এনালাইসিসের সাথে নিজের বিশ্লেষণ যোগ করে তুলে ধরবো।
এই লিখাটি লিখছি মুলত বইটির আলোকে।

যেমন, বইটিতে শুরুতেই যাকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তিনি ফ্রান্সের রাজা লুই-১৪

একেবারে সংক্ষেপে লুই’এর জীবনের ঘটনাগুলো তুলে ধরা যাক।


লুই মাত্র ৪ বছর বয়সে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলেন। উনার বাবা মারা গিয়েছিলেন। ফলে রাজার ছেলে রাজা হলেন।
তো বুঝতেই পারতেছেন, মাত্র চার বছর বয়সে তো আর কেউকিছু বোঝে না। রাজ্য চালানো তো প্রশ্নই আসে না।
সুতরাং লুই-১৪ রাজা হিসেবে থাকলেও কার্যত রাজ্য পরিচালনা করতেছিলো তাঁর মা এবং সেইসাথে ফ্রান্সের এরিস্ট্রোক্র্যাট বা প্রভাবশালী শ্রেণী।
লুটেপুটেই চলতেছিলো রাজ্য শাসন। প্রভাবশালী শ্রেণী তথা ধনিক শ্রেণী ফ্রান্সকে রীতিমত দেউলিয়া করে ফেলেছিলো।
১৬৬১ সালে যখন লুই-১৪ এর বয়স ২৩ বছর, তখন যুবক লুই রাজ্যের সত্যিকারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেবার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু তিনি দেখলেন, নামকাওয়াস্তে তিনি রাজা। কার্যত দেশ চলে গিয়েছে এরিস্ট্রোক্রেসির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আর্মিও অসন্তুষ্ট। কার্যত দেশ দেউলিয়া। পলিটিক্যাল ক্রাইসিস যখন তখন শুরু হবে। এবং সেটা হলে লুই’এর গর্দান যাবে।
ওদিকে লুই খবর পেলেন, প্রভাবশালীরা চিন্তাভাবনা করতেছে ফ্রান্সের ক্ষমতার পালা বদলের। নতুন কাউকে ক্ষমতায় আনার। এটা মুলত একটা আইওয়াশ। অর্থাৎ দেশের দিশেহারা মানুষকে একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়ে শান্ত করার। সেইসাথে ভবিষ্যতেও নিজেদের লুটপাটতন্ত্র চালু রাখার।
তো লুই-১৪ বেশ সাবধানে এগোলেন। নবীন আর্মি অফিসারদের প্রমোশন দিলেন, এবং বয়স্ক আর্মি অফিসারদের অবসরে পাঠালেন এবং নতুন মানুষদের রাজার “Inner Circle” বা পলিটিক্যাল ক্ষমতার প্রভাববলয়ের ভেতরে নিয়ে আসতে শুরু করলেন।
আর্মি অফিসার র‍্যাঙ্কে প্রচুর নিয়োগ দিলেন একেবারে আমজনতার ভেতর থেকে।
আর্মি আরোবেশি রাজনীতিতে ইনভল্ভ হতে শুরু করলো।
এটা করে তিনি মুলত পুরনো এরিস্ট্রোক্র্যাসির ভেতর ফ্রেশ ব্লাড সঞ্চালন করতেছেন। সেইসাথে একটা নতুন এরিস্ট্রোক্রেসি তৈরি করতেছেন যারা রাজার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে এবং দায়বদ্ধ থাকবে। লুই খুব দ্রুত কাজটি করেছিলেন এবং আঘাত আসার আগেই তিনি পুরনো এরিস্ট্রোক্র্যাটদের টেকনিক্যালি আইসোলেট করে এবং পরে ক্ষমতার বলয়ের বাইরে ঠেলে দিয়ে ফ্রান্সের শাসনতন্ত্র এবং মসনদকে নতুনভাবে নিজেরমত করে গড়ে তোলেন।

সেইসাথে দীর্ঘদিন যারা প্রভাবশালী শ্রেণী হিসেবে বেশ আরামে ছিল, নিশ্চিন্তে ছিল, তাঁদের ভেতরই এবার কম্পিটিশন শুরু হয়ে গেল। নতুন ভার্সেস পুরনো।
এরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখতে নিজেদের ভেতর কম্পিটিসন শুরু করলো। ফলাফল, রাজা হটানোর চিন্তা আপাতত তাঁদের মাথা থেকে আউট।

আর এন্ড গেম হল, দিনশেষে লুই একেবারে লয়্যাল ইনার সার্কেল তৈরি করলেন একেবার নিজের হাতে গড়া লোক দিয়ে। পুরনো মানুষগুলোকে ঝেড়ে ফেলে।

এই লুই-১৪ গোটা ফ্রান্স সম্রাজ্যকেই বদলে দিয়েছিলেন পরে।
লুই-১৪ শাসনামলে ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আটল্যান্টিকের অন্যপাশে, অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশেও ফ্রান্সের প্রভাববৃদ্ধি পায়। তাঁর তৈরি করা 'কোড অফ ল” পরবর্তীতে নেপোলিয়নিক কোড তৈরিতেও ইনফ্লুয়েন্স করে এবং আধুনিক ফ্রান্সের আইনের ব্যাসিকও এসেছে সেই লুই-১৪ এর কাছ থেকেই।
লুই যে আধুনিক ধাচের আর্মি গড়ে তুলেছিলেন নতুন করে, নতুনভাবে, সেটা পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য শক্তিশালী সম্রাজ্যগুলোও অনুসরণ করেছিলো।

সুতরাং রাজা লুই-১৪ ছোট বয়সেই বুঝেছিলেন, ক্ষমতায় থাকতে হলে আগে প্রভাবশালী শ্রেনীকে চেকইন দিতে হবে। নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।
এরপর আসবে অপরিহার্য এবং বিনিমেয়রা...


(ধারাবাহিকভাবে সিরিজ আকারে বাকিঅংশ লিখা হবে)
ধন্যবাদ।
রেফারেন্স বইঃ “ডিক্টেটরস হ্যান্ডবুক” বাই প্রফেসর ব্রুস
Read More »