Sunday, January 14, 2018

মসনদের রাজনীতি -১০১ (ক্লাস-১)



ক্ষমতা কি জিনিস?
ক্ষমতার মসনদে গেলে মানুষ কেন বদলে যায়?
আসুন, আমরা ক্ষমতাবানদের বোঝার চেষ্টা করি লেখক ব্রুস ব্রুনোর চোখে এবং বিশ্লেষণের মধ্যদিয়ে।
Bruce Bueno de Mesquita is a political scientist,
professor at New York University, and senior fellow at Stanford University's Hoover Institution.

একটি রুলস সবার আগে বিবেচনায় রাখুন।
ক্ষমতায় যাবার আগে যারা চিন্তা করে কিভাবে ক্ষমতায় যাবো,আবার ক্ষমতায় বসার পর তাদের চিন্তা শুরু হয়, কিভাবে ক্ষমতায় থাকবো।
এই চিন্তা সর্বদা তাদের ব্যস্ত রাখবে। রাখবেই রাখবে।

আপনি ভুলেও ভাববেন না, নর্থকোরিয়ার নেতা কিম জন উনের ক্ষমতা হারানোর ভয় নেই। অবশ্যই আছে।
ক্ষমতা হারানোর ভয় যেমন জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলের আছে,
তেমন কিম জন উনেরও আছে।

কিন্তু এখানে একটা জিনিস খেয়াল করেন।
জার্মানির নেতা এঙ্গেলা মার্কেল
আর নর্থ কোরিয়ার নেতা কিম জং উন,
দুজনের ক্ষমতার ধরণ আলাদা।

মার্কেল একটি গনতান্ত্রিক দেশের নেত্রী। জার্মানিতে সত্যিকার অর্থেই গনতান্ত্রিক চর্চা বিদ্যমান।
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামবে নির্বাচনে হেরে। (মারা গেলে ভিন্ন হিসাব)
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামলে তাঁর আহামরি খারাপ তেমনকিছুই হবে না। হয়ত দুর্নীতি করে থাকলে নেক্সট সরকার এসে সেই দুর্নীতির তদন্তে নামবে। মার্কেলকে কোর্টে হাজিরা দিতে হবে। এই যা।
মার্কেল ক্ষমতা থেকে নামলে তিনি “জার্মান চ্যান্সেলর” থেকে একজন “সাধারণ নাগরিক” হয়ে যাবেন।

কিন্তু কিম জং উন?
সে ক্ষমতা থেকে নামবে তখনই, যখন তাঁকে ক্ষমতা থেকে নামানো হবে জোর করে। হত্যা করা হবে সাদ্দামের মত অথবা জেলে ভরা হবে।
যে পদের ক্ষমতা যত বেশি, সেই পদ ততবেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এবং ক্ষমতা হারানোর ভয়ও ততবেশি।
জার্মানিতে মার্কেল যে পরিমাণ ক্ষমতাবান,
কিম জং উন উত্তর কোরিয়াতে আরো বেশি ক্ষমতাবান।
জার্মানিতে মার্কেল যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। ইচ্ছা হলে দশটা মানুষকে মেরে ফেলার ক্ষমতা মার্কেলের নেই। মার্কেলের ক্ষমতা জার্মানির সাংবিধানিক রুলস এন্ড রেগুলেশনে বাধা।
মার্কেল যেটা করেন, সেটা সাংবিধান চাকরি।
কিন্তু উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম?
সে তো উত্তর কোরিয়াতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারি। যা ইচ্ছা করতে পারে সে। উনার উপর কথা বলার সাহস কারো নেই। উনার আদেশ যেটাই হোক, মেনে চলতে হবে সবাইকে।

আর এজন্যেই কিম জং উনের ক্ষমতা যেমন বেশি, ঠিক তেমনই ক্ষমতা হারানোর ভয় বা প্যারানোয়া জার্মানির মার্কেলের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণ বেশি। আর ক্ষমতা হারালে পরিনতিও ভয়াবহ।
আর এজন্য ক্ষমতার প্রতি হুমকি হতে পারে, এমন কোনোকিছুকেই তিনি স্বাভাবিকভাবেই টলারেট করেন না।

নানান দেশে নানান ধরণের শাসন ব্যবস্থা চলতেছে। কোথাও গনতন্ত্র, কোথাও সামরিক সরকার, কোথাও একনায়কতন্ত্র, কোথাও রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র,
নানান ধরণের শাসন ব্যবস্থা চলতেছে।
কনভেনশন্যাল উইজডম অনুসারে আমরা নর্থ কোরিয়ার নেতা কিম জং উন’কে একজন ডিক্টেটর বা একনায়ক হিসেবেই চিনি।

তবে শাসনব্যবস্থা যেমনই হোক,
একটা জিনিস সবার আগে মনে রাখতে হবে,
No Leader Can Lead Unilaterally. No Leader is monolithic.

অর্থাৎ একাএকা কোনো লিডারের পক্ষেই দেশ চালানো সম্ভব না। সেটা অতীতের হিটলার বা জোসেফ স্তালিনের জন্যেও সমান সত্য ছিল।
ঠিক একইভাবি সত্য কিম জং উনের জন্যেও।
আমরা কেবল ক্ষমতার মসনদে বসা ব্যক্তিটিকেই দেখি।
ক্ষমতার মসনদটিকে যেসব স্তম্ভগুলো সাপোর্ট দিয়ে ধরে রাখে, সেগুলোকে দেখিনা।
প্রফেসর ব্রুসের লিখা “dictator's Handbook” বইটিতে প্রথমেই আলোচনায় এসেছে মসনদের এই স্তম্ভগুলো।
তিনি গনতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, ধনতন্ত্র, Oligarchy, মেরিটোক্র্যাসি সহ আরো যতধরণের ব্যবস্থা প্রচলিত আছে,
সবগুলোর ভেতর একটা কমন সিনারিও তুলে ধরেছেন। এসব গতানুগতিক ক্লাসিফিকেশন বাদ দিয়ে তিনি বলেছেন, ক্ষমতার মসনদে যে বা যারাই বসুক,
তাঁদের বা তাঁকে মুলত তিন শ্রেণীর মানুষ ডিল করতে হয়।
১. ইনফ্লুয়েন্সিয়াল (Influential) / প্রভাবশালী
২. এসেন্সিয়াল (Essential) / অপরিহার্য
৩. ইন্টারচেঞ্জেবল (interchangeable) / বিনিমেয়

তো প্রভাবশালী শ্রেনী কারা?
আমরা গতানুগতিকভাবে যাদেরকে প্রভাবশালী বলি। সেই প্রভাবশালীদের বোঝাচ্ছেনা এখানে।
এখানে প্রভাবশালী শ্রেনী বলতে তাঁদেরকে বোঝানো হচ্ছে, যাদেরকে মসনদে বসে আপনার “নিয়ন্ত্রণে” রাখতে হবে এবং যারা আপনাকে “ক্ষমতা থেকে নামানোর ক্ষমতা” রাখে।
এই জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশের সামরিকবাহিনী এই শ্রেণীর অন্তর্গত। সেইসাথে ফরেন ব্যাকার, তথা “বিদেশী প্রভু”রাও এই শ্রেনীতে পড়ে।
একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে।
মিশরের আরব বসন্তের কথা চিন্তা করুণ।
হোসনি মোবারকের তিন দশকের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হল। মানুষজন রাস্তায় নামলো। মিশরের তেহরির স্কোয়ার মানুষে ভরে গেল।
হোসনি মোবারক পুলিশ দিয়ে জনসমুদ্র নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেন।
এরপর তিনি আর্মি নামালেন।
আর্মি ট্যাঙ্ক গোটা তেহরির স্কোয়ার ঘিরে ফেললো। কিন্তু মানুষের গায়ে একটি বুলেটও ছুড়লো না।
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। ওদিকে মানুষের মিছিলে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে গেল। ট্যাঙ্কে বসা সেনারা কার্যত কিছুই করলো না।

অর্থাৎ?
অর্থাৎ বোঝা হয়ে গেল, হোসনি মোবারক ক্ষমতার মসনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ Influential পিলার বা স্তম্ভ হারিয়ে ফেলেছেন। সেটা হল “আর্মি”
তখন বুঝতে আর বাকি রইলো না, মিশরের আর্মি এখন হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে।
মিশরের রাজনীতি যারা পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁরা ভালো করেই জানেন, মিশরের রাজণীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে আর্মি আর আমেরিকা।
হোসনি মোবারক নিজেও একসময় বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন।
তো আমেরিকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ Influential স্তম্ভ।
আর্মি যেহেতু মোবারকের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সেহেতু এটাও বোধগম্য, আমেরিকাও আর চাচ্ছে না হোসনি মোবারক ক্ষমতায় থাকুক।
সুতরাং ফলাফল কি?
ফলাফল হল, মোবারক’কে এখন ক্ষমতা থেকে নামতে হবে। ইশারা পরিস্কার।

তো মোবারক সত্যিসত্যিই ক্ষমতা থেকে নেমে গেল। আর্মি পুলিশ গিয়ে হোসনি মোবারককে গ্রেফতার করলো।
ওদিকে আমজনতা?
আমজনতা কিন্তু মহাখুশি।
আমজনতার ধারণা, তাঁদের গনআন্দোলন আর বিশাল মিছিলের ঠেলায় হোসনি মোবারকের পতন ঘটেছে। সুতরাং
গোটাবিশ্বে এবার নিউজ পেপারে হেডলাইন হইল,
“জনতার আন্দোলন তথা আরব বসন্তে মোবারক পদচ্যুত”

ওকে... ফাইন।
খুব ভালো কথা।
এরপর কি হল?
এরপর মিশরে ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন হইলো। কে জিতলো?

জিতলো, মুসলিম ব্রাদারহুড।
খোদ আর্মির পরোক্ষ তত্ত্বাবধানেই নির্বাচন হয়েছিলো। মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি পেল ৫১.৭৩% ভোট।
মোহাম্মদ মুরসি হল প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু এখানে তো সমস্যা। এই মুসলিম ব্রাদারহুডকে দুচোখে দেখতে পারে না আমেরিকা আর আর্মি। এই দুইটা ইনফ্লুয়েন্সিয়াল স্তম্ভ একবছর যেতে না যেতেই ঠিকই মুরসির পতনের আয়োজন করলো।
কি হল এরপর?
আবার মিশরের তেহরির স্কোয়ারে আন্দোলন শুরু হল। এবার দাবি, মুরসি’কে ক্ষমতা থেকে নামাও। এরা মুলত এন্টি ব্রাদারহুড জনতা।
আবার ঠিক তখন মিশরের বড়বড় শহরগুলো ব্রাদারহুডের সমর্থকদের বিশাল মিছিল, তাদের দাবি, মুরসিকে ক্ষমতায় রাখো।

ব্যস, এবার আবার আর্মি নামলো। মুরসিকে গ্রেফতার করলো এবং হা... মুরসির সমর্থকদের উপর আর্মি নির্বিচারে গুলি চালালো। Rabaa স্কয়ারে গোলাগুলিতে বহুমানুষ মারা গেল।
কত মানুষ মারা গিয়েছিল, সঠিক হিসাব নেই।

ঠিকই মিশরকে রক্তে ভাসিয়ে এবার আর্মি ক্ষমতা নিয়ে নিলো।



ব্রাদারহুড আর এন্টি ব্রাদারহুড,
দুইগ্রুপই এবার আর্মির গুলির ভয়ে জীবন বাঁচাতে ঘরে ফেললো।
সেই হতে আমেরিকান ব্যাকিং নিয়ে আব্দুল ফাতাহ আল সিসি মিশরের ক্ষমতায়।
হোসনি মোবারক গেল। সিসি এলো।
মিশর সেই আগের মতই ডিক্টেটরশিপের আন্ডারেই রয়ে গেল।
এখন যদি সিসি’র পদত্যাগের দাবিতে কোনো মিসিল হয় তেহরির স্কোয়ারে,
নিশ্চিত থাকুন, আর্মি এসে গুলি করে ঝাঁজরা করে দেবে। কেউকিছু বলবে না। আমেরিকাও চুপ করে থাকবে।

সুতরাং বুঝতেই পারতেছেন, ইনফ্লুয়েন্সিয়াল বা প্রভাবশালী শ্রেনীকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আপনার ক্ষমতার গদী নড়ে যাবে। ফলাফল,
এই শ্রেনীকে চেকইনে রাখতে হবে।
তাঁদের সুযোগসুবিধা দিতে হবে।

যেমন, আমি নাম নিচ্ছি না, এমন অনেক গনতান্ত্রিক দেশ আছে, যে দেশের আর্মিরা প্রচুর ফরেন মিশনে যায়। জাতিসংঘের পিস মিশন, আফ্রিকান মিশন, এটা সেটা, নানান মিশনে যায়। সরকার এসব সুযোগ সুবিধা করে দেয়।
এসব বিদেশি মিশনের সিংহভাগ ডোনেশন দেয় আমেরিকা আর পশ্চিমা দেশগুলো।
সুতরাং আমেরিকা আর পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সরকারের যদি সম্পর্ক ভালো থাকে, তাহলে আর্মি সুযোগসুবিধা নিয়েই চুপ থাকবে। ক্ষমতা দখল করার চিন্তা সহজে করবে না। কারণ ক্ষমতা দখল করলে পশ্চিমারা রেগে যাবে। তখন মিশনে কর্মরত সেনাদের ফিরিয়ে দেবে। ফরেন মিশনে সেনা নেয়া বন্ধ করে দেবে। ফলাফল, যে আর্মি পারসন ক্ষমতা দখল করবে, তার বিপক্ষে খোদ আর্মির ভেতরেই অসন্তোষ তৈরি হবে। কেউ কি চায় নিজেদের পেটে লাথি মারতে?
সুতরাং আর্মি ক্ষমতা নেবার আগে দশবার ভাববে।
তবে হা... যদি এমন পরিস্থিতি কখনো আসে, পশ্চিমারা নিজেরাই গ্যারান্টি দেয় আর্মিকে যে ক্ষমতা কেড়ে নিলেও সমস্যা হবে না, ইন দ্যাট কেস, আর্মির ভেতরে থাকা উচ্চভীলাসী সেনা কর্মকর্তারা হয়ত তখন ক্ষমতা দখলের ট্রাই করবে। অন্যথায় তেমনটি হবে না।

এই হিসাবটা আফ্রিকার দেশগুলোতে অনেকবেশি প্রচলিত আছে।


সুতরাং, ক্ষমতার মসনদে যে বসে থাকবে, তাঁকে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে, এই প্রভাবশালী শ্রেনী অর্থাৎ ক্ষমতার ব্যাকার + ক্ষমতা কেড়ে নেবার ক্ষমতা যাদের আছে, তাঁদের বেশি পরিমাণ সুযোগসুবিধা দিয়ে শান্ত রাখতে।
সেইসাথে বেশি বিশ্বাসও করা যাবে না।
হোসনি মোবারকের কথা চিন্তা করুণ। তিন দশক কিন্তু ঠিকই ক্ষমতায় থেকেছিলো সে। কিন্তু একদিন না একদিন ঠিকই সমস্যা হবে।


যাই হোক...
এবার আসুন, এসেন্সিয়াল (Essential) / অপরিহার্য শ্রেনী।
এই শ্রেনীতে নানান কিসিমের, নানান ধরণের মানুষ থাকবে।
মসনদে যে বসে আছে, তাহার আপনজন, দলবল, প্রিয়জন, পুলিশ, আমলা, সরকারি বেতনভোগী ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, কর্মকর্তা সহ নানান পদের লোক।
অর্থাৎ দেশের + ক্ষমতার সিস্টেমটাকে সুন্দরমত সচল রাখতে যাদের লাগবে, তাহারা এই সিস্টেমে অন্তর্গত।
উন্নত দেশে বিজ্ঞানী + গবেষক + টেকনোক্রেটরাও এই শ্রেনীতে পড়ে।
যেমন হিটলারের সময়কার জার্মান নাৎসি অনুগত বিজ্ঞানী বা গবেষকদের কথা চিন্তাকরুণ। এরা কিন্তু হিটলারের ক্ষমতার প্রতি কোনো থ্রেট কখনো হবার ক্ষমতা রাখতো না। কিন্তু ছিল অপরিহার্য শ্রেনী।
এদেরকে ব্যবহার করে হিটলার জার্মানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিলো নাটকীয়ভাবে।
অর্থাৎ,
সোজা কথা, শাসনযন্ত্র সুন্দরমত টিকিয়ে রাখতে যাদের দরকার হয়, তাহারাই এই শ্রেনীভুক্ত।
গোয়েন্দাবাহিনীও এই শ্রেনীভুক্ত।
যেমন আমেরিকা গোটা দুনিয়াতে তাঁর প্রভাব বজায় রাখতে সিআইএ ব্যবহার করে। ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার। সিআইএ সেটা সরবরাহ করে।
তবে সোভিয়েত কেজিবি কিন্তু (Essential) / অপরিহার্য শ্রেনী ছিল না। বরং কেজিবি ছিল প্রভাবশালী বা ইনফ্লুয়েন্সিয়াল শ্রেণী।
কেজিবি একটা প্যারালাল সরকারের মত কাজ করতো এবং কেজিবির ক্ষমতা ছিল মসনদ বদলে দেবার। সুতরাং কেজিবি আলাদা হিসাব।

আগেই বলে নিচ্ছি, দেশ ভেদে হিসাবগুলো একটু বদলে যায়। তবে মোটামুটি সিনারিওতে মিল পাবেন।
সোজা হিসাব হল, এসেন্সিয়াল শ্রেণী জীবনে মসনদে বসতে পারবে না, কিন্তু শাসনতন্ত্র চালাতে হলে এই এসেন্সিয়াল শ্রেণীকে খুশি রাখতে হবে।
এরা ঠিকমত কাজ না করলে শাসকের জন্য নানান সমস্যা তৈরি হবে। কোনো শাসকই চাইবে না মসনদে বসে অশান্তিতে থাকতে।
সুতরাং সব প্রভাবশালী শ্রেণীর দাবিদাওয়া পুরনের পরই শাসক নজর দেবে অপরিহার্য শ্রেণীর দাবিদাওয়া, বেতনভাতা, আবাসন সুবিধা, এটাসেটা সহ ছোটখাটো নানান দাবিদাওয়া পুরন করতে।

এবার শেষ শ্রেণী হল, আমজনতা। অর্থাৎ ইন্টারচেঞ্জেবল (interchangeable) / বিনিমেয়
এরা না প্রভাবশালী, না অপরিহার্য।
তবে হা... ক্ষেত্র বিশেষে বা পেক্ষাপটভেদে এরা কখনো অপরিহার্য আবার কখনো খোদ প্রভাবশালীও হয়ে যেতে পারে, আবার অনেকসময় এদের মূল্য থাকে সবার পরে।
ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা না করে বললে বুঝবেন না।

যেমন, নর্থ কোরিয়ার কথা চিন্তা করুণ।
সেই দেশে কোনো গনতন্ত্র নাই। চলতেছে এবসোল্যুট ডিক্টেটরশিপ।
তো সেইদেশের প্রভাবশালী শ্রেণী হল নর্থ কোরিয়ার আর্মি + বিদেশী প্রভু “চীন”
কিম জং উনকে সবার আগে এই দুই শ্রেণীকে খুশি রাখতে হবে। নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে।
সুযোগসুবিধা দিতে হবে।
এরপর আসতেছে অপরিহার্য শ্রেণী, বা এসেন্সিয়াল।
যেমন কমিউনিস্ট পার্টি, আমলা, বিচারবিভাগ, পুলিশ, বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার,
এসব।
এদেরকে সুযোগসুবিধা দিতে হবে। তাহলে অন্তত রিজিম ক্যালাপস করবে না।
এরপর সবার শেষে আসতেছে আমজনতা। বা ইন্টারচেঞ্জেবল।
এরা না খেয়ে মরলেও সমস্যা নেই। আমজনতাকে নানান উপায়ে ভুলিয়ে রাখা যায়, ম্যানুপুলেট করা যায়। দুর্ভিক্ষ হলেও নর্থ কোরিয়াতে সরকার পতন হয় না, কারণ প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণী থাকে কিম পরিবারের পকেটে।
একই হিসাব জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবের জন্যেও প্রযোজ্য ছিল।
রবার্ট মুগাবে যুগের পর যুগ জিম্বাবুয়ে শাসন করেছে একটানা। এবং তাঁর শাসন আমলে অব্যবস্থাপনা চরমে উঠে গিয়েছিলো। জিম্বাবুয়ের মানুষ দিনকে দিন গরিব হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে মুগাবে ছিল সফল। কারণ মুগাবে জানতো, ক্ষমতায় বসে থাকতে হলে কাদেরকে হাতে রাখতে হবে।
এবং মুগাবে ঠিক তাঁদেরই সুযোগসুবিধা দিতো।

ডিক্টেটরশিপ যে দেশে চলে, সেইদেশের প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীর আকার হয় অনেক ছোট। ওদিকে ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী বা আমজনতার আকার হয় অনেক বড়।
ফলাফল, রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে সাপ্লাই হওয়া সুযোগসুবিধাগুলো প্রভাবশালী আর অপরিহার্য শ্রেণী অনেক বেশি ভোগ করে। (কারণ তাঁদের আকার ছোট)
সেইসাথে ডিক্টেটরও আমজনতার উপর ইচ্ছামত কর আরোপ করতে পারে। কারণ আমজনতা অসহায়। তাঁদের উপর বেশি কর আরোপ করে আরো বেশি টাকা তুলতে পারে এবং সেই টাকায় প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণী আরো বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে।
সুতরাং হিসাবটা বুঝতে পারতেছেন।
প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীর জন্য ডিক্টেটরশিপ রীতিমত আশীর্বাদ।

অন্যদিকে যদি দেশে গনতন্ত্র থাকে, তাহলে কি হয় চিন্তা করুণ।
বিশাল পরিমাণ আমজনতা, অর্থাৎ ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী প্রতি চার বছর বা দেশভেদে পাঁচ বছর পরপর রীতিমত প্রভাবশালী শ্রেণীর ভুমিকাতে অবর্তীর্ণ হয়। ভোট দেয়। ভোট দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল করতে পারে।
সুতরাং ক্ষমতায় যে বসে, সে চিন্তা করে কিছুতেই এই আমজনতা বা ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণীকে খ্যাপানো যাবে না। অন্তত সামান্যকিছু হলেও বা যতটুকু না হলেই না, ততটুকু সুযোগসুবিধা তাঁদের দিতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট, চালডাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পাতির সাপ্লাই নিশ্চিত করতে হবে আমজনতার জন্য। এতে আমজনতা শান্ত থাকবে।
চার বছর বা দেশভেদে পাঁচ বছর পর ভোট হলে তখন আমজনতা যাতে ভোট দেয় অন্তত।
সেইসাথে জনতার উপর ইচ্ছামত কর আরোপ করাও যাবে না। তাতেও জনতা রেগে যাবে।

গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতেও প্রভাবশালী শ্রেণী ও অপরিহার্য শ্রেণী বিদ্যমান। তবে ইন্টারচেঞ্জেবল শ্রেণী বা আমজনতা যেহেতু তিনশ্রেণীতেই সময়ে সময়ে অবস্থান করে, বা ওভারল্যাপ করে, সেজন্য ক্ষমতার মসনদে যে বসে আছে, তাঁকে পুরস্কারের বন্টন বা সুযোগসুবিধার বন্টন বেশ সাবধানে করতে হয়। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে প্রভাবশালী আর অপরিহার্য শ্রেণী সুযোগসুবিধা ঠিকই ভোগ করে, কিন্তু সেটা কখনোই ডিক্টেটরশিপে যেপরিমাণ একচেটিয়া সুযোগসুবিধা পায়, সেটার মত নয়।
যেমন গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে গনতান্ত্রিক দলগুলো নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে। গনতান্ত্রিক দলগুলো চালাতে বড়বড় বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ফান্ডিং লাগে। টাকা লাগে। এসব বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতায় গিয়ে সুযোগসুবিধা দিতে হয়। সরকারি কনট্রাক্ট, ঠিকাদারি কাজ, এসব দিতে হয়।
গনতান্ত্রিক সরকারকেও একইভাবে প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। এরপর অবশ্য আমজনতার ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হয়।
যদি একটা দেশে সত্যিকার গনতন্ত্র থাকে, তাহলে সেইদেশে দুর্ভীক্ষ হলে পরবর্তী নির্বাচনে অবশ্যই ক্ষমতার পালাবদল হবে। এটা পানির মত পরিস্কার হিসাব।

যাই হোক, আমি গনতন্ত্র বলতে বাস্তব ও কার্যকর গনতন্ত্রের কথা বলছি। লোক দেখানো গনতন্ত্র না।

সুতরাং প্রফেসর ব্রুসের মতে,
মসনদ ও ক্ষমতার ধরণ যেমনই হোক,
ক্ষমতাধরকে-
প্রভাবশালী, অপরিহার্য এবং (বিনিময়ে/ আমজনতা),
এই তিন শ্রেণীকে ফেস করতে হবে।

এতোটুকু যা লিখলাম, সেটা হল ইন্ট্রোডাকশন। বা সূচনা।
এবার এই বিষয়গুলোকে ভালোমত বিশ্লেষণের জন্য উদাহরণ প্রয়োজন।
আমি আমার এই সিরিজ লিখাটি প্রফেসর ব্রুসের “ডিক্টেটরস হ্যান্ডবুক” বইটির বিশ্লেষণ ও এনালাইসিসের সাথে নিজের বিশ্লেষণ যোগ করে তুলে ধরবো।
এই লিখাটি লিখছি মুলত বইটির আলোকে।

যেমন, বইটিতে শুরুতেই যাকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তিনি ফ্রান্সের রাজা লুই-১৪

একেবারে সংক্ষেপে লুই’এর জীবনের ঘটনাগুলো তুলে ধরা যাক।


লুই মাত্র ৪ বছর বয়সে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলেন। উনার বাবা মারা গিয়েছিলেন। ফলে রাজার ছেলে রাজা হলেন।
তো বুঝতেই পারতেছেন, মাত্র চার বছর বয়সে তো আর কেউকিছু বোঝে না। রাজ্য চালানো তো প্রশ্নই আসে না।
সুতরাং লুই-১৪ রাজা হিসেবে থাকলেও কার্যত রাজ্য পরিচালনা করতেছিলো তাঁর মা এবং সেইসাথে ফ্রান্সের এরিস্ট্রোক্র্যাট বা প্রভাবশালী শ্রেণী।
লুটেপুটেই চলতেছিলো রাজ্য শাসন। প্রভাবশালী শ্রেণী তথা ধনিক শ্রেণী ফ্রান্সকে রীতিমত দেউলিয়া করে ফেলেছিলো।
১৬৬১ সালে যখন লুই-১৪ এর বয়স ২৩ বছর, তখন যুবক লুই রাজ্যের সত্যিকারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেবার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু তিনি দেখলেন, নামকাওয়াস্তে তিনি রাজা। কার্যত দেশ চলে গিয়েছে এরিস্ট্রোক্রেসির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আর্মিও অসন্তুষ্ট। কার্যত দেশ দেউলিয়া। পলিটিক্যাল ক্রাইসিস যখন তখন শুরু হবে। এবং সেটা হলে লুই’এর গর্দান যাবে।
ওদিকে লুই খবর পেলেন, প্রভাবশালীরা চিন্তাভাবনা করতেছে ফ্রান্সের ক্ষমতার পালা বদলের। নতুন কাউকে ক্ষমতায় আনার। এটা মুলত একটা আইওয়াশ। অর্থাৎ দেশের দিশেহারা মানুষকে একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়ে শান্ত করার। সেইসাথে ভবিষ্যতেও নিজেদের লুটপাটতন্ত্র চালু রাখার।
তো লুই-১৪ বেশ সাবধানে এগোলেন। নবীন আর্মি অফিসারদের প্রমোশন দিলেন, এবং বয়স্ক আর্মি অফিসারদের অবসরে পাঠালেন এবং নতুন মানুষদের রাজার “Inner Circle” বা পলিটিক্যাল ক্ষমতার প্রভাববলয়ের ভেতরে নিয়ে আসতে শুরু করলেন।
আর্মি অফিসার র‍্যাঙ্কে প্রচুর নিয়োগ দিলেন একেবারে আমজনতার ভেতর থেকে।
আর্মি আরোবেশি রাজনীতিতে ইনভল্ভ হতে শুরু করলো।
এটা করে তিনি মুলত পুরনো এরিস্ট্রোক্র্যাসির ভেতর ফ্রেশ ব্লাড সঞ্চালন করতেছেন। সেইসাথে একটা নতুন এরিস্ট্রোক্রেসি তৈরি করতেছেন যারা রাজার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে এবং দায়বদ্ধ থাকবে। লুই খুব দ্রুত কাজটি করেছিলেন এবং আঘাত আসার আগেই তিনি পুরনো এরিস্ট্রোক্র্যাটদের টেকনিক্যালি আইসোলেট করে এবং পরে ক্ষমতার বলয়ের বাইরে ঠেলে দিয়ে ফ্রান্সের শাসনতন্ত্র এবং মসনদকে নতুনভাবে নিজেরমত করে গড়ে তোলেন।

সেইসাথে দীর্ঘদিন যারা প্রভাবশালী শ্রেণী হিসেবে বেশ আরামে ছিল, নিশ্চিন্তে ছিল, তাঁদের ভেতরই এবার কম্পিটিশন শুরু হয়ে গেল। নতুন ভার্সেস পুরনো।
এরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখতে নিজেদের ভেতর কম্পিটিসন শুরু করলো। ফলাফল, রাজা হটানোর চিন্তা আপাতত তাঁদের মাথা থেকে আউট।

আর এন্ড গেম হল, দিনশেষে লুই একেবারে লয়্যাল ইনার সার্কেল তৈরি করলেন একেবার নিজের হাতে গড়া লোক দিয়ে। পুরনো মানুষগুলোকে ঝেড়ে ফেলে।

এই লুই-১৪ গোটা ফ্রান্স সম্রাজ্যকেই বদলে দিয়েছিলেন পরে।
লুই-১৪ শাসনামলে ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আটল্যান্টিকের অন্যপাশে, অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশেও ফ্রান্সের প্রভাববৃদ্ধি পায়। তাঁর তৈরি করা 'কোড অফ ল” পরবর্তীতে নেপোলিয়নিক কোড তৈরিতেও ইনফ্লুয়েন্স করে এবং আধুনিক ফ্রান্সের আইনের ব্যাসিকও এসেছে সেই লুই-১৪ এর কাছ থেকেই।
লুই যে আধুনিক ধাচের আর্মি গড়ে তুলেছিলেন নতুন করে, নতুনভাবে, সেটা পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য শক্তিশালী সম্রাজ্যগুলোও অনুসরণ করেছিলো।

সুতরাং রাজা লুই-১৪ ছোট বয়সেই বুঝেছিলেন, ক্ষমতায় থাকতে হলে আগে প্রভাবশালী শ্রেনীকে চেকইন দিতে হবে। নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।
এরপর আসবে অপরিহার্য এবং বিনিমেয়রা...


(ধারাবাহিকভাবে সিরিজ আকারে বাকিঅংশ লিখা হবে)
ধন্যবাদ।
রেফারেন্স বইঃ “ডিক্টেটরস হ্যান্ডবুক” বাই প্রফেসর ব্রুস
Read More »

Monday, September 11, 2017

মেক্সিকান আন্ডারওয়ার্ল্ড


তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিলো মেক্সিকোর সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্বলিত মিলিটারি নিয়ন্ত্রিত জেলখানায়। তাঁর থাকার সেলটিও সর্বক্ষণ সিসি ক্যামেরা দ্বারা পর্যবেক্ষণে রাখা হত।
একদিন সিসি ক্যামেরায় দেখা গেল, তিনি গোসল করার জন্য shower room গেলেন। ব্যস, এরপর ঠিক ম্যাজিসিয়ানের মত, গায়েব !

বলছিলাম, CEO of Crime হিসেবে পরিচিত, এল চ্যাপো গুজম্যানের কথা।
কিভাবে সেদিন ওই গোসলখানা থেকে তিনি গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন, শুনলে অবাক হবেন।

সেই গোসল খানার ঠিক নিচে এক মাইল লম্বা ট্যানেল নির্মান করেছিলো এল চ্যাপোর লোকেরা। রীতিমত আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে লাইনের মত ট্যানেল।

এই সেই গোসলখানা।


আর এই সেই ট্যানেলের অন্যপ্রান্তের মুখ।


আর নিচের ছবিতে দেখতেছেন ট্যানেলের ডিজাইন।


এতো দীর্ঘপথ যাতে এল চ্যাপোকে পায়ে হেটে যেতে না হয়, সেজন্য রেল লাইন বসিয়ে তাতে আবার মোটরসাইকেল ইম্প্রোভাইজ করে বিশেষ vehicle বানিয়ে এল চ্যাপোকে জেল থেকে বের করে আনা হয়েছিল।




এতো দীর্ঘ টানেলের ভেতরে ইলেকট্রিসিটি ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উপরে ট্যানেলের নকশাটি দেখতে পাচ্ছেন।
রীতিমত প্রোফেশন্যাল লেভেলের কাজ।
প্রায় এক মাইলের বেশি দুরে গিয়ে ট্যানেলের অন্যপ্রান্ত থেকে বের হয়ে আসেন এল চ্যাপো।

গোটা ব্যাপারটা কোনো হলিউডি মুভিকে হার মানাবে।

যে ব্যক্তির কথা বলছি, সেই "El Chapo" Guzmán মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যমতে "the most powerful drug trafficker in the world"

গোটা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করে বিখ্যাত Forbes ম্যাগাজিন।
তাতে বারাক ওবামা, ভ্লাদিমির পুতিনের মত বিশ্ব নেতারা থাকেন।

আর ২০০৯, ২০১০ এবং ২০১১ সালের দিকে এল চ্যাপো ছিল যথাক্রমে ৪১, ৬০ এবং ৫৫ নাম্বারে !
মেক্সিকোর টেলিকম ব্যবসায়ী কার্লোস স্লিমের পর তিনিই ছিলেন মেক্সিকোর সবচেয়ে পাওয়ারফুল ব্যক্তি।
(DEA)- এর তথ্য মতে, তিনি “The most ruthless, dangerous, and feared man on the planet”

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের Crime Commission ২০১৩ সালে
"the godfather of the drug world" হিসেবে পরিচিত এল চ্যাপোকে ঘোষণা করেছিলো "Public Enemy Number One" হিসেবে।

এল চ্যাপো গুজম্যান মেক্সিকোর নাগরিক।
Gangland হিসেবে পরিচিত মেক্সিকোর অন্যতম পাওয়ারফুল গ্যাং সিনোলোয়া কার্টেলের প্রধান।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন মেক্সিকোকে টার্গেট করে। “they are bringing drugs.. they are bringing crimes… they are rapists… and some of them are good people”

এই কথাটি বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই সমালোচিত হয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমস্যা হল, যে কথাটা ভদ্রভাষায় বলা যায়, সেই কথাটাকেও সে সরলীকরণ করে একেবারে বাজেভাবে বলে।
তবে আমেরিকাতে ড্রাগসের সমস্যা যে ভয়াবহ, সেটা জানার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের দরকার নেই। তথ্য উপাত্ত দেখলেই চলে।
কিছু তথ্য উপাত্ত দেয়া যাক। খোদ মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য উপাত্ত দেখলেই ভয়াবহ অবস্থাটা কিছুটা হলেও বোঝা যায়।

মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, Mexican drug cartels take in between $19 and $29 billion annually from US drug sales.

কেবল মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলগুলোই যদি বছরে ১৯ থেকে ২৯ বিলিয়ন ডলারের ড্রাগসের সাপ্লাই আমেরিকাতে দেয়, তাহলে ভেবে দেখুন আসল চিত্র আরো কত ভয়াবহ।

আমেরিকাতে ঢোকা ৯০% কোকেন মেক্সিকোর বর্ডার হয়েই আসে। আর এই কোকেন উৎপাদন হয় মুলত পেরু, কলম্বিয়া আর বলিভিয়াতে।
কলম্বিয়ান মাফিয়ারা মেনুফ্যাকচারিং বা প্রোডাকশন নিয়ন্ত্রন করে। আর মেক্সিকান মাফিয়া সাপ্লাই চেইনের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রন করে। মুল গন্তব্য কিন্তু সেই আমেরিকা।
পাবলো এস্কোবার বা কালি কার্টেলদের জামানায় মেক্সিকোকে বলা হত বাউন্সিং ট্রেম্পোলিন। অর্থাৎ দক্ষিন আমেরিকা থেকে উৎপাদিত ড্রাগ মেক্সিকো নামক ট্রেম্পোলিনের উপর একটা লাফ দিয়ে আমেরিকাতে চলে যেত। কথাটা মেটাফোরিক। কি বোঝানো হচ্ছে, আশা করি সবাই বুঝতে পারতেছেন।
যেমন, কেবল ২০১০ সালেই ৪০০ মেট্রেক টন কোকেন মেক্সিকোর বর্ডার হয়ে আমেরিকাতে ঢুকেছে।

কোকেনের মুল সাপ্লাই দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশীয় দেশগুলো থেকে এলেও,
আমেরিকাতে ঢোকা হেরোইন আসে মুলত মধ্যএশিয়া ও এশিয়া থেকে।
৯০% ওপিয়াম উৎপাদন হয় আফগানিস্তানে। এখানে প্রোডাকশন নিয়ন্ত্রন করে এশিয়ান মাফিয়াগুলো। আর তাঁদের সাথে যুক্ত হয়ে ল্যাটিনো ও আমেরিকান মাফিয়াগুলো সাপ্লাই ও ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ন্ত্রন করে।
গাজা আমেরিকার কিছুকিছু স্টেটে লিগালাইজ হয়েছে। কিন্তু এখনো মেক্সিকো থেকেই গাজার সিংহভাগ সাপ্লাই আমেরিকাতে আসে।
জাতিসংঘের তথ্য মত বার্ষিক ড্রাগ ট্রেডের পরিমাণ হাফ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। মেক্সিকোতে তৈরি হওয়া মেথানফেটামিনের জন্য দরকারি কেমিক্যালস আসে চীন থেকে। অর্থাৎ ইয়াবা বা মেথ। যেটাই বলি।
সেই সুত্র মেক্সিকান মাফিয়াদের সাথে চাইনিজ ও জাপানিজ সহ এশিয়ান মাফিয়াদের লিঙ্ক তৈরি হয়েছে অনেক আগে থেকেই।

According to a 2007 United Nations report, স্পেনে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভেতর প্রতি ১০০ জনের ৩ জন, অর্থাৎ ৩% মানুষ কোকেন আসক্ত। যা দুনিয়াতে সর্বোচ্চ। আর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। (২.৮%)
তবে দেশ হিসেবে মোট সেবনের পরিমাণ বিচার করলে আমেরিকা সর্বোচ্চ।
২০০০ সালে গোটা পৃথিবীতে কোকেন সেবনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬০০ টন। যার ৩০০ টন কনজিউম করেছে আমেরিকা একাই। অর্থাৎ ৫০%
The 2010 UN World Drug Report concluded that "it appears that the North American cocaine market has declined in value from US$47 billion in 1998 to US$38 billion in 2008. Between 2006 and 2008, the value of the market remained basically stable.
http://www.unodc.org/pdf/research/wdr07/WDR_2007.pdf


গাঁজার পর কোকেনই আমেরিকার মাদকসেবীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় রিক্রিয়েশনাল ড্রাগ। এবং একক দেশ হিসেবে আমেরিকাতে সবচেয়ে বেশি কোকেনের সেবন হয়। মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের ভেতর কোকেন জনপ্রিয় হবার কারণে এটাকে "rich man's drug" বলা হয়ে থাকে।

কলেজ পড়ুয়া মার্কিনী ছেলেমেয়েদের কাছেও কোকেন সবচেয়ে জনপ্রিয় পার্টি ড্রাগস হিসেবে। . A study throughout the entire United States has reported that around 48 % people who graduated high school in 1979 have used Cocaine recreationally during some point in their lifetime,
the drug became particularly popular in the disco culture as cocaine usage was very common and popular in many discos such as Studio 54.


২০০৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেনের মোট বাজার ছিল ৭০ বিলিয়ন ডলারের। যা সেই বছর Starbucks টাইপের বিখ্যাত কর্পোরেশনের বার্ষিক রেভিনিউয়ের চেয়ে বেশি ছিল।


২০১৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ওপিয়াম উৎপাদনের ৬৬% হয়েছে কেবল এক আফগানিস্তানে।
According to a U.N. sponsored survey, in 2004, Afghanistan accounted for production of 87 percent of the world's diamorphine.
Afghan opium kills around 100,000 people annually.

According to the 2012 National Survey on Drug Use and Health (NSDUH), আমেরিকাতে কেবল ইয়াবা বা মেথ আসক্ত মানুষ আছে ১ কোটি ২০ লাখ।
এটাও মাথায় রাখুন, আমেরিকার জনসংখ্যা ৩১ কোটির বেশি।

আমাদের বাংলাদেশেও প্রতিমাসে লক্ষ লক্ষ পিচ ইয়াবা প্রবেশ করে কেবল পার্বত্য চট্রগ্রাম দিয়েই। লক্ষ লক্ষ পিচ ইয়াবা পুলিশ আটক করে।
আমাদের দেশও এদিক দিয়ে খুব একটা পিছিয়ে আছে কি?
পুলিশের হাতে যা ধরা পড়ে, সেটা খুব ক্ষুদ্র একটা অংশ।

যেখানে ডিমান্ড থাকবে, সেখানে সাপ্লাই আসবেই। এটা ঠেকানোটা দুরুহ ব্যাপার। সেই পাবলো এস্কোবারের যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমেরিকার DEA কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু লাভ কি?
ল্যাটিন আমেরিকার ড্রাগ ট্র্যাফিকারদের ধরতে আমেরিকা গত পঞ্চাশ বছরে যে পরিমাণ অর্থ ও সময় ব্যয় করেছে, তাতে লাভ হয়েছে কি?
তেমন কোনো লাভ হয়নি।
পাবলো এস্কোবার মরেছে। তাঁর জায়গায় ক্যালি কার্টেল এসেছে। ক্যালি কার্টেলকে ধরা হয়েছে। তাঁদের জায়গায় মেক্সিকান মাফিয়ারা এসেছে। এল চ্যাপো গুজম্যানকে ধরা হল, এবার তাঁর জায়গায় অন্যকেউ আসবে।
এই যুদ্ধ চলবেই।
অথচ এই অর্থ, এই সময়, এই শ্রম যদি আমেরিকা নিজের দেশে মাদকসেবন রোধ করতে ব্যয় করতো, সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে নিজ দেশে মাদকসেবন প্রতিহত করার চেষ্টা করতো, তাহলে হয়ত আরো বেশি সফলতা আসতো।


এটি ২০১০ সালে মেক্সিকোতে ড্রাগ কার্টেলগুলোর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ম্যাপ...
ড্রাগ কার্টেলগুলোর ভেতর সর্বক্ষণ টেরিটোরিয়াল ক্ল্যাস চলে। এবং তাতে মারা যায় হাজারহাজার মানুষ।
মেক্সিকো ড্রাগ কার্টেলগুলোর জন্য রীতিমত রণক্ষেত্র।
যেমন উপরের মানচিত্রে (২০১০ সালের) আকাশী রঙের যে টেরিটোরি দেখছেন, সেটা ছিল সিনালোয়া কার্টেলের নিয়ন্ত্রণে।
সবচেয়ে পাওয়ারফুল এই সিন্যালোয়া কার্টেলের প্রধান হল এল চ্যাপো গুজম্যান।

মেক্সিকোর সাথে আমেরিকার যে বিশাল বর্ডার আছে, এই বর্ডার দিয়ে আনায়াসে ড্রাগ প্রবেশ করে। বিশেষ করে আমেরিকার নিউ মেক্সিকো এবং এরিজোনা বর্ডার এরিয়াতে বিশাল বিশাল ট্যানেল বানিয়ে এসব ট্যানেল দিয়ে টনকে টন মাদকদ্রব্য প্রবেশ করানো হয়।
মার্কিন বর্ডার গার্ডেরা মাঝেমাঝেই বড়বড় ট্যানেলের সন্ধান পায়। এবং সেসব ট্যানেল ধ্বংসও করা হয়। কিন্তু ট্যানেল নির্মান চলতে থাকে। এবং ড্রাগসও আমেরিকাতে প্রবেশ করতেই থাকে।
এল চ্যাপোর সিনালোয়া কার্টেলে এক বড়সড় ইঞ্জিনিয়ারিং টিম আছে, ট্যানেল এক্সপার্ট আছে, যারা রীতিমত প্রফেশন্যাল স্কিলে এসব ট্যানেল নির্মান করে।

যেমন নিচের চিত্রে ২০০৭ সালে মার্কিন বর্ডার গার্ড’দের সিজ করা একটা ট্যানেল দেখতে পাচ্ছেন। অন্তত ধারণা পাবেন, কিভাবে ট্যানেলগুলো মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেল ব্যবহার করে।







নানান উপায়ে আমেরিকাতে প্রবেশ করানোর পর এসব ড্রাগস ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় আমেরিকা জুড়ে। আমেরিকাতে থাকা ডিস্ট্রিবিউটরদের সাহায্যে।



যেমন উপরের মানচিত্রে দেখতেই পাচ্ছেন, আমেরিকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অধিকাংশ জায়গায় প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে সিনালোয়া কার্টেল। (deep yellow color)

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন লোকেশনগুলো হল ম্যায়ামি, নিউইয়র্ক, লাস ভেগ্যাস, লস এঞ্জেলস, এবং অবশ্যই শিকাগো।
শিকাগো শহর অবশ্য অনেক আগে থেকেই আমেরিকান মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য ছিল। এই শিকাগোতে রাজত্ব করতো আল ক্যাপোনের মত ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মাফিয়া ডন।

আর এখন এই শিকাগো শহরে সবচেয়ে বেশি মেক্সিকান হিস্পানিক মানুষের বসবাস। আর এসব হিস্পানিক কমিউনিটির ভেতর ঘাপটি মেরে থাকে MS-13 এর মত দুর্ধর্ষ গ্যাং...
এল চ্যাপোর সিনালোয়া কার্টেলের সাথে সরাসরি সম্পর্ক আছে MS-13 এর। MS-13 এর মুল ট্যারিটোরি অবশ্য ক্যালিফোর্নিয়াতে।
শিকাগো শহর দাপিয়ে বেড়ায় Latin kings, Gangster Disciples, Latin Angels, Los Zetas, Chicago outfits
টাইপের ডজনখানেক গ্যাং।
এসব গ্যাংগুলো টেরিটোরি নিয়ে নিজেরা নিজেরা মারামারি খুনোখুনি করে। ফলাফল, শিকাগো শহরের ক্রাইমরেট রীতিমত ভয়াবহ। খোদ মার্কিন রাজনীতিবিদেরাও শিকাগো শহরের ক্রাইম প্রবলেম নিয়ে অনেক চিল্লাপাল্লা করে এসেছে।
Chicago is considered the most gang infested city in the United States, with a population of over 100,000 active members from nearly 60 different factions.
Gang warfare and retaliation is common in Chicago. Gangs were responsible for 61% of the homicides in Chicago in 2011. (from Wikipedia)

August 2016 marked the most violent month Chicago had recorded in over two decades with 92 murders,
By October 2016, Chicago had surpassed 600 homicides and over 2,800 people shot, marking a 32 percent increase in murders and non-fatal shootings compared to 2015.
Chicago's 2016 murder and shooting surge has attracted national media attention from CNN, The New York Times, USA Today, Time Magazine and PBS.


আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব গ্যাংগুলোর মুল ব্যবসা হল ড্রাগস। মেক্সিকান মাফিয়াদের সাথে এরা ব্যবসা করে। মেক্সিকান মাফিয়ারা কলম্বিয়া থেকে কোকেনের মত ড্রাগস প্রতি কেজি ২ হাজার ডলার মুল্যে কিনে নিয়ে আসে। এরপর সেটা বর্ডার পার করে আমেরিকাতে থাকা এসব গ্যাংগুলোর কাছে প্রতি কেজি ৩০ হাজার ডলার মুল্যে বিক্রি করে। এরপর সেই কোকেন আমেরিকাতে কেজি প্রতি ১ লাখ ডলার মুল্যে বিক্রি হয়।
বুঝতেই পারতেছেন, বিশাল ব্যবসা।
চেইন বিজনেস।

ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক, ম্যায়ামি, লস এঞ্জেলস, লাস ভেগাসের মত জায়গায় ড্রাগসের দাম বেশি। সেখানে পয়সাওয়ালা মানুষও বেশি। কমন ইকুয়েশন। সুতরাং এসব এলাকার টেরিটোরি দখল করা নিয়ে গ্যাংগুলোর ভেতর মারামারিও বেশি হয়।

এল চ্যাপো গুজম্যানের জন্ম ১৯৫৭ সালে। তাঁর জন্ম সিনালোয়া প্রদেশে।
এই রিজিওনে গ্রামীন এলাকার প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে গাঁজার চাষ করে। গন্তব্য আবার সেই আমেরিকা।
অর্থাৎ আমেরিকাতে গাঁজা চাষ যেহেতু অবৈধ ছিল, (এখনো আমেরিকার অধিকাংশ রাজ্যে অবৈধ) সেহেতু এসব মেক্সিকোর গ্রামীণ জনপদে গাঁজার চাষ হয়, এবং এই গাঁজা মেক্সিকান ড্রাগ ট্রাফিকাররা আমেরিকাতে এক্সপোর্ট করে।
সনাতনী ফসল চাষ করার চেয়ে কৃষকদের কাছে গাঁজা চাষ অনেক বেশি লাভজনক।
এটা অবশ্য আমাদের দেশেও একটু অন্যভাবে দেখা যাচ্ছে। যেমন হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে কিছুদিন আগে একটি প্রতিবেদন দেখিয়েছিল। দেশের উত্তরবঙ্গে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো টাইপের বিদেশি বিড়ি সিগারেট কোম্পানিগুলো মোটা অংকের টাকা দিয়ে কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করতেছে। কৃষকরাও দ্রুত লোভের আশায় ফসলী জমিতে তামাক চাষ করতেছে। তামাক গাছ চাষ করতে গিয়ে কেবল মাটি না, জমির পাশে পুকুর, খাল বিলও বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাটির অবস্থা এমন হচ্ছে, ভবিষ্যতে এই মাটিতে আর কোনো ফসল ফলানো সম্ভব না, কেবল তামাক ছাড়া...

তো মেক্সিকোতে চলতেছে গাঁজা চাষ।
এল চ্যাপো গুজম্যানের পরিবার এই গাঁজা চাষের সাথেই যুক্ত ছিল।
ফলে ড্রাগ ট্রাফিকারদের সাথে তাঁর পরিচয় হতে বেশি সময় লাগেনি।
এল চ্যাপোর বাবা সারাদিন মদ গাঁজা খেতো এবং পতিতালয়ে গিয়ে সময় কাটাতো। ফলে কম বয়সেই গাঁজা চাষাবাদের কাজে এল চ্যাপোকে মনযোগ দিতে হয়। লিখাপড়া আর করা হয়ে ওঠেনি।
সময় যেতে থাকে। এল চ্যাপো উঠাবসা করতে শুরু করে ড্রাগ ট্রাফিকারদের সাথে। ধীরেধীরে ওই অঞ্চলের বড়বড় ড্রাগ ট্রাফিকার হর্তাকর্তাদের সাথে এল চ্যাপোর পরিচয় হয়।
এরপর যা হবার সেটাই... অর্থাৎ একেএকে ওদেরকে খুন করে বা সরিয়ে দিয়ে একসময় এল চ্যাপো গ্যাংলিডার হয়ে যায়।




এবার কিছু ব্যাপার মাথার রাখতে বলবো। মেক্সিকোর পরিস্থিত আপনাকে বিবেচনায় নিতে হবে। আশি ও নব্বয়ের দশকে মেক্সিকোর অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এখনো খুব একটা ভালো না। সিনোলোয়ার মত এলাকাগুলোর অধিকাংশ জায়গা অনুন্নত। গরিব মানুষ আছে প্রচুর। বেকারত্ব সমস্যা আছে ভয়াবহ। তো দেখা যায়, ড্রাগসের বিজনেসের সাথে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে গিয়েছে প্রচুর মানুষজন। ড্রাগস উৎপাদন করে আমেরিকাতে রফতানি করা হচ্ছে। সুতরাং ডলার রিটার্ন আসতেছে। সিনালোয়ার মত এলাকাতে এল চ্যাপোর ইমেজ একারণে রীতিমত রবিন হুডের মত।
পুলিশ প্রশাসন এল চ্যাপোর পে রোলে থাকে। রাজার হালে চলে সে। দুইশো দেহরক্ষী তাঁর নিরাপত্তা দেয়।
সেইসাথে সিনোলোয়া কার্টেলের আছে বিশাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক। রীতিমত প্রফেশন্যাল লেভেলের। যারা Netflix এর Narcos সিরিয়াল দেখেছেন, আমি কি বলতেছি, সেটা হয়ত তাঁরা আরো ভালো বুঝতে পারবেন।
আমেরিকা থেকে fusion চ্যানেলের কিছু সাংবাদিক গিয়েছিলো এল চ্যাপোর সিনোলোয়া প্রবেশে। এল চ্যাপোর উপর প্রতিবেদন বানাতে।
বিমানবন্দরে নামার সাথেসাথে এল চ্যাপোর লোকেরা তাঁদের ফলো করা শুরু করে। এবং তাঁদের প্রতিটি মুভমেন্ট ফলো করা হয়।
পলিটিয়ান থেকে শুরু করে সরকারি হর্তাকর্তা আমলাদেরও অনেকে থাকে এল চ্যাপোর পে রোলে...
টাকা থাকলে ক্ষমতা কেনা যায়... আবার ক্ষমতা থাকলে টাকা আসে...

রীতিমত গোয়েন্দাবাহিনী বানিয়ে ফেলেছে এসব কার্টেলগুলো। তাঁদের নিজনিজ টেরিটোরি ও তাঁদের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে।
এবং ব্যাপক মানুষের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাতে এলাকাতেও তাঁরা জনপ্রিয়।
যেমন এল চ্যাপো গুজম্যানকে তাঁর এলাকায় রীতিমত প্রভুভক্তি করা হয়। সে রীতিমত সেলিব্রিটি। আর সেইসাথে যেহেতু সে আমেরিকার শত্রু, সেহেতু তাঁর প্রতি আলাদা সফট কর্নার আছে মেক্সিকোবাসীর। কারণ এসব ল্যাটিন দেশের অনেক দুর্দশার জন্য এরা আমেরিকাকে দায়ী করে এবং এসব দেশের মানুষের ভেতর এন্টি আমেরিকান সেন্টিমেন্ট আছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণে।



এল চ্যাপো এই রিজিওনে রীতিমত সেলিব্রিটি। তাঁর নামে ক্যাপ, টি শার্ট বিক্রি হয়।



যেমন, নিচে ছবি’তে দেখছেন, সিনোলোয়া এলাকাতে একটা চার্চ



খেয়াল করে দেখুন, জিসাস ও মাদার মেরীর মুর্তির সামনে যে মোচওয়ালা মুর্তি আছে, এই ভদ্রলোকের নাম Joaquin Murrieta
তাঁকে মেক্সিকোর রবীনহুড বলা হয়। The Real Zorro (দেখতেই তো পারছেন, চার্চের দেয়ালে রীতিমত মার্কিন ডলার লাগিয়ে রেখেছে)
তাঁকে রীতিমত পুজা করা হয়।

সিনালোয়াতে এল চ্যাপোর ইমেজ হল আধুনিক যুগের Joaquin Murrieta, যে গরিব মানুষের জন্য কাজের ব্যবস্থা করেছে, ডলার নিয়ে এসেছে।



রাইভেল গ্যাংদের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে এল চ্যাপো ১৯৯৩ সালে জেলে গিয়েছিল। অবশ্য এই জেলে যাওয়াটা কিছুটা তাঁর ইচ্ছাতেই হয়েছিল। তাঁর মত লোকের জন্য জেলখানা মাঝেমাঝে বেশ নিরাপদ জায়গা।
এল চ্যাপো জেলখানাকে রীতিমত ফাইভ স্টার হোটেল বানিয়ে ফেলেছিলো। জেলখানার নিরাপত্তা প্রহরী অনেকেই ছিল এল চ্যাপোর পে রোলে।
টাকা থাকলে সব জায়গাতেই সিস্টেম করা যায়।
জেলখানাতে মডেল থেকে শুরু করে প্রস্টিটিউটদের রাতদিন আনাগোনা চলতো। জেলখানার কয়েদী অনেকেই ছিল এল চ্যাপোর লোকজন। সেখানে আবার অন্য রাইভেল গ্যাংদের লোকেরাও ছিল। তাঁদের সাথে মারামারিও বেধে যেত।

Zulema Hernandez নামের এক মহিলার সাথে প্রেম হয়ে যায় এল চ্যাপোর এই জেলখানায় বসে।
এই জেলখানাতে বসেই এল চ্যাপোর বিজনেস ছড়িয়ে পড়ে মেক্সিকো থেকে স্পেন। স্পেন হয়ে ইউরোপে।

২০০১ সালে পরিস্থিত বদলে গেলে জেলখানা থেকে একরকম পায়ে হেটে বেরিয়ে যান এল চ্যাপো।
এরপর এল চ্যাপো রাইভেল গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধ আজ পর্যন্ত চলতেছে। লক্ষাধিক লোক নিহত হয় এই ড্রাগ যুদ্ধে।
কেবল ২০০৬ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৬০ হাজার মানুষ মারা গেছে ড্রাগ ট্রাফিকারদের ভেতর ইন্টারনাল যুদ্ধে।
Beltrán Leyva Cartel ছিল এল চ্যাপোর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।
ওদিকে মেক্সিকান সরকারি আর্মি এবং আমেরিকার DEA এক হয়ে এল চ্যাপোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে।

অনুমানিক, কমপক্ষে ৪ বার বৈধভাবে বিয়ে করেছেন এল চ্যাপো। সন্তান আছে কমপক্ষে দশজন।
২০০৭ সালে সর্বশেষ বৈধভাবে বিয়ে করেন একজন মার্কিনী মডেলকে। নাম Emma Coronel Aispuro



২০১২ সালে আমেরিকার মাটিতে তাঁদের জমজ সন্তানের জন্ম হয়।
এটা বলা বাহুল্য যে নিরাপত্তাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়েই এল চ্যাপো দেশে দেশে ঘুরতো...

২০১৪ সালে এল চ্যাপো আবার গ্রেফতার হয়। এবার আর নাম’কা ওয়াস্তে গ্রেফতার নয়। এবার সিরিয়াস।
মিলিটারি গ্রেডের জেলখানায় রাখা হয় এল চ্যাপোকে।
সেখানথেকেই সেই টানেল বানিয়ে পালিয়ে যায় এল চ্যাপো। যেটা নিয়ে শুরুতেই বললাম।
২০১৫ সালে।

ঠিক সেইবছরই নির্বাচনী প্রচারণায় নামে ডোনাল্ড জে ট্রাম্প।
আর নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেই মেক্সিকো’ এবং ড্রাগস ইস্যুকে হাইলাইট করে প্রচারণা শুরু করে ট্রাম্প।
এল চ্যাপো ট্রাম্পের মাথার মুল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করে। জি হা... ঠিকই শুনেছেন। ট্রাম্পের মাথার মুল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার ঘোষনা করেছিল এল চ্যাপো।

ড্রাগস ইস্যু যে কত বড় সমস্যা আমেরিকাতে, আমেরিকার প্রগতিশীল শিক্ষিত সমাজ সেটা নিয়ে এতোটা চিন্তিত না হলেও আমেরিকার আমজনতা এটাকে বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছিল।
খেয়াল করে দেখবেন, ট্রাম্প যে বর্ডার দেয়াল বানানোর প্রপোজাল দিয়েছে, সেটা কিন্তু এই ড্রাগস এবং অবৈধ অধিবাসী প্রবেশ বন্ধ করার ধুয়া তুলে...
যদিও দেয়াল বানিয়ে কখনোই ড্রাগ ট্রাফিকারদের আটকানো পসিবল হবে কিনা, সেটা সন্দেহ।
কারণ তো এতোক্ষণ পড়লেনই।
এরা রীতিমত আন্ডারগ্রাউন্ডে বিশাল সাইজের টানেল বানিয়ে ড্রাগ প্রবেশ করাচ্ছে। দেয়াল বানিয়ে এদের কিভাবে আটকানো যাবে, সেটা আমার বোধগম্য না।


এরপর এল চ্যাপোকে তৃতীয়বারের মত গ্রেফতার করা হয়। ২০১৬ সালে।


এবার আর মেক্সিকোর কোনো জেলে রাখা হয়নি তাঁকে। আমেরিকা তাঁকে extradition এর মাধ্যমে ২০১৭ সালে এল চ্যাপোকে মেক্সিকো থেকে আমেরিকাতে নিয়ে আসা হয়। ১৯শে জানুয়ারি।

ঠিক তার একদিন পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়।


বর্তমানে এল চ্যাপো আমেরিকাতে বন্দী আছে।
টেড ক্রুজ কিছুদিন আগে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এল চ্যাপোর লুকানো ব্যাংক ব্যালান্স উদ্ধার করে সেই টাকা দিয়ে ট্রাম্পের বর্ডার দেয়াল বানাতে।
আমার ধারনা, এটা জাস্ট কথার কথা...

মেক্সিকোর প্রশাসন আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ড্রাগ কার্টেলগুলোকে দমন করতে। সাফল্যের দেখা কিছু পেয়েছে। তবে ড্রাগ কার্টেলের বিশাল সম্রাজ্যে হয়ত কেবলমাত্র কিছু অংশতে আঘাত হানতে পেরেছে।
এল চ্যাপো না থাকলে তাঁর জায়গায় অন্যকেউ আসবে। অথবা রাইভেল গ্যাং এল চ্যাপোর ভ্যাক্যুয়াম দখল করবে। কিন্তু কার্টেলের রাজত্ব চলবেই। অন্তত যতদিন আমেরিকাতে ড্রাগসের বিশাল ডিমান্ড থাকবে, ততদিন।

কিছুদিন আগে মেক্সিকান সেনাবাহিনী ড্রাগসের একটা চালান জব্দ করেছিল। নিচে দেখছেন সেটার ছবি।



এছাড়া ড্রাগ ট্রাফিকারদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে নানা সময়ে। তাঁদের টাকা পয়সাও জব্দ করা হচ্ছে।






এতোকিছুর পরও মেক্সিকোতে গাঁজা, পপি, মেথ উৎপাদন কমেনি। বরং বেড়েছে। গত দশ বছরে দিগুন হয়েছে। এল চ্যাপোর না থাকার পরও তাঁর সিনোলোয়া কার্টেল বহাল তবিয়তে চলতেছে।



এতো গেল কেবল ড্রাগস। কার্টেলদের বিজনেস কখনোই কেবলমাত্র ড্রাগসের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না। মানবপাচার, মানিলন্ডারিং, হুন্ডির ধান্দা, প্রস্টিটিউশন, অস্ত্রের ব্যবসা তাঁদের কাছে নতুন কিছু না। তবে একটা ভিন্ন ডাইমেনশন তাঁরা এনেছে গত বিশ বছরে।
সেটা হল তেল।

এবার বলতেছি মেক্সিকোর আরো একটি ভয়াবহ চিত্র।
ইরাক যুদ্ধের পর তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল ব্যাপকভাবে। আর মেক্সিকোর কার্টেলগুলোর চোখ পড়েছিল তখন তেলের দিকে।
ক্রুড ওয়েল, অর্থাৎ অপরিশোধিত তেল মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় রফতানিখাত। এবং মেক্সিকোর তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা আবারও সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মেক্সিকোর অর্থণীতির লাইফ ব্লাড বলা হল তেল।
রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানি Pemex এর কাছ থেকেই মেক্সিকো সরকার মোট রাজস্বের তিনভাগের একভাগে আদায় করে।
অথচ এই কোম্পানির তেলের পাইপলাইন কেটে তেল চুরি করাটাকে রীতিমত ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে মেক্সিকান মাফিয়ারা।

২০০০ সাল থেকে তেলের পাইপ লাইন কেটে তেল চুরি করার হার বেড়ে গিয়েছে ভয়াবহ ১৫৪৮%

মাল্টি মিলিয়ন ডলারের আন্ডারগ্রাউন্ড তেলের বাজার তৈরি করেছে মেক্সিকান মাফিয়ারা চুরি করা তেল বিক্রি করে।
ইন ফ্যাক্ট, রীতিমত মিলিটারি দিয়ে তেলের পাইপলাইনগুলোর নিরাপত্তা দিতে হচ্ছে মেক্সিকান সরকারকে।
মেক্সিকান সরকার রীতিমত দিশেহারা এই তেলচুরি ঠেকাতে গিয়ে।

ব্যবসাটা কি বুঝেছেন এখনো?
ধরূণ, মেক্সিকো থেকে একটা পাইপলাইনে করে তেল যাচ্ছে আমেরিকাতে। মেক্সিকো সরকার ব্যারেল প্রতি তেল বিক্রি করতেছে আন্তর্জাতিক বাজার মুল্যে। ধরূণ, ১০০ টাকা... অর্থাৎ কথার কথা, ১০০ টাকা দিয়ে মেক্সিকো আমেরিকার কাছে তেল বিক্রি করতেছে।

এখন ড্রাগ কার্টেলরা পাইপলাইন কেটে তেল চুরি করে সেই চুরি করা তেল ধরূণ ৫০ টাকায় আমেরিকার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতেছে গোপনে। অর্থাৎ অর্ধেক দামে চুরি করা তেল ব্যারেলে ভরে টেক্সাসে পাচার করে দিচ্ছে, যেভাবে হেরোইন, কোকেইন পাচার করে, সেভাবে।
আমেরিকান ছোটছোট তেলের ডিপোর মালিকদের এতে লাভ। তাঁরা ৫০ টাকা দিয়ে তেল কিনে ১২০ টাকার বিক্রি করতেছে। যেখানে ১০০ টাকায় লিগ্যালি কিনে ১২০ টাকায় বিক্রি করার কথা।
অর্থাৎ হিসাবটা নিশ্চয় বুঝেছেন। আমেরিকার তেলের পাম্প বা ডিপোগুলোর মালিকেরা বেশি লাভ করতেছে চুরি করা তেল কিনে।

টেক্সাসের পাঁচটি কোম্পানিকে ইতিমধ্যেই সনাক্ত করা হয়েছে চুরি করা তেল কেনার দায়ে। valley fuel ltd, Murphy Energy Corp, Trammo petroleum, BASF Corp এবং US petroleum Deport সরাসরি চুরি করা তেল কেনার সাথে জড়িত।
আবার মেক্সিকান কার্টেলগুলোর তো সবটাই লাভ। চুরি করা তেল যত কম দামেই বিক্রি করুক, লোকসান অন্তত হবে না।



ছবিতে দেখতেছেন, কিভাবে মাটি খুড়ে তেলের পাইপ লাইন ফুটা করে ছোট পাইপ লাগিয়ে তেলে টেনে চুরি করা হচ্ছে।

কার্টেলরা এটাকে বলে Fuel milking

মেক্সিকোতে মোট ১৭ হাজার মাইল তেলের পাইপলাইন আছে। এতো বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্ক সারাক্ষণ সামাল দিয়ে রাখাটা রীতিমত অসম্ভব।
আর এজন্য তেল চুরিও ঠেকানো যাচ্ছে না।
সেইসাথে পেমেক্স কোম্পানির অসাধু কর্মচারী ও ঠিকাদারেরাও জড়িত আছে। জড়িত আছে অসাধু কর্মকর্তারা। গত দশ বছরে শতাধিক পেমেক্স কর্মকর্তা কর্মচারীকে তেল চুরি ও ড্রাগ কার্টেলের সাথে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সেইসাথে তেল চুরি করতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার নজীরও আছে।
সেইসাথে মেক্সিকো বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব থেকে।
এভাবে চলতে থাকলে মেক্সিকোর অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
কারণ ইতিমধ্যে কেবল Los Zetas নামের কার্টেল প্রায় বিলিয়ন ডলারের আন্ডারগ্রাউন্ড তেলের বাজার তৈরি করে ফেলেছে।
তেল চুরির সাথে লস জেটাস নামের এই মাফিয়া সবচেয়ে বেশি জড়িত।


এছাড়া নাইট টেম্পলার কার্টেলের মত ভয়াবহ সংগঠনও সরাসরি জড়িত অস্ত্র এবং তেল চুরির সাথে।

প্রায় ডজনখানেক পাওয়ারফুল এবং আরো ডজনখানেক ছোট বড় কার্টেল মেক্সিকোতে রাজত্ব করতেছে। মার্কিন প্রশাসন এবং DEA বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতেছে কখনো সরাসরি আবার কখনো মেক্সিকান সরকারের সাথে মিলে কাজ করে ড্রাগ ট্রাফিকারদের সামাল দিতে।
কিন্তু কার্যত ফলাফল খুব একটা ভালো হচ্ছে না।
হাইড্রার মাথার মত একটা মাথা কাটতেছে, আরো দুইটা তৈরি হচ্ছে।

সবকথার শেষ কথা হল, ডিমান্ড থাকলে কেউ না কেউ বাইরে থেকে সাপ্লাই দিবেই।
আমাদের দেশে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পিচ ইয়াবা প্রবেশ করে কেবল মিয়ানমান বর্ডার দিয়েই। এছাড়া হেরোইন, কোকেইন, ফেন্সিডিল, এসবের কথা তো বাদই দিলাম।
এসব কারা খায়?
অবশ্যই এই দেশের মানুষই খায়।
ডিমান্ড তাঁরা তৈরি করেছে, সুতরাং চোরেরা সাপ্লাই নিয়ে আসতেছে।

বিশাল বড় অংকের বাজার তৈরি করে ফেলেছে দেশের ভেতর। ফলে ড্রাগ ট্রাফিকারদের হাতে টাকাও যাচ্ছে মোটা অংকের। আর এই টাকা দিয়ে তাঁরা ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে।

আমি চেষ্টা করলাম একটা ব্রিফ আইডিয়া দেবার।
অনেককিছু বাদ দিয়ে গেলাম। বাদ না দিলে লিখাটা আরো বড় হইতো। আর একটামাত্র লিখাতে ডিটেইলস সবকিছু বলা পসিবল না।
আমি কেবল ড্রাগসের আগ্রাসনের ভয়াবহ চিত্রটি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

লিখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।









Read More »

Monday, May 29, 2017

ইন্ডিয়ান আন্ডারওয়ার্ল্ড (মাফিয়া)



১৪ জানুয়ারি, ২০০০ সাল।
ঋত্বিক রোশন অভিনীত প্রথম মুভি “কাহো না প্যায়ার হে” রিলিজ পায়। ব্লক বাস্টার হিট হয় মুভিটি। এই মুভি দিয়ে বলিউডে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌছে যায় ঋত্বিক রোশন।
২০ জানুয়ারি, ২০০০ সাল।
মুভি রিলিজের এক সপ্তাহের মাথায় মুভির পরিচালক, ঋত্বিক রোশনের বাবা, রাকেশ রোশনের উপর দুইজন অস্ত্রধারী হামলা চালায়। দুইবার গুলি করা হয় রাকেশ রোশনকে। একটি গুলি তার হাতে, আরেকটি বুকে লাগে। সেইসাথে তার গাড়ি লক্ষ করে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়ে পালিয়ে যায় দুই ব্যক্তি।
রাকেশ রোশন সেই যাত্রায় বেঁচে যান। সুস্থ হবার পর তিনি বলেছিলেন, অস্ত্রধারীরা তাকে খুন করতে আসেনি। যদি আসতো, তাহলে মেরে ফেলতে পারতো সহজেই। তারা এসেছিলো তাকে আহত করতে। সেইসাথে গোটা বলিউডের জন্য একটা সতর্কতা সংকেত পাঠাতে।
প্রশ্ন হল, কিসের সতর্কতা সংকেত? আর রাকেশ রোশনকে গুলি করা হল কেনো?





১৯৭০ সালে ভারত সরকার বলিউডের জন্য ব্যাংক ঋণ প্রদান নিষিদ্ধ করে।
এই ব্যান ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ছিল।
অর্থাৎ এই সময়টাতে বলিউডকে “ইন্ড্রাস্ট্রি” হিসেবে ভারত সরকার স্বীকৃতি দিত না। ফলে ব্যাংকও লোন দেয়া হত না। একারণে পরিচালকেরা মুভির ফাইন্যান্সিংএর জন্য প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, ধনী বিত্তশালী ও কিছু প্রতিষ্ঠিত মুভি স্টুডিওর উপর নির্ভর করতো।
আর এখানেই সুযোগ নিয়েছিল ভারতীয় মাফিয়ারা।
তাদের কাছে কালো টাকার অভাব ছিল না। সুতরাং মুভিতে তারা নগদ ইনভেস্ট করে দ্রুত রিটার্ন পেতো।
ভারতীয় মাফিয়াদের জন্য বলিউড হয়ে ওঠে লোভনীয় ব্যবসা।
যে পরিচালক মাফিয়াদের সাথে যত ভালো সম্পর্ক রাখতো, সে ততবেশি নগদ অর্থ পেতো, সুতরাং তার মুভির প্রোডাকশন ও পাবলিসিটিও তত ভালো হত।

এটা চেইন রিয়াকশন।
মাফিয়াদের কাছে প্রচুর টাকা আছে। টাকা দিয়ে তারা পলিটিসিয়ান পকেটে রাখে। সেন্সর বোর্ডের লোকদেরও পকেটে রাখে। সিনেমা হল গুলো নিয়ন্ত্রন করে। রন্ধে রন্ধে তাদের ইনফ্লুয়েন্স।
সুতরাং তাদের সাথে হাত মেলালে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।
ওই যে বললাম, চেইন রিয়াকশন। অর্থাৎ আপনি ওদের সাথে হাত মিলিয়ে নিজের সুবিধা আদায় করবেন। আবার আপনাকে সুবিধা দিয়ে ওরা আরো বেশি অর্থ কামাবে। তখন কামানো আরো বেশি অর্থ দিয়ে ওরা আরো বেশি ইনফ্লুয়েন্স তৈরি করতে পারবে। আরো শক্তিশালি প্রভাবশালী হবে। এই তো।

১৯৯৯ সালে এই ব্যান তুলে নেয়া হয়। অর্থাৎ এখন একজন পরিচালক এখন মুভির জন্য ব্যাংক লোন পাবেন। বলিউডকে অফিসিয়ালি ইন্ড্রাস্ট্রি হিসেবে ভারত সরকার স্বীকৃতি দেয়।
মাফিয়াদের স্বার্থে তখন আঘাত লাগে।
এতোদিন তারা বলিউডের রন্ধে রন্ধে প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রভাবটা এতোটাই প্রকট, খোদ বলিউডকে পর্দার অন্তরাল থেকে চালায় মাফিয়ারা। মুভি দেশে বিদেশে ব্যবসা করুক আর না করুক, মাফিয়াদের মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয় মুভির পরিচালকদের।
তো রাকেশ রোশনের কাছে বাহরাইন ভিক্তিক একটি মাফিয়া দল চাঁদা চেয়েছিলো। রাকেশ রোশন চাঁদা দিতে অস্বীকার করাতে তাকে গুলি করা হয়। Ali Baba Budesh নামের কুখ্যাত বাহরাইন ভিক্তিক ইন্ডিয়ান মাফিয়া দল রাকেশ রোশনের উপর গুলি চালিয়েছিলো। এখন এই আলী বাবা বুদেশ গ্যাং নিয়ে পরে বলবো। আগে তো শুরু করি প্রথম থেকে।

সমগ্র ব্যাপারটা বুঝতে হলে ইন্ডিয়ান মাফিয়াদের কথা বলতে হবে। নেপথ্য নায়কদের কথা বলতে হবে।
সমস্যা হল, শুরু করবো কোথাথেকে?
অর্গানাইজড ক্রাইমের ইতিহাস তো হাজার বছরের পুরনো।
তবে আধুনিক ইন্ডিয়ান আন্ডারওয়ার্ল্ড বলতে আমরা যা বুঝি, সেটা বলা যাক।
আর কাহিনীর সূচনা যাকে দিয়ে, তাকে দিয়েই শুরু করা যাক। শুরু করবো তাকে দিয়ে, আর শেষ করে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর আন্ডারওয়ার্ল্ড “ডন” দাউদ ইব্রাহিমের কাহিনী দিয়ে।

যারা ২০১০ সালের অজয় দেবগান অভিনীত Once upon a time in Mumbai মুভিটি দেখেছেন, তাদের জন্য আমার এই ধারাবাহিক লিখার প্রথম অংশের কাহিনীগুলো কমন পড়বে।
ওই মুভিতে অজয় দেবগান করেছে Mastan Haider Mirza অর্থাৎ হাজি মাস্তানের রোল, আর ইমরান হাসমী অসাধারণ অভিনয় করেছে ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ডন দাউদ ইব্রাহিমের চরিত্রে।
আধুনিক মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের জন্ম যার হাতে, তিনি হলেন হাজি মাস্তান।



হাজি মাস্তানের জন্ম তামিল নাড়ু’তে। ১৯২৬ সালে। একেবারে দরিদ্র পরিবারে জন্ম।
মাত্র আট বছর বয়সে বাবার সাথে মুম্বাই এসেছিলো হাজি মাস্তান। বাই সাইকেলের দোকানে কাজ করতো। দিন মজুরি করতো। এসব করে পেটের ভাত জুটতো না।
সেই ছোট বয়সে মুম্বাই বন্দরে দিনমজুরের কাজে লেগে গেলো। সারাদিন কাজ করতো হায়দার মির্জা, ওরফে হাজি মাস্তান। হায়দার মির্জা থেকে হাজি মাস্তান হয়ে ওঠার কাহিনী সেই মুম্বাই বন্দর থেকেই।
মুম্বাইয়ের এক পাশে সাগর। আর এই সাগর হয়েই স্বর্ণ চোরাকারবারিরা ভারতে স্বর্ণ পাচার করে নিয়ে আসে।
পুলিশের চোখ ফাঁকি দেবার জন্য স্বর্ণ চোরাকারবারি’দের দরকার ছিলো হাজি মাস্তানের মত বাচ্চা ছেলেদের। ভোলাভালা চেহারার হাজি মাস্তানের সাথে পরিচয় হল কিছু স্বর্ণচোরাকারবারির। সেই ছোট বয়সে হাজি মাস্তান নিজের মুখের ভেতর স্বর্ণ লুকিয়ে মুম্বাই বন্দর পার করে দিতো পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে।
আর এভাবেই বাচ্চা বয়সে পেটের দায়ে প্রবেশ করে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে।
বয়স বাড়তে থাকে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সিঁড়ি বেয়ে আরো উপরে উঠতে থাকে হাজি মাস্তান।
মুলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসব অবৈধ স্বর্ণ ভারতে আসে। (আমাদের বাংলাদেশেও আসে। তবে বিমানবন্দর হয়ে)

একসময় কেবল স্বর্ণ নয়, আরো যত বেআইনে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া প্রোডাক্ট মুম্বাই বন্দর দিয়ে ঢোকে, সবগুলোর সাথেই নিজেকে জড়াতে শুরু করলো হাজি মাস্তান।
মাথায় ভালো বুদ্ধি ছিল হাজি মাস্তানের। ফলে বাইরের স্মাগলারদের নজরে পড়ে গেলো সে। ওরা বুঝে গেলো, ছেলে রিসোর্সফুল।
একসময় হাজি মাস্তান হয়ে গেলো স্মাগলার। টাকা পয়সা কামানো শুরু করলো ভালোমতই। নিজের একটা বাহিনী তৈরি করলো। মুম্বাই বন্দরে অন্য যেসব স্মাগলাররা ছিল, একসময় তাদেরকেও নিজের পথ থেকে সরিয়ে দিতে শুরু করলো সে।
স্বপ্ন তার মুম্বাই বন্দরের শাহেনশাহ হবার।

(** আমাদের দেশে বিদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ প্রতিবছর বিমান বন্দর দিয়ে ঢোকে, সে খবর সবাই জানে। মাসে মাসে স্বর্ণ আটকের নিউজও আসে। কিন্তু এরপরও সেটা বন্ধ হয় না। কারণ স্বর্ণ চোরাকারবারিরা বিমান বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে ঠিকই যোগাযোগ রাখে। এবং মাঝেমাঝে কিছু চালান চোরাকারবারীরা ইচ্ছা করেই স্যাক্রিফাইস করে। যাই হোক, সেসব আলোচনা পরে)

তো হাজি মাস্তান একসময় মুম্বাই বন্দরের স্মাগলিং নিজের নিয়ন্ত্রনে আনে।
হিসাবটা সহজ। আবার কঠিনও।
বাইরের স্মাগলারদের সাথে যোগযোগ রাখতে হবে। বাইরে থেকে অবৈধ মালামাল মুম্বাই বন্দর হয়ে হাজি মাস্তান পৌছে দেবে মুম্বাইয়ের অন্যসব মাফিয়াদের কাছে। অর্থাৎ সাপ্লাই বিজনেস।
আর এই করে মোটা টাকা। সেইসাথে কিছু অসাধু পুলিশ ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সাথে হাজি মাস্তানের পরিচয়। তাদের ভায়া হয়ে অসাধু পলিটিসিয়ানদের সাথে পরিচয়। অর্থাৎ যেভাবে সবকিছু হয় আরকি।
কান টানলে মাথা আসার মত ব্যাপার।

হাজি মাস্তানের টাকা যত বাড়তে থাকে, ক্ষমতাও তত বাড়তে থাকে। দলবলও তত বড় হতে থাকে। প্রভাবও বাড়তে থাকে। রিচও বাড়তে থাকে। সমাজের হাইক্লাস মানুষের সাথে মেলামেশাও শুরু হয়।
সেই সাথে মুম্বাই ভিক্তিক অন্যান্য মাফিয়া লিডারদের সাথেও তার ওঠাবসা চলতে থাকে। মুম্বাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলো নিজেরা নিজেদের ভেতর মারামারি করতো। হাজি মাস্তান তাদেরকে একসাথে একটেবিলে বসায়। ঠিক যে কাজটি আমেরিকাতে Lucky Luciano করেছিলো, একই কাজ হাজি মাস্তান করে।
মুম্বাই গ্যাংগুলোকে এলাকা ভাগ করে দেয়। ব্যবসা ভাগ করে দেয়। অর্থাৎ অমুক এই অঞ্চল, তমুক ওই অঞ্চলে রাজত্ব করবে। কেউ কারো বিজনেসে ভাগ বসাবে না।
হাজি মাস্তানের এই পদক্ষেপের কারণ মুম্বাই গ্যাংগুলোর ভেতর হানাহানির অবসান হয়।
ওদিকে সাগর ও মুম্বাই পোর্টের নিয়ন্ত্রন রাখে হাজি মাস্তান।

হাজি মাস্তান মাস্তান ষাট ও সত্তরের দশকে উপলব্ধি করে, অর্থ বিনিয়োগের সবচেয়ে লোভনীয় খাত হতে পারে ভারতীয় ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রি। মুম্বাই ভিক্তিক ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রি, যা এখন বলিউড নামে পরিচিত, সেখানে তখন চরম অর্থঅভাব। পরিচালকেরা ছবি তৈরির জন্য ব্যাংক লোন পাচ্ছেন না। বিনিয়োগ দরকার। ক্যাশ টাকা দরকার।

হাজি মাস্তানের কাছে কালো টাকার অভাব নেই। ট্যাক্স ফ্রি বিনিয়োগ। পেছনের দরজা দিয়ে।
মুম্বাই ফ্লিম পরিচালকদের কাড়িকাড়ি টাকা ইনভেস্ট করতে শুরু করে হাজি মাস্তান।

বেশি টাকা পেলে ভালো মুভি বানাতে পারে পরিচালকেরা। আর ভালো মুভি বানালে সেটা ভালো ব্যবসা করবে। আর ভালো ব্যবসা করলে ভালো লাভ আসবে।
হাজি মাস্তান বিনিয়োগ তো উসুল করবেনই। সাথে সুধ আসল সহ।

মুম্বাই ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করে বেশ ভালো লাভবান হতে শুরু করে হাজি মাস্তান।
মুভির পরিচালকদের সাথে সক্ষতা গড়ে ওঠে হাজি মাস্তানের।
সেইসাথে নায়ক নায়িকাদের সাথেও।
দিলিপ কুমার, রাজ কাপুর, ধর্মেন্দ্র, সঞ্জিব কাপুর, ফিরোজ খানের মত তখনকার সুপারস্টাররা ছিলেন হাজি মাস্তানের বন্ধু তালিকায়।

কথায় বলে, টাকায় টাকা আনে। সেইসাথে আনে ক্ষমতা। প্রভাব। খ্যাতি।
ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রিতে হাজি মাস্তান রীতিমত নামকরা প্রযোজক, ফ্লিম ফাইনান্সার।
এছাড়া রিয়েল স্টেট, ইলেকট্রনিক, হোটেল বিজনেসেও ইনভেস্ট করে হাজি মাস্তান।


তখন দক্ষিণ মুম্বাইয়ের Bhendi Bazar, Dongri, Nagpada টাইপের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোর অবস্থা ছিলো ভয়াবহ। চরম হতদরিদ্র মানুষগুলোর কাছে হাজি মাস্তান ছিল রীতিমত রবিন হুড।
মানুষ ঝামেলায় পড়লে পুলিশের কাছে যেতো না। ‘গডফাদার’ হাজি মাস্তানের কাছে যেত।
চাকরি বাকরির দরকার, হাজি মাস্তান তো আছে। চাকরি দিয়ে দেবে। হাজি মাস্তানের ব্যবসা বানিজ্যের অভাব নেই। একটা না একটা জায়গায় তো ব্যবস্থা ঠিকই করে দেবে।
দক্ষিণ মুম্বাইয়ের মুসলিম অধ্যুষিত এসব অবহেলিত জায়গায় হাজি মাস্তান অনেক বড় সেলিব্রিটি।

অর্থাৎ সেই গডফাদার মুভিতে যেটা দেখায়।
দেশে দেশে ঘটনাগুলো ঠিক একই রকম। কিছুটা ভিন্ন মোড়কে।
সেইসাথে আরো একটা জিনিস ভাবার বিষয় আছে। নিউইয়র্ক আন্ডারওয়ার্ল্ডের লাকি লুচিয়ানো, ভিটো জেনোভিচ, বাকসি সিগ্যাল, এরা সবাই উঠে এসেছিলো ইহুদি বস্তিগুলো থেকে। অবহেলিত, চরম দরিদ্র বস্তি থেকে।
মুম্বাইয়ের দাউদ ইব্রাহিমের উত্থানও হবে মুম্বাইয়ের সংখ্যালঘু হতদরিদ্র এলাকা থেকে। সেই গল্প একটু পরে।

তো হাজি মাস্তান ছিল মুম্বাইয়ের প্রথম সেলিব্রিটি গ্যাংস্টার। যাকে মাফিয়া ডন, বা গডফাদার আপনি বলতেই পারেন।
হাজি মাস্তান অন্যান্য মুম্বাই ও তামিলনাড়ু ভিক্তিক গ্যাংস্টারদের সাথে লিয়াজো করেই চলতো। ব্যবসা বানিজ্য ভাগভাটোয়ারা করে নিয়েছিলো। যাতে আন্ধকার জগতের এসব খলনায়কদের ভেতর বড়ধরণের যুদ্ধ শুরু না হয়।

হাজি মাস্তানের ব্যবসা ছিল অবৈধ স্বর্ণ চোরাচালান, ট্যাক্স বহির্ভুত মদ, ইলেকট্রনিক্স, বেআইনিভাবে আনা অস্ত্র, এসব ছিলো হাজি মাস্তানের মুল ব্যবসা। সেইসাথে একসময় রিয়েলস্টেট, ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল বিজনেসে ইনভল্ভ হয়েছিলেন হাজি মাস্তান। কিন্তু তার নামে Narcotics অর্থাৎ মাদক দ্রব্যের অর্থাৎ হেরোইন, কোকেনের মত দ্রব্যের ডিলিংসের কোনো অভিযোগ ছিল না। সেগুলো অন্যরা করতো।

তো ১৯৯৪ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান হাজি মাস্তান।
অজয় দেবগানের Once upon a time in Mumbai মুভির শেষটা যেভাবে দেখানো হয়েছে, সেভাবে নয়।

হাজি মাস্তান নিজেকে পরিচয় দিতেন “সোলেমান মির্জা” হিসেবে।
হাজি মাস্তান নামটি মিডিয়ার দেয়া।

হাজি মাস্তান পেটের দায়ে খারাপ হয়েছিলো।
আর এবার যার কথা বলবো, সে খারাপ হয়েছিলো স্বভাবগতভাবেই।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে যে নাম সবচেয়ে পরিচিত, আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম।



বাপ তার পুলিশ। মুম্বাই পুলিশের কন্সটেবলের চাকরি করতেন। মা গৃহিনী।
বেড়ে ওঠা দক্ষিন মুম্বাইয়ের Dongri এলাকাতে।
ছোটবেলা থেকে গোঁয়ার, ডানপিটে ছিল দাউদ ইব্রাহিম।
পরিবার থেকে যতটুকু সম্ভব সাপোর্ট দেয়া হলেও উচ্চভিলাসী দাউদ বখে যাওয়া বন্ধুবান্ধবের সাথে ছোটবেলা থেকেই চুরি, ছিনতাই শুরু করে।
দাউদের বাবার কাছে অভিযোগ আসতো। দাউদ মার খেতো। কিন্তু এতে দাউদ আরো বখে যেতে শুরু করে।
লিখাপড়া বাদ দিলো দাউদ।
সারাদিন এলাকায় টো টো করে ঘুরতো। এলাকার মাস্তানে পরিনত হয় সেই বয়সে।
এরপর দাউদের বাবা পুলিশের লোক হয়েও ধর্না দিলেন হাজি মাস্তানের কাছে।
সেটা ষাটের দশকের শেষদিকের কথা।
হাজি মাস্তান দাউদের জন্য ছোটখাটো একটা কাজ জোগাড় করে দিলেন। কিন্তু সেটা দাউদের পোষালো না।
সে ধনী হতে চায়।
হাজি মাস্তানের কারবার সম্পর্কে দাউদের বেশ ভালো ধারণাই ছিল।
দাউদ ছুটে গেল হাজি মাস্তানের কাছে।
বললো, আমি আপনার কাছের লোক হতে চায়। আপনার ব্যবসায় যোগ দিতে চাই।

দাউদের ভেতর হাজি মাস্তান কিছু একটা দেখেছিলো। এই ধরণের ছেলেকে দিয়েই কাজ হবে। ওর ভেতর কিছু একটা আছে !!
দাউদ ঢুকে গেলো হাজি মাস্তানের স্মাগলিং বিজনেসে।
হাজি মাস্তানের খাস লোক হতে শুরু করে সে।

হাজি মাস্তানের সাথে থেকে থেকে স্বর্ণলতার মতই বেড়ে ওঠে দাউদ।
হাজি মাস্তান যে কাজটা কখনোই করেনি, দাউদ এবার সেই কাজটি করা শুরু করে। হাজি মাস্তানের স্মাগলিং বিজনেসে ঢুকে narcotic অর্থাৎ মাদক দ্রব্য মুম্বাই বন্দর দিয়ে স্মাগলিং শুরু করে দাউদ।
আর এই নিয়ে হাজি মাস্তানের সাথে দাউদের বিবাদ তৈরি হয়।
দাউদ হাজি মাস্তানের মত কেবল মুম্বাইএর বন্দরের রাজা হতে চায়নি। সে চেয়েছিলো গোটা মূম্বাই শহরে রাজত্ব করতে। গোটা মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিজের দখলে নিতে।
দাউদের মাদকপাচারে হাজি মাস্তান বাধা দেয়। দাউদের দুইজন খাস লোক’কে হাজি মাস্তানের লোকেরা আক্রমন করলে অফিসিয়ালি হাজি মাস্তানের দল থেকে বেরিয়ে যায় দাউদ ইব্রাইম।

তৈরি করে তার "The Young Company" যেটা পরবর্তীকালে “D-Company” নামে গোটা দুনিয়াতে পরিচিত হয়।

মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড আশির দশকের শুরুর দিকে এসে বদলে যেতে শুরু করে। দাউদের প্রভাবে।
হাজি মাস্তান মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে যে নিয়ন্ত্রন এনেছিলো, দাউদ ঝড়ে সেটা বেসামাল হয়ে যায়। দাউদের কোনো ক্ষুদ্র অঞ্চল নয়, গোটা ব্যবসা চায়। গোটা মুম্বাই সে চায়।

মুম্বাইয়ের অন্যান্য গ্যাংদের সাথে গুটিবাজি শুরু করে প্রথমে সে হাজি মাস্তানের প্রভাব কমাতে শুরু করে। ঘটনা চক্রে সেসময় অর্থাৎ আশির দশকের দিকে হাজি মাস্তানও অবৈধ স্মাগলিং ব্যবসা বাদ দিয়ে ফ্লিম ইন্ড্রাস্ট্রি আর রিয়েল স্টেট নিয়েই পড়ে থাকে। আর এই ভ্যাকুয়াম দাউদ পুরন করতে শুরু করে।
গোটা আশির দশকে দাউদ মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের উপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।

এবং আশির দশকের শেষ দিকে, মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে একচেটিয়া দাউদ ইব্রাহিমের রাজত্ব।
হাজি মাস্তানের গ্রুপ ততদিনে দাউদের নিয়ন্ত্রনে।

হাজি মাস্তান মুম্বাই ও ভারতের অন্যান্য জায়গার ক্রাইম সিন্ডিকেটগুলোর সাথে পার্টনারসিপ ভিক্তিতে ব্যবসা চালাতো। কিন্তু দাউদ এসে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রনে নেয় সবকিছু। হয় তার কথামত চলতে হবে, অন্যথায় মরতে হবে।

দাউদের হাত কেবল ভারতে সীমাবন্ধ থাকেনি। দাউদ তার অন্ধকার সম্রাজ্য বিস্তার করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। আর্মেনিয়ান মাফিয়া, রুশ মাফিয়া, এশিয়ান মাফিয়াদের সাথে মিলে বিশাল এক ক্রাইম নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে যায় দাউদ।
মানি লন্ডারিং ব্যবসা, নারী পাচার, আফগানি হেরোইন এশিয়া ও ইউরোপে ছড়িয়ে দেয়া, আফগানিস্তানে সোভিয়েত বিরোধি যুদ্ধে অস্ত্র পাচার করেও দাউদ প্রচুর অর্থ কামানো শুরু করে।
নব্বয়ের দশকের শেষদিকে দাউদ ইব্রাহিম তালিবান প্রটেকশন নিয়ে আফগানিস্তানে গিয়ে ওসামা বিন লাদেনের সাথে দেখা করে। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং আফ্রিকাতে অস্ত্র ব্যবসা, ইংল্যান্ড সহ ইউরোপের বড়বড় দেশে বিপুল পরিমাণ আফগানি হেরোইন সাপ্লাই দিতে থাকে দাউদ।
মুম্বাইয়ের রিয়েলস্টেট ব্যবসাতেও দাউদ ভাগ পেতে শুরু করে।
ধরুন, কোনো রিয়েলস্টেট ব্যবসায়ী মেগা প্রজেক্ট করবে এমন একটা জায়গায় যেখানে বিশাল বস্তি। তো এই বস্তি উচ্ছেদ করতে হবে।
এই ধরণের কাজে দাউদের ক্রাইম সিন্ডিকেট বেশ ইফেক্টিভ। রাতের আধারেই এরা গোপনে কাজ করবে। ভয় ভীতি দেখিয়ে, আতংক তৈরি করে বস্তি উচ্ছেদ করবে দাউদের দল। এবার সেখানে যখন রিয়েল স্টেট ব্যবসা রমরমা হবে, তখন দাউদ ভাগ পাবে।
মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রিতে তখন দাউদের দাপট।





মধ্যপ্রাচ্যে শারজাহ কাপ চলে, আর দাউদের জুয়া খেলার বিজনেসও রমরমা হয়।
ম্যাচ ফিক্সিং কেন হয়?
এসব বেটিং যারা করে, জুয়া যারা খেলে, তারাই এই ম্যাচ ফিক্সিং করে।




ভারতের সাবেক ক্রিকেটার দিলিপ ভেন্সারকার ২০১৩ সালে এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ১৯৮৬ সালে দাউদ ইব্রাহিম শারজাহ কাপ চলার সময় ইন্ডিয়ান ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমে ঢোকে, এবং প্রতিটি ইন্ডিয়ান ক্রিকেটারকে একটা করে ব্রান্ড নিউ গাড়ি অফার করে যদি তারা ফাইনাল ম্যাচ পাকিস্তানকে হারাতে পারে।

ব্যাপারটা হল, দাউদ ইব্রাহিম ফাইনাল ম্যাচে ইন্ডিয়ার হয়ে বেট ধরবে। এজন্য ইন্ডিয়ার জেতাটা তার জন্য জরুরী।
সিম্পল হিসাব।

দাউদ ইব্রাহিমের আন্ডারওয়ার্ল্ড আশির দশকের শেষদিকে রীতিমত রমরমা। ওই যে বললাম, আশির দশকে আফগানিস্তানের যুদ্ধে দাউদ ইব্রাহিম অস্ত্র ব্যবসা করেছিলো, আর সেই সুবাদেই দাউদের সাথে পাকিস্তানি গোয়েন্দাসংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স, অর্থাৎ ISI এর সখ্যতা তৈরি হয়। আর আইএসআই এর সাথে দাউদের এই সম্পর্ক মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডকে একেবারেই বদলে দেবে।
সেই কাহিনী এবার বলছি।

১৯৯২ সাল। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা নিয়ে ভারতে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সেই দাঙ্গায় দুই হাজারের উপর মানুষ মারা যায়। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি হবে, কম নয়।
মুম্বাইয়ের অবহেলিত মুসলিম অধ্যুষিত দক্ষিণ অংশের এলাকাগুলোতেও দাঙ্গায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
এবার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড রীতিমত বদলে যায়।

দাউদ ইব্রাহিম যত অকাম কুকামই করুক, ভারতে মুসলিম পরিবারে জন্ম নেবার সুবাদে তার ভেতরও সেই সময় আইন্ডেন্টিটি ক্রাইসিস কাজ করেছিল। এছাড়া হাজি মাস্তানের দেখাদেখি দাউদ দক্ষিণ মুম্বাইয়ের মুসলিম অধ্যুষিত গরিব এলাকাগুলোতে “রবিন হুড” গীরি করতো।
মানুষ সমস্যায় পড়লে পুলিশের কাছে না গিয়ে দাউদের লোকেদের কাছে যায়। দাউদ এলাকার মুসলিম বেকার ছেলেপেলেদের জন্য কাজেরও ব্যবস্থা করে দেয়।
দক্ষিন মুম্বাইয়ের এসব মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাতে দাউদের বেশ জনপ্রিয়তা ছিল।
খেয়াল করে দেখুন, বিখ্যাত কলম্বিয়ান ক্রাইম বস পাবলো এসকোবার কিন্তু তার এলাকা মেডিলিনের মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল। এখানে ভোটে দাঁড়িয়ে পার্লামেন্টের মেম্বারও হয়েছিল। ‘রবিন হুড’ রোল সেও প্লে করতো।
দুইটা কারণে।
নিজের এলাকার মানুষের কাছে একটা ভালো ইমেজ ধরে রাখতে। অর্থাৎ আমি চুরি করি আর যাই করি, তোমার জন্য করি। তোমাদের বিপদে আমি আছি, সুতরাং কোনোদিন আমার বিপদ হলে তোমরা আমার সাথে থাকবা।
আবার আরেকটা কারণ হল,
এই ধরণের হতদরিদ্র মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের উপকার করলে চরম লয়েল সাপোর্ট পাওয়া যায়। লয়েল সাপোর্টার তৈরি করা যায়।

তো যাই হোক, দাউদ সিদ্ধান্ত নেয়, সে মুম্বাই উড়িয়ে দেবে। ভারত সরকারকে উচিৎ শিক্ষা দেবে।
এরপর সে যা করে, সেটা রীতিমত ভয়ংকর।

১৯৯৩ সালের মার্চ মাসের ১২ তারিখ।
• Mumbai Stock Exchange Building
• Passport Office
• Masjid- Mandvi Corporation Bank Branch
• Fisherman's Colony in Mahim causeway
• Zaveri Bazaar
• Plaza CinemaCentury Bazaar
• Katha BazaarHotel Sea Rock
• Terminal at Sahar Airport (now known as CSIA)
• Air India Building
• Hotel Juhu Centaur
• Worli
ভারতের মুম্বাই শহরের এই গুরুত্বপূর্ন স্থানগুলো সিরিজ বোমা হামলায় কেপে ওঠে। ২৫৭ জন মানুষ মারা যায়। ৭১৭ জন হতাহত হয়।
বোমা হামলা মুম্বাই শহর থমকে যায়।











এই হামলার ফলে আরেকটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয় গোটা ভারত জুড়ে। যার ফলে আরো মানুষের প্রাণ যায়।

দাউদ ইব্রাহিম দুবাইতে তার বিলাসবহুল বাড়িতে বসে এই হামলার অর্ডার দিয়েছিলো। আর সমগ্র হামলার প্লান তৈরি করেছিল দাউদের ডান হাত হিসেবে পরিচিত “টাইগার মেনন”
টাইগার মেনন এখনো ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে আছে।



গাড়ি বোমা থেকে শুরু করে মোটর সাইকেল বোমা, ব্রিফকেস বোমা, এসব ব্যবহার করা হয়েছিলো এই হামলায়।
এটা ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা।

দাউদ ইব্রাহিমের যেসব ফুট সোলজার এই হামলাতে অংশগ্রহন করেছিল, এদের অধিকাংশ ছিল বেকার যুবক। বাবরি মসজিদ ধ্বংস পরবর্তী দাঙ্গার সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে এসব ছেলেদের রিক্রুট করা হয়েছিলো।
এই হামলা পরিচালনায় অংশগ্রহনকারী ফুট সোলজারদের দাউদ পাকিস্তানে বা দুবাইতে নিয়ে যেতে পারেনি। ভারতীয় পুলিশ তাদের কয়েকজনকে আটক করে। বাকিরা এনকাউন্টারে মরে, কেউ আবার আটকের হাত থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করে।
২০০৭ সালের মুভি Black Friday তে মুম্বাই হামলার পর পুলিশ যেভাবে হামলাকারি ফুট সোলজারদের ধরেছিল, সেটার উপর ভিক্তি করে বানানো। মুভিটি দেখতে পারেন।

দাউদ ভেবেছিলো এই হামলার পর ভারতের মুসলিমদের কাছে তার জনপ্রিয়তা বাড়বে। কিন্তু হয়েছে উল্টাটা। দাউদ ইব্রাহিম যে কত বড় সন্ত্রাসী, সেটাই বরং সবার সামনে আরো পরিস্কার হয়ে যায় এই হামলার পর।
ঠিক পাবলো এসকোবারও কলম্বিয়াতে এই একই ভুল করেছিল। বিশাল গাড়ি বোমা হামলা চালিয়ে কলম্বিয়ার রাজধানী কাঁপিয়ে দিয়েছিলো। প্রচুর নিরীহ মানুষ খুন করেছিল।


এখানে বলে রাখি, ভারতের নামকরা অভিনেতা সঞ্জয় দত্ত এরেস্ট হয়েছিল এই মুম্বাই হামলার পর। Terrorist and Disruptive Activities (Prevention Act) এর অধিনে সঞ্জয় দত্ত এরেস্ট হয় অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে। পুলিশ অভিযোগ এনেছিল, সঞ্জয় দত্ত মুম্বাই হামলার কথা আগে থেকেই জানতো। পুলিশের অভিযোগ, মুম্বাই হামলার পর সৃষ্টি হওয়া দাঙ্গায় অস্ত্র সরবরাহ করার কাজটি সঞ্জয় দত্তকে দিয়ে করাতে চেয়েছিল দাউদ।
যাই হোক, সঞ্জয় দত্তের পাঁচ বছরের জেল হয় পরে। সঞ্জয় দত্তের বাবা তখন ভারতের এমপি।
http://www.dnaindia.com/india/report-here-s-why-sanjay-dutt-is-in-jail-2046779

মুম্বাই হামলার পর মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে পরিবর্তন আসে। দাউদের ডি কোম্পানি’তে যেসব হিন্দু গ্যাং মেম্বার ছিল, তারা আলাদা হয়ে যায়। দাউদের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভাঙ্গন ধরে।
দাউদের একসময়কার ডান হাত ‘ছোট রাজন’ দাউদের শত্রু হয়ে যায়।



এরপর মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে শুরু হয় মারামারি। দাউদের লোকেরা ছোট রাজনের লোকদের মারে। ছোট রাজনের লোকেরা দাউদের লোকদের মারে।
এই মারামারি আজও চলতেছে।

২০০০ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে নাটকীয় কায়দায় দাউদ ইব্রাহিমের লোকেরা ছোট রাজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়। কিন্তু সে যাত্রায় ছোট রাজন অল্পের জন্য বেঁচে যান।

২০১৫ সালে ছোট রাজন গ্রেফতার হল ইন্দোনেশিয়ার বালি উপদ্বীপে। এখন ভারতের আদালতে তার বিচার চলতেছে।



ওদিকে দাউদ ইব্রাহিম কখনো দুবাই, কখনো পাকিস্তানে অবস্থান করে।
মার্কিন প্রশাসন তাকে মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীর লিস্টে রেখেছে।
বর্তমান দুনিয়ার শীর্ষ ১০ মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তির তালিকাতে দাউদ ইব্রাহিম আছে তিন নাম্বারে।

শত কোটি টাকা তার মাথার মুল্য।
অথচ সে দিব্যি ঘুরে বেরাচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন দাউদ ইব্রাহিম এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
২০০৬ সালে দাউদ ইব্রাহিমের মেয়ে Mahrukh Ibrahim, এর সাথে বিয়ে হয় পাকিস্তানি ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াদাদের ছেলের।
এই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল দুবাইয়ে। ধুমধাম করে এই বিয়ে হয়েছিল। এবং বিয়ের সময় ইন্টারপোল রেড এলার্ট জারি করে রেখেছিল। কিন্তু দাউদ সামহাউ সেই বিয়েতে এসেছিল।
টাকা থাকলে আর আইএসআই’এর মত এতো কুখ্যাত একটা গোয়েন্দা বাহিনী পকেটে থাকলে এসব হয়ত করাই যায়। ফিল্মি স্টাইলে।

দাউদ ইব্রাহিমের আরেক মেয়ে মেহরিনের বিয়ে হয় পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত এক মার্কিন নাগরিকের সাথে।
তার ছেলের বিয়ে হয়েছে লন্ডনের এক ধনুকুব ব্যবসায়ীর মেয়ের সাথে।


হাজি মাস্তান মুম্বাইয়ের বন্দর থেকে শুরু করেছিল তার কারবার। মুম্বাই বন্দর হয়েই ১৯৯৩ সালের বোমা হামলার জন্য প্রচুর পরিমাণ বোমা ও অস্ত্রসস্ত্র ভারতে ঢুকেছিল।
আবার এই ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় অংশগ্রহনকারী সন্ত্রাসীরাও মুম্বাইয়ে ঢুকেছিল সাগর দিয়ে।


লিখার শুরুতেই বলেছিলাম, রাকেশ রোশনের উপর গুলি চালিয়েছিলো আলী বুদেশ।
এই আলী বুদেশ প্রথম জীবনে ছিল একজন পকেটমার।




মুম্বাইয়ের বস্তি এলাকায় পকেটমারী ও ছিচকে চুরি করতো।
এরপর যা হবার, অর্থাৎ একসময় দাউদ ইব্রাহিমের লোকেদের নজরে এলো। এরপর দাউদ ইব্রাহিমের ডি কোম্পানিতে যোগ দিয়ে বড় গুন্ডা হয়ে গেলো।
একসময় দাউদ ইব্রাহিমের সাক্ষাৎপেতে সে দুবাই গেল। মুম্বাই মাফিয়াদের জন্য ইহা নাকি এক বিরাট সম্মান। অর্থাৎ দাউদ ইব্রাহিমের দেখা পাওয়া।

যাই হোক, একসময় বুদেশ দাউদ ইব্রাহিমের কিছু লোকজন নিয়ে আলাদা হয়ে গেল। বাহরাইনে ঘাটি গেড়ে সেখান থেকে অকাম কুকাম চালিয়ে যাচ্ছে সে।

দাউদ ইব্রাহিম তাকে হত্যার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে বহুদিন ধরে। দাউদ ইব্রাহিমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছোট সাকিলের উপর দায়িত্ব পড়েছে আলী বুদেশকে শেষ করার।
কিন্তু এখন পর্যন্ত সে বুদেশ বেঁচে আছে।

আলী বুদেশও অন্যান্য মাফিয়াদের মত বলিউডের প্রতি ইন্টারেস্টেড। আফটার অল, ইনভেস্ট করার জন্য বলিউড সবসময় লোভনীয় জায়গায়। কাঁচা টাকা ইনভেস্ট করে নগদে প্রচুর কাঁচা টাকা কামানো যায়।

বলিউডে মাফিয়াদের এই প্রভাব, আজ পর্যন্ত আছে।
ওদিকে আফগানিস্তানে হেরোইনের রমরমা উৎপাদন হচ্ছে।
Golden Crescent আর golden Triangle এই দুইটা জায়গার নিয়ন্ত্রণে রাখা এশিয়ান মাফিয়া দলগুলোর জন্য মুল ব্যাটলফিল্ড।




( পরের পর্বে থাকবে অন্যকোনো দেশের অন্যকোনো মাফিয়া চক্র নিয়ে লিখা।
আমি বেশি ডিটেইলসে যাবো না। জাস্ট একটা ধারণা দিয়ে যাবো )

( চলবে......... )















Read More »

Tuesday, August 2, 2016

Koch Brothers, American Puppet Masters



আমেরিকার বিখ্যাত Massachusetts Institute of Technology অর্থাৎ MIT-এর একটি নাম করা ক্যান্সার রিসার্চ ইন্সটিউট আছে।
নাম হল, Koch Institute for integrative Cancer Research.
বর্তমানে এই ক্যান্সার গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দুনিয়ার সবচেয়ে নামকরা এবং উন্নত ক্যান্সার গবেষণাকেন্দ্র। ক্যান্সারের প্রতিরোধ ও প্রতিষেধক আবিস্কার এবং পৃথিবী থেকে ক্যান্সার নির্মুল করার মত মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে।
ক্যান্সার গবেষণাতে কিছু যুগান্তকারী সাফল্য ইতিমধ্যে দেখিয়েছে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

খুবই ভালো। তাই না? কিন্তু প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার।
যার ডোনেশনে এই উন্নত ক্যান্সার প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছে, যার নামে এই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছে, তার নাম ডেভিড কোখ।
Koch brothers হিসেবে পরিচিত দুই ভাইয়ের একজন।
এবং অগনিত আমজনতার ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার পরোক্ষ এবং ক্ষেত্রে বিশেষে প্রত্যক্ষ কারণও তিনি ও তাদের প্রতিষ্ঠান !


১৯৯২ সালে এই ভদ্রলোক মুত্রথলির ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
বাঁচার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন ডেভিড কোখ। আমেরিকার সবচেয়ে নামকরা ডাক্তাররা মিলে তার চিকিৎসা করেছে। নিজে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার পর ক্যান্সার রিলেটেড গবেষণায় তিনি টাকা ঢালা শুরু করেন।
Prostate cancer Foundation-এর বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সের একজন সদস্য হন তিনি।
সেই আমলের ৪১ মিলিয়ন ডলার ডোনেট করেন এই ফাউন্ডেশনে। ৫ মিলিয়ন ডলার ডোনেট করেন ন্যানোটেক গবেষণাতে।
২০০৬ সালে Johns Hopkins University of Medicine-এর ক্যান্সার রিসার্চ ইন্সটিটিউটের জন্য ২০ মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দেন তিনি।
সেই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিল্ডিংটির নাম ‘David H. Koch Cancer Research Building’

২০০৭ সালে MIT-এর জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দিয়ে তৈরি করেন ১ লক্ষ ৮০ হাজার বর্গফুটের Koch Institute for integrative Cancer Research. যেটার কথা শুরুতেই বললাম।

একই বছর ৩০ মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দেন Memorial Sloan Kettering Cancer center ফ্যাসিলিটির জন্য।
২০১৫ সালে এসে এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য ১৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২৩ তলা একটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির David H. Koch Center for cancer care তৈরির কাজ নিয়েছেন তিনি। যেটার কাজ এখন চলমান।
(** আমাদের হুমায়ুন আহমেদের জীবনের শেষসময়ে ক্লোন ক্যান্সারের চিকিৎসা হচ্ছিলো এই Memorial Sloan Kettering Cancer Center হাসপাতালেই)

এছাড়াও ২০০৮ সালে University of Texas, Houston এর জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দিয়ে তৈরি করেন David Koch Center for applied Research in Genitourinary Cancers.

২০১৯ সাল নাগাদ আরো ২ বিলিয়ন ডলার ক্যান্সার, চিকিৎসা ও এমবুলেন্স সার্ভিসের কাজে ব্যয় করবেন ডেভিড কোখ।

এতোটুকু পড়ার পর যে কেউ বলবে, লোকটা অনেক উদার। মানবিক। দায়িত্ববান। সচেতন। একজন সম্মানিত নাগরিক। তাকে অবশ্যই শ্রদ্ধা করা উচিৎ।
তাহলে প্রশ্ন, খোদ নিজের দেশেই কেনো এই দুইভাই রীতিমত ভিলেন ইমেজ?

ওই যে বললাম, প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার।
এবার আসুন, মুদ্রার অন্যপিঠটাও দেখি।

ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট কার্টুনটি দেখেছেন ছোটবেলা?
ক্যাপ্টেন প্ল্যানেটের যে ভিলেনগুলো থাকে, তারা কি করে? হয়ত মনে আছে, তারা পরিবেশ দূষণ করে।
মানুষের জীবনের তোয়াক্কা না করে নদী নালা, খালবিল আবাদী জমি, বাতাস, পানি ধ্বংস করে।
ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট কার্টুনের সেই ভিলেনগুলোর দুনিয়াবি ভার্সন হিসেবে এই কোখ ভাইদের বিবেচনা করতে পারেন।
তারা কেবল আমেরিকার পরিবেশ নয়, পলিটিক্সকেও দুষিত করেছে। তারা একরকম আইনের উর্ধে। টাকা দিয়ে তারা যেমন আইন তৈরি করে, আবার টাকার জোরে আইন ভাঙ্গে। পলিটিসিয়ান, বিশেষ করে রিপাবলিকান পার্টি এখন একরকম কোখ ভাইদের পকেটে।
এদের অসংখ্য ফ্যাক্টরি থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেটার সঠিক পরিসংখ্যান হয়ত নেই। তবে প্রতিবাদ হয়েছে জোরেসোড়ে। কোখ ভাইদের কাজকারবার কোনো গোপনীয় বিষয় নয়। একেএকে সকল কিছু নিয়েই আলোচনা হবে। শুরু করতে হবে একেবারে শুরু থেকে।
সবার আগে আলোচনা করা যাক, কোখ ভাই কারা; কোথাথেকে এসেছে; কি করে।



ফোর্বস ম্যাগাজিন অনুসারে কোখ ইন্ডাস্ট্রি আমেরিকার দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় প্রাইভেট কোম্পানি। যার রেভিনিউ ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। মাইক্রোসফটের রেভিনিউ যেখানে ৯৩ বিলিয়ন ডলার।
(** এখানে গুলিয়ে ফেলবেন না আশা করি। মাইক্রোসফট একটা পাবলিক কোম্পানি। কোখ ইন্ডাস্ট্রি একটা প্রাইভেট কোম্পানি। মাইক্রোসফটের শেয়ারের মালিক আমেরিকার যেকেউ হতে পারে। শেয়ার মার্কেটে গিয়ে জাস্ট মাইক্রোসফটের শেয়ার কিনতে হবে। কিন্তু কোখ বা কার্গিলের মত প্রতিষ্ঠান একেবারেই প্রাইভেট।
এজন্য মাইক্রোসফটের asset কত, সেটা সহজে পাওয়া গেলেও Koch industries Ltd এর asset হিসাব সঠিকভাবে জানা যায় না। স্পেকুলেশন করা যায় )

তো David Koch এবং তার ভাই চার্লস কোখ মিলে কোম্পানির ৮৪% মালিকানা হোল্ড করে। বাকিগুলো নিকট বন্ধুবান্ধব ও ব্যবসায়িক পার্টনারদের ভেতর।

ডেভিড কোখ এবং চার্লস কোখ দুইজনই দুনিয়ার সেরা ১০ শীর্ষ ধনীর লিস্টে আছেন। কারণ দুইজনের সম্পদের পরিমাণ আলাদা আলাদাভাবে এই মুহুর্তে ৪৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার করে। অর্থাৎ দুইভাইয়ের মোট আছে ৮৯ বিলিয়ন ডলার। (বিল গেটসের সম্পদের পরিমাণ এখন ৭৯.৪ বিলিয়ন ডলার )
অর্থাৎ দুইভাইয়ের সম্পদ এক করলে তারা দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী।



Wait a minute !!!!
তারা দুই ভাই নয়। তারা আসলে চার ভাই।
তাদের অন্যদুই ভাই Bill Koch এবং ফেড্রিক কোখের সম্পদের পরিমাণ যথাক্রমে ২ এবং ৪ বিলিয়ন ডলার করে।
অর্থাৎ চার ভাইয়ের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ এই মুহুর্তে প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার।



সমস্যা হইলো, বিল আর ফেড্রিক এক গ্রুপ। এবং চার্লস আর কোখ আরেক গ্রুপ।
আপন মায়ের পেটের একই রকম চেহারার এই চার ভাইয়ের ভেতর দুইটা গ্রুপ। দুইভাই মিলে অন্য দুইভাইয়ের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। সেসব পরে বলবো।


শুরুতেই বলি। তাদের ব্যবসা শুরু হল কিভাবে।
ব্যবসা পেয়েছে তারা তাদের বাপের কাছ থেকে। উত্তরাধিকার সুত্রে।

চার ভাইয়ের বাবা ফ্রেড কোখ। (উচ্চারণ আসলে “কোওক” ) /kouk/


ফ্রেড কোখ ১৯২২ সালে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংএর উপর গ্রাজুয়েশন করেন MIT থেকে।
এরপর পেট্রোলিয়াম কোম্পানিতে চাকরি করেন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে।
একসময় নিজেই একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের মালিক হয়ে যান।
নাম Winkler-Koch Engineering Company

১৯২৭ সালে ফ্রেড কোখ অধিক কার্যকর thermal Cracking process উদ্ভাবণ করেন যেটা দিয়ে ক্রুড ওয়েল থেকে আরো সহজে গ্যাসোলিন বিয়োজিত করা যায়।
সেইসময় আমেরিকার অন্যান্য পেট্রো কোম্পানিগুলো ফ্রেড কোখ’কে ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তাদের ব্যবসার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত করতে শুরু করে।
এটা অবশ্য দুনিয়ার সব জায়গার নিয়ম। যখন কোনো ছোট কোম্পানি খুব ভালো করা শুরু করে, তখন বড়বড় কোম্পানিগুলো সেই ছোট কোম্পানিকে থ্রেট মনে করে এবং সেটাকে ধ্বংস করার জন্য চেষ্টা করে। ফ্রেড কোখের হয়েছিলো সেই দশা।
জঙ্গলের বড় খাদকগুলোর সাথে টিকতে পারছিলেন না ফ্রেড কোখ। তাকে পেটেন্ট সঙ্ক্রান্ত নানান মামলা দিয়ে জর্জরিত করে রেখেছিলো আমেরিকার বড়বড় তেল গ্যাস কোম্পানিগুলো।
ফলে ফ্রেড কোখ বাধ্য হয়ে দেশের বাইরে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন।

ফ্রেড কোখের কোম্পানি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ডিল করে।
জোসেফ স্তালিনের সম্মতিতে ফ্রেড কোখ সোভিয়েত ইউনিয়নে পেট্রোলিয়ামের ডিস্ট্রিলিউশন প্ল্যান্ট প্রতিষ্ঠা করে। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে কোখের ব্যবসা। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইঞ্জিনিয়ারদের ট্রেনিং দেবার দায়িত্ব পড়ে কোখের উপর। একসময় প্রায় ১৫ টি তেল শোধনাগার তৈরি হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে। কোখের তত্ত্বাবধানে।
আরেক মার্কিন ব্যবসায়ী উইলিয়াম ডেভিসের সাথে মিলে কোখ হিটলারের জার্মানিতে জার্মানির তৃতীয় সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার তৈরি করেন। এই উইলিয়াম ডেভিস ছিলো অনেকটা হেনরি ফোর্ডের মতই এলিট ক্লাসের মার্কিন ধনুকুব, যারা হিটলারের নাৎসি বাহিনীর ফান্ডিং দিতো।

তো এভাবেই কোখের ব্যবসা একসময় বড় হয়। কোখ শক্তিশালি হতে শুরু করে। অনেক অর্থসম্পদের মালিক হয়ে যায়।
এবার আমেরিকাতে কিছু বিজনেস পার্টনারকে সাথে নিয়ে তিনি ১৯৪০ সালে তৈরি করেন Wood River Oil and Refining Company
এটাই পরবর্তীকালে Koch industries lnc হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ফ্রেড কোখ একজন বর্ণবাদী ছিলো।
আমেরিকার তখনকার সিভিল রাইটস মুভমেন্টকে কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
কালো এবং সাদা চামড়ার ছেলেমেয়ে একসাথে স্কুলে যাবে, বিয়ে করবে, এসবের বিরোধি ছিলেন ফ্রেড।
ফ্রেডের ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে যে গৃহপরিচায়িকার তত্ত্বাবধানে, সেই জার্মান মহিলা ছিলো হার্ডকোর নাৎসি।

ফ্রেড কোখের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা কোখ ইন্ডাস্ট্রির দায়িত্ব বুঝে নেয়।

কোখ ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান CEO এবং চেয়ারম্যান চার্লস কোখ MIT থেকে মেক্যানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংএর উপর মাস্টার্স করেছেন।
আর ডেভিড কোখ MIT থেকেই কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংএর উপর এম,এস করেছেন।

অন্য দুইভাই বিল কোখ MIT থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংএর উপর এম,এস এবং ফেডরিখ কোখ বিখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা।

সমগ্র আমেরিকা জুড়ে কোখ ভাইদের রকমারি ব্যবসা।
মূল ব্যবসা পেট্রোলিয়ামের।
এছাড়া সারকারখানা, কাগজ, কেমিক্যালস, ম্যানুফ্যাকচারিং, টিস্যু পেপারসহ নানান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে কোখ ইন্ডাস্ট্রির মালিকানায়।
এক লক্ষের অধিক মানুষের কর্মসংস্থান করেছে কোখ ইন্ডাস্ট্রি।


অর্থবিত্ত তো অনেকের থাকে। কিন্তু কোখ ভাইরা আলোচিত তাদের ক্ষমতা ও প্রভাবের জন্য।
কোখ ভাইদের পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স তাদের এতোটা আলোচিত করে রাখে। তারা তাদের অর্থ দিয়ে পলিটিসিয়ান পকেটে রাখে। তাদের ইচ্ছামত আইন পাস করায়। রিপাবলিকান পার্টির সবচেয়ে বড় ডোনার এই কোখ ভাইয়েরা। আপনি যদি রিপাবলিকান পার্টিকে কোখ ভাইদের পার্টি বলেন, তাহলে ভুল কিছুই বলা হবে না। মার্কিন কংগ্রেস আর সিনেটে যদি রিপাবলিকানরা মেজোরিটি থাকে, তাহলে কোখ ভাইয়েরা তাদের দিয়ে ইচ্ছামত আইন পাস করিয়ে নেয়।

তাদের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভয়ানক রকমের পরিবেশ দূষণ করে। এজন্য রিপাবলিকানরা যখন হাউজ মেজোরিটি থাকে, তখন US Environmental Protection agency, অর্থাৎ EPA-এর ফান্ডিং রিপাবলিকানরা একেবারেই কমিয়ে রাখে। এবং তাদের কর্মকান্ডকে নানানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেকরে কোখ’দের মত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুযোগ দিয়ে থাকে।
( ** এখানে একটা বিষয় মাথায় রাখা জরুরী। বিল গেইটস বা স্টিভ জবস যেধরণের ব্যবসার সাথে জড়িত, সেই ধরণের ব্যবসাতে খুব একটা পলিটিসিয়ানদের হাতে রাখার দরকার হয় না।
কারণ তারা টেকনোলজি বেজড প্রোডাক্ট তৈরি করতেছে, বাজারে বিক্রি করতেছে। ভোক্তাদের ভালো লাগলে তাদের প্রোডাক্ট কিনবে বা ইউজ করবে। ভালো না লাগলে করবে না। এখানে কারো ক্ষতি হচ্ছে না। কিন্তু পেট্রোলিয়াম বা রিয়েল স্টেট বা মিডিয়া বিজনেসের সাথে জড়িত থাকলে রাজণীতিবিদ হাতে রাখার দরকার হয়। এখানে আইনের ফাক ফোকড় ইউজ করার দরকার হয়। এজন্য দেখবেন এই ধরণের ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদদের সাথে সখ্যতা বজায় রাখে। রাজনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। পলিসিগুলোকে নিজেদের অনুকুলে আনার চেষ্টা করে। )

তো যেটা বলছিলাম।
কোখ ইন্ডাস্ট্রি আমেরিকার পলিটিক্সে ভয়ংকর প্রভাব তৈরি করেছে। পুঁজিবাদের স্বর্ণযুগের কার্নেগি, রকারফেলার বা মরগ্যানের মতন করে না হলেও, অনেকাংশে তাদের মতই।

আমেরিকার ABC চ্যানেলের এক ইন্টারভিউতে কোখ ইন্ডাস্ট্রির CEO Charles Koch প্রকাশ্যে বলেছিলেন,
“Koch industries lnc. has a philosophy that profits are above everything else.”

ব্যাপারটা আসলেই তেমন।
রিপাবলিকান দলের অনেক আইডিওলজির সাথে কোখ ভাইদের বিরোধ আছে। কিন্তু রিপাবলিকানদের লিমিটেড গভর্মেন্ট রুলস এন্ড রেগুলেশন আইডিয়াকে কোখ ভাইয়েরা পছন্দ করে।
জাস্ট এটাই মূল কারণ রিপাবলিকান দলের পেছনে কোখ ভাইদের এই নিরঙ্কুশ সমর্থনের।
রিপাবলিকান দল অনেক বেশি করাপ্টেড। সেটা NRA অর্থাৎ national Rifles association এর টাকা খেয়েই হোক, আমেরিকা ইসরাইলের লবিং AIPAC এর টাকা খেয়েই হোক অথবা কোখ ভাইদের টাকা খেয়েই হোক, রিপাবলিকান দলের অধিকাংশ পলিসি আসলে আমেরিকার বড়বড় ধনুকুব আর এলিট শ্রেনীদের স্বার্থ হাসিলের পলিসি।

ডেমোক্রেটরাও যে খুব ভালোকিছু, সেটাও না। ওয়াল স্ট্রিটের বড়বড় ফাইন্যান্সার, যেমন জর্জ সোরাস বা বড়বড় সিলিকন ভ্যালির টেকনোক্রেটরা ডেমোক্রেট দলের পেছনে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। সেখানেও আর্থিক স্বার্থ জড়িত।
(** বার্নি স্যান্ডার্স বর্তমানে বহুল আলোচিত। এখানে মনে রাখতে হবে, বার্নি স্যান্ডার্স কিন্তু ইন্ডিপেন্ডেট পলিটিসিয়ান। উনি গতবছর ডেমোক্রেট পার্টিতে এসেছেন মুলত প্রেসিডেন্টসিয়াল নির্বাচনে নাম লিখানোর জন্য। উনি তার নীতির কারণে ডেমোক্রেটদের সাথেই তাল মিলিয়ে চলেন মাঝেমাঝে। কারণ রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্রেট তার কাছে অনেক বেটার অপশন )


মার্কিন পলিটিসিয়ানদের ফান্ডিং দেবার জন্য কোখ ভাইয়েরা বেশকিছু সংগঠন বানিয়েছে।
যেমন Americans for prosperity,
American Commitment,
American Future fund,
American Energy alliance,
Libre Initiative Trust,
Public Notice,
Center to protect patient rights,
এই টাইপের ৮০+ সংগঠন আছে কোখ ভাইদের। এসব সংগঠনে তারা টাকা ডোনেট করে। লবিস্ট নিয়োগ করে। এরপর এসব প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা এজেন্ডা নিয়ে পলিটিসিয়ানদের টাকা ঢালে। পলিসি তৈরি করে।
যেমন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান নমিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদ্য বিদায়ী ক্যাম্পেইন ম্যানেজার কোরী লুইনডোস্কি ছিলেন Americans for Prosperity সংগঠনের একজন কর্মকর্তা। ঠিক একইভাবে জেব বুশ, মার্কো রুবিও সহ আরো যত বড়বড় রিপাবলিকান নেতা আছে, আপনি সবার সাথেই এমন কোনো না কোনো কোখ প্রতিষ্ঠানের লোকজন দেখবেন।

২০১২ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্টসিয়ান নির্বাচনের সময় কোখ ভাইয়েরা মোট ৪০০+ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিলো রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনিকে জেতাতে।
এবারের ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে তাদের ৯৯০ মিলিয়ন ডলার খরচ করার কথা ছিলো রিপাবলিকানদের জেতানোর জন্য।
কিন্তু সকল প্ল্যান প্রোগ্রাম ভেস্তে যাচ্ছে ডোনান্ড ট্রাম্প নমিনেশন জেতার কারণে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে এতো বিপুল অর্থ ইনভেস্ট করার সাহস কোখ ভাইরা পাবে কিনা সন্দেহ। অন্তত যতক্ষণ পর্যন্ত ট্রাম্প নির্বাচন পোলে হিলারির চেয়ে পিছিয়ে আছে, ততক্ষন পর্যন্ত কোখ ভাইরা এগোবে না। রিক্স নেবে না।

হিলারি আরেক করাপ্টেড পার্সন।
এজন্য ট্রাম্প নমিনেশন জেতার পর চার্লস কোখ হিলারিকে প্রোপজ করেছিলো নির্বাচনে ফান্ডিং দেবার। অর্থাৎ রিপাবলিকানদের বাদ দিয়ে ডেমোক্রেট হিলারিকে ফান্ডিং দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। বিনিময়ে keystone pipeline টাইপের কিছু ইস্যুতে হিলারি কোখ ভাইদের পক্ষে থাকবে, এটাই ছিলো তার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য।
কিন্তু প্রথমে উত্তর না দিলেও ডেমোক্রেটদের ভেতর থেকে হিলারির উপর প্রেসার তৈরি হয়। সেইসাথে বার্নি স্যান্ডার্সের মত কট্টর কোখবিরোধি পলিটিসিয়ান তখন হিলারির বিরুদ্ধে প্রাইমারি নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করছিলেন। সুতরাং কোখ ভাইদের সমর্থন বা ডোনেশন গ্রহন করাটা হিলারির জন্য হতে পারতো আত্মঘাতি। সম্ভবত এই কারণেই হিলারি টুইট করেছিলো কোখ ভাইদের রিফিউজ করে।
নিচের ছবি ও লিংকে দেখতে পারেন। হিলারির করা ২৪ শে এপ্রিল, ২০১৬ সালের টুইট।
https://twitter.com/hillaryclinton/status/724313224305360896





কোখ ভাইদের জন্য বিষয়টা শ্রেফ অপমানের।
আর ট্রাম্পের জন্য বিষয়টা ছিলো শ্রেফ বিনোদন। কোখ ভাইদের বাধ্য হয়েই এখন ট্রাম্পকে ডোনেশন দিতে হবে। অথবা ডোনেশন দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
ব্যাপারটা এখন hobson’s choice
অর্থাৎ হয় ট্রাম্পকে ফান্ডিং দাও। অন্যথায় একুল ওকুল দুইকুলই হারাবে।

তো কোখরা এখন ট্রাই করতেছে ট্রাম্পের দিকে মনোযোগ না দিয়ে সিনেট ও কংগ্রেসের দিকে মনোযোগ দিতে।
অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা হিলারি, যেই হোক না কেনো, কংগ্রেস আর সিনেটে যদি রিপাবলিকান মেজোরিটি থাকে, তাহলে কোখ ভাইরা তাদের দিয়ে ইচ্ছামত পলিসি বা আইন পাস করিয়ে নিতে পারবে। কে প্রেসিডেন্ট হইলো না হইলো, সেটা ম্যাটার করবে না।

কোখ ভাইদের পরিবেশ দূষণের রেকর্ড জাহির করলে রীতিমত ভয় পাবেন।

টেক্সাসের Smithvile এলাকায় Koch Pipeline leak হয়ে প্রায় ১৭ হাজার গ্যালন অপরিশোধিত তেল পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের তেল শোধনাগার থেকে।
এজন্য প্রায় ৫০+ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিলো কোখ ভাইদের।

এছাড়া গ্রিনপিসের ওয়েবসাইটে গেলে কোখ ভাইদের পরিবেশ দূষণ ও মানুষের জীবনমালের ক্ষতি করার আরো অনেক খতিয়ান পাওয়া যায়।
http://www.greenpeace.org/usa/global-warming/climate-deniers/koch-industries/koch-industries-pollution/

• A Koch-owned cellulose facility in Taylor County Florida was responsible for two successive-chlorine dioxide chemical leaks in May, 2014.

• Koch Pipeline Company spilled 17,000 gallons of crude oil (400 barrels) near Austin Texas in October, 2013. (যেটা বললাম)
A road had to be built to access the spill site for cleanup, which contaminated livestock ponds.

হাস্যকর ব্যাপার হল,
Months before the spill, Koch Pipeline was gifted it’s second annual “Environmental Performance Award”from the American Petroleum Institute, the top U.S. oil and gas lobbying organization.

• Subsidiaries of Koch Carbon have accumulated massive piles of petroleum coke in U.S. cities like Detroit and Chicago, where the toxic dust has blown into peoples’ homes from a 5-story-tall pile of pet-coke.
Petcoke is a byproduct of refining tar sands that is usually burned like coal.

• Facing “enormous” cleanup costs for soil and groundwater contamination and high crude oil prices,
Flint Hills announced in 2014 that it would permanently close its North Pole refinery outside of Fairbanks, Alaska. Koch blames contamination on the refinery’s previous owner, Williams Companies.

• Ongoing, permitted releases of hazardous chemicals including benzene, sulfuric acid, hydrogen cyanide from Koch’s oil refinery in Corpus Christi, Texas, where refinery communities experience high rates of illnesses known to be associated with the chemicals released.

• Millions of gallons of toxic paper mill waste from Koch-owned Georgia-Pacific facility in Crossett, Arkansas.
A 2011 complaint to regional and national Environmental Protection Agency offices, filed by Public Employees for Environmental Responsibility (PEER) and Ouachita Riverkeeper, alleged that Koch’s plant was
“Discharging 45 million gallons per day of paper-mill waste, including ammonia and chloride, and metals such as zinc, copper, and mercury.”

এবার দেখুন, পরিবেশ দূষণের জন্য ও জনদুর্ভোগ তৈরির জন্য কোখ ভাইরা কি পরিমাণ শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে।

• In 2009, the US Justice Department and EPA announced in 2009 that Koch Industries’Invista subsidiary would pay a $1.7 million penalty and spend $500 million to fix environmental violations at facilities in seven states, in an agreement with the US EPA and Department of Justice.

• In May 2001, Koch Industries paid $25 million to settle with the US Government over a long-standing suit brought by Bill Koch – one of the brothers bought out in 1983 – for the company’s long-standing practice of illegally removing oil from federal and Indian lands.
The value of oil that brother Bill Koch accused Koch Industries of stealing was worth $133 million – over $255 million in 2014 dollars.

• In late 2000, the company was charged with covering up the illegal releases of 91 tons of the known carcinogen benzene from its refinery in Corpus Christi.
Initially facing a 97-count indictment and potential fines of $350 million, Koch cut a deal with then-Attorney General John Ashcroft to drop all major charges in exchange for a guilty plea for falsifying documents, and a $20 million settlement. Informing the federal case, a former Koch employee blew the whistle on the company for allegedly falsifying its emissions reports, downplaying the amounts of toxic chemicals it released.

• In 2000, the EPA fined Koch Industries $30 million for its role in 300 oil spills that resulted in more than three million gallons of crude oil leaking into ponds, lakes, streams and coastal waters.

• In 1999 a Koch subsidiary pleaded guilty to charges that it had negligently allowed aviation fuel to leak into waters near the Mississippi River from its refinery in Rosemount, Minnesota, and that it had illegally dumped a million gallons of high-ammonia wastewater onto the ground and into the Mississippi.

In 1996, a rusty Koch pipeline leaked flammable butane near a Texas residential neighborhood.
Warned by the smell of gas, two teenagers drove their truck toward the nearest payphone to call for help, but they never made it.
Sparks from their truck ignited the gas cloud and the two burned alive. The National Transportation Safety Board determined that “the probable cause of this accident was the failure of Koch to adequately protect its pipeline from corrosion” and the ineffectiveness of Koch’s program to educate local residents about how to respond during a pipeline leak.


তাদের পরিবেশ দূষণের কারণে কত মানুষ নানাবিধ রোগে ভুগে মারা গেছে, কত মানুষের আর্থিক ও শারিরীক ক্ষতি হয়েছে,
সেটার সঠিক হিসাব না থাকলেও উপরের তথ্যগুলো থেকে সহজেই অনুমান করতে পারেন।
আমেরিকাতে ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ কিন্তু কম নয়। প্রচুর।
কোখ ভাইদের পরিবেশ দুষণের কারণ যেসব মানুষ ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে, তারা কিন্তু কোখ ভাইদের ফান্ডিংএ চলা হাইফাই দামী মেডিকেল ফ্যাসিলিটিগুলোতে চিকিৎসা করার সুযোগ পাচ্ছে না।

এছাড়া পরিবেশ দূষণকারী ফ্রাকিং পদ্ধতিতে তেল তোলার কারণেও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।
আমেরিকা আর চীন মিলে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কার্বন ইমিশনের জন্য দায়ী। পরিবেশ দুষনের জন্য দায়ী। গ্লোবাল ওয়ার্মিংএর জন্য দায়ী।
ভুক্তভুগী কিন্তু সবচেয়ে বেশি হচ্ছে বাংলাদেশের মত দেশগুলো।
উন্নতবিশ্বগুলো পরিবেশ দূষণ করে বাংলাদেশের মত দেশগুলোকে অল্পকিছু নগদ টাকা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। আর সেই নগদ টাকা পেয়েই আমরা অনেক খুশি।

আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টি সরাসরি ক্লাইমেট চেঞ্জ ডিনাই করে। কারণ আর কিছুই না। কারণ হল, কোখ ইন্ডাস্ট্রির কাঁচা ডলারের লোভ।

নির্বাচনের ক্যাম্পেইন ফাইন্যান্সিংএর জন্য আমেরিকাতে আগে রুলস এন্ড রেগুলেশন ছিলো।
কোখ ভাইরা সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের টাকা খাইয়ে এবং টেড ওলসন নামের এক উকিল নিয়োগ করে সুপ্রিম কোর্ট থেকে citizen united রুল পাস করিয়ে নেয়। ফলে এখন একজন ধনুকুব যত ইচ্ছা অর্থ ডোনেট করতে পারে পলিটিক্যাল ক্যাম্পেইনে।
ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি।
ধরুন, বাংলাদেশের দুইটা দল নির্বাচনে লড়তেছে। নির্বাচনের প্রচার প্রচারণায় প্রচুর টাকা লাগে।
তো ধরুণ, দুইটা দল নানান ব্যক্তিদের কাছ থেকে ডোনেশন নিয়ে ১০-১৫ কোটি টাকার ফান্ডিং করেছে। এখন হঠাৎ করে একজন ধনুকুব এসে যদি একটি দলকে একাই ১০০ কোটি ডলার ডোনেট করে, তাহলে কি হবে ভেবে দেখুন। নির্বাচনে একটি দল ১০-১৫ কোটি টাকার প্রচার প্রচারনা করবে।
আরেকটি দল ১১০-১১৫ কোটি টাকার ক্যাম্পেইন করবে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় দলটি এগিয়ে থাকবে। তার জেতার সম্ভাবনা অনেকবেশি হয়ে যাবে। এখন দলটি যদি জিতে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই যেই ব্যক্তি ১০০ কোটি টাকা ডোনেট করেছিলো, সে দলটির কাছে আগ্রাধীকার পাবে। তাকে সবার আগে সুযোগ সুবিধা করে দেয়া হবে। তাই না?
তো আগে ডোনেশনের একটা লিমিট থাকলেও এখন আর নেই আমেরিকাতে। ফলে ২০১৬ নির্বাচনে কোখ ভাইয়েরা একাই ৯৯০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ড নিয়ে বসে আছে।
বাই দা ওয়ে, টেড ওলসন নামের সেই উকিল মুলত কোখ ভাইদের পার্সোনাল উকিল। অথচ আমেরিকার এতোবড় একটা পলিসি সে চেঞ্জ করে দিয়েছে।

কোখ ভাইদের আরো একটা ভয়াবহ উদ্দেশ্য হল আমেরিকাতে Public education বন্ধ করে দেয়া।
অর্থাৎ দেশের সকল স্কুল কলেজ প্রাইভেটাইজেশন করা।
এখন আমাদের দেশে ব্যাপারটি চিন্তা করে দেখতে পারেন।
আমাদের দেশের সকল সরকারি স্কুল কলেজ যদি প্রাইভেটাইজেশন হয়, তাহলে আমাদের বাংলাদেশে লিখাপড়ার সিস্টেমটা কেমন হয়ে যাবে, সেটা একবার ভেবে দেখুন।
বড়লোকের ছেলেরা শিক্ষাদিক্ষায় সুযোগ পাবে বেশি।
সেইসাথে equal opportunity এবং equal education বলে কিছুই থাকবে না। যার টাকা আছে, সে ভালো শিক্ষা পাবে।
যার টাকা নেই সে ভালো স্কুল কলেজের দেখা পাবে না।
আমেরিকাতে আরো বাজে একটা ব্যাপার হবে। সেটা হল, সাদা আর কালোরা আলাদা আলাদা স্কুলে পড়তে বাধ্য হবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারনেই সাদা আর কালোরা আলাদা আলাদা স্কুলে যেতে বাধ্য হবে। আফটার অল, সাদারা আমেরিকাতে প্রিভিলেজড, ডমিনেটিং ফোর্স। আর কালোরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।
কোখ ভাইরা প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে পাবলিক স্কুল সিস্টেমের বিরুদ্ধে।
বর্তমানে চলমান মার্কিন প্রেসিডেন্টিসিয়াল নির্বাচনে রিপাবলিকানরা common core education সিস্টেম নষ্ট করে state based local education সিস্টেম চালু করার কথা বলতেছে।
তারা ক্ষমতায় গেলে common core education বাতিল করবে। এটা মুলত কোখ ভাইদের একটা স্বপ্ন। অর্থাৎ লিখাপড়াকে প্রাইভেটাইজেশন করা।


এবার বলি, ইউনিভার্সিটিগুলোর কথা।
আমেরিকার নামকরা ইউনিভার্সিটিগুলো অধিকাংশই বেসরকারি। এখানে ডোনেশন অনেক বড় একটা ফ্যাক্টর। কোখ ভাইয়েরা আমেরিকার ১৫০+ ইউনিভার্সিটি এবং কলেজে ডোনেশন দেয় প্রতিবছর। এবং অনেক বড়বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তাদের ফাইন্যান্সিয়াল এগ্রিমেন্ট আছে।

ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই দেখবেন Climate change is a hoax টাইপের আর্টিকেল পাবেন, যাতে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক প্রফেসর, তমুক প্রফেসরের গবেষণাপত্র দেখবেন যেখানে বলা হয়েছে আসলে ক্লাইমেট চেঞ্জ বলে কিছু নেই।
এই টাইপের প্রোপাগান্ডা সাইন্স পেপারগুলো কোখ ভাই টাইপের লোকেদের টাকা খেয়েই এসব প্রফেসরেরা পাবলিশ করে।
এছাড়া নানাবিধ কারণে ইউনিভার্সিটি প্রফেসর পকেটে রাখতে হবে।
পলিটিক্যাল সাইন্স প্রফেসর থেকে শুরু করে বড়বড় পলিটিক্যাল জার্নালে বা পেপারে কলাম লেখক বড়বড় ডিগ্রীধারী ব্যক্তি, সাংবাদিক ও অর্থনীতিবিদ’দেরও পে-রোলে রাখতে হয় রিপাবলিকানদের নানাবিধ এজেন্ডার পক্ষে একাডেমিক সাফাই গাওয়ার জন্য।

কোখ ভাইরা শ্রমিকের নুন্যতম মজুরী সীমা বাতিল করার পক্ষে।
তাদের যুক্তি হল, স্টেট বাই স্টেট মজুরী নির্ধারণ হবে পরিস্থিতি বুঝে।
অর্থাৎ কোনো স্টেটে যদি প্রতিঘন্টা ৪ ডলার মজুরিতে শ্রমিক খাটানো সম্ভব হয়, তাহলে খাটাবে। এখানে কোনো রুলস এন্ড রেগুলেশন থাকবে না।
কিন্তু ডেমোক্রটরা বা বার্নি স্যান্ডার্সরা বলে ভিন্ন কথা। তারা শ্রমিকের ১৫ ডলার প্রতি ঘন্টা ন্যুনতম মজুরির কথা বলে। অর্থাৎ শ্রমিক এক ঘন্টা খাটালে এই পরিমাণ অর্থ তাকে দিতেই হবে।

কোখ ভাইরা যেহেতু মালিক শ্রেনী, স্বাভাবিকভাবেই তারা এই রুলস এন্ড রেগুলেশন পছন্দ করে না। আমাদের বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি বাড়ানো নিয়েও কম কাহিনী হয়নি। মালিকপক্ষ আপ্রাণ চেষ্টা করে মজুরি কমিয়ে রাখতে। এতে তাদের বেশিবেশি লাভ হয়। সরকার যদিও শক্তহাতে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর চেষ্টা করে।

যাই হোক, কোখ ভাইদের দৈনিক আয় ১৩ মিলিয়ন ডলার মাত্র। (per day)
কোখ ভাইয়েরা এক দিনে যে অর্থ আয় করে, সেই পরিমাণ অর্থ একজন ১৫ ডলার ঘন্টা প্রতি বেতন পাওয়া শ্রমিকের আয় করতে ৬৯০ বছর কাজ করা লাগবে।
কোখ ভাইয়েদের বিলাসী জীবন নিয়ে কমেডিয়ান জন স্টুয়ার্ট এবং স্টিভেন কোলবেয়ার বেশকিছু প্রতিবেদন করেছে।

কোখ ভাইদের সবচেয়ে জঘন্য পলিটিক্যাল ম্যানুপুলেশনের দৃষ্টান্ত সম্ভবত খুব সম্ভবত আমেরিকার ভোটিং রাইট রিলেটেড।
ভোটিং রাইট সাপ্রেশনের জন্য তাদের ফান্ডিংএ করা বেশকিছু লেজিসলেশন আমেরিকার নির্বাচনের ফলাফলে সুদুর প্রসারে প্রভাব রেখে চলেছে।

Koch Brothers, Exxonmobil এবং National rifle association (NRA) মিলে Alec অর্থাৎ American legislative exchange council বানিয়েছে, যার কাজ মুলত পলিটিসিয়ানদের অর্থ দিয়ে তাদের সুবিধামত আইন তৈরি করা। সমগ্র আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটগুলোতে এরা নানান ধরণের ভোটিং রাইট আইনকানুন বানিয়েছে।
অর্থাৎ ভোট দিতে আপনার আইডি কার্ড লাগবে। এবং সেই আইডি কার্ড করতে হলে নানান শর্ত পুরণ করতে হবে।
ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি।
যেমন ধরুণ, কালো বর্ণের আমেরিকানরা তুলনামুলক অস্বচ্ছল পরিবারে জন্ম নেয়।
তাদের ভেতর স্বাভাবিক ভাবেই ক্রাইম করার প্রবনতা, গাজা টাইপের নেশার বস্তু সেবনের প্রবনতা বেশি থাকে।
সেইসাথে সমস্যা হইল, একজন কালো বর্ণের আমেরিকানকে পুলিশ সহজেই ছোটখাটো ক্রাইম করার জন্য গ্রেফতার করে জেলে ভরতে পারে।
কিন্তু একজন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানকে পারে না।
এখন চিন্তা করে দেখুন, আপনার স্টেটে যদি একটা নিয়ম করা হয়, কোনো পুলিশি মামলা কারো বিরুদ্ধে অতীতে বা বর্তমানে থেকে থাকলে সে ভোটার আইডি কার্ড পাবে না, তাহলে ফলাফল কেমন হবে?
যা ভেবেছেন, ঠিক তাই।
অর্থাৎ তুলনামুলকভাবে প্রচুর কালো বর্ণের আমেরিকান ভোটার আইডি কার্ড পাবে না। ভোট দিতেও তারা পারবে না।
এবার উপরে যা বললাম, সেটার সাথে নিচের তথ্যগুলোকে কানেক্ট করূণ। দেখুন, কোনো অর্থ খুজে পান কিনা !!
আমেরিকার Bureau of Justice statistics এর প্রতিবেদন অনুসারে,
2013 সালে আমেরিকার প্রতি ১১০ জনের ১ জন জেলে গেছে কোনো না কোনো ক্রাইম করে। এবং প্রতি ৫১ জনের ১ জন প্যারোলে আছে।
যেমন এই মুহুর্তে আমেরিকার প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষ জেলে আছে। যেখানে আমেরিকার জনসংখ্যা ৩১ কোটি।
অর্থাৎ প্রতি ১ লক্ষ মানুষের ভেতর প্রায় ৭০০ জন মানুষ জেলে আছে।
আমেরিকাতে দুনিয়ার মাত্র ৪.৪% মানুষ বসবাস করে। অথচ দুনিয়ার ২৩% কয়েদী আছে আমেরিকাতে।
দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি জেলখানাও আছে আমেরিকাতে।
এসব জেল খানাগুলোকে কাজেও লাগাচ্ছে বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। সস্তা শ্রম পাচ্ছে। অর্থাৎ কার্যত সেগুলো লেবার ক্যাম্প।

খোদ আমেরিকার ব্যুরো অফ জাস্টিস স্ট্যাটিস্টিক্স অনুসারে, প্রতি ১৫ জন কালোবর্ণের আমেরিকানদের ভেতর ১ জন,
প্রতি ৩৬ জন হিস্প্যানিকের ভেতর ১ জন,
এবং প্রতি ১০৬ জন শ্বেতাঙ্গ মার্কিনীর ভেতর ১ জন জেলে আছে।
আমেরিকার জনসংখ্যার ৩০% জনগণ অশ্বেতাঙ্গ।
অথচ আমেরিকার জেলখানাগুলোর ৬০% কয়েদী অশ্বেতাঙ্গ অর্থাৎ হয় কালো অথবা হিস্প্যানিক।
প্রতি ৩ জন কালোবর্ণের আমেরিকানের ভেতর ১ জন জীবনের কোনো না কোনো সময় পুলিশি মামলায় ফেঁসেছে বা ফাঁসার চান্স আছে।

১৯৮০ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রায় আড়াই কোটি মানুষ ড্রাগ রিলেটেড মামলায় গ্রেফতার হয়েছে।
আমেরিকার নেশাখোড়দের ভেতর কালোবর্ণের মানুষের সংখ্যা ১৪% হলেও ড্রাগ রিলেটেড মামলায় জেলে যাওয়া আসামীদের ভেতর কালোবর্ণের মানুষের সংখ্যা ৩৭%
এছাড়া কিশোর অপরাধের দিক দিয়েও কালোবর্ণের মানুষেরা জেলে বেশি যাচ্ছে।
এর জন্য দুইটা ব্যাপার দায়ী।
প্রথমত, কালো’রা আমেরিকার পিছিয়ে পড়া বা তুলনামুলক কম প্রিভিলেইজড জনগোষ্ঠী।
দ্বিতীয়ত, একই অপরাধ করে একজন শ্বেতাঙ্গের চেয়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গের জেলে যাওয়ার প্রবাবিলিটি অনেক বেশি। এবং খুব মাইনর ক্রাইম করেও একজন কৃষ্ণাঙ্গ জেলে চলে যেতে পারে সহজেই। এর কারণ, law enforcement agency গুলোতে সাদা’দের তুলনামুলক প্রাধান্য।

এবার চিন্তা করূণ, ভোটার আইডি আইনে যদি উল্লেখ করে দেয়া হয়, যাদের নামে পুলিশি মামলা আছে, বা যারা অতীতে কোনো না কোনো সময়ে পুলিশি মামলায় ফেঁসে গেছিলো, তারা সরকারি চাকরিতে ঢুকতে পারবে না + ভোটার আইডি কার্ড পাবে না, তাহলে কি হতে পারে?
কারা সবচেয়ে বেশি ভোটিং রাইট থেকে বঞ্চিত হবে?

ঠিকই ধরেছেন।
কালোরা।

আমেরিকাতে রিপাবলিকানরা সর্বদা ভোটার আইডি আইন কঠিন থেকে আরো কঠিন করার চেষ্টা করে। কারণটা সহজেই বোধগম্য।
people with color, অর্থাৎ কালো এবং নন শ্বেতাঙ্গ অন্যান্য আমেরিকানদের ভেতর রিপাবলিকানদের জনপ্রিয়তা কম। ভোট কম।
এজন্য তারা কঠিন ভোটার আইডি আইনের পক্ষে।
এতে বিপুল পরিমাণ people with color অর্থাৎ নন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান মানুষ ভোটারাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
ফলাফল, রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।

আবার ডেমোক্রেটরা সবার জন্য ভোটারাধিকার সহজ করার জন্য চেষ্টা করে। এর পেছনেও কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই। আছে সেই ভোটের রাজনীতি। কালো এবং হিস্পেনিক জনতার ভোট ডেমোক্রেটরা বেশি পায়। সহজ হিসাব।
এজন্য ডেমোক্রেটরা ড্রাগস আইন সহজ করার চেষ্টা করে। গাজা টাইপের নানান মাদক দ্রব্যকে বৈধতা দেবার চেষ্টা করে। কারণ মারুয়ানা বা গাজা বৈধ করতে পারলে বিপুল পরিমাণ ভোটার পাবে তারা।

Koch brothers’ funded, ALEC এবং America for prosperity টাইপের প্রতিষ্ঠানগুলো সমগ্র আমেরিকাতে ভোটিং রাইট শক্ত করার জন্য লবিং করে।
এখানে বলে রাখি, আমেরিকান রাজনীতিতে লবিং একেবারে বৈধ।
অথচ ওই জিনিসটা আমাদের দেশে করলে সেটা একেবারেই অবৈধ।
ব্যাপারটা ক্লিয়ার করার জন্য, আরো একটা উদাহরণ দেয়া যাক।
ধরূণ, আপনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হতে চাচ্ছেন। তো ভোটে দাঁড়িয়েছে।
অর্থমন্ত্রী হবার আগে আপনাকে ভোটে জিতে সংসদ সদস্য হতে হবে তো। তাই না?
তো আপনি ভোট করতেছে। ভোটের ক্যাম্পেনিং করতে বিপুল অর্থ খরচ করতে হবে আপনাকে। অন্যথায় জিতবেন কিভাবে?
আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী ভোটে জেতার জন্য কোটি কোটি টাকার প্রচারণা চালাচ্ছে। তো আপনাকেও তো চালাতে হবে। নাকি?
তো টাকা আসবে কোথাথেকে? আপনার বাপের তো আর জমিদারি নেই।
তো ধরূণ, একটি বিদেশি Car কোম্পানি আপনার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে মোটা টাকা ডোনেশন দিলো। শর্তটা হল, আপনি ভোটে জিতলে অর্থমন্ত্রী হয়ে প্রথম বছরেই বিদেশী গাড়ির উপর আমদানি শুল্ক কমাবেন।
তো আপনি ভোটে জিতে গেলেন।
অর্থমন্ত্রী হলেন।
অর্থমন্ত্রী হয়ে আমদানি শুল্ক কমালেন। ব্যস, গাড়ি কোম্পানির বিক্রি বেড়ে গেলো। কারণ গাড়ির দাম কমে গেছে। বেশি মানুষ কিনতেছে।
সংসদে দাঁড়িয়ে আপনি নানান যুক্তি তর্ক তুলে ধরলেন। দেশের উন্নতির জন্য বিদেশি গাড়ির উপর শুল্ক কমানো কেনো দরকার, সেই মর্মে এক জালাময়ী ভাষণ দিয়ে জনগনকে ভুগোল বোঝালেন।
তো এটাই হল লবিং।

এটা বাংলাদেশে কেউ করলে, সেটাকে আমি আপনি দুর্ণীতি বলবো।
আমেরিকাতে এটা একেবারেই বৈধ।
এটাকে আপনি যদি দুর্ণীতি হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে আমেরিকা নির্সন্দেহে দুনিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ দেশের তালিকায় সবার উপরে থাকবে।
কারণ আমেরিকাতে এখন লবিং বিজনেস অন্যতম প্রফিটেবল বিজনেস।

ভুলে গেলে চলবে না, আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গরা ভোটারাধিকারের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছে।
খুব বেশি আগের কথা না। মাত্র ছয় দশক আগেও আমেরিকাতে সাদা আর কালোদের জন্য আলাদা আলাদা স্কুল ছিলো, টয়লেট ছিলো, ট্রান্সপোর্টেশন ছিলো। সবই ছিলো আলাদা আলাদা।
সেই বিভেদ কাগজে কলমে মুছে গেলেও সেটা ধীরে ধীরে আবার ফিরে এসেছে। একটু ভিন্নভাবে। স্যাগগ্রিগেশন প্রসেসটা এবার হচ্ছে আরো সুক্ষভাবে।

আমাদের বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করলে ইউরোপ আমেরিকা থেকে নানান পর্যবেক্ষক দল আসে। দেশের নির্বাচন আবাধ, নিরপেক্ষ এবং সঠিক হয়েছে কিনা, সেই সার্টিফিকেট তারা দিয়ে থাকে। আমাদের দেশের পলিটিসিয়ানরা সেগুলোকে অনেক মুল্য দেন।
প্রশ্ন হল, আমেরিকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ হয়েছে কিনা, সেটা দেখার জন্য পর্যবেক্ষক আসে কোথা থেকে?
উত্তর হল, তাদের ভেতর থেকেই।
বাইরের কোনো দেশের পর্যবেক্ষক তারা ডাকে না।
True the vote টাইপের Koch funded প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকার ভোটকেন্দ্রগুলো পর্যবেক্ষণ করে।
True the vote-এর প্রায় ১০ লক্ষ সেচ্ছাসেবক আছে, যারা মার্কিন সরকারের ছাড়পত্র নিয়ে সমগ্র আমেরিকাতে নির্বাচনী ভোটকেন্দ্রগুলো নজরদারি করে। বলাবাহুল্য, সেচ্ছাসেবকদের অধিকাংশ সাদা মার্কিনী। এদের বিরুদ্ধে নানান সময়ে কালোবর্ণের মানুষদের ভোটকেন্দ্র হয়রানী করার অভিযোগ এসেছে।
বিশেষ করে টেক্সাসের মত স্টেটগুলোতে black voter suppression করার কাজটি এরা ভালোমতই করে।
যে county গুলোতে কালো ভোটার বেশি, সেখানে ভোটিং বুথ বসাবে কম করে। ফলাফল, বেশি ভোট পড়বে না। সেইসাথে ভোটিং প্রসেসটাও slow করে দেবে।
ব্যাপারটাকে টিকেট কাউন্টারে প্রচন্ড ভিড়ের সময় টিকেট কাটার সাথে তুলনা করতে পারেন।
অথবা ঈদের আগে ব্যাংকের সামনে টাকা তোলার লাইনের সাথে তুলনা করতে পারেন।
বুথ বেশি হলে কিন্তু সময় কম লাগবে। হয়রানিও মানুষ কম হবে।
ভোট দিতে গিয়ে যদি এতো ভোগান্তিতে মানুষ পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কেউ ভোট দিতে যাবে না। সহজ হিসাব।

আরো একটা জিনিস বেশ ভয়াবহ।
আমেরিকাতে General Election যেদিন হবে, সেইদিনটিকে তারা সরকারি ছুটি ঘোষণা করে না !!!
সেইদিনটি হবে একেবারে কর্মব্যস্ত দিন। ফলে, ওয়ার্কিং ক্লাস আমেরিকানদের জন্য ভোট দিতে যাওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।
এবার বার্নি স্যান্ডার্স দাবি জানিয়েছিলো, ২০১৬ সালের General Election day টাকে ছুটি ঘোষণা করতে।
কিন্তু ছুটি হবে বলে মনে হয় না।
এবার চিন্তা করে দেখুন। আপনি এক একজন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। আপনি মনেমনে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক। আপনার ফ্যাক্টরিতে প্রচুর কৃষ্ণাঙ্গ কম বেতনে চাকরি করে। তো আপনার ধারণা, তারা সবাই ডেমোক্রেটদের ভোট দেবে। সুতরাং ভোটের দিন আপনি কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলেন। এমন ব্যবস্থা করলেন, যাতে তাদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগই না হয়।
এই টাইপের নানান কায়দায় ভোটার suppression হয়।

আমেরিকাতে জেনারেল ইলেকশনে ভোটার টার্ন আউট মাত্র ৪০-৬০% এর ভেতরে থাকে। আমেরিকান স্ট্যান্ডারে এটা কমই।
এর কারণ মুলত এই ভোটার সাপ্রেশন।

১৯৮১ সালের দিকে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ জনতার পরিমাণ ছিলো ৮৪%
তখন রিপাবলিকান দলের পক্ষে ভোটে জিতে আসাটা যত সহজ ছিলো, এই ২০১৬ সালে এসে তত সহজ নয়।
এখন ৭২% আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ। হিস্প্যানিকদের বাদ দিলে শ্বেতাঙ্গ আছে ৬৩%
রিপাবলিকানদের ভোটের সিংহভাগই আসে এই নন হিস্প্যানিক শ্বেতাঙ্গদের ভেতর থেকে।
অর্থাৎ ক্রমেই রিপাবলিকানদের জন্য ভোটে জেতাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এজন্যে নানান ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে তারা। যার ভেতরে আছে voter right suppression, (যেটা নিয়ে উপরে বললাম) ... সেইসাথে আছে gerrymandering

Gerrymandering জিনিসটা কি?
এটা আশা করি অনেকেই জানেন। আমি বেশি ডিটেলসে যাবো না। যদি কেউ Gerrymandering না বোঝেন, তাহলে অন্তত এটা চিন্তা করুন, ঠিক যেকারণে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুইভাগ করা হল, সেটাই gerrymandering.

যেমন টেক্সাসে নন হিস্প্যানিক আমেরিকান এবং কালোবর্ণের মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে।
টেক্সাস রিপাবলিকানদের ঘাটি। সেখানকার স্টেট গভর্মেন্টও রিপাবলিকানদের দখলে। কিন্তু নন হিস্প্যানিক ও কালোবর্ণের মানুষ বাড়তে থাকলে একসময় টেক্সাসও ক্যালিফোর্নিয়ার মত ডেমোক্রেট ঘাটিতে পরিনত হবে। সুতরাং টেক্সাসের ভেতরে ইচ্ছামত gerrymandering করা হচ্ছে। লোকাল গভর্মেন্ট নির্বাচনে যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়াচ্ছে।

যেসব এলাকাতে সাদারা বেশি থাকে, সেগুলোকে ছোটছোট county তে ভাগ করা হচ্ছে। ফলে সাদাদের এলাকা থেকে নির্বাচিত আইনপ্রনেতার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। আর কালোদের বসবাসের এলাকাকে একসাথে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে কালোদের বসবাসরত এলাকা থেকে কম legislator আসে স্টেট গভর্মেন্টে।

এতোটুকু পড়ার পর হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন, বারাক ওবামা কি এসব জানেন না? তিনি কি এসব সমাধান করতে পারেন না? তিনি তো ডেমোক্রেট + একজন মিক্সড রেসের মানুষ। অর্থাৎ তার বাবা কৃষ্ণাঙ্গ আর মা শ্বেতাঙ্গ।
উত্তর হল, বারাক ওবামা যত সহজে একটা executive order জারি করে ইরাক বা সিরিয়ার মত একটি দেশকে ধ্বংস করে দিতে পারেন, তত সহজে নিজের দেশের সমস্যার সমাধান করতে পারেন না। কারণ নিজের দেশের ভেতর তার এতো ক্ষমতা নাই।
যেমন, বর্তমানে আমেরিকাতে কি হচ্ছে, সেটাই দেখুন। বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট। ওদিকে কংগ্রেস এবং সিনেট দখল করে আছে রিপাবলিকানরা।
বারাক ওবামা আজ প্রায় ৮ বছর ক্ষমতা থাকলেন। এখন পর্যন্ত একটা gun control law পাস করতে পারলেন না।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার নিজ দেশে কখনোই ডিকটেটরের মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাকে কংগ্রেস এবং সিনেট, সেইসাথে স্টেট গভর্নরদের সাথেও কাজ করতে হয়।
আর মার্কিন কংগ্রেস এবং সিনেট, সেইসাথে প্রতিটি স্টেট গভর্মেন্টে চলে লবিং অর্থাৎ টাকার খেলা।
দিনশেষে পুঁজিবাদী আমেরিকাতে পুঁজিপতিরাই মুল ক্ষমতায় থাকে।

একসময় ভ্যান্ডারবিল্ড, মরগ্যান, ফোর্ড, কার্নেগী, রকারফেলার, কোল্ট, ফোর্ডরা ছিলো।
এরপর এখন ল্যারি পেজ, সার্গে ব্রাইন, ব্লুমবার্গ, গেইটস, বাফেট, ট্রাম্প, এডেলসন, সোরাস আর কোখ ভাইদের রাজত্ব।
দিনশেষে আমেরিকাতে কি ধরণের আইন পাস হবে, আমেরিকার ভবিষ্যৎ কোনদিকে যাবে, এটা নির্ভর করে এসব ধনুকুবদের উপর।
কোনো ধনুকুব শ্রেনী ডেমোক্রেটদের পেছনে টাকা ঢালে। (যেমন সিলিকন ভ্যালির টেকনোক্রেটরা)
আবার আরেক ধনুকুব শ্রেনী রিপাবলিকানদের পকেটে টাকা ঢালে।
পলিটিসিয়ানরা জাস্ট পাপেট।
তাদের ডোনার আর স্পেশ্যাল ইন্টারেস্টের রাবার স্টাম্প।

এজন্য আপনি এতোশত shooting ইনসিডেন্টের পরও আমেরিকাতে শক্ত অস্ত্র আইন করতে দেখবেন না।
কারণ রিপাবলিকান, এবং সেইসাথে কিছু ডেমোক্রেট পলিটিসিয়ান রেগুলার NRA এর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা পায়।
আমেরিকার mass shooting ইনসিডেন্টে রেগুলার প্রতিবছর হাজার পঞ্চাশের উপর মানুষ মারা যায়। অথচ একটা শক্ত gun law কেউ করে না। কারণটা সবাই জানে।
বড়বড় অস্ত্র কোম্পানিগুলো এবং বিশেষ করে gun manufacturers কোম্পানিগুলো প্রতিবছর আমেরিকার ভেতরে অস্ত্র বিক্রি করে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করে। আমেরিকার মানুষের অস্ত্রের প্রতি ফ্যাসিনেশন অনেক পুরনো। শিকার করা এবং আত্মরক্ষার নাম দিয়ে অস্ত্র কেনা যায় সহজেই। একজন শ্বেতাঙ্গ মার্কিনীর জন্য দোকানে গিয়ে একটা AR-15 assault rifle কেনা ঠিক ততটাই সহজ, যতটা সহজ তার জন্য দোকানে গিয়ে একটা ফ্রিজ বা টেলিভিশন কেনা !

কোখ ভাইদের America for Prosperity টাইপের সংগঠন anti union আইনের জন্য লবিং করেছে। করে যাচ্ছে।
সেইসাথে আছে পুঁজিবাদের পোষা মিডিয়া।
শ্রমিকদের দাবিদাওয়া আদায় করার জন্য লেব্যার ইউনিয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। পুঁজিবাদীরা স্বাভাবিকভাবেই সেটা পছন্দ করে না।
মে দিবস, অর্থাৎ শ্রমিক দিবসের সেই রক্তে ভেজা ইতিহাস কিন্তু আমেরিকারতেই হয়েছিলো।
অথচ আজকের আমেরিকাতে শ্রমিকদের জন্য দাবিদাওয়া আদায় করা আরো কঠিন হয়ে গেছে।
ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে পঙ্গু করা হয়েছে। দুর্বল করা হয়েছে নানান আইন কানুনের ফাঁদে ফেলে।
একারণে আমেরিকাতে ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো খুব সহজেই অতিরিক্ত লাভের আশায় আমেরিকা থেকে ফ্যাক্টরি সরিয়ে মেক্সিকো বা চীনের মত আরো সস্তা শ্রমের দেশে চলে যাচ্ছে। আমেরিকাতে প্রচুর মানুষ বেকার হচ্ছে। রাতারাতি হাজার খানেক শ্রমিক কর্ম হারালেও তারা দাবি আদায়ে রাস্তায় নামতে পারতেছেনা। নুন্যতম মজুরি বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে।

ওদিকে পুজিবাদী মিডিয়া শ্রমিকের স্বার্থের পক্ষে কেউ কথা বললেই তাকে কমিনিস্ট বা সোশ্যালিস্ট ট্যাগ দিচ্ছে। আমেরিকাতে এগুলো একরকম ‘গালি’

দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাদী আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে চলা স্নায়ু যুদ্ধের সময় থেকে মিডিয়া যেভাবে সমাজতন্ত্রকে ডেমোনাইজ করেছে আমেরিকাতে, তাতে এটা স্বাভাবিক। এখনো সমাজতন্ত্র বলতে আমেরিকার মানুষ ভেনিজুয়েলা বা কিউবার উদাহরণ টানে। মিডিয়াতে বারবার দেখানো হয়, ভেনিজুয়েলার দুরাবস্থা। অথচ ফিনল্যান্ড বা ডেনমার্কের উদাহরণ মিডিয়াতে আসে না।

তবে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে democrat socialist বার্নি স্যান্ডার্স কিন্তু ঠিকই আমেরিকানদের মন জয় করেছে।
বার্নি’কে তার প্রতিপক্ষরা ‘socialist’ বলে বলে গালি দিয়েছে। কিন্তু এতে বার্নির খুব ক্ষতি হয়নি।
বরং আমেরিকার মানুষ গুগল সার্চ দিয়েছে, “what is socialism?” লিখে।
বার্নির কারণে যদি আমেরিকার মানুষ “What is democratic socialism?” জিনিসটা সম্পর্কে একটা ধারনা পায়, সেটাও বা কম কি?

কোখ ভাইদের মত ধনুকুবের কাছে বার্নি স্যান্ডার্সের মত সোশ্যাল ডেমোক্রেট রীতিমত আতঙ্ক। এক বিভীষিকার নাম।
আমেরিকার তরুণ সমাজ সোশ্যালিজমের প্রতি ঝুঁকে যাক, এটা অন্তত জীবনেও পুঁজিপতিরা চাইবে না। তাহলে তাদের ক্যাপিটালিজমের স্বর্গ আমেরিকা আর তো আমেরিকায় থাকবে না।
সুতরাং ডেমোক্রেট হোক বা রিপাবলিকান, বার্নির মত সোশ্যালিস্টের উত্থান যে করেই হোক ঠেকাবে। সেটা মিডিয়া দিয়েই হোক বা গায়ের জোরে।

কোখ ভাইদের ফান্ডিং ইতিমধ্যে ৯০টি anti union বিল পাস করেছে ৩৬ টি স্টেটে।
মিডিয়া দিয়ে অনরবরত প্রচারনা চালানো হচ্ছে, union free environment শ্রমিকদের জন্য ভালো। অথচ বাস্তবে হচ্ছে উল্টো।
গত ৫০ বছর ধরেই আমেরিকার মিডিল ক্লাস ছোট হয়ে যাচ্ছে। ধনী গরিবের বৈষম্য বাড়তেছে প্রতিনিয়ত। গরিব আরো গরিব হচ্ছে, ধনী আরো ধনী হচ্ছে।
১০% মানুষের কাছে যত সম্পদ আছে, বাকি ৯০% মানুষের কাছেও তত সম্পদ নাই।

কোখ ভাইদের সবচেয়ে বড় শত্রু “without any doubt” বার্নি স্যান্ডার্স।
বার্নি স্যান্ডার্স গত তিন দশক ধরে কোখ ভাইদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলে যাচ্ছে।
যেমন কোখ ভাইরা আমেরিকা থেকে social security উঠিয়ে দেবার এবং retirement age বাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বার্নি সরাসরি কোখ ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলো তখন। কোখ ভাইদের দাবি, retirement age করতে হবে ৭০ বছর।
বার্নির কথা হল, ৭০ বছর রিটায়ারমেন্ট বয়স নির্ধারণ করা অন্যায়।
এতে করে তরুণ ছেলেমেয়েরা workforce হিসেবে কর্মক্ষেত্রে সহজে ঢুকতে পারবে না পুরনোদের রিপ্লেস করে।
অর্থাৎ তরুন জনতার জন্য কর্মক্ষেত্রে কমে যাবে। ফলাফল, কোখ ভাইদের মত ধনুকুবদের দুইদিক দিয়ে লাভ হবে। খোদ আমেরিকার তরুনেরাই যদি বেকার থাকে, তাহলে জব মার্কেটে চাপ থাকবে। ফলে তরুনদের কম বেতনে খাটানো যাবে। সেইসাথে বাইরের দেশ থেকে ইমিগ্রেন্ট কম আসবে আমেরিকাতে।
অর্থাৎ সুদুর প্রসারি চিন্তাভাবনা।

ওদিকে কোখ বাদ্রাররা ফক্স নিউজের মত চ্যানেলগুলোতে রিটায়ারমেন্ট বয়স বাড়ানোর পক্ষে পেইড বুদ্ধিজীবি ও পন্ডিতদের নিয়োগ দিয়েছে।
তারা রিটায়ারমেন্ট বয়স বাড়ানোর পক্ষে সাফাই গেয়েছে।
জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির মত বেশকিছু নামিদামি ভার্সিটিতে কোখ ফান্ডেড গবেষণাপত্র পয়দা করা হয়েছে। যেখানে আমেরিকার আমজনতাকে একাডেমিক এঙ্গেলে বোঝানো হয়েছে, রিটায়ারমেন্ট বয়স বাড়ানোটা কেনো জনকল্যানমুলক হবে।
ওইযে যেমন মাঝেমাঝে দেখবেন, সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, বা মদ খেলে শরীর ভালো থাকে, টাইপের আজব আজব সব বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। এগুলো যেমন টাকা খেয়ে গবেষণা রিপোর্ট তৈরি করা হয়,
কোখ ভাইদের টাকায় তেমন রিটায়ারমেন্ট বয়স রিলেটেড গবেষণাও প্রকাশ হয়েছিলো।

যেমন বছরখানেক আগে আমেরিকার আমজনতা ফেটে পড়ে Keystone XL pipeline বানানোর বিরুদ্ধে।
কোখ ভাইরা এই পাইপ লাইন বানাতে চাচ্ছিলো।
তারা কানাডা থেকে Tar Sand পাইপ লাইনে করে আমেরিকার ভেতর দিয়ে এনে অপরপ্রান্তের টেক্সাসে পেট্রোলিয়াম ফ্যাক্টরিতে নিয়ে আসতে চাচ্ছিলো।


Tar Sand হল চরম পরিবেশদূষণ সৃষ্টিকারি জ্বালানি।
Tar Sand থেকে পেট্রোলিয়াম প্রস্তুত করা যায়। কোখ ভাইয়েরা সেটা করতে চাচ্ছিলো।
সমস্যা হল, গোটা আমেরিকার উপর দিয়ে এই পাইপ লাইন আসবে, আমেরিকার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে এই পাইপলাইন পৌছাবে, anyhow, anywhere যদি কখনো পাইপলাইন ফেটে Tar sand পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেটা হবে ভয়াবহ ব্যাপার।
পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্জয় ঘটবে।
প্রায় ১০ হাজার মানুষ white house ঘেরাও করে এই Keystone XL pipeline এর বিরুদ্ধে।
এগিয়ে আসে বার্নি স্যান্ডার্স।
মানুষের তুমুল বিক্ষোভের মুখে শেষমেষ white house এই keystone XL pipeline এর কাজ বন্ধ (pending) রাখতে নির্দেশ দেয়। বলাবাহুল্য, কোখ ভাইয়েরা হাউজ মেজোরিটি রিপাবলিকানদের টাকা দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে এই পাইপলাইন তৈরির কাজ চালিয়ে যাবার। কিন্তু কাজ হয়নি। জনতা ঠিকই প্রতিরোধ করেছে।










আজ যখন আমাদের বাংলাদেশে সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লাভিক্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর কাজ চলছে, তখন আমার সেই Keystone XL pipeline এর কথা মনে পড়ে।
আমাদের ভাগ্য খারাপ। আমাদের একটা বার্নি স্যান্ডার্স নাই।

কোখ ভাইয়েরা fox news টাইপের কনজার্ভেটিভ মিডিয়া দিয়ে আপ্রাণ প্রচার প্রচারণা চালিয়েছিলো Keystone pipeline-এর পক্ষে।
এই পাইপলাইন+রিফাইনারি তৈরি হলে বহু মানুষের চাকরিবাকরি হবে, এই পাইপলাইন অনেক সুরক্ষিত ও মজবুত হবে, ফলে পাইপ ফেটে পরিবেশ দূষণের কোন সম্ভাবনা নাই, এমন নানান ভুজুং ভাজুং মানুষকে গেলানোর চেষ্টা করেছিলো fox news.
ভাড়াটে পয়সার কাছে মাথা বিক্রি করা বুদ্ধিজীবি নিয়োগ করেছিলো। কিন্তু কাজ হয়নি।
বার্নি স্যান্ডার্সের মত পলিটিসিয়ানরা মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলো কোখ ভাইদের ছলচাতুরির ব্যাপারে।

কোখ ভাইদের বিরুদ্ধে বার্নি স্যান্ডার্সের লড়াই দীর্ঘদিনের।
এবারের চলমান মার্কিন প্রেসিডেন্টসিয়াল নির্বাচনে বার্নি স্যান্ডার্স ভুয়সী প্রশংসা পেয়েছিলো কোখ এবং wall-street কে আক্রমণ করে।

যাই হোক, ব্যক্তিজীবনে ডেভিড কোখ তিন সন্তানের জনক। তার স্ত্রীর নাম জুলিয়া।


অন্যদিকে চার্লস কোখ দুই সন্তানের জনক।

এই পোস্টটি লিখা মুলত কোখ পরিবার ও কোখ ভাইদের কর্মকান্ড নিয়ে হালকা ধারনা দেবার জন্য।
ব্রিফলি অনেকগুলো বিষয় এখানে তুলে আনার চেষ্টা করেছি।
চলমান মার্কিন নির্বাচনে কোখ ভাইদের ভুমিকা ডিসাইসিভ না হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।


ডেমোক্রেসি তখনই ভালো, যখন জনতা তাদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ পায়। যখন জনতা ক্ষমতার উৎস হয়।
সমস্যা হল, জনতাকে হতে হবে well informed এবং sensible... সুবিবেচক। নুন্যতম শিক্ষিত।
যতটুকু নলেজ থাকলে একজন আমজনতা ভালোমন্দের বিভেদ ধরতে পারবে, এবং নিজের ও দেশের জন্য কোনটা ভালো, সেটা বুঝতে পারবে,
অন্তত ততটুকু জ্ঞান একজন ভোটারের থাকা প্রয়োজন।
কিন্তু জনতার জ্ঞান বা দিনদুনিয়া সম্পর্কে ধ্যানধারণা আসে কোথাথেকে?
মিডিয়া থেকে। পত্রপত্রিকা থেকে। বুদ্ধিজীবিদের টক শো বা লিখা ব্লগ + বই থেকে।
এবার চিন্তা করুণ।
একটি দেশের এলিট শ্রেনী যদি সেই দেশের মিডিয়া নিয়ন্ত্রন করতে পারে, তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই সেই দেশের জনতার ব্রেনে ইচ্ছামত পারসেপশন, information, ঢোকানোর ক্ষমতা পেয়ে যাবে।
এসব নিউজ মিডিয়া ফলো করে জনতার দুনিয়া সম্পর্কে আইডিয়া হবে। ভালোমন্দের ধারনা তৈরি হবে।
এবং সেই ধারণা থেকেই তারা পলিটিসিয়ানদের এজেন্ডাকে কখনো সমর্থন দেবে, আবার কখনো উপেক্ষা করবে।
ফলে পলিটিসিয়ানরাও নিয়ন্ত্রিত হবে জনতা দ্বারা।
যেমন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব কথা বলে এবার নির্বাচনে রেকর্ড পরিমান ভোট পেয়ে রিপাবলিকান নমিনেশন জিতলো, এই ধরনের প্রস্তাব বা ইশতেহার নিয়ে যদি আজ থেকে ১৬ বছর আগে আমেরিকাতে ভোটে দাড়াতো, তাহলে খুব বাজে ভাবে হারতো।
অথচ গত ১৬ বছরে ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। ২০০১ এর পর থেকে অনরবরত মিডিয়া ব্যাশিং ইসলামোফোবিয়া এবং জেনোফোবিয়া বাড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন জনতার ভেতর। সেইসাথে ভীতি তৈরি করেছে। সবমিলিয়ে আরো বহুকিছুর স্বারমর্ম হল ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই উত্থান।
জনতার ভেতরে আগে থেকেই তৈরি হওয়া সেন্টিমেন্ট, পারসেপশন এবং পুঞ্জিভুত ক্ষোভকেই মুলত ট্রাম্প cash করতেছে এই নির্বাচনে।
এভাবে কখনো জনতাকে নিয়ন্ত্রন করে পলিটিসিয়ান তৈরি করা যায়।
আবার কখনো পলিটিসিয়ানদের দিয়ে জনতাকে ম্যানুপুলেট করা যায়।
জনতা এবং পলিটিসিয়ান একটি অপরটির পরিপুরক।
আর মিডিয়া, মোটা টাকা এবং স্পেশ্যাল ইন্টারেস্ট হল পাপেট মাস্টার।

এবং আমেরিকার পাপেট মাস্টারদের ভেতর সবচেয়ে আলোচিত হিসেবে কোখ ভাইদের নাম আসে সবার আগে।
Read More »